হালাকু খানের বাগদাদ আক্রমণ ও একটি সমৃদ্ধ মুসলিম সভ্যতার পতন (শেষ পর্ব)

প্রকাশিত: ১২:০২ পূর্বাহ্ণ, জুন ১১, ২০২০
ছবিঃ ইন্টারনেট।

হালাকু বাহিনী চল্লিশ দিনে যে ধ্বংসলীলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলো তা বর্ণনাতীত। তারা তাদের সহযোগী মুসলমানদেরও রেহাই দেয়নি। তাতাররা রামাযান মাসে মুসলমানদেরকে শূকরের গোশত ও মদ্যপান করতে বাধ্য করে।

 

এরবলের শাসক ইবনুস সালায়া যে হালাকুকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেছিলো তাকেও হালাকু হত্যা করে।এছাড়া শায়খ ইবনুল জাওযী, তার তিন সন্তান, মুজাহিদুদ্দীন দোওয়ায়দায়ে ছগীর আয়বেক, শিহাবুদ্দীন সুলায়মান শাহ, ছাদরুদ্দীন আলী বিন নাইয়ারসহ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অসংখ্য আলেম-ওলামা, হাফেযে কুরআন, বক্তা ও ইমামদের হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী জামালুদ্দীন সুলায়মান বিন রতলায়ন বলেন, খলীফার সাথে যে ১৭ জন লোককে হালাকুর দরবারে উপস্থিত করা হয় তাদের মধ্যে আমার পিতাও ছিলেন। অন্যান্য সকলকে হত্যা করে। আমার পিতা বলেন, খলীফা প্রতি রাতে আমাদের কাছে এসে বলতেন- তোমরা আমার জন্য দোআ করো। একদিন খলীফার তাঁবুতে একটি পাখি বসলে হালাকু তাঁকে তলব করে জিজ্ঞেস করেন এই পাখি কীসের? এটি আপনাকে কি বললো? অতঃপর তাদের মধ্যে বহুক্ষণ আলাপচারিতা চললো। এরপর তাঁকে ও তাঁর বড় ছেলে আবু বকরকে লাথি মারতে শুরু করলো। অবশেষে তাঁরা মারা গেলেন। আর ঐ ১৭ জনকে ছেড়ে দিয়ে তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করা হলে, এতে তাদের দু’জন নিহত হলো। অন্যরা নিজেদের বাড়ি ফিরে এসে দেখলো জনশূন্য বিরানভূমি। আমি আমার সঙ্গাহীন পিতার নিকট এসে দেখলাম, তিনি তার বন্ধুদের মধ্যে পড়ে আছেন। তাদের কেউ আমাকে চিনতে পারলো না। তারা আমাকে বললো, আপনি কাকে চান? আমি বললাম, ফখরুদ্দীন বিন রতলায়নকে চাই। আমি তাকে চিনে ফেলেছিলাম। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তার থেকে কি চাও? আমি বললাম, আমি তার সন্তান। তিনি আমার দিকে তাকালেন। আমাকে চিনতে পেরে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। আমার নিকট তখন কিছু খাদ্য ছিলো তা তাদের মধ্যে বিতরণ করে দিলাম।

 

একজন লোক খলীফার প্রাসাদে প্রবেশ করে আব্বাসের বংশধরগণকে আহবান করে সমবেত করলো। অতঃপর তাদের সকলকে কবরস্থানে নিয়ে গিয়ে ছাগলের মতো যবেহ করে হত্যা করলো। মাসের পর মাস মসজিদসমূহ বন্ধ থাকলো। জুম‘আ ও জামা‘আতে সালাত আদায় বন্ধ হয়ে গেলো। এরই মধ্যে ইবনুল আলকামী বাগদাদের মাদরাসা, মসজিদ ও পাঠশালাগুলো বন্ধ করে দিয়ে শী‘আ রাফেযীদের দর্শনীয় স্থানগুলো উন্মুক্ত করে দেয়। সে রাফেযী মতাদর্শ প্রচার ও প্রসার করার জন্য মাদরাসা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করে। কিন্তু আল্লাহ তার ঘৃণ্য আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে দেন নি। কয়েক মাসের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।

 

