ঢাকা, রবিবার ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১১ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

কামিনী রায়: একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী নারী ও কবি (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)


প্রকাশিত: ১০:২০ অপরাহ্ণ, জুন ১৫, ২০২০

লিখেছেন: স্বর্ণা লাকী।

 প্রথম পর্বের পর থেকে।

বন্ধুদের কথায় চণ্ডীচরণের ভুল ভাঙলো। ফলে ১৮৮৬ সালে কামিনী রায় পিতার ইচ্ছাতেই বেথুন বিদ্যালয়ে শিক্ষায়িত্রী হিসেবে যোগদান করেন। ১৮৯১ সালে কামিনী রায় এ স্কুলের কলেজ বিভাগে তৃতীয় লেকচারার পদে উন্নীত হন। কামিনী রায়ের সাড়া জাগানো কাব্যগ্রন্থ আলো ও ছায়া প্রকাশিত হয় ১৮৮৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এ গ্রন্থটির অধিকাংশ কবিতা অনেক বছর আগে লেখা হয়েছিলো। তাঁর উপর পিতা ও বন্ধুরা তাকে অনেকবার কবিতাগুলো ছাপানোর জন্য অনুরোধ করেছিলো,কিন্তু তিনি কোনো মতে রাজি হন নি। পরবর্তীতে তাঁর পিতার কোন এক বন্ধু কামিনী রায়ের নাম গোপন করে কবিতাগুলোকে কবি হেমচন্দ্রকে দেখান এবং তাঁর মতামত জানতে চান। কবিবর হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় কবিতাগুলো পাঠ করে আলো ও ছায়া কাব্যগ্রন্থের উদার প্রশংসা করেছিলেন। প্রথমে লেখিকার নাম গোপন করে প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে ব্যাপক জনসমাদর লাভ করেছিলো বলে আলো ও ছায়া কাব্যগ্রন্থটির লেখিকার নাম বেশিদিন গোপন থাকে নি। আলো ও ছায়া কাজ নিয়ে পরবর্তীতে Calcutta Review পত্রিকায় উচ্চ সুখ্যাতিপূর্ণ সমালোচনা করেছিলেন স্টাচুটারি সিভিলিয়ান সুপণ্ডিত কেদারনাথ রায়। ১৮৯৪ সালে বিপত্নীক কেদারনাথের সাথে কামিনী রায়ের বিয়ে হয়।

 

বিয়ের পর তিনি বেথুন কলেজের অধ্যাপিকার পদ থেকে যেমন অবসর নেন তেমনি এ সময়ে কব্যচর্চায়ও সাময়িক বিরতি নেন। তিনি কব্যচর্চা ছেড়ে দিয়েছেন কেউ কেউ এ অভিযোগ তুললে কামিনী রায় তাঁর সন্তানদের দেখিয়ে বলতেন, ‘এগুলোই আমার জীবন্ত কবিতা’। জীবনের একটা বিশেষ সময়ে এসে গৃহকর্ম, স্বামী-সেবা ও সন্তান-পালনই প্রধান কাজ মনে করে আত্মশক্তিকে সেদিকে নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু কামিনী রায়ের এই সুখের সংসারে কিছুদিনের মধ্যেই দুঃখের কালো মেঘ এসে উপস্থিত হয়। ১৯০০ সালে মৃত্যু হয় তাঁর এক সন্তানের। এরপরে ১৯০৩ সালে বোন প্রেমকুসুম এবং ১৯০৬ সালে ভাই যতীন্দ্রমোহন এবং পিতা চন্ডীচরণ সেনের মৃত্যু হয়। ১৯০৯ সালে ঘোড়ার গাড়ী উল্টে যাওয়ায় কেদারনাথ রায় গুরুতর আহত হন এবং পরে মৃত্যু হয়। এর চার বছর পরে কিশোর পুত্র আশোকের মৃত্যুতে তিনি মানসিকভাবে দারুণ আঘাত পান। নানারকম দুঃখ কষ্টে জর্জরিত কবি কামিনী রায় পুনরায় কাব্যরচনায় মনোযোগী হন। কাব্যচর্চার পাশাপাশি এ সময় সামাজিক ও ধর্মসম্পর্কিত নানাবিধ কাজের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে থাকেন। ১৯২৯ সালে কামিনী রায় তাঁর কাজের স্বিকৃতিস্বরূপ কলকাতা বিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিনী সুবর্ণ পদক’ লাভ করেন। ১৩৩২ বঙ্গাব্দের ৭ চৈএ বৈদ্যবাটির যুবক সমিতির এবং ১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দে ১৯ তম বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মলের সাহিত্য শাখার সভাপতিত্ব করেন। ১৯৩২-৩৩ খ্রীষ্টাব্দে নিযুক্ত হন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ এর সহ-সভাপতি পদে।

