ঢাকা, মঙ্গলবার ৩০শে নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৪শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

রুমি, আল্লামা রুমি,আল্লামা রুমি (রহ:)-(দ্বিতীয় পর্ব)


প্রকাশিত: ১০:৪৪ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২০

লিখেছেন:মাহমুদ হাসান।

 

এখন থেকে প্রায় ৮১৩ বছর আগের একজন মানুষের লেখা এখনো বেস্ট সেলিং,পুরো বিশ্বজুড়ে তাঁর অসংখ্য, অগণিত ভক্ত আছে – এটা ভাববার মতো বিষয়!- বিবিসি ইংলিশ।

 

হুসামুদ্দীন নামে রুমির খুব প্রিয় এক ছাত্র ছিলো। রুমিকে একবার খুব উৎফুল্ল অবস্থায় দেখে সে রুমিকে বললো- আপনি মাঝে মধ্যে দুই চার লাইন করে কবিতা আবৃত্তি করেন। গভীর জীবনবোধ থাকে আপনার সেসব কথায়। আমাদের মনে দাগ কেটে যায় আপনার কথাগুলো। মনে দাগ কেটে যাওয়ার মতো কথা সবাই বলতে পারে না। আপনি পারেন। মানুষের মনের ক্ষুধা নিবারণের জন্য, অন্তরের চাহিদা পূরণের জন্য, হৃদয়কে উজ্জীবিত করার জন্য, খোদার প্রেমের প্রেমিকদের জন্য আপনার একটা বই লেখা অত্যন্ত জরুরী।

রুমি বললেন- আমারও মনে হয়েছে কিছু একটা লেখা উচিত। এবং লেখা শুরুও করেছি।

এটা বলে তিনি পাগড়ীর ভাঁজ থেকে বের করে একটি কাগজ হুসামুদ্দীনের হাতে ধরিয়ে দিলেন। কাগজে আঠারোটি লাইন লেখা। এই আঠারোটি লাইনই ছিলো রুমির জগদ্বিখ্যাত মসনভীর সূচনা।

 

এরপরের বারোটি বছর রুমি বলেছেন আর হুসামুদ্দীন লিখে রেখেছেন। মাঝে অবশ্য দুই বছর হুসামুদ্দীনের স্ত্রীর অসুস্থতা এবং মৃত্যুর কারণে মসনভী রচনার কাজ স্থগিত ছিলো। মোট ছয় খণ্ডে শেষ হয় মসনভীর রচনা। গুরু,শিষ্যের দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনীর প্রচেষ্টার এক অনবদ্য ফসল এই মসনভী, জগত তোলপাড় করে দেয়া মসনভী। মূল মসনভীতে প্রায় চল্লিশ হাজার লাইন রয়েছে। কেউ কেউ মসনভীকে মানব রচিত ‘কুরআন’ বলেও আখ্যায়িত করেছেন। ফার্সি ভাষায় এখন পর্যন্ত মসনভীর চেয়ে উঁচু মানের কোন সাহিত্যের বই রচিত হয় নি। পৃথিবীর প্রায় সকল ভাষায় অনূদিত হয়েছে রুমির মসনভী। কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন- মসনভী লিখতে সময় লেগেছে বাইশ বছর।

 

তুরস্কের কৌনিয়াতে মাওলানা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত মসনভী।

 

রুমির লেখা চার লাইনের প্রায় দুই হাজার কবিতা আছে। এগুলো রুবাইয়াত নামে পরিচিত। এই দুই হাজার কবিতা থেকে নির্দিষ্ট কিছু কবিতার ইংরেজী অনুবাদ করেন ক্যামব্রিজের প্রফেসর আর্থার জন আরবারি। ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হয়। আরবারি এই কবিতাগুলো একাডেমিক ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। তাই কবিতাগুলো সাধারণ মানুষের জন্য ছিলো দুরূহ।  ১৯৭৬ সালে বিখ্যাত আমেরিকান কবি রবার্ট ব্লাই আমেরিকার আরেক কবির হাতে আরবারির অনূদিত বইটি ধরিয়ে দিয়ে বললেন-