ছয় শতাব্দী ধরে বাগদাদে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে অমূল্য ভাণ্ডার সঞ্চিত হয়েছিলো, নিষ্ঠুর তাতাররা এক সপ্তাহের মধ্যে সবকিছু দজলার পানিতে ফেলে তা নিঃশেষ করে দেয়। ইবনু কাছীর (রহঃ) ও অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ বলেন, অদৃষ্টে যা ঘটার ছিলো যখন তা ঘটে শেষ হলো তখন ইসলাম জগতের কেন্দ্র বাগদাদ নগরী পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। খুব অল্প লোকই সেখানে দেখা যেতো। পথে ঘাটে লাশগুলো টিলার মতো পড়েছিলো। বৃষ্টির কারণে লাশগুলো পঁচে গলে বাতাসের সাথে চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বায়ু দূষিত হয়ে লাশের দুর্গন্ধ সিরিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিলো। বায়ু দূষণের ফলে অসংখ্য প্রাণী মারা যায়। লোকদের মধ্যে প্লেগ ও মহামারীর মতো বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

 

এই ধ্বংসলীলার পর যখন বাগদাদে নিরাপত্তার ঘোষণা দেওয়া হয়। তখন আত্মরক্ষার্থে বাঙ্কার, নির্জনভূমি ও কবরের ভিতর যারা আশ্রয় নিয়েছিলো তারা বের হয়ে আসে। ক্ষুধার কারণে লোকদের অবস্থা কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিলো। যখন তাদেরকে কবর থেকে বের করা হলো তখন তারা একে অপরকে চিনতে পারছিলো না। বাবা তার ছেলেকে এবং ভাই তার ভাইকে চিনতে পারছিলো না। ভয়াবহ বিপদে সবাই ভীতবিহবল হয়ে পড়েছিলো।

 

এই আক্রমণের ফলে বাগদাদ মোঙ্গলদের অধিকারভুক্ত হয় এবং মুসলিম বিশ্ব তিন বছরের জন্য খলীফাশূন্য হয়ে পড়ে। এই আক্রমণের তাণ্ডবে অসংখ্য নর-নারী আত্মাহুতি দেয়। পৃথিবীর বিশেষত মুসলমানদের ওপর যেসব বিরাট বিপর্যয় ও ভয়াবহ ধ্বংসলীলা সংঘটিত হয়েছিলো, তন্মধ্যে তাতারদের আক্রমণ অন্যতম। তারা এমন রক্তপিপাসু জাতি ছিলো যারা নারী-পুরুষ, শিশু সবাইকে হত্যা করেছে। এমনকি গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত ঘটিয়ে ভ্রূণকেও হত্যা করেছে। বিশ্ব ইয়াজূজ-মা‘জূজ ব্যতীত কারো দ্বারা হয়তো এরূপ হত্যাকাণ্ড আর দেখবে না।

 

ইবনু খালদূন বলেন, মুসলমানদের ভাণ্ডারে থাকা জ্ঞান- বিজ্ঞানের বহু কিতাব দজলা নদীেতে নিক্ষেপ করা হয়। তিনদিন ধরে শহরের পথে পথে রক্তের স্রোত প্রবাহিত হয়েছিলো এবং টাইগ্রিস নদীর পানি মাইলের পর মাইল রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। ইবনু খালদূনের মতে, তাতারদের আক্রমণের ফলে এক লক্ষ ষাট হাজারর লোক প্রাণ হারায়। মতান্তরে দু’লক্ষ অধিবাসীদের মধ্যে এক লক্ষ ষাট হাজার লোক মারা যায়। কারো মতে আশি হাজার বা এক লক্ষ আশি হাজার মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বাগদাদ পতনের ফলে আব্বাসীয় শাসনের অবসান ঘটে। অবসান ঘটে ইসলামী খেলাফতের, যার ছায়াতলে ইসলামী বিশ্ব পরিচালিত হয়ে আসছিলো।

 

