স্পেনে মুসলিম সভ্যতার নীরব সাক্ষী “আল হামরা” (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রকাশিত: ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৪, ২০২০

 

আল হামরায় ১৭৩০ মিটার দেয়ালে ঘেরা শহরের ভিতরে রয়েছে ত্রিশটি টাওয়ার আর চারটি সদর দরজা। এর মূলত তিনটি অংশ- প্রাসাদের নিরাপত্তাদানকারী রাজকীয় সেনাবাহিনীর বাসস্থান বা আল কাজবা, শাসকের পরিবারের আবাস বা সিটাডেল, আর শহর বা মদিনা। রাজসভার কর্মকর্তারা এখানেই বসবাস করতেন। পশ্চিম অংশটি মূলত আল কাজাবা দুর্গ। এটিই সবচেয়ে পুরনো অংশ এবং পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু স্থানে অবস্থিত। মোটামোটি ত্রিকোণাকৃতির অবয়ব। চারদিকে উঁচু দেয়ালের ভিতরে তিনটি বুরুজ বা টাওয়ার এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। ৮৫ ফুট অর্থাৎ প্রায় আট তলার সমান উঁচু এ টাওয়ারটি স্প্যানিশ ভাষায় ‘টরে ডি ডেলা’ নামে পরিচিত।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

প্রাসাদগুলোর স্থাপত্যশৈলী খুবই হৃদয়গ্রাহী। অসংখ্য কলাম, তোরণ, ঝর্ণা, প্রবাহিত পানি এবং স্বচ্ছ পুকুরগুলো প্রাসাদগুলোর নান্দনিক সজ্জার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আলহামরা ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যেন ভেতরে প্রচুর আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে। কক্ষের ভেতরের দেয়ালগুলোতে আরবি হরফ, কোরআনের আয়াত ও মুরিশ কবি ইবন জামরাকের কবিতা খোদাই করে সাজানো হয়েছে।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

এছাড়া রয়েছে নানারকম জ্যামিতিক কারুকাজ এবং অ্যারাবেস্কের কাজ। আন্দালুসিয়ার এই নান্দনিক অভ্যন্তরীণ সজ্জা ছিলো স্পেন বিকাশমান আন্দালুসিয়ান শিল্পের অবদান। মুরিশ শিল্পীরা নতুন এই শিল্পের আবিষ্কারের উপাদান সংগ্রহ করেছেন বাইজেন্টাইন ও সমকালীন আব্বাসীয় খেলাফত থেকে। কিছু কিছু নিজেরাও উদ্ভাবন করেছেন, যেমন অলঙ্কৃত তোরণ, গম্বুজাকৃতি সিলিংয়ের কারুকাজ। গ্রানাডার শেষ সময়ে বিকশিত এই স্থাপত্য কৌশলের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে আজকের আধুনিক মুসলিম স্থাপত্যগুলোতে।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

আল হামরার সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা তিনটি হলো মাচুকা প্যালেস, কোমারিস প্যালেস, কোর্ট অফ লায়ন। সবগুলোই চতুর্দশ শতাব্দীতে নির্মিত। সবচেয়ে পুরনো প্রাসাদটি মাচুকা প্যালেস হিসেবে জানা যায়। আল কাজাবা দুর্গ থেকে পূর্ব দিকে আল হামরা প্যালেস অংশে ঢুকতে হলে প্রথম তোরণ পাড়ি দিলে বেশ খোলা জায়গা চোখে পড়ে। বাগিচাসমৃদ্ধ। একপাশে একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ এখনো দৃশ্যমান। দ্বিতীয় তোরণ পাড়ি দিলে বাগানসমৃদ্ধ উঠোনটি কোর্ট অব মাচুকা। উঠোনের উত্তর পাশে মেক্সুয়ার বা সমাবেশস্থল।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

আরবি মাশোয়ার শব্দের স্প্যানিশ উচ্চারণ মেক্সুয়ার হিসেবে এটি পরিচিত। এখানে সুলতানগণ রাজন্যবর্গ ও অতিথীদের সাথে দেন-দরবার করতেন।  চতুর্দিকে আর্চওয়ে সমৃদ্ধ বারান্দা বলা যায়। যেকোনো জনসমাগমের জন্য ছায়াঢাকা কিন্তু খোলা জায়গা। কেউ কেউ ধারণা করেন দক্ষিণ পাশেও একই রকম আরেকটি বারান্দা ছিলো। উঠোনের মধ্যখানে দুটি গোলাকৃতি পানির ফোয়ারা। মাচুরা চত্বরের পূর্ব পাশেই নাসরিদ বংশীয় সুলতানদের রয়েল প্যালেস বা প্রাচীন রাজপ্রাসাদ। বিভিন্ন উচ্চতর এবং আকারের চৌচালা ছাদ সমৃদ্ধ একাধিক বাহুর সম্মিলনে মোটামোটি আয়তকার প্রাসাদ। এর মাঝখানে আবার ছোট ছোট কিছু উঠান তৈরি হয়েছে। মাচুকা প্যালেসকে আল হামরার সবচেয়ে পুরনো অংশ বলে বিবেচনা করা হয়। এটি এখন আর খুব বেশি দৃশ্যমান নয়।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

