বরিশালের নারীঃ কবি কুসুমকুমারী দাস ( দ্বিতীয় পর্ব)

প্রকাশিত: ৯:২৩ অপরাহ্ণ, জুন ৫, ২০২০
ছবিঃইন্টারনেট। কবি কুসুমকুমারী দাস।

লিখেছেনঃ স্বর্ণা লাকী

সাহিত্য মূল্যায়ন :

বিশ শতকের প্রথম তিন দশকে যেসব বাঙ্গালী মেয়ে সাহিত্যচর্চা করেছেন কুসুমকুমারী দাস তাঁদেরই একজন। মূলত কিশোর  ও তরুণদের উদ্দেশ্যে রচিত কবিতাগুলোর জন্য কুসুমকুমারী সর্বাধিক পরিচিত। কুসুমকুমারী দাসের সাহিত্যকর্মের সার্বিক বিচারে ড.সুমিতা চক্রবর্তী যে মন্তব্য করেছেন তা অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য-

স্ত্রী শিক্ষার প্রথম যুগে যে মেয়েরা সারাজীবন সাহিত্য সাধনার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রেখেছে তিনি তাঁদেরই একজন। সাহিত্যরুচির একটি একান্ততা ছিল তাঁর মধ্যে। নিজেদের জীবন ও সামাজিক পরিবেশ থেকে একটি আদর্শ ছেঁকে নিতেন এবং লেখায় তাকে রূপ দিতে চেষ্টা করতেন। লেখার মধ্য দিয়ে উচ্চভাব প্রকাশ করতে হবে- বঙ্কিম যুগের এই প্রতিষ্ঠিত ধারণার তাঁরাই ছিলেন শেষ বাহক।

সত্যিকার অর্থে ব্রাহ্মসমাজের নারীরা সে সময় স্ত্রী শিক্ষা ও স্ত্রী স্বাধীনতার পথ উম্মুক্ত করেছিলেন। কুসুমকুমারী দাসের সাহিত্য কর্ম সম্পর্কে পুত্র, কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন :

প্রথম জীবনে মা কয়েকটি কবিতা লিখেছেন। যেমন ‘ছোট নদী দিনরাত বহে কূলকুল’ অথবা ‘দাদার চিঠি’ কিংবা ‘বিপাশার পরপারে হাসিমুখে রবি উঠে’।একটি শান্ত অর্ধঘন সুম্মিত ভোরের আলো শিশির লেগে রয়েছে যেনো এসব কবিতার শরীরে। সে দেশ মায়েরই স্বকীয় ভাবনা, কল্পনার স্বীয় দেশ। কোন সময় সেখান থেকে এদের স্থানচ্যুত করতে পারবে না।

ছোট বেলা থেকেই কবিতা ও প্রবন্ধ লেখার হাত ছিলো কুসুমকুমারী দাসের। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় তাঁর এই ক্ষমতাকে সব সময় উৎসাহিত করতেন। “প্রবাসী” সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় শিশুদের জন্য যে চিত্র শোভিত বর্ণশিক্ষার বই লিখেছিলেন,তার প্রথমভাগে কুসুমকুমারী রচিত যুক্তাক্ষরবিহীন ছোট ছোট দু একটি পদ্যাংশ সংযোজন করেছিলেন। যেমন-

“ছোট নদী দিনরাত বহে কুলকুল, পরপারে আমগাছে থাকে বুলবুল”।

কুসুমকুমারীর কবিতাগুলো ব্রাহ্মবাদী ,প্রবাসী , মুকুল ,বামাবোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কুসুমকুমারীর মুকুলপৌরাণিক আখ্যায়িকা নামে দুটি গ্রন্থের কথা বিভিন্নজন উল্লেখ করলেও আজ পর্যন্ত প্রাচীন গ্রন্থাগার ও মুদ্রিতগ্রন্থ তালিকায় কুসুমকুমারীর কোনো বইয়ের সন্ধান পাওয়া যায় নি।