বাগদাদ আক্রমণের ফলে বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রাসাদ ও মসজিদ, মাদরাসা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অসংখ্য বই-পুস্তক বিনষ্ট হয় এবং বহু প্রখ্যাত পণ্ডিত ও বিজ্ঞানী নিহত হন। এভাবে মুসলিম বিশ্বের স্বপ্নরাজ্য বাগদাদে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা-সংস্কৃতির যে দীপশিখা প্রজ্বলিত হয়েছিলো তা মুহূর্তে নির্বাপিত হয়। তৎকালীন বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির শীর্ষ কেন্দ্র বাগদাদ ধ্বংসের ফলে শুধু মুসলিম বিশ্বের নয়, বরং সারাবিশ্বের অগ্রগতিও ব্যাহত হয়েছিলো।
পৃথিবীর ইতিহাসে যত ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে, বাগদাদ ধ্বংস তার সব কিছুকে ছাড়িয়ে যাবে। বাগদাদ ধ্বংসকে কেন্দ্র করে বহু কবিতা ও শোকগাঁথা রচিত হয়েছে। অনেক ঐতিহাসিক স্বতন্ত্র ইতিহাস গ্রন্থ লিখেছেন। কিন্তু এই ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়ে কেউ পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারেন নি।

 

এবার তাহলে চলুন, দেখে আসি কী কী করণে সামৃদ্ধশালী এক জনপদ এভাবে ধ্বংস হয়ে গেলো।

 

ক. রাজনৈতিক কারণ :

চেঙ্গীস খানের আমলে তাতার ব্যবসায়ীদের হত্যা করা হয় বলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। এরই প্রেক্ষিতে ৬১৪ হিজরী সনে তাতার সৈন্যরা মুহাম্মাদ খোয়ারিযম শাহের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে। যাদের নেতৃত্বে ছিলেন তাতার নেতা চেঙ্গীস খান। এ যুদ্ধে মুসলমানগণ পরাজিত হন। তাতাররা বিশ থেকে সত্তর হাজার মুসলমানকে হত্যা করে। এ যুদ্ধে জয় তাদের বিশ্ব জয়ের আকাঙ্ক্ষাকে ত্বরান্বিত করে। তাছাড়া পরবর্তীতে পারস্যের গুপ্তঘাতক সম্প্রদায়কে দমন করার জন্য খলীফার নিকট সাহায্য চাওয়া হলে তিনি তাতে মৌন সম্মতি দিলেও সৈন্য দিয়ে সাহায্য করেন নি। ফলে হালাকু খান বাগদাদ আক্রমণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন।

 

খ) ধর্মীয় কারণ

১. শী‘আ- সুন্নী দ্বন্দ্ব

ইতিহাস নিন্দিত এ ঘটনার জন্য মূল দায়ী ব্যক্তি ছিলো খলীফা মুস্তা‘ছিম বিল্লাহর প্রধানমন্ত্রী গোঁড়া শী‘আ রাফেযী ইবনু আলকামী। সে সর্বাস্থায় সুন্নীদের পতন কামনা করতো। সে মুসলমানদের পতন ঘটাতে দীর্ঘ পরিকল্পণা নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। খলীফা মুস্তানসিরের আমলে যেখানে মুসলিম সৈন্য সংখ্যা এক লক্ষেরও বেশী ছিলো, সেখানে ইবনুল আলকামী সৈন্যের সংখ্যা কমাতে কমাতে দশ হাজারে নামিয়ে আনে। অতঃপর মুসলমানদের দুর্বলতার সার্বিক বিষয়ে লিখে পাঠায় হালাকু খানের কাছে। তাকে আহবান জানায় বাগদাদ আক্রমণের জন্য। ইবনুল আলকামী তার বন্ধু ইরবিলের আমীর ইবনুছ ছালায়াকে এ মর্মে পত্র লিখে পাঠান যে, তিনি যেন হালাকু খানকে বাগদাদ আক্রমণের জন্য প্ররোচিত করেন এবং তার জন্য পথ সুগম করে দেন’।

 

