আত্মোন্নয়ন এবং সফলতার মূলমন্ত্র (তৃতীয় পর্ব)

প্রকাশিত: ৯:২৯ অপরাহ্ণ, জুন ১, ২০২০

বিশ্বখ্যাত আত্মোন্নয়ন প্রশিক্ষক সজল রোশান এর ভিডিও লেকচার অবলম্বনে –

অনুলিখনঃ উষামা তাসনীন।

কথা বলছিলাম সাফল্যের সাতটি আবশ্যকীয় উপায় এবং উপকরণ নিয়ে। গত লেখায় একশন মুড নিয়ে আলোচনা করেছিলাম।

আজকের লেখায় আলোচনা করবো সফল মানুষদের আরেকটি অবধারিত বৈশিষ্ট্য নিয়ে। তা হলো- সফল মানুষেরা তাঁদের যা আছে তারই হিসেব করে। যা নেই তার আক্ষেপ বা অপেক্ষা নয়।

যা নেই তার হিসেব করে বসে থাকলে আপনি সারা জীবনেও তৃপ্ত হতে পারবেন না। কাজ শুরুই করতে পারবেন না।

Life is like digging a gold mine. 95% of the people focus on the 99% dirt and dust and keep complaining. 5% of the people focus on the 1%   gold and keep collecting.  – জীবন হলো স্বর্ণের খনি খোঁড়ার মতো। ৯৫ শতাংশ মানুষই ৯৯ শতাংশ ময়লা এবং ধুলোবালির দিকেই মনোযোগ দেয়। আর ৫ শতাংশ মানুষ বাকী ১  শতাংশ স্বর্ণের উপর মনোযোগ দেয় এবং তা সংগ্রহ করতে থাকে।

সুতরাং, যা পেয়েছেন তার জন্য শুকরিয়া জ্ঞাপন করতে হবে প্রতিনিয়ত। যেটুকু সামর্থ আছে সেটুকুই কাজে লাগাতে হবে। শুকরিয়া জ্ঞাপন করার অভ্যাস না থাকলে পর্বতপ্রমাণ যোগ্যতা, সামর্থ বা অর্জন অর্থহীন। বঙ্গবন্ধু সাতই মার্চের ঐতিহাসিকে ভাষণে ডাক দিলেন- তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।

এখন আপনি যদি বলেন– আমাদের তো কামান নেই, বিমান নেই, সেনাবাহিনী নেই, নৌবাহিনী নেই । আগে কামান হোক,বিমান হোক, সেনাবাহিনী হোক, নৌবাহিনী হোক। তারপর আমরা যুদ্ধ শুরু করবো। তাহলে যুদ্ধও হতো না,স্বাধীনতাও আসতো না কোন দিন।

স্বাধীনতা এসেছিলো সত্যিকার অর্থে অজেয়কে জয় করার প্রতিজ্ঞা আর যা কিছু আছে তা ই নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। আক্ষরিক অর্থেই আমাদের প্রতিটা ঘর দুর্গ হয়ে ওঠে। কোদাল, কোঠার,শাবল- যার কাছে যা ছিলো তা ই হয়ে ওঠে মরণাস্ত্র। ছাত্র,শিক্ষক,কৃষক, শ্রমিকদের নিয়ে তৈরি হয় আমাদের সেনাবাহিনী। লঞ্চ, স্টিমার, ডিঙ্গি নৌকা যেখানে যা ছিলো তা ই নিয়ে তৈরি হয়ে যায় আমাদের নৌবাহিনী।

একইভাবে দুনিয়ার সব সফল মানুষেরা, সুখী মানুষেরা তাদের যা আছে তা দিয়েই সাফল্য এবং সুখ অর্জন করেছেন।

আলবার্ট আইনস্টাইন চার বছর বয়স পর্যন্ত কোন কথাই বলেন নি। ষোল বছর বয়সে সুইস ফেডারেল পলিটেকনিক্যাল স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় ফেইল করেন। গ্রাজুয়েশনের পর বীমা কোম্পানিতে সেলস এর চাকুরী নেন। যদিও তাতে তিনি ব্যর্থ হন। আইনস্টাইন এতোই ভুলোমনা মানুষ ছিলেন যে তাঁকে নিয়ে অনেক মজার কৌতুক প্রচলিত আছে।

একবার আইনস্টাইন ট্রেনে করে কোথাও যাচ্ছিলেন। টিকেট চেকার এসে যখন টিকেট চাইলো আইনস্টাইন এ পকেট ও পকেট হাতড়ে টিকেট আর খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এর মধ্যে টিকেট মাস্টার আইনস্টাইনকে চিনতে পারলো এবং ব্যতিব্যস্ত হয়ে বললো- স্যার, আমি আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনি অ্যালবার্ট আইনস্টাইন। আপনার টিকেট দেখাতে হবে না। কিন্তু আইনস্টাইন টিকেট খুঁজেই যাচ্ছেন আর বলছেন- টিকেট তো আমাকে খুঁজে পেতেই হবে। টিকেট চেকার অবাক হয়ে বললো- স্যার,টিকেট দিয়ে কী করবেন!  আইনস্টাইন তখন জবাব দিলো- আসলে ওই টিকেটে লেখা ছিলো আমি কোন স্টেশনে নামবো।

