দোয়া: মুমিনের অব্যর্থ অস্ত্র (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রকাশিত: ৯:৪৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২০

লিখেছেন রিদওয়ানুল হাসান

[প্রথম পর্বের পর থেকে]

• দোয়া কবুলের বিশেষ সময়: বিভিন্ন হাদীসে দোয়া কবুল হওয়ার কিছু বিশেষ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ হল শেষ রাত্রি৷ দুঃখজনক হলেও সত্য, সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ সময়টিই আমাদের নিকট সবচে’ বেশি অবহেলিত৷ কেবল হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ীই নয় বরং পবিত্র কোরআনেও এই সময়টির গুরুত্ব বিবৃত হয়েছে৷ সূরা আলে ইমরানের ১৭ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিন বান্দাদের গুণবাচক পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, “আর যারা গভীর রাতে ক্ষমা প্রার্থনা করে৷”

সহীহ বুখারীর একটি হাদীসের মর্ম- নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “প্রত্যেক রাতের শেষ এক তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে আমাদের প্রতিপালক দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন৷ তিনি বান্দাদের ডাকতে থাকেন- কে আছে দোয়া করবে, আমি তার দোয়া কবুল করবো৷ কে আছে আমার কাছে চাইবে, আমি তার চাওয়া পূরণ করে দিবো৷ কে আছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করে দিবো৷”(¹)

দোয়া কবুল হওয়ার আর একটি বিশেষ সময় হলো প্রত্যেক ফরজ নামাযের অব্যবহিত পরের সময়টুকু৷ হাদীসের ভাষ্য- “সবচে বেশি দোয়া কবুল হয় রাতের গভীরে এবং ফরয নামাযের পর৷”(²) তবে ফরজ নামাজের পরের দোয়া নিয়ে আমাদের সমাজে কিছু প্রান্তিকতা রয়েছে৷ যেটা নিয়ে প্রবন্ধের শেষ ভাগে আলোচনা করা হবে৷

এছাড়াও দোয়া কবুল হওয়ার আরও কিছু বিশেষ সময় হলো- জুমার রাত, জুমার দিন, আযানের পর, আযান ইকামতের মধ্যবর্তী সময়, সফর অবস্থায়, ইফতারের সময়, দুই খুতবার মধ্যবর্তী সময়, অর্ধ শাবানের রাত, কদরের রাত, ঈদের রাত, নামাজে সেজদারত অবস্থায়, অসুস্থতার সময় ও জিহাদ অবস্থায়৷

 

• দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ:

দোয়ার শর্ত এবং আদবসমূহ যথাযথভাবে পালন করা না হলে দোয়া কবুল হওয়ার আশা করা যায় না৷ অনেক সময় আমরা ভাবি, উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যাওয়ার নামই দোয়া কবুল হওয়া৷ কিন্তু আমরা বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে প্রথম কিস্তিতে জানতে পেরেছি, মুমিন বান্দা যথাযথভাবে দোয়া করার পর তার দোয়ার তিনটি অবস্থা হতে পারে৷ নিকটবর্তী সময়ে প্রয়োজন পূরণ হওয়া কিংবা এর বিনিময়ে আখেরাতে সওয়াব পাওয়া অথবা এর পরিবর্তে কোনো বিপদ দূর হয়ে যাওয়া৷ সুতরাং আমি যে কোন দোয়া করলে এর বিনিময়ে আমার জন্য যা কল্যাণকর তাই আল্লাহ তায়ালা দান করবেন৷ যে উদ্দেশ্যে দোয়া করেছি সে উদ্দেশ্য পূরণ না হলে এ কথা ভাবা যাবে না- এতো দোয়া করলাম, কবুল হলো না!! হতে পারে আমার জন্য কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি এই মুহূর্তে অর্জিত হওয়া কল্যাণকর না বিধায় আল্লাহ তায়ালা এর পরিবর্তে আখেরাতের জন্য সওয়াব জমা করে দিয়েছেন বা কোনো বিপদ দূর করে দিয়েছেন৷ সুতরাং কাঙ্ক্ষিত বস্তু না পেলে বা উদ্দেশ্য হাসিল না হলে ভেবে নিবো আল্লাহ হয়তো এর বদলে উত্তম কিছুর ফায়সালা করে রেখেছেন৷