উল্লেখ্য যে, তাতাররা ৬৩৪ হিজরীতে ইরবিলে হামলা করেছিলো এবং মিনজানীক তাক করে শহরের প্রাচীর ভেঙ্গে শহরে প্রবেশ করে হাজারর হাজার মুসলমানকে হত্যা ও তাদের সন্তান ও স্ত্রীদের বন্দি করেছিলো। ইবনুল আলকামী হালাকুকে এও প্রস্তাব দেয় যে, যদি তিনি তাকে বাগদাদের নায়েব বানিয়ে দেয় তাহলে বাগদাদ দখল তাদের জন্য সহজ হয়ে যাবে। মুছেলের শাসনকর্তা তাকে হালাকুর বাগদাদ দখলের ষড়যন্ত্রের কথা জানালেও সে খলীফাকে কিছুই অবহিত করেনি। অবশেষে সে স্বপরিবারে হালাকুর নিকট গিয়ে বাগদাদ আক্রমণের আহবান জানায় এবং নিজ ও পরিবারের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ফিরে আসে। খলীফা ইবনুল আলকামীকে হালাকুর সাথে চুক্তি করতে পাঠালে সে ফিরে এসে খলীফাকে বলে, হালাকু খান আপনার ছেলে আবুবকরের সাথে তার মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করতে চান। আর আপনি তার আনুগত্যে থাকবেন যেমন আপনার পূর্ববর্তীরা ছিলো। এজন্য মন্ত্রী পরিষদসহ আপনাকে যেতে হবে। ফলে খলীফা মন্ত্রী, আত্মীয় ও আলেম-ওলামাকে সাথে নিয়ে ছেলের বিয়ে সম্পন্ন করার জন্য হালাকু খানের নিকট গমন করেন। এ সুযোগে হালাকু খানের সৈন্যরা খলীফা ও তার সতের জন সঙ্গী ব্যতীত সকলকে হত্যা করে। পর্যায়ক্রমে দলে দলে জ্ঞানী-গুণীরা খলীফার সন্ধানে যেতে থাকে আর হালাকুর সৈন্যরা তাদের হত্যা করতে থাকে। এতে খলীফা মন্ত্রী ও আলেম শূন্য হয়ে একমাত্র ইবনুল আলকামী নির্ভর হয়ে পড়েন। হালাকু খান সুকৌশলে শী‘আ মতাদর্শী নাছীরুদ্দীন তুসীকে তার মন্ত্রীর পদ প্রদান করে। ইবনুল আলকামী ও নাছীরুদ্দীন তুসী এই দু’মন্ত্রী এক সাথে পরামর্শ করে বাগদাদ ধ্বংসের যাবতীয় পরিকল্পনা সম্পন্ন করে।

 

ইবনুল আলকামী এতো হিংস্র হওয়ার পিছনে কারণ ছিলো এই যে, বিগত বছরে শী‘আ, রাফেযী ও আহলে সুন্নাতের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় যাতে রাফেযীদের কেন্দ্র কারাখ, রাফেযীদের অন্যান্য আবাসভূমি ও মন্ত্রীর আত্মীয়-স্বজনের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। এরপর থেকে মন্ত্রী হৃদয়ে প্রতিশোধের আগুন নিয়ে সুন্নীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হ’তে থাকে। বাগদাদ নগরীতে ৩৯৮ হিজরীতে শী‘আ-সুন্নীদের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। এতে বহু লোক নিহত হয়। আল্লামা রশীদ রেযা বলেন, বাগদাদের ইতিহাস পাঠ কর, যাতে রয়েছে তাতার অভিযানের বর্ণনা, যার কারণে পৃথিবীতে মুসলিম গৌরবের ভিত্তি বিনষ্ট হয়, মুসলিম রাষ্ট্রসমূহ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। এর অন্যতম কারণ ছিল হানাফী-শাফেঈ মাযহাবের চরম দ্বন্দ্ব এবং খলীফার শী‘আ মন্ত্রী ইবনুল আলকামী। এই মন্ত্রী সুন্নীদের নিধনকল্পে ৬৫৬ হিজরীতে ইসলামী খেলাফতের রাজধানী বাগদাদে তাতারদের ডেকে আনে। কিন্তু তাতাররা বাগদাদ নগরীকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পর শী‘আ-সুন্নী সকলকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ইবনুল আলকামীকে বিশ্বাস ঘাতকতার জন্য স্বয়ং হালাকু খান তিরস্কার করেছিলেন। এক সময় ইবনুল আলকামী অভিশপ্ত জীবনের দুশ্চিন্তায় মৃত্যুমুখে পতিত হয়’।

 

২. মাযহাবী দ্বন্দ্ব :