এঁদের খাঁচা থেকে কবিতাগুলোকে মুক্ত করা দরকার।

 

সেই কবি রসকষহীন জটিল একাডেমিক ভাষা থেকে রুমির কবিতাগুলোকে সরল,সাধারণ আমেরিকান ইংলিশে অনুবাদ করেন। সেই কবির নাম কোলম্যান বার্কস। তাঁর অনূদিত বইয়ের নাম The Essential Rumi। আমেরিকায় স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়লো রুমির কবিতা। একটা রেনেসাঁ ঘটে গেলো। কয়েক মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়ে গেলো এই বই। সেই থেকে শুরু। এখনো হচ্ছে। আমেরিকার বেস্ট সেলিং বই হয়ে গেলো রুমির রুবাইয়াত। এগুলো আমার কথা না। বিবিসির কথা।  ২০১৪ সালের অক্টোবরে বিবিসি একটা রিপোর্ট করেছিলো। শিরোনাম- Why is Rumi the best-selling poet in the US? রিপোর্টের প্রথম লাইন ছিলো-

This 807-year-old Persian mystic and dervish has a massive following in the US and around the world. – বিবিসি ইংলিশ একজন মুসলিম স্কলারের ক্ষেত্রে massive following শব্দ ব্যবহার করছে- এটা পয়েন্ট টু বি নোটেড।

এখন থেকে প্রায় ৮১৩ বছর আগের একজন মানুষের লেখা এখনো বেস্ট সেলিং,পুরো বিশ্বজুড়ে তাঁর অসংখ্য, অগণিত ভক্ত আছে – এটা ভাববার মতো বিষয়! ৮০৭ আর ৮১৩ এর কি ব্যাখ্যা করার দরকার আছে?

 

একটা ইন্টারেস্টিং তথ্য দিয়ে রাখি। কোলম্যান বার্কস তাঁর The Essential Rumi বইটি উৎসর্গ করেছেন শামস আত তাবরিজকে।

 

রুমির আরো বেশ কিছু কাজ আছে। ফি মা ফিহি, মাজলিস এ সাবআ,মাকাতিব। এগুলো সবই রুমির আলোচনা, ছাত্রদের উদ্দেশ্যে দেয়া লেকচার, বিভিন্ন সমাবেশে দেয়া বক্তৃতা এবং বিভিন্নজনকে লেখা চিঠিপত্র।

 

মসনভী লেখা শেষ হওয়ার কিছুদিন পরেই রুমি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই অসুস্থতা থেকে ৬৬ বছর বয়সে তিনি বর্তমান তুরস্কের কৌনিয়াতে মারা যান। পৃথিবী থেকে নক্ষত্র বিদায় নেয়। তবে রুমি এমনই এক নক্ষত্র যে নক্ষত্র দিনের বেলায়ও স্তিমিত হয় না। শুরুতেই বলে এসেছি- রুমির তুলনা রুমি নিজেই। রুমি, আল্লামা রুমি, আল্লামা রুমি (রহ:)। রুমির জানাজায় অন্যান্য ধর্মের অনেক অনুসারী উপস্থিত হয়েছিলো, সবাই যে যার ধর্মানুযায়ী প্রার্থনা করেছে- এগুলো বলে অনেকেই রুমির মহত্ব বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন। আমি আর সেদিকে গেলাম না। আমার কাছে রুমির মহত্ব বর্ণনার জন্য এগুলো অবান্তর।

 

কৌনিয়াতে রুমির কবর।

 

আমি মারা গেলে পৃথিবীতে আমার সমাধি না খুঁজে, আমাকে মানুষের হৃদয়ে খুঁজে নাও– রুমি।

 

বি:দ্র: আমি কোন ইতিহাস লিখি নি। রুমি সম্পর্কে টুকটাক যা জানি তা-ই লিখলাম। লেখার খটমটে ভাব দূর করার জন্য পারতপক্ষে সাল তারিখ এড়িয়ে গেছি। সাল তারিখ দরকার হলে গুগল করে নিবেন দয়া করে। ধন্যবাদ।

 

আরও পড়ুন: রুমি,আল্লামা রুমি,আল্লামা রুমি (রহ:)- (প্রথম পর্ব)