 

কামিনী রায়ের কবিতা আমরা সকলেই শৈশবে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে কমবেশি পড়েছি –

করিতে পারি না কাজ / সদা ভয় সদা লাজ / সংসয়ে সংকল্প সদা টলে,পাছে লোকে কিছু বলে।

 মূলত কামিনী রায় ছিলেন আপাদমস্তক একজন গীতিকবি। উনিশ শতকের বাংলা গীতিকবিতায় বিষয়বৈচিত্রে, ভাবের গভীরতায়, ভাষার সরলতায়, রুচির নির্মলতায়,সর্বত্র হৃদয়গ্রাহী ও নারী হৃদয়ের অকৃত্তিম প্রকাশে, সর্বোপরি ছন্দমাধুর্যে কামিনী রায়ের কবিতা অনন্য ও অনুপম। বিষয়নিষ্ঠা, নীতিচিন্তা ও উপদেশাশ্রয় এসব বৈশিষ্ট্য প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পূর্বসূরিদের ধ্যানধারণার সাথে সংযোগসাধন করেছিলেন। প্রবাদের মতো মর্যাদা পেয়েছে তাঁর নীতি বিষয়ক কবিতাগুলো। যেমন

আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনি পরে,সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।

অথবা

পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলি দাও, তার চেয়ে সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও।

 

হেমচন্দ্র-নবীনচন্দ্র যুগের পর আসে রবীন্দ্র যুগ। সে এক অদ্ভুত যুগসন্ধিক্ষণ। মধুসূদন, দীনবন্ধু, বঙ্কিমচন্দ্রের পর বাংলা ভাষায় এক কৃত্তিমতার যুগের আবির্ভাব ঘটে। হেমচন্দ্র- নবীনচন্দ্র এ কৃত্রিম যুগের কবি। ইংল্যান্ডের এলিজাবেথান যুগের পর এসেছিলো পোপ ড্রাইডেনের কৃত্রিম যুগ, রোমান্টিক যুগের পর এসেছিল অর্ধ-কৃত্তিম ভিক্টোরিয়ান যুগ। ফ্রান্সে ও Moliere, Corncille পর তেমন আর সাহিত্যিক দেখা যায় নি। বহুদিন পরে আবার ভিক্টর হিউগো,ডুমা প্রমুখ বিপুল প্রতিভাবাপন্ন লেখক দেখা দেয়।

 

স্পেনেও তাই Cervantes ও Lope de vega এরপর আসে অচল কৃত্রিমতার যুগ। সে যুগে Luis de Carrillo , Gongora Gomez প্রমুখ লেখক তখনকার দিনে বেশ নাম করলেও এখন আর তাদের সাহিত্য প্রতিষ্ঠা নেই। বিহারীলালসহ আমাদের বাংলা সাহিত্যের অনেক কবি এক অভিনব সুর তুলে কাব্য মালঞ্চ ঝংকৃত করে তুলেন। কবি কামিনী রায়ও সেই যুগসন্ধিক্ষণের একজন কবি। এ যুগের প্রায় সব কবির কাব্য প্রতিভা রবীন্দ্র প্রভাবে অল্পবিস্তর চঞ্চল হয়েছে ; হয়নি শুধু কামিনী রায় এবং স্বভাব কবি গোবিন্দচন্দ্র দাস এর।

 

সে যুগে পাশ্চাত্য সাহিত্যের মতো বাংলা সাহিত্যেও অনেক লেখক বেশ সুনাম করলেও এখন আর তাদের সাহিত্য সহজলভ্য নয়। এ সময়ে দাঁড়িয়ে কামিনী রায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে ততোটা প্রভাবিত হন নি যতোটা হয়েছেন হেমচন্দ্র,মধুসূদন, বিহারীলাল দ্বারা। সেকেলে বলেও যেমন কামিনী রায় এর কবিতা পরিত্যাগ করা যাবে না তেমনি আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও তাঁর কবিতা পুরোপুরি আধুনিক নয়। এ যুগসন্ধিক্ষণে আবির্ভূয়ত হয়েও কামিনী রায় তাঁর কাব্যে স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার সুকুমার সেন কামিনী রায়ের কবিতা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন-

