স্পেনে মুসলিম সভ্যতার নীরব সাক্ষী “আল হামরা” (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ৯:৩৪ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২০

ইতিহাসের মহানায়কদের হাতে সভ্যতার গোড়াপত্তন হয় বিজয়ের উল্লাস আর আড়ম্বরময় স্বপ্ন নিয়ে। অতঃপর সে গৌরবোজ্জ্বল সময় আবার ক্ষয়ে যায় ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষ হয়ে, চিহ্ন রেখে যায় পৃথিবীর প্রান্তরে। আধুনিক স্পেনের বুকে আজো দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক আল হামরা প্রাসাদ তেমনই এক গৌরবময় সময়ের বিবর্তন চিহ্ন, যার নিষ্প্রভ কালচে দেয়ালে কান পাতলে আজো শোনা যায় অশ্বখুরের ধ্বনি। আজো স্মৃতির মিনারে ভেসে উঠে সুবহে সাদিকের সুললিত আজানের সুর।মর্মর শ্বেত পাথরের নিষ্প্রভ চেহারার আড়ালে ঢেকে আছে সময়ের জ্বলজ্বলে ক্ষণ।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

৭১১ খ্রিস্টাব্দের ৩০ এপ্রিল সেনাপতি তারিকবিন যিয়াদের নেতৃত্বে মুসলিম সেনাবাহিনী স্পেন উপকূলের এক পাহাড়ে এসে ঘাঁটি গাড়েন, যা পরবর্তীতে জাবালে তারিক বা তারিকের পাহাড় নামে বিখ্যাত । জাবালে তারিক শব্দটিই ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয়ে জিব্রাল্টার হয়েছে। পাহাড়ে অবস্থান নিয়ে সেনাপতি তাঁর নৌকাগুলো পুড়িয়ে দেন। এতে অবাক সৈন্যদের জিজ্ঞাসায় তারিক বলেছিলেন—‘আমরা ফিরে যাওয়ার জন্য আসি নি। হয় বিজয়, না হয় মৃত্যু।’

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

সৈন্যদের উদ্দেশেতারিক বিন যিয়াদ বলেন-“হে আমার যোদ্ধারা! কোথায় তোমরা পালাবে? তোমাদের পেছনে সাগর, সামনে শত্রু , তোমাদের আছেশুধু সাহস ও ধীশক্তি। মনে রেখো, এ দেশে তোমরা সেই এতিমদের চেয়েও হতভাগা, যাদের লোভী মালিকদের সঙ্গে টেবিলে বসতে হয়।তোমাদের সামনে শত্রু, যাদের সংখ্যা অগণিত। কিন্তু তোমাদের তলোয়ার ছাড়া কিছুই নেই। তোমরা বেঁচে থাকতে পারবে, যদি শত্রুর হাত থেকে নিজেদের জীবনকে ছিনিয়ে আনতে পারো। ভেবো না, আমি তোমাদের সঙ্গে থাকবো না। আমিই সবার সামনে থাকবো এবং আমারবাঁচার সম্ভাবনাই সবচেয়ে ক্ষীণ।’

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

তারিকের এমন মর্মস্পর্শী বক্তব্য ও সুদীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মুসলমানরা স্পেন বিজয় করে। তারা স্পেনের নামকরণ করে আন্দালুসিয়া। সুদীর্ঘ ৭৮০ বছর স্পেনে মুসলিম শাসনে কর্ডোভা হয়ে ওঠে ইউরোপের সবচেয়ে মনোরম ও উন্নত জনপদ।প্রায় পাঁচ হাজারমিল-কারখানা ছিল শুধু কর্ডোতেই। শিক্ষা দীক্ষার জন্য ছিলো ৮০০ স্কুল। অথচ তখন ইউরোপেএকটিও স্কুলও ছিল না। ইউরোপের ৯৯ শতাংশ লোক ছিলো অশিক্ষিত। তৎকালের ইউরোপে গোসলখানার ধারণাই ছিলো না। অথচ তখন মুসলমানরা কর্ডোভায় ৯০০ হামামখানা বা গণগোসলখানা বানিয়েছিলেন। দশম শতকে কর্ডোভায় ছিল ৭০০ মসজিদ,৬০ হাজার প্রাসাদতুল্য বাড়ি। ছিল ৭০টি লাইব্রেরি, যার সবচেয়ে বড়টিতে ছিল ছয় লাখ গ্রন্থ। সে সময় আন্দালুসিয়ায় বছরে ৬০ হাজার বইপত্র ওপুস্তিকা প্রকাশিত হতো।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি-সভ্যতার অনন্য অধ্যায় স্পেনের ‘আন্দালুস’। এ নগরীর গর্ব আল-হামরা। আরবি ‘কিলআতু আল হামরা’-অর্থাৎ লালকেল্লা বা বহুল প্রচলিত ‘আল-হামরা প্যালেস”। সৌন্দর্য-সুষমায় আল্লাহতাআলা ‘আল-হামরা’কে অতুলনীয় করে রেখেছেন। বিশ্ববাসীর কাছে তা আজও অপার বিস্ময় ও সৃজনসম্ভার হিসেবে পরিচিত। ১২৩৮ সালে মুহাম্মদ ইবনে নাসর (১২৩৮-১২৭৩ খ্রিস্টাব্দ) গ্রানাডা জয় করেন। তিনি তাঁর আবাসন ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। পরবর্তী ৩০০ বছরে বিভিন্ন মুসলিম শাসকের পরিকল্পনা ও পরিচর্যায় আল-হামরার নান্দনিকতা ও পরিব্যাপ্তি বৃদ্ধি পেয়ে যশ-খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

 

গ্রানাডাশহরের পশ্চিমে সাবিক পাহাড়ের উপরে দুর্লভ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থানে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন আল হামারা প্রাসাদ। এটির ভৌগলিক অবস্থান খুবই আকর্ষণীয়। প্রাসাদের চারপাশের ঘন সবুজ বন। বাঁ দিয়ে বয়ে গেছে দারো নদী। অপরপাশে মুরদের পুরনো শহর আলবাইজিন ও সামনের ঢালু তৃণভূমি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। আল হামারার সৌন্দর্য্যের প্রসংসা করতে গিয়ে মুরিশ কবিরা বলেছে, “পান্নাখচিত মুক্তা”।