রুমি,আল্লামা রুমি,আল্লামা রুমি (রহ:)- (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ১১:০০ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২০

লিখেছেনঃ মাহমুদ হাসান।

 

এখন থেকে প্রায় ৮১৩ বছর আগের একজন মানুষের লেখা এখনো বেস্ট সেলিং,পুরো বিশ্বজুড়ে তাঁর অসংখ্য, অগণিত ভক্ত আছে – এটা ভাববার মতো বিষয়!- বিবিসি ইংলিশ।

 

আল্লামা রুমি। নামটুকু লেখার পর অনেকক্ষণ ঝিম ধরে বসে চিন্তা করছিলাম- কী কী গুণবাচক শব্দ ব্যবহার করে রুমির পরিচয় দেয়া যায়! খুঁজে পেলাম না। রুমির পরিচয় দেয়ার মতো যথেষ্ট গুণবাচক শব্দ আমার জানা নেই। কিছু কিছু মানুষের নামের আগে হাজারটা বিশেষণ যোগ করলেও তাঁদেরকে ঠিকঠাক বিশেষিত করা যায় না। রুমি এমনই একজন। রুমির বিশেষণ রুমি নিজেই। আল্লামা রুমি।

 

পুরো নাম মুহাম্মদ জালালুদ্দীন। রোম সাম্রাজ্যের বালখ নগরীতে জন্ম। এজন্য নামের শেষে রুমি যোগ হয়ে গেছে। বালখীও অবশ্য যোগ হয়েছে। কিন্তু রুমি বা আল্লামা রুমি নামেই তিনি বিখ্যাত।

 

বাবার নাম বাহাউদ্দীন ওয়ালাদ। তিনি খুব বড় আলেম ছিলেন। ‘সুলতানুল উলামা’ ছিলো উনার উপাধি। সুলতানুল উলামা মানে আলেমদের সুলতান। উপাধি থেকেই বোঝা যায় তিনি কতো বড় আলেম ছিলেন।

 

একটা তথ্য দিয়ে রাখি- রুমি পিতার দিকে থেকে আবু বকর (রা:) এর বংশধর। রুমির দাদার নাম আহমাদুল হোসাইন। আহমাদুল হোসাইনের বাবা- মাহমুদ। তাঁর বাবা- মওদুদ। মওদুদের বাবা সাবিত। সাবিতের বাবা মোসাইয়াব। মোসাইয়াবের বাবা হযরত আবু বকর (রা:)। এই বংশপরম্পরাটা বাহাউদ্দীনের কিছু অনুসারী তৈরি করেছে। প্রাচীন গবেষকরাও এই মতকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু আধুনিক যুগের গবেষক ফ্র্যাংকলিন লিউইস, হামিদ আলগার এই মতকে ভিত্তিহীন বলেছেন। ফ্র্যাংকলিন লিউইসের মতে- ”রুমির পূর্বপুরুষদের মধ্যে ছয় অথবা সাত জেনারেশন পর্যন্ত পাওয়া যায়। এই ছয় সাত জেনারেশন দিয়ে আবু বকর (রাঃ) পর্যন্ত পৌছানো যায় না। রুমির বাবা বাহাউদ্দীনের কিছু অনুসারী এই ফ্যামিলি লিনেজ করতে গিয়ে কিছুটা তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। বাহাউদ্দীনের মায়ের দিক থেকে একজন পূর্বপুরুষের নাম ছিলো আবু বকর সারাখসী। আবু বকর সারাখসী আর আবু বকর (রা:) এক ব্যক্তি নন।” এই ফেমিলি লিনেজে দাবি করা হয়েছে- মোসাইয়াবের বাবা আবু বকর (রা:)। কিন্তু মোসাইয়াব নামে আবু বকর (রা:) এর কোন ছেলে ছিলো না।

 

সকল যন্ত্রণাকে ভালোবাসার মাধ্যমে যন্ত্রণানাশকে পরিণত করা যায়–আল্লামা রুমি।

 