সত্যিই, সফল মানুষেরা কল্পলোকের কোন অতিমানব নয়। তাঁরা আমাদের মতোই প্রতিবন্ধকতা, সীমাবদ্ধতায় ভরা অতি সাধারণ মানুষ। কিন্তু তাঁরা তাঁদের সামর্থ আর সম্ভাবনার পরিপূর্ণ ব্যবহার করতে পেরেছিলেন।

বিল গেটস, স্টিভ জবস, মার্ক জুকারবার্গ, জেফ বেজোস, ল্যারি পেইজ , সার্গেই ব্রিন এঁরা কেউই বিলিয়ন ডলার দিয়ে শুরু করেন নি। ইউনিভার্সিটির ডর্ম রুম বা বাড়ির গ্যারেজ থেকে তাঁদের যাত্রা শুরু।

কিংবদন্তি কৌতুক অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন সীমাহীন দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠেছেন। কর্নেল স্যান্ডার্স তাঁর ক্যান্টাকি ফ্রাইড চিকেন বা কেএফসির প্রথম ফ্র্যাঞ্চাইজি বিক্রির আগে একহাজার বার রিফিউজড হয়েছিলেন।

ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট ,দ্যা ফাদার অব অটো মোবাইল হেনরি ফোর্ড, যিনি পরিবহণকে আমেরিকা এবং সারা বিশ্বে জনপ্রিয় করেছিলেন । তাঁর প্রথম প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যায়, দ্বিতীয় কোম্পানির পার্টনারশিপ দ্বন্দ্বের পর তিনি শুধু তাঁর নামের স্বত্বাধিকার ফেরত পান। ফোর্ড মটর্সের প্রথম মডেলে ভুলবশত ব্যাক গিয়ার যুক্ত করা হয় নি। ফলে বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হন।

কিংবদন্তি কৌতুক অভিনেতা জিম ক্যারি টরন্টোর একটি কমেডি ক্লাবে তাঁর প্রথম পার্ফরম্যান্সে দুয়োধ্বনি শুনেন।

জে কে রৌলিং সাত বছর ধরে তাঁর বিখ্যাত হ্যারি পটার এন্ড দ্যা সারসারার্স স্টোন  লিখেন। কিন্তু ইউকের বারোটি শীর্ষ প্রকাশনী সংস্থার সবকটিই তাঁর বই রিজেক্ট করে দেয়। অথচ হ্যারি পটার থেকে রৌলিং যে রয়্যালিটি আয় করেন তা ব্রিটেনের রাণীর আয়ের চেয়েও বেশি।

কিংবদন্তি টিভি তারকা অপরাহ উইনফ্রে সীমাহীন দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হন। ছোট বেলায় তিনি শারীরিক, মানসিক এবং যৌন হয়রানির শিকার হন। চৌদ্দ বছর বয়সে গর্ভবতী হন। টিভি উপস্থাপিকা হিসেবে তাঁর প্রথম চাকুরী থেকে বরখাস্ত হন।

হোন্ডার প্রথম ফ্যাক্টরি দ্বিতীয় যুদ্ধের সময় বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। দ্বিতীয় ফ্যাক্টরি ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়। সাচিরো হোন্ডা তাঁর স্ত্রীর ওয়েডিং রিং  বন্ধক রাখেন। কিন্তু হাল ছাড়েন নি।

মিকি মাউস, ডোনাল্ড ডাকের স্রষ্টা ওয়াল্ট ডিজনির প্রথম কোম্পানি লাফোগ্রাম দেউলিয়া হয়ে যায়। পরবর্তী ইতিহাস সবার জানা।

আমাদের দেশেও জহুরুল ইসলাম, আকিজ গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ,স্কয়ার গ্রুপ, হানিফ পরিবহণ, মোহাম্মদী গ্রুপ এঁরা সবাই শূন্য থেকেই শুরু করেন।

এমন অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যাবে যাদের সামনে এমন অগণিত সমস্যা ছিলো। হতাশ হওয়ার, হাল ছেড়ে দেয়ার অসংখ্য কারণ ছিলো। কিন্তু তাঁরা সেসব সমস্যা স্বত্ত্বেও  তাঁদের সম্ভাবনার উপর মনোনিবেশ করেন। সীমাবদ্ধতা স্বত্ত্বেও সামর্থের সর্বোচ্চ কাজে লাগান।