আমাদের সমাজে অধিকাংশের ক্ষেত্রে দোয়া কবুল না হওয়ার প্রধান কারণ হলো উপার্জন হালাল না হওয়া৷ মুসলিম শরীফের এক দীর্ঘ হাদীস, যেখানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৈধ উপার্জনের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন৷ ঐ হাদীসের শেষাংশে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করেন৷ তিনি বলেন, দীর্ঘ সফর শেষে এলোমেলো চুল, ধুলোমলিন চেহারা নিয়ে এক পথিক আল্লাহ তায়ালার দরবারে দোয়া করছে৷ অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পরিধেয় বস্ত্র হারাম এবং আহার্যও হারাম। কাজেই এমন ব্যক্তির দোয়া তিনি কী করে কবুল করতে পারেন!(³) এই হাদীসে অবৈধ বা হারাম উপার্জনের কারণে দোয়া কবুল না হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট৷

দোয়া কবুল না হওয়ার আরেকটি কারণ হলো দোয়ার মধ্যে হারাম জিনিস বা আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করার কোনো বিষয় থাকা৷ প্রবন্ধের প্রথম পর্বে আমরা একটি হাদীস পড়েছি, যেখানে বিষয়টার উল্লেখ রয়েছে৷

অপর মুসলিম ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করাও দোয়া কবুল না হওয়ার অন্যতম একটি কারণ৷ অর্ধ শাবানের রাত্রিতে দোয়া কবুল হওয়ার ফজিলত সম্বলিত হাদীসটিতে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে৷ হাদীসের ভাষ্য- “অর্ধ শাবানের রাতে আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিজগতের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন৷ অতঃপর সকলকে ক্ষমা করে দেন দুই শ্রেণীর লোক ব্যতীত৷ ১. যারা আল্লাহর সাথে শিরিক করে৷ ২. পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ করে৷”(⁴)

সুতরাং এই বিরাট ফজিলতপূর্ণ রাতে ক্ষমাপ্রাপ্তদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারব না যদি আমি অপর মুসলিম ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি৷ তাহলে এই ত্রুটি নিয়ে সাধারণ সময় কীভাবে আমার দোয়া কবুল হবে! এজন্যই দোয়া করার পূর্বে সকলের প্রতি অন্তর পরিস্কার করে নেওয়ার পরামর্শ ওলামায়ে কেরাম দিয়ে থাকেন৷

মুসলিম উম্মাহর মাঝে ব্যাপকভাবে ‘সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ’ উঠে যাওয়া দোয়া কবুল হওয়ার পথে বাধা হিসাবে হাদীসে বর্ণিত আরেকটি কারণ৷ ইবনে হিব্বানের বর্ণনা- নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “হে লোকসকল! আল্লাহ তা’আলা তোমাদের বলছেন, তোমরা সৎ কাজের আদেশ করো ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করো। এমন সময় যেন না এসে যায়- তোমরা দোয়া করবে কিন্তু তা কবুল হবে না। তোমরা চাইবে কিন্তু তা দেওয়া হবে না। তোমরা শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করবে কিন্তু তা কবুল করা হবে না।”(⁵)

এছাড়াও উদাসীনভাবে দোয়া করা, অন্য ফরজ আমলে ত্রুটি রেখে বা ফরজ আমল বাদ দিয়ে দোয়ায় মশগুল থাকা ইত্যাদি কারণগুলোর জন্যও অনেক সময় দোয়া কবুল হয় না৷

 

• দোয়া সংক্রান্ত কিছু ভ্রান্তি:

১. দোয়া করার জন্য পবিত্র থাকতে হয়৷
একটা হলো হাত তুলে আয়োজন করে দীর্ঘসময় দোয়া করার জন্য বসা৷ এক্ষেত্রে পবিত্র হয়ে যথাযথভাবে পরিচ্ছন্ন পোশাক পরে বসা উত্তম৷ আরেক হলো মনে মনে যে কোনো অবস্থায় নিজের হাজতের জন্য, গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করতে থাকা৷ দ্বিতীয় ক্ষেত্রে পবিত্রতা, আয়োজন করে বসা ইত্যাদি যদি শর্তই হতো তাহলে দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ সময়গুলোর অনেকগুলোতেই মানুষ দোয়া করার সুযোগ পেতো না৷ যেমন সফর, জিহাদ, অসুস্থতা ইত্যাদি অবস্থায়৷