কামিনী রায়ের কাব্যে নারী হৃদয়ের প্রকাশ যতটা অকৃত্রিম এমনটি ইতিপূর্বে কোন মহিলার রচনায় দেখা যায় নাই। কামিনী রায় এর কবি দৃষ্টি আত্মগত অথচ বাহিরের প্রতি অনুদাসীন এবং বিহারীলালের মতো ভাবোন্মত্ত অথবা অক্ষয়কুমারের মতো ভাবাতন্ময় নয়।বিষয়নিষ্ঠা, নীতিচিন্তা এবং উপদেশাশ্রয় ইহার পূর্বগামী কবিদের ধারার সাথে যুক্ত রাখিয়াছে। ভাষা পরিমিত ও সংযত কিন্তু সংগীতময় নয়। ছন্দে তরঙ্গেও বৈচিত্র নাই। নিঃস্বার্থতা ইহার কাজের বিশিষ্ট সুর।

 

১৮৮৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কামিনী রায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ আলো ও ছায়া প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের কবিতাগুলো পাঠ করে হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন-‘এ কবিতাগুলো আমার বড়ই সুন্দর লাগিয়াছে, স্থানে স্থানে এমন মধুর ও গভীরভাবে পরিপূর্ণ যে, পড়িতে পড়িতে হৃদয় মুগ্ধ হইয়া যায়। ফলত বাঙ্গালা ভাষায় এরূপ কবিতা আমি অল্প পাঠ করিয়াছি। কবিতাগুলো আজকালের ছাঁচে ঢালা। বস্তুত কবিতাগুলোর ভাবের গভীরতা, ভাষার সরলতা,রুচির নির্মলতা এবং সর্বত্র হৃদয় গ্রহীতাগুণে আমি নিরতশয় মোহিত হইয়াছি। পড়িতে পড়িতে গ্রন্থকারকে মনে মনে কতই সাধুবাদ প্রদান করিয়াছি। আর বলিতেইবা কি স্থলবিশেষ হিংসারও উদ্রেক হইয়াছে। আমার প্রশংসাবাদ অত্যুক্তি হইলো কিনা, সহৃদয় পাঠক পাঠিকাগণ পুস্তকখানি একবার পাঠ করিলেই বুঝতে পারিবেন। আমি কায়মনোবাক্যে আশীর্বাদ করি যে, এ নবীন কবি দীর্ঘজীবী হইয়া বঙ্গ সাহিত্যসমাজের মুখোজ্জ্বল করুন।’

জনৈক সমালোচক কামিনী রায়ের কবিতার আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন – কামিনী রায়ের কবিতাগুলোর প্রধান গুণ তাহার কোনখানে অল্প দোষ নাই। ভাবের জটিলতা নাই। ছন্দের আড়ষ্টতা নাই। তা অবান্তুর চিন্তাতরঙ্গ পাঠকের চিত্ত পীড়ার উদ্রেক করে না। তাহা লঘু, স্বচ্ছ,নির্মল,চটুলতা বা অসংলগ্নতা দোষ হইতে মুক্ত।

 

কামিনী রায়ের অধিকাংশ কবিতা ভাবসম্পদে পূর্ণ। তাঁর কবিতায় বিশ্বসাহিত্যের অপূর্ব বিকাশ পরিলক্ষিত হয়। বিষয় গৌরবের দিক দিয়ে তাঁর কোন কোন কবিতা রবীন্দ্রনাথের পূর্বগামী বলে মনে হয়। এ প্রসঙ্গে যোগেন্দ্রনাথ গুপ্তকে লেখা কবির এক চিঠি উদ্ধৃত করা যেতে পারে। কামিনী রায় এর মতে, আমার মনে হয় আমি কিছু অকালপক্ব ছিলাম। কতকগুলো বিষয় আমি রবীন্দ্রনাথের পূর্বেই লিখিয়াছি। কিন্তু তিনি যখন লিখিয়াছেন অনেক সুন্দর করিয়া লিখিয়াছেন। রাম রাম বসুর মতে, স্বাভাবিক প্রতিভার সহিত উচ্চশিক্ষার সহযোগ ঘটাইতেই তাঁহার রচনা মার্জিত ও শিল্পসুষমামণ্ডিত হইবার অবকাশ পাইয়াছিলো।

