করোনা ভাইরাস ও ইসলামী দৃষ্টিকোণ-

প্রকাশিত: ৯:৪৬ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২০

ইবনুল হাজার আল আসকালানি রহিমাহুল্লাহ রচিত বাজলুল মাউন ফি ফাযলিত ত্বাউন কিতাবকে সামনে রেখে সময়োপযোগী একটি উপস্থাপনা।

লিখেছেনঃ ফয়জুল্লাহ মুনির

(প্রথম পর্ব)

মহামারির সূচনাঃ পরোক্ষ কার্যকারণ

নামটা শুনলেই অনেকে আঁতকে ওঠেন। পিলে চমকে যায়। কারও কারও ভেতরটা হু হু করে কেঁদে ওঠে। হঠাৎ করেই আমাদের জীবনযাত্রায় এই ভাইরাসটার উদয় হয়েছে। একেবারে যেন হাসতে হাসতে আচমকা দম আটকে মারা যাবার মতো। বাইরে গেলে মনে হয়, কোন এক অদৃশ্য দৈত্যের ভয়ে যেন পুরো নখরী ঘরে ঢুকে খিল এঁটে দিয়েছে। যাই হোক, করোনা একটি বিভীষিকাময় আতঙ্ক। একটি ভয়াবহ মহামারি।

ইসলাম সার্বজনীন ধর্ম হিসাবে আমরা আশা করতে পারি, মহামারি সম্পর্কেও এতে সুস্পষ্ট বিস্তারিত ধারণা দেয়া আছে। এবং এই মহামারির প্রত্যক্ষ কারণ ছাপিয়ে পরোক্ষ কার্যকারণের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। ইবনে মাযাহ শরীফের একটি হাদীস উদ্ধৃত করছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন সম্প্রদায় যখন প্রকাশ্যে অশ্লীল কর্মে লিপ্ত হয়, তখন তাদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে মহামারি এবং এমন সব রোগের প্রাদুর্ভাব যা তাদের পূর্বপুরুষদের মাঝে ছিল না।” (হাদীস নং—৪০১৯)

হাদীসের ভাষ্য একেবারেই সুস্পষ্ট। এর সত্যতাও আমাদের চোখের সামনে। পুরো বিশ্বে প্রতিদিন কতগুলো ধর্ষণের ঘটনা ঘটে? এছাড়াও গোপন অভিসার, ব্যভিচার, পরকীয়া, নিষিদ্ধ পল্লীতে গমন, নাইটক্লাব ইত্যাদি অপ্রকাশিত যিনার পরিমাণ কত? পুরো বিশ্বে প্রতি মিনিটে কতজন ব্যাক্তি পর্ণোগ্রাফি দেখছে? এসবের পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে।

মহামারির এই ভয়াবহ পরিস্থিতি উম্মতে মুহাম্মদীতেই প্রথম নয়। আমাদের পূর্বেও বহু জাতিকে অবাধ্যতার দরূণ মহামারির আযাব ভোগ করতে হয়েছে। আমি সেসব থেকে এক দু’টি উপমা তুলে ধরছি। আমাদের প্রথম কেবলা বাইতুল মাকদিস নির্মাণের প্রেক্ষাপটই ধরা যাক। বনী ইসরাইলের অবাধ্যতা তুঙ্গে উঠলে আল্লাহ তা’আলা হযরত দাউদ আ. কে তার কওমের জন্য তিনটি ইখতিয়ার দিলেন। দুই বছরের দূর্ভিক্ষ, কিংবা দুই মাসের জন্য তাদের উপর শত্রুর আধিপত্য, অথবা তিন দিনের মহামারি। দাউদ আ. সহজ মনে করে মহামারিকেই বেছে নিলেন। কিন্তু একি! সকালে পেরিয়ে দুপুর গড়াতেই সত্তর হাজারের মৃত্যু। পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে দাউদ আ. দোয়া করলেন। আল্লাহ তা’আলা মহামারি উঠিয়ে নিলেন। তখন দাউদ আ. তাঁর কওমকে বললেন, তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বরূপ বাইতুল মাকদিস নির্মাণ করো।

