ফেসবুকে সাহিত্য চর্চা ও কিছু কথা

প্রকাশিত: ৬:১২ অপরাহ্ণ, জুন ১, ২০২০

লিখেছেনঃ ইমরান হোসাইন ।

আমি ফেইসবুককে কখনওই জ্ঞান শেখার বা চর্চার মাধ্যম বলে মনে করি না। বিভিন্ন ভালো পেইজ বা গ্রুপে যুক্ত থাকলে, আমরা কিছু তথ্যসূত্র পেতে পারি মাত্র। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে টুকটাক ধারণা আসতে পারে। কিন্তু জ্ঞান শেখার বা চর্চার বিষয়টা সম্পূর্ণই ভিন্ন। এর জন্য চাই নিভৃত স্থান ও অখণ্ড সময়। ফেইসবুক একটা মেছোহাটা। অহর্নিশি এখানে চলে কোলাহল। তাই নিরঙ্কুশ জ্ঞান-চর্চা অসম্ভব।

সাহিত্য-চর্চাও একটা জ্ঞান-চর্চা। আসলে সাহিত্য নিয়ে আমাদের ধারণা পরিস্কার নয়। পরিস্কার না থাকার কারণটাও স্পষ্ট- পড়াশুনো নেই এই বিষয়ে। এমন অনেক শিক্ষিত মানুষ আছেন, যারা সাহিত্য মানেই কেবল গল্প ও উপন্যাসকে বোঝেন। যেখানে থাকবে প্রেম ও মাখামাখি। উদাহরণ স্বরূপ, ইতিহাস-চর্চাও যে সাহিত্যের একটা অঙ্গ, তা জানে খুব কম লোকই। বিজ্ঞানের সঙ্গে সাহিত্যের কথা চিন্তাই করতে পারেন না অনেকে। ধর্ম ও সাহিত্যকে জোযন জোযন দূরে রাখতে বদ্ধপরিকর অধিকাংশ মানুষ। অথচ সাহিত্য বিষয়টা খুবই ব্যাপক। এর চর্চার জন্যও তাই প্রয়োজন ব্যাপক ও বিস্তৃত প্রস্তুতির।

লেখালেখি ও সাহিত্য- দুটো এক নয়। পোস্ট লেখা, সংবাদ লেখা বা কলামকে কলম-বন্ধ করা ইত্যাদি হলো লেখালেখি। কিন্তু সাহিত্য এরচে’ বিস্তৃত। সাহিত্য বেশ সময় ধরে টিকে থাকে। অন্য লেখালেখি যেখানে সাময়িক।

সব লেখালেখি সাহিত্য নয়। কিন্তু সাহিত্য একটা লেখালেখিই বটে। যারা সাংবাদিকতা করেন বা কলাম যারা লেখেন অথবা ব্লগ করেন কিংবা করেন ফ্রিল্যান্সিং, তারাও লেখেন। কিন্তু তাদের লেখার একটা গণ্ডি আছে। আছে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-নীতি। কিন্তু সাহিত্যের কোন গণ্ডি নেই।

আরও সহজ করে বললে, সাহিত্য কেউ কাউকে শেখাতে পারেন না। কিন্তু এ ছাড়া বাকি বিষয়গুলো শেখা ও শেখানো যায়। সেগুলোর একটা ছক আছে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে কোন ছক নেই। সাহিত্যে শব্দ ও বাক্যের ক্ষেত্রে লেখক স্বাধীন। কিন্তু অন্য লেখালেখি হলো ফরমায়েশি ধরণের।