 

কামিনী রায় নিজেই এক চিঠিতে লিখেছেন, সুখ,দুঃখ,ক্ষুধা,তৃষ্ণা, আশা,আকাঙ্খা,গভীর আনন্দ ও তীব্র বেদনা এ সকল দিয়া যে মানবজীবন তাহার একটি জাগ্রত অস্তিত্ব আছে এবং তাহার একটি সরল সবল প্রকাশের উপযোগী কবিতাও আছে এবং থাকিবে। ড. কাজী দীন মোহাম্মদ এ প্রসংগে লিখেছেন, মানব জীবনের তীব্র বেদনাময় অস্তিত্বের প্রকাশ তার কাজের ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে। মোতাহার হোসেন সুফি লিখেছেন, উনিশ শতকের শেষার্ধে গীতিকবিতা রচনার ব্রতী মহিলা কবিদের মধ্যে কামিনী রায় নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ। রবীন্দ্রনাথের সর্বগ্রাসী প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার জন্য তিনি সচেতন প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু রবীন্দ্র প্রভাব থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।

অপরপক্ষে হেমচন্দ্রের প্রতি নিরতিশয় শ্রদ্ধা প্রকাশ করলেও ভাবে এবং ভাষায় তিনি হেমচন্দ্রকেও যথার্থভাবে অনুসরণ করেন নি। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অভিধান গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে বীতশোক ভট্টাচার্য কামিনী রায়ের কবিতা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন – কামিনী রায় ছিলেন বিশিষ্ট বাঙ্গালি কবি। হেমচন্দ্রের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ছিলো। রবীন্দ্রনাথের অভিঘাতও তার কাব্যে কাজ নেই। পরে তাঁর অনেক বই বেরিয়েছে, হেমচন্দ্রের ভূমিকা লেখা আলো ও ছায়াই কিন্তু তাঁর সেরা বই।

 

অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন – গত শতাব্দীর মহিলা কবিদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় কামিনী রায়ের লেখায় একটি নিরবচ্ছিন্ন বেদনার সুর লক্ষ্য করা যায়। তাহার আলো ও ছায়া বিবাহের পূর্বেই রচিত ও প্রকাশিত হয়। সুতরাং ব্যক্তিগত শোক নহে, রোমান্টিক বিষাদই তাহার কাজের মূল ভিত্তি। প্রথম যৌবনেই কবি হৃদয় অরণ্যে কাদিঁয়া ফিরিয়াছেন। মানবজীবনের ব্যর্থতা সম্বন্ধে সচেতনতাই এই বিষাদের প্রেরণা দিয়াছে।

 

রবীন্দ্রনাথের আসন যখন বাংলায় পাকা হয় নি, আলো ও ছায়া তখন নতুন রস, নতুন রুচি সৃষ্টি করেছিলো। হেমচন্দ্র তাঁর কবিতায় আজকালের ছাঁচ লক্ষ্য করেছিলেন। হেমচন্দ্রের যুগের কবিতায় একধরনের সরল সবলতা ছিল। গিয়াছে ভাঙিয়া সাধের বীণাটি/ ছিঁড়িয়া গিয়াছে মধুর তার ; হেমচন্দ্রের অনুবর্তী কবিরূপে কামিনী রায় এ সুর সেধেছিলেন। কামিনী রায়ের আত্মভাবনার কবিতায় ঐ সরল সবলতা আছে। সাহসী উচ্চারণের জন্য তাঁকে কখনো কখনো আধুনিক মনে হয়।

 

পুরাণনির্ভর কবিতা লেখায় তিনি যেমন নতুনত্ব দেখিয়েছিলেন তেমনি সংস্কৃত কবিতার সাথে পরিচয় তাঁর কবিতা ভাষাকেও পরীশীলিত ধ্বনি দিয়েছেন। মার্জিত ভাষা এবং সহজ ধীর ছন্দে লেখা তাঁর কবিতাগুলো একটি মসৃণ আতপ্ত করপুটে সকরণ ও সুকুমার কিছু মাল্য ও নির্মাল্য ধরে রেখেছেন।