মহামতি হেলেন কেলার উনিশ মাস বয়সে পাকস্থলীর এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। যাতে তিনি চির দিনের জন্য অন্ধ ও বধির হয়ে যান। একই সাথে অন্ধ ও বধির কোন বাচ্চার সাথে কমিউনিকেট করার কোন উপায় ছিলো না। তাই তাঁকে লেখাপড়া করানোর কোন মাধ্যম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। কেলারের বাবা,মা বহু পথ ঘুরে আলেকজান্ডার গ্রাহামবেলের কাছে যান। যিনি সে সময় বধির বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করতেন। পরবর্তীতে অবশ্য গ্রাহামবেল টেলিফোন আবিষ্কারক হিসেবেই বেশি খ্যাতি অর্জন করেন।

আলেকজান্ডার গ্রাহামবেলের পরামর্শে কেলারের বাবা,মা পার্কিন্স ইনস্টিউট ফর দ্য ব্লাইন্ড এ যোগাযোগ করেন। ইনস্টিউট তাঁদের প্রতিষ্ঠানের সাবেক এক অন্ধ শিক্ষার্থী ,বিশ বছর বয়সী এনি সুলেভানকে হেলেন কেলারের শিক্ষিকার দায়িত্ব দেন। এনি সুলেভান ছিলেন হেলেন কেলারের সারা জীবনের বন্ধু। কেলারকে বিভিন্ন বস্তুর নাম শেখাতে তিনি কতো অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন , সেসব নিয়ে কেলার পরবর্তীতে তাঁর বিখ্যাত বই লিখেন- লাইট ইন মাই ডার্কনেস। অন্ধদের পড়ার পদ্ধতি আয়ত্ব করার পর হেলেন কেলার পার্কিন্স ইনস্টিউটে প্রাথমিক শিক্ষা নেন। পরবর্তীতে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির রেডক্লিফ কলেজের ব্যাচেলর অব আর্টস পরীক্ষায় হেলেন কেলার সর্বোচ্চ মেধাস্থান অর্জন করেন।

হেলেন কেলার কারোর সাথে কথা বলার সময় তার গলায় হাত দিয়ে গলার যে ভাইব্রেশন হয় তা থেকে বুঝতেন সে কী বলছে। একবার এক সাংবাদিক হেলেন কেলারকে জিজ্ঞেস করলেন – স্রষ্টা আপনাকে দৃষ্টি শক্তি দেন নি, শ্রবণ শক্তি দেন নি। এ নিয়ে কি স্রষ্টার প্রতি আপনার কোন অভিযোগ, অনুযোগ আছে?

হেলেন কেলার তখন বললেন-

স্রষ্টা আমাকে এতো এতো কিছু দিয়েছেন এবং তার জন্য আমি এতো কৃতজ্ঞ যে অভিযোগের কথা কখনো চিন্তাতেও আসে নি।

পৃথিবীর ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ প্রভাবশালী একশ’ মানুষেরা তালিকায় হেলেন কেলার একজন।

এমন মানুষ সম্পর্কে হয়তো শুনেছেন যে কোন দুর্ঘটনায় অন্ধ বা প্যারালাইজড হয়ে গেছে।  ক্ষতিপূরণ হিসেবে কয়েক মিলিয়ন ডলার পেয়েছে। কিন্তু আপনি সেই মানুষটার সাথে আপনার লাইফ এক্সচেইঞ্জ করতে চাইবেন না।

তার মানে আমাদের যা আছে তা কয়েক মিলিয়ন ডলারের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান। আমাদের আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব, পরিবার পরিজন আমাদের জীবনের সেরা উপহার।

আমাদের যা কিছু আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকার তৃপ্তি, সন্তুষ্ট থাকার অভ্যাস- একজন সফল,সুখী মানুষের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। কৃতজ্ঞতাবোধ চর্চার জন্য প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে অন্তত পাঁচটি জিনিসের নাম লিখুন যার জন্য আপনি সত্যিই খুব সন্তুষ্ট এবং কৃতজ্ঞ। প্রাপ্তির হিসাব, কৃতজ্ঞতাবোধের অভ্যাস – ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে। আরো কাজ, আরো নতুন নতুন লক্ষমাত্রা অর্জনের অনুপ্রেরণা ও আত্মবিশ্বাস যোগায়।

জিগ জিগলার খুব চমৎকার বলেছেন-

Gratitude is the healthiest of all human emotions. The more you express gratitude for what you have, the more likely you will have even more to express gratitude for. – মানুষের আবেগগুলোর মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধ সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর, সুন্দর। আপনি আপনার প্রাপ্তিগুলো নিয়ে যতো বেশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন, আপনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মতো আরো অনেক কিছু পাবেন।

আগামী লেখায় আলোচনা করবো সফল মানুষদের আরেকটি অবধারিত অভ্যাস নিয়ে।

আজ এ পর্যন্তই। ধন্যবাদ।