বাগদাদ আক্রমণের অন্যতম কারণ ছিল হানাফী ও শাফেঈ মাযহাবের দ্বন্দ্ব। আল্লামা রশীদ রেযা, সূরা বাক্বারার ২০৮নং আয়াতের তাফসীরে রাসূল (সঃ)-এর নিম্নোক্ত হাদীস- ‘সাবধান! আমার পর তোমরা বিপথগামী হয়ে একে অন্যের জীবননাশ করো না’ -এর ব্যাখ্যায় বলেন, অথচ আমরা এ দলীলগুলোকে পশ্চাতে ফেলে বিভক্ত হয়ে পড়েছি এবং দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছি। দ্বীনের বিষয়ে একে অপরকে সন্দেহ করছি। ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন মাযহাব গ্রহণ করেছি। প্রত্যেকে নিজ নিজ মাযহাবের প্রতি অন্ধ ভক্তি করছে। আর এজন্য সকল মুসলিম ভাইদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করছে। সে মনে করছে দ্বীনকে সাহায্য করছে অথচ সে বিভেদ সৃষ্টি করে দ্বীনকে অপদস্ত করছে। সুন্নীরা শী‘আদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, শী‘আরা ইবাযিয়াদের সাথে সংঘাত করে। শাফেঈরা হানাফীদের বিরুদ্ধে তাতারদেরকে প্ররোচিত করে, হানাফীরা শাফেঈদের যিম্মী মনে করে, এরা খালাফদের মুক্বাল্লিদ ও সালাফদের অনুসারীদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে। ইবনুস সাম‘আনী ৪৬২ হিজরীতে হানাফী মাযহাব ত্যাগ করে শাফেঈ মাযহাব অবলম্বন করলে এই দু’মাযহাবের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। এতে খোরাসান ও মারভ নগরী শ্মশানে পরিণত হয়। ইবনু তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেন,

وَبِلَادُ الشَّرْقِ مِنْ أَسْبَابِ تَسْلِيطِ اللهِ التتر عَلَيْهَا كَثْرَةُ التَّفَرُّقِ وَالْفِتَنِ بَيْنَهُمْ فِي الْمَذَاهِبِ وَغَيْرِهَا ‘প্রাচ্যে মাযহাব ও অন্যান্য বিষয়ে তাদের পরস্পরের মধ্যে অধিক মতপার্থক্য ও ফিৎনার কারণে আল্লাহ তা‘আলা তাতারদের বিজয় দান করেন’

 

প্রত্যেক মাযহাব একে অপরকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয়। তূস শহরে হানাফীরা শাফেঈ মাযহাবের লোকদের প্রতি অতিষ্ট হয়ে হালাকু বাহিনীকে শাফেঈদের হত্যা করার জন্য আহবান করে। নিজেরাই হালাকু বাহিনীর জন্য শহরের দরজা খুলে দেয়। তাতাররা শহরে প্রবেশ করে শাফেঈদের হত্যার পাশাপাশি হানাফীদেরও রেহাই দেয়নি। শায়খ আব্দুল ওয়াহ্হাব শা‘রানী বলেন, হানাফী ও শাফেঈদের মধ্যে যাতে তর্ক-বিতর্ক ও মারামারি করার শারীরিক ক্ষমতা লোপ না পায় এজন্য উভয় মাযহাবের লোকেরা তাদের আলেমদের ফতুয়া সূত্রে রামাযান মাসে ছিয়াম পালন করতো না।

 

তাই পরিশেষে বলবো, শী‘আ-সুন্নী ও মাযহাবী মতপার্থক্য ভুলে গিয়ে কুরআন ও ছহীহ হাদীসের ভিত্তিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ক্ষমতার মোহে পড়ে দলাদলি না করে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সচেষ্ট হতে হবে। অন্যথায় ইসলাম তথা কুরআন ও ছহীহ হাদীস বিদ্বেষীরা এমন হামলা করবে যে, হালাকু বাহিনীর মতো হানাফী-শাফেঈ, মালেকী-হাম্বলীসহ হকপন্থী জামা‘আতকেও ধ্বংস করে দিবে। তাই আসুন, আমরা বাগদাদ ধ্বংসের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ জীবন যাপন করি। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন-আমীন!