তরুণ আলেমদের ব্যবসাবান্ধব ভাবনা

প্রকাশিত: ৯:১১ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২০

তরুণ আলেমদের অনেকেই এখন ব্যবসা-বান্ধব চিন্তা করছেন। এটা একটি আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন। উলামায়ে কেরামদের একটি অংশকে ব্যবসা বান্ধব পরিবেশে নিয়ে আসার জন্য বর্তমানে আলোচনার যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে এটাকে অনেকেই সাধুবাদ জানাচ্ছেন। উলামায়ে কেরামদেরকে পরিকল্পিতভাবে সকল প্রকার ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে দূরে রাখা হয়েছিলো। আর আমরাও ভুলে গিয়েছিলাম যে, ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্রে কোন প্রকার কর্তৃত্ব করা যায় না, প্রভাব বিস্তার করা যায় না। যাদের হাতে ব্যবসা তাদের হাতেই থাকে সব।

ভারত উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ অধিপতি সিরাজউদ্দৌলার সময়ে যখন ব্যবসা ইংরেজদের হাতে তুলে দেওয়া হল তখন তাদের হাতে ক্ষমতাটাই তুলে দেওয়া হলো। আজও বর্তমান বিশ্বে চীন একচেটিয়া ব্যবসার বাজার দখল করে নিয়েছে ফলে সারা বিশ্বের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব তার হাতেই চলে আসবে।
করোনা ভাইরাস আমাদেরকে চিন্তার জগতে ব্যাপক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। আমরা ব্যবসা-বান্ধব হতে শুরু করেছি, চিন্তা করছি, একেবারেই প্রাথমিক যাত্রা, ব্যবসার সূচনা মাত্র, এই প্রেক্ষাপটে কিছু কথা আলোচনা না করলেই নয়।

“ব্যবসায় আলেম সমাজ : কিছু পরামর্শ” শীর্ষক লেখাটির সম্পূরক হিসেবে এখানে আরও কিছু কথা আলোচনা করা হলো

০১। ব্যবসার সব তথ্য প্রকাশ করা যাবে না।
ব্যবসা একটি কৌশল এর নাম। এর মাধ্যমে মুনাফা অর্জিত হয়। সেজন্য ব্যবসার সকল তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। আমাদের মধ্যে অনেক আলেম আছেন যারা সহজ-সরল। ওনারা মনে করেন, ব্যবসার সব তথ্য প্রকাশ করে দিলেই ব্যবসায় লাভবান হওয়া যাবে, এটা ঠিক নয়। ব্যবসায় অনেক গোপনীয়তা আছে। সেটা রক্ষা করতে হবে। সব সময় মনে রাখতে হবে যে, মনে করেন আপনি কোন পণ্য ১০ টাকায় কিনেছেন কিন্তু সেটার বাজার মূল্য ২০ টাকা বা ২৫ টাকা। আপনি যদি সেটা সৎ হতে গিয়ে ক্রয়মূল্য প্রকাশ করে দেন তাহলে ব্যবসায় লাভবান হতে পারবেন না। বাজার মূল্যের চেয়ে আপনি হয়তো এক টাকা বা দু টাকা কম নিতে পারেন। কারণ বাজারে প্রতিদিন সমান লাভ হবে না অথবা অনেক সময় পণ্য ঠিক মতো বিক্রি হবে না।

ব্যবসা করতে হলে বাজার মূল্য বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি জিনিস। আপনার ক্রয় মূল্য বিক্রয় মূল্য একটি গোপন জিনিস। সেটা শুধু আপনি জানবেন আর কেউ জানবে না। আর কাউকে বুঝতে দিবেন না। এতে আপনার কোন ক্ষতি নেই, নৈতিকতার মানদণ্ডে কোন অসুবিধা নেই। ব্যবসা মানেই কৌশল, ব্যবসা মানে গোপনীয়তা। কিছু বিষয় আছে যা হজম করতে হয়। এটা যে যতটা গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারবে সেই ব্যবসায় সফল হতে পারবে, টিকে থাকতে পারবে। কখনই ধোঁকার আশ্রয় নিবেন না, কাউকে মিথ্যা আশ্বাস দিতে পারবেন না। কিন্তু সব সত্য প্রকাশ করবেন না।

