১ম বিশ্বযুদ্ধঃ মানব ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায় (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ১০:০৬ অপরাহ্ণ, জুন ১৭, ২০২০

 

মানবতার ইতিহাসে এক ভয়ংকরতম বিভীষিকা, অভূতপূর্ব ভয়ানক ধ্বংসলীলা ও ইউরোপীয় সভ্য মুখোশের আড়ালে অসভ্য শাসকদের হাতে সংঘটিত ইউরোপীয় মহাযুদ্ধকে আমরা ১ম বিশ্বযুদ্ধ নামে জানি। ৪ বছর দীর্ঘস্থায়ী এই মহাযুদ্ধে ক্ষমতার বলি হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলো ২ কোটি মানুষ, আহত হয়েছিলো ২ কোটি ১০ লাখ নিরীহ জনগণ, ৭০ লাখ মানুষ চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করে। এছাড়া এই সময়কালে ইনফলুয়েঞ্জায় বিশ্বব্যাপী ৫ কোটি মানুষ মৃত্যুর মুখে পতিত হয়।

 

এই মহাযুদ্ধের করালগ্রাসে বদলে যায় ইউরোপের নকশা, ক্ষমতাধর তিনটি সাম্রাজ্যের পতন হয়, নতুন অনেক রাষ্ট্রের জন্ম হয় ও বদলে যায় পৃথিবীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস। কিভাবে এই তাণ্ডবলীলা শুরু হয়েছিলো, চলুন তাহলে দেখে আসি।

 

তৎকালীন ইউরোপের মানচিত্র

 

১৮৭১ সালে জার্মানী একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। তারপর উচ্চাকাঙ্খী সম্রাট কাইজার দ্বিতীয় উইলহেইম অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে জার্মানিকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

 

গোটা ইউরোপের তখন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্টগুলো মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা ও ভারতবর্ষসহ অন্যান্য রাষ্ট্র নিজেদের উপনিবেশ বিস্তার করে চলছে। ১৮৫৮ সালে শিল্পবিপ্লবের ফলে এর মাত্রা আরো বেড়ে যায়। ফ্রান্স, ব্রিটেন,পর্তুগাল, ইতালি ও অন্য শক্তিশালী দেশগুলো উপনিবেশ কলোনিগুলো থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করতো ও নিজ দেশে তৈরিকৃত পণ্য সেসব দেশে বাজারজাত করতো।

 

ভৌগলিকভাবে ইউরোপের বাহিরে একটা দ্বীপরাষ্ট্র বৃটেন। প্রচণ্ড নৌ-সামরিক শক্তি দ্বারা তৎকালীন অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে একক আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছিলো বৃটেন এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কলোনিগুলোর সাহায্যে বৃটিশরা তখন এক পরাশক্তি। জার্মানদের উত্থান ছিলো তার নিজশক্তির প্রতি হুমকিস্বরূপ। জার্মানি চাচ্ছিলো বৃটেনকে চ্যালেঞ্জ করতে!

 

অপরদিকে রাশিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় নিকোলাস ক্ষয়িষ্ণু অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যে নিজ প্রভাব বিস্তারে মনোযোগী হয়ে উঠে। ঘরোয়া সমস্যা অর্থাৎ তৎকালীন কম্যুনিস্ট বিপ্লব থেকে জনগণের নজর ফিরানো এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো।

 

এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা নিয়ন্ত্রণ করতো অটোমান সাম্রাজ্য। কিন্তু ১৯১১ সালে ত্রিপলির যুদ্ধে ইতালীর সাথে হেরে যাওয়া ও পূর্ব ইউরোপে বলকান রাষ্ট্রসমূহ- বুলগেরিয়া, সাইবেরিয়া, মন্টিনিগ্রো ও গ্রীস অটোমান সাম্রাজ্য থেকে বেরিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলে অটোমান সাম্রাজ্য দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসে। তাই ইউরোপ এশিয়ায় এক সময় দোর্দণ্ড প্রতাপে শাসন করা অটোমান সাম্রাজ্য জার্মানির সাথে মিলে হৃত সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখছিলো।