মোট কথা সাহিত্য একটা বিস্তৃত ক্ষেত্র। অন্য লেখালেখি অতোটা বিস্তৃত নয়।

সাহিত্য যেহেতু বিস্তৃত। সুতরাং তার চর্চাও হওয়া উচিত ব্যাপক আকারে। বেশ সময় নিয়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হয়। অনেক সময় সাহিত্যিক নিজের অবচেতন মনেই প্রস্তুত হয়ে ওঠেন। পৃথিবীর ক’জন সাহিত্যিক আছেন, যারা সাহিত্য নিয়ে কলেজ-ভার্সিটিতে পড়েছেন! আর সাহিত্য নিয়ে পড়া ক’জন আছেন, যারা সাহিত্যিক হয়েছেন।  না, সাহিত্য কাউকে শেখানো যায় না। আমরা বিভিন্ন পুস্তক পড়ে, জ্ঞানের মৌলিক ও গভীর পাঠ নিয়ে, যাপিত জীবনের বিভিন্ন খেলা দেখে, মানুষ ও জীবনের পাতা থেকে যে শিক্ষাটা নেই; সাহিত্যিক তাকেই রূপ দেন ভাষার। জ্ঞানের ও জীবনের পাঠ যার যতো বেশি, ভাষা নিয়ে খেলতে গেলে তার ততো বেশি সুবিধা।

সাহিত্য নিয়ে অনেক গ্রন্থ রচনা হয়েছে। খুব খেয়াল করে দেখলে দেখবেন, সেগুলো পড়লেই কিন্তু কেউ সাহিত্য শিখে যাচ্ছেন না। ওসব বইয়ের লেখকগণ তাদের নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা লিখে থাকেন। সাহিত্য নিয়ে চিন্তা গ্রন্থিত করে রাখেন। একজন সবুজ পাঠক যা থেকে কিছু রসদ সংগ্রহ করতে পারেন মাত্র। কিন্তু সেই পথে হাঁটতে হলে তার প্রয়োজন দীর্ঘ প্রস্তুতির। দিনশেষে চর্চাটা কিন্তু তাকেই করতে হয়।

বস্তুত সাহিত্য কী ও কেমন, তা নিয়ে বিতর্ক বহু দিনের। আমি তার সমাধান করতে এই লেখা লিখছি না। সাহিত্য যে হাড়-খাটুনির একটা বিষয়, সেই কথাটাই বোঝাবার চেষ্টা করছি মাত্র।

এতোটুকু বোঝাতে পারলে আমি এবার মূল কথায় যাই!

ফেইসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে অনেকেই সাহিত্য-চর্চা করেন। খুঁজলে সাহিত্য-চর্চা বা এধরণের নামের বহু গ্রুপও পাওয়া যাবে। নাম না থাকলেও সাহিত্য-চর্চার জন্য তারা বেশ কসরত করে থাকেন। আমার অভিজ্ঞতা বলে, প্রথম প্রথম সে সকল গ্রুপে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায় বটে। কিন্তু মাসান্তেই তা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যায়।

এতো এতো মানুষ সেখানে সাহিত্য-চর্চা করতে আসেন, যা অকল্পনীয়। এমনিতেই কথায় আছে, শহরে কাক বেশি না কবি! এই সকল গ্রুপ দেখলে কথাটার বাস্তবতা বোঝা যায়। মনে হয়, কাক বেচারা আসলেই সংখ্যালঘু।

বিভিন্ন গ্রুপ আমার নজরে পড়েছে। তারা লেখক তৈরীর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। অনেকেই এই কাজ করে থাকেন। এই লেখক অর্থ সাংবাদিক বা কলাম লেখক নয়। পুরো দস্তুর সাহিত্যিক। মানে তারা বই-টই লিখবেন আরকি। তাদের উদ্দেশ্য মহৎ। কিন্তু কর্মপন্থা ভুল।

ছোট্ট করে বললে, গ্রুপগুলোতে এক জন লেখক দুদিন পরপরই পোস্ট করেন। সাহিত্যের চর্চার যেই সময়টা দরকার, তা পান না তারা। নবীন তার ঝুলিতে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পারেন না। তাদের লেখার কোন সমালোচনা হয় না। সমালোচানাকে তারা মনে করে নিরুৎসাহ প্রদান। নবীনদের শেখার মতো কোন দীর্ঘস্থায়ী পন্থা অবলম্বন করা হয় না। বন্ধুদের লাইক ও মিষ্টি কমেন্টেই তারা মোহিত হয়ে যান। এবং মনে করেন, যাক! কিছু একটা তো হয়ে গেল। কিন্তু ফল এর শূণ্য। এ সব নিয়ে বেশ দীর্ঘ আলোচনা করা যায়। আমি সেদিকে না গিয়ে একটা বিষয় কেবল তুলে ধরি।