এছাড়াও ইতিহাসের পাতায় আমাদের জন্য রয়েছে মুসা আ. এর যামানার ঘটনা। সেই প্রসিদ্ধ বাল’আম বিন বা’উরের কাহিনী। যার কূট পরামর্শে মুসা আ. এর সৈন্যবাহিনীতে যিনার মতো অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে আল্লাহ তা’আলা তাদের উপর মহামারি দিয়ে দেন। যার পরিসমাপ্তি ঘটে সত্তর হাজার লোকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

তবে আশার কথা হচ্ছে, এই মহামারি পূর্ববর্তী উম্মাহর জন্য ছিল শাস্তি স্বরূপ। আর এই উম্মতের মুমিনদের জন্য তা হচ্ছে রহমত এবং উপদেশ গ্রহণের মাধ্যম। বুখারীর রেওয়ায়েতে এসেছে— إنَّ هذا الوَجعَ رِجسٌ وعَذابٌ عُذِّبَ به ناسٌ قبلَكم. (হাদীস নং—৫৭২৮)

(দ্বিতীয় পর্ব)

মহামারির উৎপত্তি ও পরিচিতি

মহামারি বলতে আমরা কি বুঝি? বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভবত এটাকে আর সংজ্ঞায়িত করে বোঝাবার কিছু নেই। তাছাড়া ‘মহামারি’ শব্দ থেকেও বোঝা যায়, এটা এমন কোন রোগ বা ব্যাধি, যার দরুন ব্যাপকহারে মৃত্যু ঘটে। আরবি মহামারি বোঝানোর জন্য দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। তাউন (طاعون) আর ওবা (وباء)। দু’টোর মাঝে ব্যবহারগত কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তাউনের উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে ওবার উৎস নির্ধারিত। রোগের কারণ উপসর্গগুলিও পরিচিত। কিন্তু একই সাথে বিরাট সংখ্যক মানুষের মাঝে তা ছড়িয়ে পড়ে। স্বাভাবিকের চেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে খুব অল্প সময়েই মৃত্যু ঘটায়। তাউনের উৎস মানুষ খুঁজে না পেলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি আশ্চর্য উৎসের কথা বলে গেছেন। মুসনাদে আহমদের এক রেওয়ায়েতে আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মত নিঃশেষ হবে শত্রুর আঘাত ও তা’উনে। রাসূলকে জিজ্ঞেস করা হলো, শত্রুর সাথে লড়াই করে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া এটা তো স্পষ্ট। কিন্তু তা’উন কি জিনিস? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর করলেন, তা’উন হচ্ছে তোমাদের শত্রু জ্বীনদের থেকে আসা আঘাত। আর উভয়টিতেই রয়েছে তোমাদের জন্য শাহাদাত। (হাদীস নং—১৯৫২৮)

বিজ্ঞানের উৎকর্ষের যুগে এর অর্থ বোধগম্য হওয়া একটু কষ্টকরই বটে। তারপরও একটা যুক্তি খুব সহজেই আমরা দাঁড় করাতে পারি। আল্লাহ তা’আলার নীতি অনুযায়ী বান্দা যখন অবাধ্যতা শুরু করে। বে-দ্বীনদের দেখানো পথে গা ভাসাতে থাকে, তখন আল্লাহ তা’আলা তাদের উপর মানুষ শত্রুদের চাপিয়ে দেন। ঠিক তারা যখন শয়তানের প্ররোচনায় পাপে তাপে লিপ্ত হয়, তখনও আল্লাহ তা’আলা শয়তান জ্বীনগুলোর মাধ্যমে শাস্তি দিয়ে থাকেন।

যাই হোক, বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আমাদের বর্তমানের করোনা ভাইরাস তা’উন নয়, বরং তা ওবার কাতারে পড়ছে। কারণ, করোনার উৎস অনেকেরই জানা। করোনা মূলতঃ একেবারেই সাধারণ ঠাণ্ডা রোগ সৃষ্টিকারী একটি ভাইরাস। এরপরও আমাদের জন্য তা মহামারির আকার ধারণ করেছে। কারণ যাই হোক না কেন? মহামারি যে আমাদের জন্য উপদেশ ও শিক্ষা, তা আমরা খুব সহজেই টের পাচ্ছি। সাধারণ জনগণের মাঝেও এর ফলাফল আশাপ্রদ। জামায়াতে উপস্থিত না হওয়ার অনুমতি থাকা সত্ত্বেও মসজিদগুলোতে দ্বিগুণ মুসল্লি হচ্ছে। (তবে এখন পরিস্থিতির কারনে সাধারন ফরয নামাজে ৫ জন ও জুমআর নামাজে ১০ জন মুসুল্লি নিয়ে সালাত আদায় করার জন্য সরকার বিশেষ চাপ প্রয়োগ করছে ) মানুষ ধর্মের প্রতি ধাবিত হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য প্লাস পয়েন্ট এবং হাদীসের ভাষ্যেরও মুয়াফিক। তারপরও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।

(তৃতীয় পর্ব)

উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য সুসংবাদ !