বালখে আলেম হিসেবে রুমির বাবা বাহাউদ্দীন ওয়ালাদ ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় । হাজার হাজার অনুসারী ছিলো তাঁর। তাঁর এ জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠে এক শ্রেণির নামধারী কিছু আলেম। আমাদের দেশেও কিছু দিন আগে আমরা এই টাইপের একটা ঘটনা দেখেছি। তারা বালখের বাদশাহকে গিয়ে বললো- আপনি তো বাদশাহী নিয়েই ব্যস্ত। আর এ দিকে বাহাউদ্দীনের অনুসারী হাজার ছাড়িয়ে লাখ হয়ে যাচ্ছে। কখনো যদি আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাহলে আপনার বাদশাহী থাকবে? এইসব হাবিজাবি বলে বাদশাহকে ক্ষেপিয়ে তুললো। নামধারী আলেমশ্রেণির সাথে পরামর্শ করে এক দিন বাদশাহ বাহাউদ্দীনের কাছে রাজভাণ্ডারের চাবি এবং রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের স্বীকৃতিপত্র পাঠিয়ে দিলেন। সাথে একটি চিঠিও দিলেন। চিঠিতে লেখা- ‘দেশের সর্বময় প্রভাব-প্রতিপত্তি তো আপনার হাতেই। সুতরাং রাজক্ষমতাটুকুও দয়া করে আপনিই গ্রহণ করুন।’ বাহাউদ্দীন যা বোঝার বুঝে গেলেন। ফিরতি চিঠিতে লিখলেন- ‘ আমি সুফী মানুষ। রাজত্বের কোন মোহ আমার মধ্যে নেই। বালখের রাজা হিসেবে আপনি আছেন, আপনিই থাকেন। আমি বালখ ছেড়ে চলে যাচ্ছি।’ কিছ অনুসারী সাথে নিয়ে তিনি বালখ ছেড়ে মক্কার দিকে রওয়ানা করলেন। রুমির বয়স তখন এগারো।

 

বাহাউদ্দীন ওয়ালাদ (রহ:) মক্কায় পৌঁছে হজ করলেন। প্রায় সাত বছর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করে তিনি পরিবার ও অনুসারীদের নিয়ে রোমে ফিরছিলেন। ইরানের নিশাপুরে এসে ফরিদুদ্দীন আত্তারের সাথে বাহাউদ্দীনের দেখা হয়ে গেলো। ফরিদুদ্দীন আত্তার ছিলেন বিখ্যাত আধ্যাত্মিক কবি এবং সাধক। রুমিকে দেখেই হয়তো তিনি কিছু একটা অনুমান করতে পেরেছিলেন। রুমির বয়স তখন আঠারো। রুমিকে তিনি আসরারনামা নামের একটি বই উপহার দিলেন। বিদায়ের সময় বাবা বাহাউদ্দীনের পেছনে ছেলে রুমিকে হাঁটতে দেখে আত্তার বললেন-

Here comes a sea followed by an ocean-একটি সাগরের পিছনে একটি মহাসাগর হেঁটে যাচ্ছে।

 

পরিবার এবং অনুসারীদের নিয়ে বাহাউদ্দীন রুমের কৌনিয়াতে চলে আসেন। তখন রুমের বাদশাহ ছিলো আলাউদ্দীন কায়কোবাদ। বাহাউদ্দীনের সুনাম, সুখ্যাতি শুনে কায়কোবাদ তাঁর সাথে দেখা করেন। বাদশাহ প্রথম আলাপেই বাহাউদ্দীনের গুণমুগ্ধ ভক্ত হয়ে গেলেন। কিছুদিন পর বাদশাহ তাঁর পরিষদবর্গসহ বাহাউদ্দীনের মুরিদ হয়ে যান। খুব সম্মানের সাথেই তিনি কৌনিয়াতে বসবাস করছিলেন। কৌনিয়াতে আসার কয়েক বছর পর ৬২৮ হিজরীতে বাহাউদ্দীন মৃত্যু বরণ করেন। রুমির বয়স তখন ছাব্বিশ।

 

বাহাউদ্দীনের মৃত্যুর পর অনুসারীরা রুমিকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন। রুমির মূলত রুমি হয়ে উঠা শুরু হয় এই সময় থেকেই। অনুসারী, বন্ধুবান্ধব, সহচরদের কাছে রুমি ধীরে ধীরে তাঁর বাবার মতোই গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে নিলেন। অসাধারণ পাণ্ডিত্য, আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে সবাইকে মোহিত করে রাখেন। কৌনিয়ার শাসক বদরুদ্দীন ছিলেন রুমির ছাত্র। রুমির চলাফেরা ছিলো রোমের উচ্চ পর্যায়ের লোকজনের সাথে। কিন্তু রুমি খুব সহজেই যে কারোর সাথে মিশে যেতে পারতেন। এজন্য মুচি, রুটি-হালুয়া বিক্রেতা, স্বর্ণকার- এই টাইপের মানুষের সাথেও রুমির খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো।

 

ধ্বংসস্তূপেই থাকে গুপ্তধনের হাতছানি। হতাশার আচ্ছন্নতাতেই প্রোথিত আছে আশার সঞ্চার — আল্লামা রুমি।

 

রুমি একদিন রুটি-হালুয়া বিক্রেতাদের এলাকা দিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। সেখানে বেশভূষায় দেখতে এক ‘পাগলের’ সাথে রুমির দেখা হয়। এই ‘পাগলের’ সাথে কথা বলে রুমি মারত্মকভাবে প্রভাবিত হন। তাঁর প্রভাবে রুমির জীবনবোধ, জীবনাচার বদলে যেতে থাকে। এই ‘পাগলের’ নাম শামস আত তাবরিয। পুরো বিশ্বে সুফীদের শিরোমনি মানা হয় রুমিকে। আর শামস আত তাবরিয ছিলেন রুমির গুরু।