এক গ্রুপে দেখলাম, লেখক হওয়ার কলাকৌশল নিয়ে ধারাবাহিক রচনা লিখছেন কয়েকজন লেখক। তারা ফেইসবুকে বেশ পরিচিত। এবং তাদের বইয়ও আছে একাধিক। কিন্তু আমি তাদের সেই সিরিজ পড়ি নি। পড়ার প্রতি কোন আগ্রহই বোধ করি নি। কেন আগ্রহ বোধ করলাম না?

কারণ যারা শেখাচ্ছেন, দেখলাম তারাই লিখেন বাংলিশ ভাষায়। তাদের পোস্টের মধ্যে ইংলিশের ছড়াছড়ি। বইয়েও অনুরূপ অবস্থা। অথচ ঐ সকল শব্দের কতো চমৎকার বাংলা আমাদের ভাষায় আছে। (টেবিল-চেয়ার ধরণের শব্দগুলো বাংলার সম্পদ হয়ে গেছে, সকল ভাষাতেই তা হয়, সুতরাং তা নিয়ে বিতর্ক কাম্য নয়) আমি জানি না, ঠিক কী কারণে তারা লেখায় প্রচুর ইংলিশ ব্যাবহার করে থাকেন! কিন্তু এতোটুকু জানি, এসকল জিনিস পোস্ট আকারে থাকতে পারে। কিন্তু যখন তা বইয়ের আদলে ঢুকে পড়ে, তখনই শঙ্কাবোধ করি।

এই কারণেরই তাদের থেকে শেখার আগ্রহ বোধ করি না। হ্যাঁ  তারা যদি বিদেশি শব্দের যথাযথ প্রয়োগ আমাদের শেখাতেন, তা-ও না হয় মেনে নেয়া যেত। কিন্তু তারা আমাকে বাংলিশ লেখাই শেখাবেন, এটাই আমার আশঙ্কা।

ঐ গ্রুপে বিভিন্ন পোস্ট ঘুরে ঘুরে দেখলাম। লেখার শিরোণাম থেকে নিয়ে ভেতর অব্দি অযাচিত ইংলিশের ছড়াছড়ি। তারা সকলেই কিন্তু লেখার চর্চা করছেন। এবং গ্রুপটাও খোলা হয়েছে এই উদ্দেশ্যেই। সুতরাং এই যে বাংলিশ লেখাগুলো প্রতিনিয়ত তারা পোস্ট করে যাচ্ছেন, এটা কি প্রশ্নের সম্মুখিন হবার মতো বিষয় নয়?

ফেইসবুক এসে আমাদের ভাষাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। সবিশেষ সেলিব্রেটি লেখকরা এই কাজটা করছেন সবচে’ বেশি। কিন্তু কেন তারা এমন করছেন, জানি না। তবে বুঝি, লেখার মশকটা তারা করেন নি ঠিক মতো। তবে বাংলার বারোটা তারা ঠিক মতোই বাজাচ্ছেন।

আমার এই কথাগুলো স্রেফ তাদের জন্যই, যারা লেখাটাকে রপ্ত করতে চান। তাদের বলি, ফেইসবুকে সেলিব্রেটি হবার চেষ্টা না করে আসল পথে হাঁটুন। সাহিত্য হলো কলম-পেশার মজুরির কাজ। তা রপ্ত না করলে টেকা মুশকিল। দুর্ঘটনা ঘটাও বিচিত্র কিছু নয়।

বাজারে বেশ চমৎকার কিছু বই পাওয়া যায়। যা আমাদেরকে লেখা-শেখার পথে হাঁটার সূত্র ধরিয়ে দিতে পারে। এবং সেই সূত্র ধরে আমরা পৌঁছে যেতে পারবো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। বই নিয়ে আরেক দিন আলাপ করা যাবে।

এখন কেবল বলি, সময় নষ্ট না করে আসল কাজ করুন।