দ্বিতীয় প্রাসাদের নাম হলো কোমারেস প্যালেস। এর পূর্ব দিকে বিশাল চত্বরের মাঝে রয়েছে পানির নহর। নহরের চারপাশে পায়ে হাঁটার সুসজ্জিত পথ। এর একপাশে প্রশাসনিক ভবন। নাম ছিলো দিওয়ান। এখানে মুসলিম সুলতানগণ তাদের সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাজ চালাতেন এবং এটাই ছিলো সিংহাসন কক্ষ ও হল অব অ্যাম্বেসেডর। ছিলো সুলতানের নিজ প্রাসাদের অবস্থান। এখন আর এটির অস্থিত্ব নেই। রাজা পঞ্চম চার্লস তার জন্য আরেকটি প্রাসাদ বানাতে গিয়ে পুরনো সুদৃশ্য প্রাসাদটি ধ্বংস করে ফেলেন। সেখানে আরো কিছু কাঠামোর সাথে একটি মসজিদও ছিলো। কিন্তু কালের গর্ভে তা হারিয়ে গেছে। এখন শুধু বিস্তৃত বারান্দাটি নজরে আসে। তার সামনে কোমেরেস প্যালেসের সদর দরজা। কোমারেস প্রাসাদের আভ্যন্তরীণ সাজ সজ্জা চোখ ধাঁধানো। গম্বুজের দেয়ালে স্বর্ণখচিত নান্দনিক কারুকাজ। মেঝের দেয়ালে শিল্পীর নিঁখুত হাতে অঙ্কিত আরবী হরফের নানারকম সূক্ষ্ম কারুকাজ।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

কোমারিস প্রাসাদের ঠিক পরেই আল হামরার আরেকটি আকর্ষণীয় ও নান্দনিক স্থাপনা কোর্ট অব লায়ন। আলাদা ভবন হিসেবে নির্মিত হলেও গ্রানাডার পতনের পর কোমারিস প্রাসাদের সাথে সংযুক্ত করা হয়। পঞ্চম মুহাম্মাদ কোর্ট অব লায়নকে দেখার মতো করেই বানিয়েছিলেন। চত্বরের উত্তরে হেরেমের অবস্থান, পশ্চিমে মাকার্নাস চেম্বার। পূর্বে হল অব জাস্টিস বা ন্যায়বিচার কক্ষ। চত্বরকে ঘিরে রেখেছে সরু কলামের সারি। চত্বরের কেন্দ্রে জটিল পানিপ্রবাহ ব্যবস্থা সংবলিত মার্বেল বেসিনের ঝর্ণা।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

কোর্ট অব লায়ন নামে পরিচিত হলেও এর আদি পরিচয় হেরেম বা অন্দরমহল। কোর্ট অব লায়নের মাকার্নাস চেম্বারের গম্বুজাকৃতির কারুকার্যখচিত সিলিং আল হামরার অন্যতম সেরা স্থাপত্য। প্রাসাদের মধ্যে উন্মুক্ত খোলা চত্বরে বারোটি সিংহের ভাস্কর্য আছে বলেই এটি এখন কোর্ট অব লায়ন বা সিংহ চত্বর নামে পরিচিত।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

১০৩১ খ্রিস্টাব্দে ঈসায়ীতে উমাইয়া শাসনের পতন হলে আল-আন্দালুস অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ক্ষুদ্র এই রাজ্যগুলো তাইফা নামে পরিচিত ছিলো। ক্ষুদ্র এই রাজ্যগুলো দুর্বল এবং একতাবদ্ধ না থাকার কারণে ধীরে ধীরে উত্তরের খ্রিস্টান রাজ্যগুলোর আগ্রাসনের শিকার হতে থাকে। পরবর্তী দুইশত বছরের মধ্যে খ্রিস্টান আগ্রাসনে একেএকে এই রাজ্যগুলোর পতন ঘটতে থাকে। ১২৪০ সালের মধ্যে দক্ষিণের একমাত্র গ্রানাডা ছাড়া বাকি সবগুলো রাজ্য মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যায়।

চলবে…