মহামারিকে উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য যেমনিভাবে শিক্ষা বলা হয়েছে, তেমনিভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহামারিকে রহমতও বলেছেন। বুখারী শরীফের এক হাদীসে আছে, হযরত আয়েশা রা. বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মহামারি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, “মহামারি হচ্ছে একটি আযাব। যাকে ইচ্ছা তিনি তাকে এই আযাবে নিপতিত করেন। কিন্তু তিনি মুমিনদের জন্য এটাকে রহমত স্বরূপ বানিয়েছেন।” (হাদীস নং—৩৪৭৪)

এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষা তো শাস্তি দিয়েও দেয়া যায়। কিন্তু মহামারি রহমত হবে কিভাবে? উত্তরটা একেবারেই সোজা। মহামারিতে মৃত ব্যক্তির জন্য হাদীসে শাহাদাতের সুসংবাদ এসেছে। তবে এর জন্য তাকে কিছু শর্ত পালন করতে হবে। হাদীসের ভাষায়, বুখারী শরীফে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে তার শহরেই ধৈর্যের সাথে অবস্থান করবে, সাথে সাথে সে বিশ্বাস করে, যা কিছু হচ্ছে সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে, তবে তার জন্য শহীদের মর্যাদা রয়েছে।” (হাদীস নং—৫৭৩৪)

কিন্তু এই ব্যাক্তি তো হুকমী শহীদ। গোসল, জানাজা সবই লাগবে। আর হুকমি শহীদের বহু প্রকার রয়েছে। তাহলে তার আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকল কই? এর উত্তরেই অপর আরেকটি হাদীসে এসেছে। মুসনাদে আহমদে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “প্রকৃত শহীদরা এবং মহামারিতে মৃতরা আল্লাহর দরবারে আসবে। তারা বলবে, আমরাও তো শহীদ। তখন বলা হবে, দেখো তো, যদি তাদের ক্ষত থেকে শহীদের ক্ষতের ন্যায় রক্ত প্রবাহিত হয়, যা থেকে মেশকের সুগন্ধি ছড়ায়, তবে এরাও তাদের মতোই শহীদ। অতঃপর ফেরেশতারা তেমনটাই দেখতে পাবে।” (হাদীস নং—১৭৬৫১)

এ থেকে সুস্পষ্টই প্রতীয়মান হয়, মহামারিতে মৃতরা অন্যান্য হুকমী শহীদের মতো নয়। আখেরাতে তাদের জন্য আলাদা সম্মান ও পুরষ্কার থাকবে। এইজন্যই সাহাবিরা যেরকম শাহাদাতের তামান্না করেছেন, ঠিক তেমনি তাঁরা মহামারিতে মৃত্যুর তামান্নাও করেছেন। যেমন, মুয়াজ ইবনে জাবাল রা.। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তাঁর উম্মাহর জন্য মহামারির দোয়া করে গিয়েছেন। কিন্তু পরিশেষে ঐ প্রশ্নের রেশটুকু থেকেই যায় যে, আখেরাতে এর মর্যাদা যাই হোক, দুনিয়াতে তো তার পরোক্ষ কারণ, অশ্লীলতার সয়লাব ও তার শাস্তি। তাহলে মহামারি রহমত হয় কি করে? এরও চমৎকার একটি উত্তর রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টই বলে গেছেন। আবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে, “আখেরাতে আমার উম্মতের জন্য কোন শাস্তি বরাদ্দ থাকবে না। তাদের যা আযাব হবে তা দুনিয়াতেই। আর তা হবে ফেতনা, ভূকম্পন ও হত্যার মাধ্যমে।” (হাদীস নং—৪২৭৮)