 

ফ্রান্স তখন আফ্রিকার কলোনী থেকে প্রাপ্ত সম্পদের কারণে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়ে যাক-এটা কখনো তারা চাইতো না। শক্তিশালী জার্মানি মানেই তাদের ভয়াবহ ক্ষতি।

 

অস্ট্রিয়ায় দীর্ঘ দিন ধরে শাসন করে আসা হাসবুর্গ রাজবংশ ও হাঙ্গেরিয় নেতৃত্বের মধ্যে ১৮৬৭ সালে একটি সমঝতা চুক্তি সাক্ষরিত হলে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়। এটাই ইতিহাসে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সম্রাজ্য নামে পরিচিত। যার রাজধানী ছিলো ভিয়েনায়। ভৌগলিকভাবে ইউরোপে তখন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ছিলো দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র।

 

ছবিতে আর্চডিউক ফার্দিনান্দ ও তার স্ত্রী

 

১৯১৪ সালের ২৮শে জুন অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ সস্ত্রীক বসনিয়ার সারায়েভো শহরে সামরিক বাহিনী পরিদর্শনে আসেন। বসনিয়া তখন অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের অন্যায়, দখলদারিত্ব, গণহত্যা, সীমাহীন নির্যাতন ও মৌলিক অধিকার হরণের প্রতিক্রিয়ায় বসনিয়া জুড়ে গড়ে উঠে উগ্র জাতিয়তাবাদী সংগঠন “দি ব্লাক হ্যান্ড” । অস্ট্রো-হাঙ্গেরি শাসন থেকে মুক্তিই ছিলো তাদের লক্ষ্য।

 

তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, নিজেরাই এর বিরুদ্ধে কিছু একটা করবে। ১৯ বছর বয়সী গাভরিলো প্রিন্সিপ নামের ছাত্রটি ছিলো এই সংগঠনের কর্মী। তার হাতেই ১৯১৪ সালের ২৮শে জুন অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। ঘটনাটি ঘটে বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি তৎক্ষণাৎ এই হত্যাকাণ্ডের জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ সার্বিয়াকে দায়ী করে। তাদের মতে সার্বিয়া সরকারই পিছনে থেকে মদদ দিচ্ছে ও কলকাঠি নাড়ছে। যদিও এর পিছনে সার্বিয়া সরকারে সম্পৃক্ততার কোন প্রমাণ মিলে নি। অস্ট্রিয়া সরকার এই গুপ্তহত্যার সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে সার্বিয়াকে দমন করতে চেয়েছিলো। কারণ, সার্বিয়া অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি ছিলো।

 

তখন জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় উইলহেইম অস্ট্রিয়াকে পূর্ণ সমর্থন দেয় এবং এই মর্মে আশ্বাস দেয় যে, যদি সার্বিয়ার সমর্থনে রাশিয়া ও ফান্স এগিয়ে আসে তাহলে বার্লিন তাদের শায়েস্তা করবে। এতে অস্ট্রিয়া সরকারের মনোবল আরো বেড়ে যায় ।

 

ফ্রান্সের ঐতিহাসিক শত্রুতার কারণে ব্রিটেন প্রথম দিকে জার্মানির প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিলো। কিন্তু জার্মানি বৃটেনের সাথে নৌ- প্রযুক্তিতে পাল্লা দিতে শুরু করায় সম্পর্কটি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠে। ফ্র্যাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধের পর থেকে জার্মানি ও ফরাসিদের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে।

 

