স্পেনে মুসলিম সভ্যতার নীরব সাক্ষী “আল হামরা” (শেষ পর্ব)

প্রকাশিত: ৯:৫৮ অপরাহ্ণ, জুন ১৪, ২০২০

 

১৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে আরাগনের রাজা ফারডিন্যান্ড ক্যাস্টাইলের রানী ইসাবেলাকে বিয়ে করেন। এই বিয়ের মধ্য দিয়ে আইবেরীয় উপদ্বীপের দুইটি শক্তিশালী খ্রিস্টান রাজ্য একত্রিত হয়। এই ঐক্যবদ্ধ খ্রিস্টান শক্তি আন্দালুসের মাটি থেকে সর্বশেষ মুসলিম রাজ্যটির স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

 

১৪৮২ খ্রিস্টাব্দে ঐক্যবদ্ধ খ্রিস্টান শক্তির সাথে গ্রানাডার সংঘর্ষ শুরু হয়। সামরিক দিক হতে পিছিয়ে থাকা স্বত্ত্বেও গ্রানাডার অধিবাসীরা অসম্ভব সাহসিকতার সাথে লড়াই করে। আন্দালুসের সর্বশেষ অবস্থানকে টিকিয়ে রাখতে সাধারন মুসলিম জনগণ এবং সেনাবাহিনী চরম সাহসিকতার সাথে লড়াই করলেও তাদের শাসকেরা উল্লেখযোগ্য তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারে নি।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

যুদ্ধের সময় খ্রিস্টান সেনাবাহিনী ঐক্যবদ্ধ ছিলো। তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র স্বার্থের কোনো দ্বন্দ্ব ছিলো না। অন্যদিকে, গ্রানাডায় মুসলিম শাসক ও প্রশাসকরা পারস্পরিক ক্ষুদ্র স্বার্থ নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। তাদের মধ্যে আবার অনেকেই অর্থের বিনিময়ে খ্রিস্টান শক্তির পক্ষে কাজ করে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক বছরের মাথায় গ্রানাডার আমির আবুল হাসানের পুত্র মুহাম্মদ ওরফে আবু আবদুল্লাহ পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

রাজা ফারডিন্যান্ড এই সুযোগকে কাজে লাগায়। সে মুহাম্মদকে তার পিতা এবং পরবর্তীতে তার চাচা আল জাগলের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে সাহায্য করে। মুহাম্মদ ফারডিন্যান্ডের সাহায্যে তার পরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গ্রানাডা অধিকার করতে সক্ষম হয়। এর মাধ্যমে ফারডিন্যান্ডের সেনাবাহিনী গ্রানাডার ভূমিতে পা রাখার সুযোগ পেয়ে যায় । ১৪৯০ সালে মুহাম্মদ যখন গ্রানাডার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন, তখন গ্রানাডা শহর ছাড়া আর কোনো অঞ্চলে তার কর্তৃত্ব স্থাপনকরতে পারেন নি।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

১৪৯০ সালে ফারডিন্যান্ড তাকে গ্রানাডা সমর্পণ করতে আদেশ দেয়। এতোদিন ধরে মিত্রতা ধরে রাখা মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ এতে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হন। ফলে ১৪৯২সালে ৪০,০০০ পদাতিক এবং ১০,০০০ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে ফারডিন্যান্ড রওনা হয় । ১৪৯১ সালে গ্রানাডাকে লণ্ডভণ্ড করে দেয় তার উন্মত্ত বাহিনী। প্রধান সেনাপতি মুসা বিন গাজানের নেতৃত্বে মুসলিম অশ্বারোহীরা প্রতিরোধ করার প্রবল প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু কোনো প্রকার সাহয্য না পাওয়ায় ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে মুসলিমদের মনোবল ও শক্তি। এরপর ২রা জুন, ১৪৯২ সালে আবু আব্দুল্লাহ আত্মসমর্পণ করেন। যার মধ্য দিয়ে স্পেনে ৭৮০ বছরের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। আমেরিকা বিজয়ী ক্রিস্টোফার কলম্বাস এ আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করে।

 

শাসক আবু আবদুল্লাহ যখন বিজয়ীদের হাতে আল হামরার চাবি তুলে দেন, তখন তিনি অঝোরে কাঁদছিলেন। এ কান্না দেখে আবদুল্লাহর মা বলেছিলেন-

“পুরুষের মতো যা রক্ষা করতে পারো নি, তার জন্য নারীর মতো কাঁদতে পারো না”।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

এরপরই নেমে আসে স্পেনে মুসলিম নিধনের কালো অধ্যায়। শর্ত দেওয়া হয়, ধর্মান্তর নয়তো মৃত্যু। ঘোষণা করা হয়, যারা মসজিদে আশ্রয় নেবে, যারা জাহাজে আশ্রয় নেবে, তারা নিরাপদ। এতে সরল বিশ্বাসে নিরীহ মুসলমানরা মসজিদে ও জাহাজে আশ্রয় নেন। তখনই ফারডিন্যান্ডও ইসাবেলার সৈন্যরা মসজিদের চারপাশে আগুন লাগিয়ে এবং জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে এক পৈশাচিক উল্লাসে মেতে ওঠে।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

নির্মম গণহত্যার পরও যেসব মুসলমান আন্দালুসিয়ায় রয়ে গিয়েছিলেন, ফারডিন্যান্ডের ছেলে তৃতীয় ফিলিপ তাদের সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় সমুদ্রপথে নির্বাসিত করে। তাদের সংখ্যা ছিলো পাঁচ লাখেরও বেশি। তাদের মধ্যে খুব অল্প লোকই জীবিত ছিলেন। বিপুলসংখ্যক মানুষ সমুদ্রের গহীন অতলে হারিয়ে যান। তারা স্পেনের মাটি থেকে মুসলিমদের নাম নিশানা চিরতরে মুছে ফেলে। মুসলিম সভ্যতা-সংস্কৃতিকে গলা টিপে হত্যা করে, যেই সভ্যতা একদিন অন্ধকারে নিমজ্জিত ইউরোপে আলোর মশাল জ্বেলেছিলো। তবে স্পেনে মুসলিমদের সোনালী ঐতিয্যের গর্ব আন্দালুস,আল হামরা, কর্ডোভা ও যোহরা প্রাসাদগুলোকে তারা মুছে ফেলতে পারে নি। এগুলো রয়ে গেছে মহাকালের গল্প হয়ে।