(চতুর্থ পর্ব)

মহামারিতে ইসলামিক নির্দেশনা

কোন এলাকায় মহামারি দেখা দিলে ইসলাম সেখানে কোয়ারেন্টিন ও লক ডাউন ব্যবস্থার নির্দেশনা দেয়। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাও চৌদ্দশত বছর আগে বলে যাওয়া এই সতর্কতাকেই একমাত্র উপায় হিসাবে সাদরে গ্রহন করে নিয়েছে। অর্থাৎ, আক্রান্ত এলাকার লোকেরা বাহিরে যাবে না। আবার বাহিরের কেউ আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশ করবে না। হাদীসের ভাষ্য এরকম, মুসলিম শরীফের রেওয়ায়েতে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যখন কোন এলাকায় মহামারি আক্রান্ত হওয়ার খবর শুনবে তখন সেখানে যাবে না। আর তোমাদের অবস্থানকৃত এলাকা আক্রান্ত হলে সেখান থেকে বেরও হবে না।” (হাদীস নং—২২১৮)

এখানে স্বভাবতই একটা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ইসলামে তাওয়াক্কুল করতে বলা হয়েছে। এবং আরও বলা হয়েছে, ইসলামে সংক্রমণ বলতে কিছু নেই। আবার অপরদিকে “কুষ্ঠ রোগী থেকে পালাও” এমন হাদীসের সংখ্যাও কম নয়। ব্যাপারটা কেমন বৈপরীত্যের আভাস দিচ্ছে। উত্তরটা একেবারেই সহজ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষের ফলে আমরা মোটামুটি সবাই জানি, অধিকাংশ রোগের পিছনে কিছু ভাইরাসের উপস্থিতি কাজ করে। এই ভাইরাসগুলোর সৃষ্টি বিভিন্ন জায়গা থেকে। কখনওবা পরিবেশের কারণে, কখনও কোন প্রাণীর দেহ থেকে, আবার কখনও সরাসরি মানব দেহেই এর উৎপত্তি ও বংশবিস্তার ঘটে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিটি রোগই সংক্রামক। হ্যা, পার্থক্য শুধু এতটুকুই যে, কোনটা আবহাওয়া থেকে সংক্রমিত হয়। আবার কোনটা এক দেহ থেকে অন্য দেহে সংক্রমিত হয়। তাহলে এখন প্রশ্ন দেখা দিবে, রাসূলের “ইসলামে কোন সংক্রমণ নেই” এ কথার অর্থ কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মূলতঃ জাহেলী যুগের একটি অপবিশ্বাসকে অপনোদন করতে চেয়েছেন। আমরা নিজেদের দিকেই তাকিয়ে দেখি না, ভূমিকম্প এত সেলসিয়াস হলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, এটা আমরা অনায়াসেই বিশ্বাস করি। আবার চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অমুক ওষুধ খেলে খুব দ্রুতই রোগটা সেরে যাবে, এটাও আমরা সহজেই মেনে নেই। খুব কম মুসলমানের মনেই এই চিন্তা কাজ করে যে, এই সব কিছুই আল্লাহ করছেন এবং আল্লাহ চাইলে এসব উপায় ছাড়াও সব ব্যবস্থা করতে পারেন। হ্যা, দুনিয়াতে প্রতিটা কাজের পেছনেই একটা প্রত্যক্ষ কারণ থাকে। আর এটা আল্লাহ তাআলার “বিশ্বনিয়ন্ত্রণ নীতি”রই অন্তর্ভুক্ত। তবে মুমিনের কর্তব্য হচ্ছে, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখে বাহ্যিক উপায় অবলম্বন করে যাওয়া। এটা তাওয়াক্কুলের খেলাফ নয়। এবং এই প্রচেষ্টা তাকদীরের প্রতি বিশ্বাসের সাথেও সাংঘর্ষিক নয়। বরং তাকদীরেই লেখা ছিল, বান্দা এই উপায় অবলম্বন করে বিপদ থেকে রেহাই পাবে।

(শেষ পর্ব)

আক্রান্তদের জন্য করণীয়

মহামারি মুমিনদের জন্য রহমত। এতে রয়েছে শাহাদাতের ফযিলত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ উম্মতের জন্য মহামারির দোয়া করে গিয়েছেন। এসব থেকে সহজেই একটা প্রশ্ন উঠে আসে, তাহলে আমরা যে প্রতি মুহূর্তে মহামারি উঠিয়ে নেবার জন্য দোয়া করছি তা কি শুদ্ধ হচ্ছে?