১৯১৪ সালে অর্থনৈতিক আধিপত্য ও উপনিবেশ বাড়াতে জার্মানি হয়ে পড়েছিলো খুবই আক্রমণাত্মক। আধিপত্য বিস্তারের জন্য জার্মানি ব্রিটেনের সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় জড়িয়েছে,আফ্রিকায় রাজ্য দখল নিয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়েছে। রাশিয়ার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছে।

 

১৯১৪ সালের ২৩ জুলাই অস্ট্রিয়া রাষ্টদূত সার্বিয়ান সরকাছের কাছে একটি দীর্ঘ চরমপ্ত্র পাঠায়।

এতে দাবি করা হয়,

১-সকল হাসবুর্গবিরোধী প্রকাশনা সার্বিয়া সরকারকে নিষিদ্ধ করতে হবে।

২-সকল জাতীয়তাবাদী সংগঠন দমন করতে হবে।

৩-যেসকল সার্বিয়ান প্রশাসনিক ও সামরিক অধিকারিক সার্ব জাতীয়তাবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল, তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে ও তাদের নামের তালিকা অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সরকারকে পাঠাতে হবে।

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই চরমপত্রের উত্তর দেয়ার জন্য সার্বিয়াকে তাগাদা দেয়া হয়। একটি স্বাধীন দেশ কর্তৃক অপর একটি স্বাধীন দেশে এই রকম চরমপত্র পাঠানো ছিলো খুবই অন্যায়কর।

 

এ সময় রাশিয়া ফ্রান্সের সমর্থনে আশ্বস্ত হয়ে তাদের মিত্র দেশ সার্বিয়া পাশে এসে দাঁড়ায়। জার্মানি তখন রাশিয়াকে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। কারণ যদি রাশিয়া,অস্ট্রিয়া- হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে গিয়ে সার্বিয়ার পাশে দাঁড়ায়, তাহলে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়বে। আর জার্মানি সেটাই চাচ্ছিলো।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

সার্বিয়া রাশিয়ার সমর্থন পেয়ে অস্ট্রিয়ার দেয়া চরমপত্রে অবহেলা প্রদর্শন করে ও তাদের সীমান্তে সৈন্য সামাবেশ ঘটাতে থাকে। ফলে ২৮ জুলাই ১৯১৪ অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। পরদিন রাশিয়া সৈন্য সমাবেশের মাধ্যমে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে জার্মানিও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয় এবং জার্মান-অটোমান চুক্তি অনুসারে রাশিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে গেলে অটোমান সাম্রাজ্য মিত্র শক্তি রাশিয়া ও সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

 

রণাঙ্গনে জার্মান সৈন্যদের মহড়া

 

১ আগস্ট জার্মানি রাশিয়ায় আক্রমণের মধ্য দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এদিকে সার্বিয়া-রাশিয়ার সমর্থনে ফ্রান্স সৈন্য সমাবেশ শুরু করলে জার্মানি তাদের সতর্ক করে দেয়। কিন্তু ফান্সের প্রধানমন্ত্রী ভিভিয়ানি জার্মা্নিকে স্রেফ জানিয়া দেয়, তাদের জাতীয় স্বার্থে তারা যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত। কাজেই ৩ আগস্ট জার্মান ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। শুরু হয়ে যায় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় অধ্যায় ।

 

বৃটেন তখনো পর্যন্ত কোন পক্ষাবলম্বন করে নি। তারা শুধু জার্মানকে সাবধান করে দেয়, তারা যেন ইংলিশ চ্যানেলে ফ্রান্সের উপর নৌ-আক্রমণ না চালায় ও ফ্রান্সকে আক্রমণ করার জন্য বেলজিয়ামের ভূখণ্ড ব্যবহার না করে। কিন্তু জার্মানি এই সতর্কীকরণ উপেক্ষা করলে ৪ আগস্ট ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে। পুরোদমে শুরু হয়ে যায় ১ম বিশ্বযুদ্ধ । মানব হত্যার এক পৈশাচিক অনন্দে মেতে উঠে গোটা ইউরোপ।

চলবে…