২. ফরজ নামাজ পরবর্তী দোয়ায় হাত তুলতেই হবে কিংবা হাত তোলাই যাবে না৷ উভয়টাই প্রান্তিকতা৷ তিরমিজী শরীফের এক হাদীস- “নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তায়ালা তো বড় মহানুভব ও লজ্জাশীল৷ কোনো বান্দা যখন দুটি হাত তুলে তাঁর কাছে দোয়া করে তখন তিনি তাকে খালি হাতে ব্যর্থ অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে লজ্জাবোধ করেন৷”(⁶) বোঝা গেলো দোয়ার সাথে হাত তোলার একটা বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে৷ সুতরাং ফরজ নামাজ পরবর্তী দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ এই সময়টিতে যে কেউ হাত তুলে নিজের জন্য দোয়া করতেই পারে৷

আবার তাই বলে এই দোয়া ইমামের সাথেই শুরু করতে হবে কিংবা তার সাথেই শেষ করতে হবে, এমনটা না করলে কেমন যেন নামাজই অসম্পূর্ণ থেকে গেল- এগুলোও বাড়াবাড়ি৷ আল্লাহ তায়ালা উভয় প্রান্তিকতা থেকে আমাদের রক্ষা করুন৷

৩. আল্লাহুম্মা আমীন বলে দোয়া শুরু করা৷
দোয়ার সুন্নাহসম্মত একটি আদব হলো হামদ-ছানা-দরূদ এর মাধ্যমে দোয়া শুরু করা৷ দোয়া শুরুতেই ‘হে আল্লাহ আপনি কবুল করুন’ বলা সুন্নাহর খেলাফ৷ এবং হাজত পেশ করার আগেই কবুল করার কথা বলা অযৌক্তিকও বটে৷

৪. ব্যক্তিগত দোয়া বা আমলের চেয়ে সম্মিলিত দোয়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়া৷ দোয়া মৌলিকভাবে ইনফিরাদি তথা ব্যক্তিগত আমল৷ তবে বিশেষ বিশেষ প্রেক্ষাপটে সম্মিলিত দোয়ার একটা তাৎপর্য রয়েছে (যদি তাতে কোনো গলত রসম-রেওয়াজের মিশ্রন না থাকে)৷ মুসতাদরাকে হাকীমের হাদীস- “যখন কিছু লোক সমবেত হয় এবং তাদের কেউ দোয়া করে আর অন্যরা আমীন বলতে থাকে তখন আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই তাদের দোয়া কবুল করেন৷”(⁷) কিন্তু তাই বলে ব্যক্তিগত আমল বাদ দিয়ে সম্মিলিত দোয়ায় অংশগ্রহণ করতে হবে এমনটা কোথাও নির্দেশিত হয় নি৷

সম্মিলিত দোয়াকে অতি গুরুত্ব দেওয়ার আর একটি ক্ষতি হলো- দোয়া অনেকের কাছে এখন বিশেষ বিশেষ সময়ে আনুষ্ঠানিকতার নামমাত্র বিষয়ে পরিণত হয়েছে৷ এর ফলে বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণার যুগে ব্যক্তিগতভাবে দোয়া ও জিকিরের গুরুত্ব হারিয়ে যাচ্ছে৷ কোনো কোনো মহলে দোয়া নিয়ে এই উদাসীনতা তো রীতিমতো উন্নাসিকতার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে৷ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হেফাজত করুন।

দোয়া মুমিনের অস্ত্র, দ্বীনের খুঁটি, আসমান-জমীনের নূর৷ এই অস্ত্র যতো বেশি শক্তিশালী হবে রাব্বে কারীমের সাথে আমার বন্ধনরজ্জুও ততো দৃঢ় হবে৷ তিনি তো এমন মহানুভব দাতা— না চাইলে তিনি রাগান্বিত হোন৷ এমন দাতার দরবারে কেন আমাদের হাত দুটো বারবার উত্তোলিত হয় না! তাই দোয়া হয়ে উঠুক আমাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী৷ সকল প্রয়োজন পূরণে দোয়াই হোক আমার প্রথম পদক্ষেপ৷

গ্রন্থপঞ্জিঃ

1. সহীহ বুখারী: হাদীস নং 1145
2. সুনানে তিরমিজী: হাদীস নং 3499
3. সহীহ মুসলিম: হাদীস নং 2236
4. সুনানে ইবনে মাজা: হাদীস নং 1390
5. সহীহ ইবনে হিব্বান: হাদীস নং 290
6. সুনানে তিরমিজী: হাদীস নং 3556
7. মুসতাদরাকে হাকেম: 4/417
8. নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাও. আবদুল মালেক হা. – 1/48
9. প্রচলিত ভুল, মাও. আবদুল মালেক হা. – 69 পৃ

 

আরও পড়ুনঃ দোয়া: মুমিনের অব্যর্থ অস্ত্র (প্রথম পর্ব)