০২। নীতি ও আদর্শ বিসর্জন দেবেন না।
অনেক সময় দেখা যায় কিছু আলিম ব্যবসা করতে গিয়ে যাদের সাথে মিশেন, তাদের মত হয়ে যান। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ গ্রহণ করতে আগ্রহ বোধ করেন। ভুলে যান তার পেছনের কথা, তার শিক্ষার কথা, তার নৈতিকতার কথা। এটা কোনোভাবেই ঠিক নয়। হালাল পথে ব্যবসা করতে গেলে বাধা আসবে, প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এজন্য অন্যকে খুশি করার উদ্দেশ্যে পোশাক ঝেড়ে ফেলা, আদর্শ বিসর্জন দেওয়া, অন্য দশজনের মতোই হয়ে যাওয়া এটা একজন আলেমের জন্য, নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের জন্য চরম অপমানের বিষয়। এটা এক ধরনের আদর্শিক পরাজয়।

০৩। ব্যবসায় প্রয়োজন ধৈর্য ও গ্রাহকবান্ধব মনোভাব।
ব্যবসায় সফলতা ও ব্যর্থতার ঝুঁকি আছে। এটা বলা যতটা সহজ করা তত সহজ নয়। এখানে প্রয়োজন পরিশ্রম, নিরবচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালন। ব্যবসায় গ্রাহকের সন্তুষ্টি অর্জন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি লক্ষ্য করেছেন কি- চীন সারা বিশ্বের সকল অঞ্চলের সব শ্রেণী-পেশার মানুষের কি প্রয়োজন, তাদেরকে কতটা সহজ করে কোন পণ্য পৌঁছে দিলে তারা গ্রহণ করবেন এই বিষয়টার প্রতি তারা কতটা গুরুত্ব দেয়। নিত্যনতুন আবিষ্কার এর পিছনে তারা এমন ভাবেই ছুটছে যা অনেক মানুষ কল্পনাও করতে পারছে না। যে কারণে আমরা দেখি আমাদের জীবনের নিত্যব্যবহার্য প্রতিটি জিনিসই নতুন নতুন আকারে মার্কেটে নিয়ে আসছে চীন আর মানুষ সেটা কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এটাই হলো গ্রাহকবান্ধব ব্যবসায়িক চিন্তা।

আপনি ব্যবসা করতে চান তাহলে আপনাকে গ্রাহকের চাহিদা বুঝতে হবে, গ্রাহকবান্ধব হতে হবে, ক্রেতা বান্ধব হতে হবে। আপনি পণ্য বিক্রি করবেন কোন পণ্য টা কখন ক্রেতাসাধারণ কিনতে আগ্রহী সেটার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। গ্রাহকদের মনোভাব, তাদের পরিবর্তনশীল মানসিকতার সাথে সঙ্গতি রেখে আপনাকে ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করতে হবে। সেটা ছোট হোক কিংবা বড়। গ্রাহকবান্ধব ব্যবসা করতে গিয়ে আপনাকে হতে হবে অপরিসীম ধৈর্যশীল, হতাশ হলেও হবে না ভেঙ্গে পড়লেও চলবে না। গ্রাহককে আপনার পণ্যটি গিলাতেই হবে।

০৪। গ্রাহকের পরিবর্তনশীল চাহিদা বুঝতে হবে।
পৃথিবীতে ব্যবসার ধরন কখনোই এক ছিল না। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। এটা নিয়ে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে, আলোচনা হচ্ছে, কিভাবে মানুষের চাহিদা পূরণ করা যায় এই নিয়ে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করা হচ্ছে। সময়ের বিবর্তনে গ্রাহকের চাহিদা ও পরিবর্তন হয়। সেজন্য গ্রাহককে আপনার পণ্য গ্রহণ করতে নানান কৌশল নিতে হবে । আর গ্রাহক কি চায় তার কোন জিনিসটা কখন কিনতে পছন্দ করে সেটার দিকে আপনাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