 

শামস আত তাবরিয ছিলেন এক মহান আধ্যাত্মিক সাধক। খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন। রুমির সাথে শামস আত তাবরিযের যখন দেখা হয় তখন রুমির বয়স চল্লিশ। রুমি তাঁর কাছ থেকে আধ্যাত্মিকতার তালিম নেন। রুমি বুঝতে পারলেন- এতো দিন যে জীবন, যে বিশ্বাস নিয়ে তিনি বেঁচে ছিলেন, এর বাইরেও অনেক কিছু আছে। আমূল পরিবর্তন ঘটে রুমির মধ্যে। শামসের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য রুমি ব্যাকুল হয়ে থাকতেন। বন্ধুবান্ধব, পরিবার-পরিজন, অনুসারী-সহচর সবাইকে ভুলে রুমি ডুবে থাকতেন শামসের সান্নিধ্যে। এটাকে অন্যরা ভালোভাবে নিতে পারলো না। শামস আত তাবরিয হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে গেলেন। চিরতরে হারিয়ে গেলেন। অনেক চেষ্টা করেও রুমি শামসের কোন খোঁজ পেলেন না। শামসকে হারানোর ব্যাথায় রুমি কাতর হয়ে গেলেন। এই কাতরতা থেকেই রুমির কাব্যচর্চার সূচনা।

 

শামসের আসলে কী হয়েছিলো এটা একটা রহস্যজনক ব্যাপার। রুমির ছোট ছেলের তত্ত্বাবধানে শামসকে হত্যা করা হয়- এমন একটা কথা প্রচলিত আছে। এবং সম্ভবত এটাই সত্যি। শামস আত তাবরিয সম্পর্কে বিভিন্ন রহস্যময় ঘটনা প্রচলিত আছে। তাঁকে একই সময়ে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যেতো। এজন্য তাঁকে ‘পাখি’ নামে ডাকা হতো। একটা ঘটনা উল্লেখ করি- রুমি আর শামস একবার এক পুকুরপাড়ে বসে কথা বলছিলেন। রুমির সামনে দুষ্প্রাপ্য কিছু জীর্ণ বই ছিলো। শামস কথা বলার সময় রুমি কিছুটা আনমনা হয়ে বই ঘাঁটছিলেন। শামস এতে বিরক্ত হলেন। বইগুলো নিয়ে পুকুরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। রুমি হাহাকার করে উঠলেন। বললেন- ‘আপনি আমাকে খুন করে ফেলেছেন। সবকিছু শেষ করে দিয়েছেন। বইগুলো সংগ্রহ করা আর সম্ভব না।’ রুমির হাহাকার দেখে শামস পুকুরে নামলেন। বইগুলো তুলে এনে রুমির হাতে দিলেন। রুমি আশ্চর্য হয়ে দেখলেন- বইগুলো সবই শুকনো। কোনোটাতে পানির ছোঁয়াও লাগে নি।

 

এই ঘটনার সত্যতা আমি জানি না। তবে জগতে রহস্যময় অনেক কিছুই ঘটে। এই পৃথিবী, পৃথিবীর মানুষ, মানুষের সীমিত জ্ঞান সেই সব রহস্যের কিনারা কি করতে পেরেছে? শেক্সপিয়র তাঁর হেমলেট নাটকে হোরাশিওর ডায়লগের মধ্য দিয়ে বলে গেছেন- There are more things in heaven and Earth। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- চিরকাল এই-সব রহস্য আছে নীরব রুদ্ধ-ওষ্ঠাধর— জন্মান্তের নবপ্রাতে সে হয়তো আপনাতে পেয়েছে উত্তর।

 

ভুলেও এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে আমি শেক্সপিয়র বা রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে রুমিকে ব্যাখ্যা করছি। রুমিকে ব্যাখ্যা করার জন্য শেক্সপিয়র বা রবীন্দ্রনাথ দরকার নেই। এঁদেরকে রুমির ধারেকাছে টেনে আনাটা নির্বুদ্ধিতা। রুমি রুমিই। মানুষ মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেই নির্বোধের মতো কিছু কাজ করে। আমিও করলাম।

 

দ্বিতীয় পর্বে কথা হবে রুমির মসনভী এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে ইনশাআল্লাহ।

 

পুনশ্চ: আমি কোন ইতিহাস লিখি নি। রুমি সম্পর্কে টুকটাক যা জানি তা-ই লিখলাম। লেখার খটমটে ভাব দূর করার জন্য পারতপক্ষে সাল তারিখ এড়িয়ে গেছি। সাল তারিখ দরকার হলে গুগল করে নিবেন দয়া করে।ধন্যবাদ।