 

বাংলা বিশ্বকোষ দ্বিতীয় খন্ডে কামিনী রায়ের জীবনী আলোচনায় দেখা যায়- সংস্কৃত সাহিত্যে গভীর জ্ঞানের জন্য তাহার কবিতায় পৌরাণিক চিত্র অত্যন্ত প্রাঞ্জল। তাহার কাব্য ভাষা ক্লাসিকাল হইলেও তাহাতে রোমান্টিকতার সুর আছে।

বাংলা সাহিত্য পরিক্রমা গ্রন্থে ভোলানাথ ঘোষ লিখেছিলেন- কামিনী রায় তাঁর আলো ও ছায়া কাব্যগ্রন্থের জন্যই বিশেষভাবে স্মরণীয়। এছাড়া অশোক সঙ্গীত, পৌরাণিকী প্রভৃতি কাব্যও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

ভাষায় সারল্য, ছন্দের সংহত রূপ, ভাবের সহজ প্রকাশ তাঁর কাব্য রচনাকে বিশিষ্টতা দান করেছে। কামিনী রায় অনেকগুলো সনেট রচনা করেছিলেন। গঠন ভঙ্গি ও ভাবাবেগের দিক থেকে ওর রচিত সনেটগুলো অনবদ্য হয়ে উঠেছে। কামিনী রায় রচিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে আলো ও ছায়া (১৮৮৯), নির্মাল্য (১৮৯১), পৌরাণিকী (১৮৯৭), গুঞ্জন (১৯০৫), ধর্মপুত্র (১৯০৭), অশোক স্মৃতি (১৯১৩), শ্রাদ্ধিকী (১৯১৩), মাল্য ও নির্মাল্য (১৯১৩), অশোক সঙ্গীত (১৯১৪), অম্বা (১৯১৫), সিতিমা (১৯১৬), ঠাকুরমার চিঠি (১৯২৪), দীপ ও ধূপ (১৯২৯), জীবনপথে (১৯৩০) প্রভৃতি।

 

এছাড়াও কামিনী রায় এর বেশ কিছু গদ্য রচনা রয়েছে। যেমনঃ জ্ঞান বৃক্ষের ফল, সুপ্তশক্তির জাগরণ, অশ্বিনীকুমার দত্তের বিশিষ্টতা, কৃষ্ণভাবিনী নারী শিক্ষার মন্দির, স্বর্গীয়া বামাসুন্দরী দেবী, ডাক্তার কুমারী ঘামিনী সেন, বাংলার নরনারী সম্বন্ধ প্রভৃতি। কামিনী রায় এর বিখ্যাত কবিতাগুলোর মধ্যে – পাছে লোকে কিছু বলে, সুখ, গাঙ্গ যে মোরে বোলায়, অনুকারীর প্রতি, মুগ্ধ প্রায়, সে কি? সৌন্দর্য ও ভালবাসা, নারী নিগ্রহ, জাগরণী সংগীত, স্থবীরা, নবীন কর্মী উল্লেখযোগ্য।

বাংলা সাহিত্যের এ অপ্রতিদ্বন্দ্বী নারী কবি কামিনী রায় ১৯৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর (১১ অশ্বিন ১৩৪০) পরলোক গমন করেন। মৃত্যু কালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৬৯ বছর।

 

তথ্যসূত্র:

(১) কামিনী রায় রচনাসংগ্রহ : ড. মিজান রহমান। ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ ২০০৭।

(২) কামিনী রায় : জীবন ও সাহিত্য : ড. মিজান রহমান সম্পাদিত। কথা প্রকাশ ২০০৭।

(৩) কামিনী রায় : মিজান রহমান। কথা প্রকাশ ২০১৩। (

৪) বঙ্গের মহিলা কবি : যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত। কলিকাতা ১৩৩৭।

(৫) কামিনী রায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা। ড. বারিদবরণ ঘোষ সম্পাদিত। ভারবি ২০০১।

 

আরও পড়ুন: কামিনী রায়: একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী নারী ও কবি (প্রথম পর্ব)