০৫। গ্রাহকের আস্থা ও আগ্রহ ধরে রাখতে হবে।
ব্যবসার সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল গ্রাহকের আস্থা ও আগ্রহ ধরে রাখতে পারা। গ্রাহক যদি কোন ব্যবসার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে তাহলে সে ব্যবসা আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আমরা যারা নতুন নতুন বিভিন্ন ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছি তাদের সামনে এ বিষয়টি বড় ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ। ব্যবসা যত ছোটই হোক না কেন সেই ব্যবসায় গ্রাহকের চাহিদা এবং আগ্রহ ধরে রাখতে হবে। আস্থা ধরে রাখতে হবে।

মনে করেন আপনি একটি ডেইরি খামার করেছেন সেখান থেকে যে দুধ উৎপাদিত হয় তার প্রতি যে আস্থা থাকার কথা সেটা যদি ধরে রাখতে না পারেন তাহলে কিছুদিন পরেই আপনি ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এইজন্য ব্যবসায় অতি মুনাফালোভী চিন্তা না করে দীর্ঘস্থায়ী চিন্তা করতে হবে। গ্রাহককে ধরে রাখতে হবে। সারাবিশ্বে ইয়াহুদী এবং হিন্দুরা এই নীতিতেই কাজ করছে। তারা গ্রাহক থেকে সুযোগ নিচ্ছে কিন্তু গ্রাহকের আগ্রহও ধরে রাখার জন্য যতটা কৌশল অবলম্বন করা দরকার সেটা তারা করছে। আপনি বাটা জুতার কথাই ধরুন, সব জায়গায় সব সময়ই তাদের চাহিদা থাকে, কারণ তারা একটি নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে ব্যবসা করে।

০৬। ব্যবসা একটি সমাজের প্রধান চালিকাশক্তি আর রাজনীতি এর পাহারাদার।
আমরা মাঝে মাঝেই আফসোস করে বলি, আমাদের ইসলামী আন্দোলন কেন সফল হয় না? কেন ইসলামী জাগরণগুলো টিকে থাকে না? কেন আলেমদের মধ্যে অনেক রাজনীতিবিদ পয়সার কাছে বিক্রি হয়ে যায়? কারণ ব্যবসা যাদের হাতে তাদের হাতে রাজনীতি, তাদের হাতেই ক্ষমতা, তাদের হাতে দেশ। তারাই সবকিছু চালায়। আমাদের অজান্তেই আমরা তাদের দ্বারা পরিচালিত হই। মনে রাখবেন রাজনীতিতে রসদ যোগায় এই ব্যবসা। যদি ব্যবসা না থাকে তাহলে আপনি রসদ কোত্থেকে? আমাদের ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী জাগরণ, ইসলামী বিপ্লব কোন কিছুই টিকে না। কারণ আমাদের হাতে ব্যবসা নেই। আজ সারা বিশ্বে ব্যবসা ইহুদীদের হাতে ব্যবসা। তাই ক্ষমতাও তাদের হাতে, ব্যবসা বৌদ্ধদের হাতে ক্ষমতা ও তাদের হাতে, ব্যবসা খ্রিস্টানদের হাতে ক্ষমতাও তাদের হাতে, ব্যবসা হিন্দুদের হাতে ক্ষমতাও তাদের হাতে। মুসলমানদের হাতে ব্যবসাও নেই ক্ষমতাও নেই।

অতএব জাগতিক কর্তৃত্ব – নেতৃত্ব অর্জনের জন্য ব্যবসায়িক সফলতা ছাড়া কোনভাবেই শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসা সম্ভব নয়। এক কথায় ব্যবসা যার হাতে দুনিয়া তার হাতে। তাহলে আপনিই চিন্তা করুন আপনি কি সফল হতে চান নাকি সারা দুনিয়ার ইয়াহুদি খ্রিস্টান বৌদ্ধ হিন্দুদের হাতের পুতুল হয়ে থাকতে চান?

 

-সৈয়দ শামছুল হুদা
জেনারেল সেক্রেটারি
বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট বিআইএম