আসলে প্রতিটি রোগই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রহমত। কারণ, মানুষ বিপদে পড়লে যতটা না আল্লাহভিমুখী হয়, নেয়ামত পেয়ে তার আংশিকও হয় না। বরং অধিকাংশের ক্ষেত্রেই তার উল্টোটা হয়। কিন্তু এই নেয়ামত উপলব্ধি করা অনেকের জন্যই কঠিন। তাই রোগ বালাই থেকে সুস্থতার দোয়া করা যেমন জায়েজ, তদ্রুপ সুন্নাতও বটে। এখানে একটি ফিকহী মাসআলা উল্লেখ্য। তা হচ্ছে, বর্তমান করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে মানুষের আতঙ্ক এতটাই যে, এতে আক্রান্ত হওয়া যেন মৃত্যুর শামিল। আক্রান্ত হওয়া ছাড়াই সবাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে থাকে, কখন জানি মরে যাই। কখন যেন ডাক এসে যায়। ফুকাহায়ে কেরাম এই ক্ষেত্রে আলোচনা করেছেন, এই পরিস্থিতিতে ব্যাক্তির উপর মরযে মাউতের হুকুম আসবে কিনা! আর তাই যদি হয়, তাহলে তো ব্যাক্তির জন্য অসিয়ত করা ওয়াজিব। এক তৃতীয়াংশের বেশি সম্পদে তাসাররুফ করা জায়েয নাই। ইত্যাদি আরও নানা হুকুম ব্যাক্তির ঘাড়ে চাপবে। তবে আশার কথা হচ্ছে, হানাফী ফকীহগণ এই ব্যাক্তিকে মরযে মাউতের হুকুমে রাখতে রাজি নন।

পরিশেষে যারা এই ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত কিংবা আশঙ্কায় ভুগছেন, তাদের জন্য কয়েকটি করণীয়—

(১) আল্লাহ তা’আলার কাছে বারবার সুস্থতার প্রার্থনা করা। তিরমিযির সূত্রে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চাচাকে লক্ষ করে বলেছেন, “হে আব্বাস! আপনি প্রচুর পরিমাণে সুস্থতার জন্য দোয়া করুন।” (হাদীস নং—৩৫০৯)

(২) আল্লাহ তা’আলার ফায়সালার উপর ধৈর্যধারণ করা এবং তাকদীরের উপর সন্তুষ্ট থাকা। মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মুমিনের বিষয়টাই আশ্চর্যজনক। তার সবই কল্যাণকর। আর এটা কেবল তার ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে। নেয়ামত পেলে সে শুকরিয়া আদায় করে, এটা তার জন্য কল্যাণকর। আবার বিপদে পতিত হলে ধৈর্য্য ধারণ করে, এটাও কল্যাণকর।” (হাদীস নং—২৯৯৯)

(৩) আল্লাহ তা’আলার প্রতি সুধারণা রাখা।এ কথা মনে করা যে, আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টির বিশাল এ ধরায় আমি ক্ষুদ্র একটা জীব। সেই তুলনায় আল্লাহর রহমত অনেক অনেক বেশি অবারিত, প্রশস্ত। আল্লাহ আমার মতো অথর্বকে শাস্তি দেয়ার কোন প্রয়োজন নাই। আমার তো গুনাহের কোন শেষ নাই। ছোট বড় কত গুনাহই না জীবনে করেছি। আর আমল যতটুকু আছে, তা কোনক্রমেই আমার ক্ষমা পাওয়ার কারণ হতে পারে না। তাই শেষমেষ বাধ্য হয়ে আল্লাহ, তোমার দরবার পানেই আমি চেয়ে রইলাম।

(৪) বেশি বেশি নফল সদকা করা। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিরমিযির বর্ণনায় এসেছে, “সদকা খোদার ক্রোধকে দমন করে এবং অপমৃত্যু রোধ করে।” (হাদীস নং—৬৬৪)

(সূত্র— بذل الماعون في فضل الطاعون মহামারীর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনায় সল্প প্রয়াস)