পর্তুগাল প্রবাসী বাংলাদেশীদের ঈদ ও করোনার দিনকাল

প্রকাশিত: ২:৪৮ পূর্বাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০
লিখেছেনঃ মোশাররফ হোসাইন।
ঈদ মানে কারো ঘরে,
ভেজা ভেজা চোখ ।
ঈদ আনে কারো দ্বারে,
যোজন যোজন শোক ।
ঈদে কারো সময় কাটে,
আনন্দে, উল্লাসে, খেলে ।
ঈদে আবার কেউ হাঁটে,
আঁধারে, বাধারে, জেলে ।
সমান খুশি সবার ঘরে,
ঈদ নিয়ে আনুক !
সব মানুষ সব সমাজে,
খুশির মানে জানুক ।

বছর ঘুরে এসেছিলো মাহে রমজান। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ-উল-ফিতর আমাদের মাঝে সমাগত। গত রোববার ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো পর্তুগালেও ঈদ-উল-ফিতর উদযাপিত হয়েছে।

তবে এবারের ঈদ যেন খুশির পরিবর্তে এক হতাশার চাদরে মোড়া। সত্যিকার অর্থে এ বছর তেমনভাবে কারও মাঝেই সে অর্থে ঈদ-আনন্দ প্রতিফলিত হচ্ছে না বললেই চলে। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস আজ গোটা পৃথিবীর মানুষের জীবনকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে । সামান্য কয়েক ন্যানোমিটারের এক আলোক আণুবীক্ষণিক বস্তুর কাছে গোটা পৃথিবীর মানুষই অসহায়। সেচ্ছাঘরবন্দী সমগ্র মানব সভ্যতা । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ অনুযায়ী পৃথিবীর ২১২টি দেশ ও অঞ্চলে করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে। প্রতিদিন যেমন বিশ্বের হাজারো মানুষ এ প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হচ্ছেন। ঠিক তেমনিভাবে প্রতিনিয়ত ঝরে যাচ্ছে শত শত তাজা প্রাণ। গোটা পৃথিবী যেন আজ মৃত্যুপুরী। এমনকি বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ দুর্যোগের সামনে দাঁড়িয়ে। অন্যরকম এক রমজান দেখলো এবার গোটা দুনিয়াবাসী। এ রমজানে ছিল না কোন আনুষ্ঠানিকতা। ছিল না কোন তারাবিহ। কিংবা জুমুয়ার দিনের আনন্দ। অনেকটা দীর্ঘশ্বাস, হতাশা আর কুয়াশাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের কষ্ট নিয়েই রমজানকে বিদায় জানাতে হচ্ছে । ঘরোয়া পরিবেশে ৩ থেকে ৫ জনের ঈদ জামায়াত ! ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে পর্তুগাল প্রবাসীর হৃদয়ের আয়নায় ।

আটলান্টিকের কিনারে অবস্থিত । তিন দিক থেকে স্পেনের বাহুডোরে জড়ানো। এক সময়ের বিশ্বপরাশক্তিধর দেশ পর্তুগাল । পাহাড় আর সবুজের সমারোহ। বিশ্বশান্তি,  শৃংখলা ও নিরাপদ দেশের শীর্ষে অবস্থান করা দেশটি, সব সময় পর্যটকদের ভিড় থাকে চোখে পড়ার মত। প্রাচীন সভ্যতা, স্থাপত্য, কৃষ্টি, কালচারের আকর্ষণে প্রতি বছর ছুটে আসে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত হতে ভ্রমন পিয়াসী লাখ লাখ মানুষ। বিদেশী বান্ধব এদেশের জনগণ ও সরকারের নীতির কারণে অভিবাসী সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে এই জনপদে। জীবন যাত্রার মান, খাদ্যদ্রব্য, বাসস্থান, ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় যথেষ্ট নাগালের ভিতরে থাকায় স্বস্তি ও সাচ্ছন্দ্য এ দেশের মানুষের চেহারায় সারল্য ভাব ফুটে থাকে সব সময় ।

রেসিডেন্স ও সিটিজেন কার্ডের সহজলভ্যতা ও বিদেশী সহায়ক আইন কানুনের জন্য প্রতিবছর লাখ লাখ বনী আদম পাড়ি জমান এই দেশে। উন্নত বিশ্বের শীর্ষে অবস্থানকারী দেশের জনগন শুধুমাত্র এক টুকরো নিরাপত্তার আশায় সেকেন্ড হোম হিসেবে গ্রহণ করছে আজকের পর্তুগালকে। অন্যদের মতো একটি উন্নত জীবন। সাফল্যের ভবিষ্যৎ পাবার সুতীব্র আশায় বাংলাদেশীদের অবস্থানও এখানে প্রায় হাজার ত্রিশের ঘরে। নব্বই দশকের মাঝামাঝির দিকে প্রথম এই দেশে বাংলাদেশীদের আগমন। কিন্তু বিস্তার ঘটে মূলত ২০০০ সালের পরে। বিশেষ করে ২০০৫ সালের পরে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইটালি ইমিগ্রেশন আইনে ব্যাপক পরিবর্তন ও কাঠিন্য নেমে আসে। জীবনের অনিশ্চয়তা ও স্থবিরতাকে জয় করতে, শেষ ঠিকানা হিসেবে পর্তুগালকে বেছে নিয়েছে বাংলাদেশীরা ।