স্মৃতিসুধা  নামে তিনি একটি আত্মজীবনী লেখা শুরু করেছিলেন কিন্তু সেটিও বেশি দূর এগোয় নি। কুসুমকুমারী কবিতা,প্রবন্ধ, দিনলিপি, শিশুতোষ গল্প এবং অসাপ্ত আত্মজীবনী রচনা করেছেন। তবে তাঁর রচনার বড় অংশই কবিতা।তাঁর প্রবন্ধ ব্রাহ্মসমাজের বিভিন্ন সভায় পাঠের উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছে। তিনি নারীত্বের আদর্শ নামে একটি প্রবন্ধ লিখে স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন।

জীবনানন্দ দাশ প্রণীত ‘আমার মা ও বাবা’ প্রবন্ধটি পাঠকের জন্য উল্লেখ করছি-

আমার মা ও বাবা : জীবনানন্দ দাশ

আমার বাবা ছিলেন সত্যানন্দ দাস। তাঁর সম্বন্ধে ভাবতে গেলেই মনে হয় – ভিতরের সঙ্গে বাইরের জীবনের যে বিরোধে একদিকে মানুষের ব্যক্তিমানস ও অন্যদিকে তার ব্যবহারিক ও জনমানস আশ্রয়ী জীবনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, তাঁর বেলায় তা তেমন নিঃশেষে ঘটে উঠতে পারে নি।

আমার মা শ্রীযুক্তা কুসুমকুমারী দাস বরিশাল শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি কলকাতার বেথুন স্কুলে পড়তেন। খুব সম্ভবত ফার্স্ট ক্লাস অবধি পড়েছিলেন।তারপরেই তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। তিনি অনায়াসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষায় খুব ভালোই করতে পারতেন।  পচিঁশ, ত্রিশ, চল্লিশ বছর আগে আমাদের বরিশালের বাড়িতে পরিবারের লোকসংখ্যা অনেক ছিলো। জেঠিমা ও মাকে সারা দিন গৃহস্থালির কাজকর্মে ব্যস্ত থাকতে দেখেছি। তখনকার দিনে পরিবারের অবস্থা বিশেষ স্বচ্ছল ছিলো না। কিন্তু জেঠিমা ও মা’র অক্লান্ত কাজকর্মে এবং এর উপরে ঠাকুমার তদারকিতে কতো বিরোধী, অস্বভাবী অবস্থার ভিতর দিয়ে কি রকম সহিঞ্চু, নিরলস ও স্বার্থকভাবে সংসারের কাজ সম্পন্ন হতো- সে কথা ভাবলে আজ আশ্চর্য হতে হয়।

খুব সকালবেলা, এমনকি শীতকালেও খুব ভোরে তাঁরা ঘুম থেকে উঠতেন এবং অনেক রাত পর্যন্ত সংসারের কাজ কর্ম সেরে ঘরে আসতেন। কোন রেহাই ছিলো না। রেহাই তাঁরা পাননি। পরিশ্রমকে ভয় করতেন না। কর্তব্যবোধ পরিপূর্ণভাবে সজাগ ছিলো। দায়িত্বকে এড়াবার কথা তাঁরা ভাবতেও পারতেন না। আরাম বিরাম বিশেষ কাকে বলে সে কথা তাঁরা নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতায় অনুভব করে দেখেন নি। শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্য কী জিনিস সে কথা ভাববার অবসরও ছিলো না। নিজের স্বকীয় সংসারের জন্য ঠিক নয় – একটা প্রকাণ্ড বড় বিমিশ্র সংসারের জন্য যেখানে প্রায়ই অতিথি আসতো শত শত, পরিজন আসতো বহুল পরিমাণে সেই বৃহৎ, বিমিশ্র সংসারের কাজে দাক্ষিণ্য ভরসায় ভরপুর অক্লান্ত সেবিকার মতো নিজেদের নিয়োজিত করে রাখতেন।