নব্বই দশক থেকে ২০১০ পর্যন্ত পর্তুগালে আসা অধিকাংশ বাংলাদেশীরা চায়না থেকে আশা কাপড়জাত সামগ্রী, খেলনা, অলংকার, পাথরজাত জিনিসপত্র, মিনিসুপার মার্কেট সহ খুচরা ও পাইকারী ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলো। কিন্ত ২০১০ সালের পর বাংলাদেশী জনশক্তির পরিসর বৃদ্ধির ফলে, রেস্টুরেন্ট, মোবাইল ও ইলেকট্রনিকস পার্টস, ট্যুরিস্ট বেইজড ব্যবসার বিস্তার ঘটে।  সাম্প্রতিক কৃষি সেক্টরেও বাংলাদেশীদের অংশ গ্রহণ চোখে পড়ার মত। তবে বিগত কয়েকবছর ট্যুরিস্ট ব্যবসা জয়জয়কর থাকায় বাংলাদেশীদের পছন্দের শীর্ষে অবস্থান করছে সুভ্যেনির ও গিফট কর্নার। বলা যায়, লিসবন ও পর্তু শহরের ৭০ শতাংশ সুভ্যেনির দোকানপাট বাংলাদেশীদের দখলে। পর্তুগাল যেহেতু পর্যটক নির্ভর অর্থনীতির দেশ। তাই সামার কেন্দ্রিক ছয় মাস বেচাকেনা থাকে উর্ধমূখী। বাকী ছয় মাস কোন রকম পেটে ভাতে চলতে হয়।

পর্তুগালে ব্যবসায়ী মহল অক্টোবর থেকে অধীর আগ্রহে মে/জুনের অপেক্ষায় থাকে । কিন্তু  ফেব্রুয়ারী থেকে শুরু হয়ে যায় করোনা ভাইরাসের কাউন্টডাউন। আর মার্চের শুরু থেকেই লকডাউনের মাঝে ঘরবন্দি হয়ে যায় সব কিছু। হারিয়ে যায় বহু বাংলাদেশীর একটু ঘুড়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। কারো কারোর ভেঙ্গেচুরে টুকরো হয়ে যায় পায়ের তলার শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর শেষ পাটাতন। হাজারও বাংলাদেশী কর্মী বেকার হয়ে সর্বস্ব হারানোর ভয়ে কম্পমান। যাদের হাতে লাল পাসপোর্ট। ইতিমধ্যেই তারা এদিক ওদিক সটকে পড়ার দিন গুনছেন । যাদের এখনো ডকুমেন্টস সমস্যা রয়ে গেছে তাদের চোখে মুখে অনিশ্চয়তার ছাপ। ফলে, ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় বড় বেশী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পড়তে যাচ্ছে পর্তুগালে অবস্থানরত বাংলাদেশী ব্যবসায়ী মহল। কারণ, করোনাভাইরাস এখনো নিয়ন্ত্রণহীন। নিশ্চিত প্রতিষেধক আবিস্কার করতে পারেনি এখনো পৃথিবীবাসী। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে? এ প্রশ্নে সমগ্র জাতী গোষ্ঠীর সম্মিলিত ফরিয়াদি চোখ আসমানওয়ালার দিকে।

উন্নতবিশ্বের দেশে দেশে কোভিড-১৯ ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার আকর্ষণীয় পাকেজ নিয়ে ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ালেও পর্তুগালে চোখে পড়ার মত কিছুই ঘোষণা আসেনি। যতসামান্যই বা প্রতিশ্রুত তা আইন আদালতের গ্যাড়াকলে বাংলাদেশীদের প্রাপ্তির খাতা শুন্যই থাকবে। ফলে সমস্যাটা খুব দ্রুতই প্রকটভাবে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে । অধিকাংশ দোকানপাট ক্ষতি কাটিয়ে উঠে ব্যবসা বানিজ্য ধরে রাখার অবস্থানে নেই বললেই চলে। অনেকেই আবার পানির দরে দীর্ঘকালের গড়ে তোলা স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিচ্ছে। অনেকের ব্যবসা আবার হাত ছাড়া হতে বসেছে শুধুমাত্র বকেয়া ভাড়া পরিশোধে অক্ষমতার দায়ে ।

সর্বশেষ এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েই লিখার ইতি টানতে চাই, আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াবাসীকে কখনও কখনও ভয়ভীতি, ক্ষুধা দারিদ্র্য, সম্পদের ক্ষতি, জনজীবনের স্থবিরতা, মহামারী, ফল-ফসল ধ্বংস করে পরীক্ষা করতে চান। দেখতে চান, কারা ধৈর্যশীল। আর যারা সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চান, ধৈর্য্য ধারণ করেন, তারাই সত্যিকারের মুমিন (সুরা আল  বাক্বরাহ)।  অতএব ভেঙ্গে পড়া নয়। বাস্তবভিত্তিক চিন্তা। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল। কষ্ট, পরিশ্রম, সাধনা করে ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। পারস্পরিক সহযোগীতা ও ঐক্যবদ্ধভাবে আগামীর পথ চলতে হবে। সে প্রত্যাশা ও আহবানই হোক আজকের লিখার মুল ম্যাসেজ। আল্লাহ আমাদের সকলকে হেফাজত করুন। আমিন।