মনে পড়ে বরিশালের শীতের সেই রাতগুলো, যখন খুব ছোট ছিলাম, সন্ধ্যা রাতেই চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে যেতো। আমাদের পড়াশোনা,খাওয়া-দাওয়া শেষ হতো।বাবা বাতি জ্বালিয়ে অনেক রাত অবধি লিখতেন। টের পেতাম- মা রান্না ঘরে আছেন। সংসারের শেষ মানুষটির খাওয়া-দাওয়া সান্ধ্য হলে তবে তিনি ঘরে ফিরতেন। কিন্তু যতই রাত হোক না কেনো, মা ঘরে না ফিরলে দু’চোখ ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আসলেও ঘুম প্রতিরোধ করে জেগে থাকতে চাইতাম। মা ঘরে এলে তবে ঘুমোব। খুব দেরিতে আসতেন। চারদিকে শীতের রাত যখন নিথর, নিস্তব্ধ, আমাদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে নারিকেল-বীথির ভিতর থেকে বাজকুরল পাখি ডাকতো,প্রহরে প্রহরে, বরিশালের শীতের শিয়রে অনন্ত অন্ধকারে দেবযানী আত্মাদের সঙ্গে।

মা ঘরে এসে ঘুরতেন,ফিরতেন এবংসেবা করতেন। দূরে পাখির ডাক ,আমি এখনো জেগে আছি কেনো,  কতদূর কী পড়াশোনা করেছি জিজ্ঞাসা করতেন। ঘুমিয়ে পড়তে বলতেন। বাইরে পৃথিবীর অন্ধকার অঘ্রাণ, পৌষের শীত। ভয় পেতাম, কোন পড়শি বাড়ির লোক ডাকতে আসতে পারে-কারো মারাত্মক রোগ হয়েছে হয়তো, কোন দুস্থ পরিবারকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের আশ্রয় থেকে, হয়তো কোন নিম্ন শ্রেণীর লোকের মৃত্যু হয়েছে, হয়তো কোন অনাথ স্ত্রীলোক বিশেষ কারণে বিপন্ন, হয়তো কোন প্রতিবেশির ঘরে ছেলেপিলে হবে -মার কাছে খবর এসে পৌছুঁলেই তিনি চলে যাবেন। সারারাত বাড়িই ফিরবেন না হয়তো আর। জেগে বা ঘুমিয়ে একাই পড়ে থাকতে হবে আমাদের।

বাইরে থেকে ঐ রকম কোন ডাক না এলে মা প্রদীপের পাশে সেলাই করতে বসে যেতেন হয়তো, কিংবা সমস্ত দিনের শেষে দু-চারটি পত্র-পত্রিকা বা বই নিয়ে বসে পড়তেন। মায়ের মুখ চোখের সামনের সেই প্রদীপটির দিকে তাকিয়ে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়তাম।

সেই বয়স, তখনকার সেই মা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গোড়ার দিকের সেই অপেক্ষাকৃত নির্দোষ পৃথিবী-  আজ মনে হচ্ছে কোনো পিস কনফারেন্স মানুষের বিক্ষিপ্ত জীবনে সে অনবতুল সমাবেশ ফিরিয়ে দিতে পারবে কি আর? ফিরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে তো কিন্তু সর্বান্তকরণে নয়। আজ অনুভব করি যে, তাঁদের নানা বিজ্ঞানের ভূষন ছিলো না, কিন্তু মহত্তর মর্মজ্ঞান ছিলো । তাঁদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিলো না, কিন্তু সকলের জন্য যতদূর সম্ভব হিতাকাঙ্খা ছিলো।

ভাবনা-বেদনা, সংকল্প-স্বপ্নের কোনো ক্ষয়প্রাপ্তির হাতে, ইতিহাসের অন্ধকার ক্ষমতার হাতে মা নিজেকে কোনো দিন সমর্পিত করতে যান নি। যে বড় ভূমিকা তাঁর পাওয়া উচিত ছিলো সংসারে সে পটভূমি পান নি তিনি। কিন্তু তাতে কী! তিল ধারণের মতো তুচ্ছ ভূমিকায় দেখিয়েছেন ব্রহ্মাও প্রতিফলিত হয়ে উঠতে পারে। আমরা তার সন্তান, ইউনিভারসিটি থেকে পাস করে বেরিয়েছি অনেক দিন হতে চললো। কিন্তু কার কাছে শিক্ষা পেয়েছিলাম আমরা? আমি অন্তত? তিনজন মানুষের কাছে। একজন বাবা, একজন মা আর আরেকজন ব্রজমোহন স্কুলের হেড মাস্টার আচার্য জগদীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়।