রহস্যময় ইনকা সভ্যতা (প্রথম পর্ব)

আমজাদ হোসাইন

প্রকাশিত: ৮:৫৪ অপরাহ্ণ, জুন ১০, ২০২০
ছবিঃ ইন্টারনেট।

ইনকা সভ্যতা হলো দক্ষিণ আমেরিকার একটি প্রাচীন সভ্যতা। ধারণা করা হয় ইনকা সভ্যতার মানুষ, আমেরিকার অন্যান্য জাতির লোকদের মতই বেরিং প্রণালী পার হয়ে এশিয়া থেকে আমেরিকা মহাদেশে পা রেখেছিল। কালক্রমে নানাভাগে বিভক্ত হয়ে এরা আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন করে। এই পার্বত্য ভূভাগে পরষ্পর সম্পর্কযুক্ত কয়েকটি প্রাচীন সভ্যতার উদ্ভব ঘটেছিল, এ সভ্যতাকে আন্দিয় সভ্যতা বলে ৷ যার মধ্যে রহস্যময় ইনকা সভ্যতা আমাদের কাছে অতি পরিচিত। এছাড়াও রয়েছে; কারাল, চাভিন, ভালদিভিয়া, পারাকাস ও টোপারা, নাজকা, মোচে, তিওয়ানাকু, চাচাপোয়া, উয়ারি, চিমু ও মুইজকা সভ্যতা।

 

উত্তরে বর্তমান কলম্বিয়া থেকে দক্ষিণে আতাকামা মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল ভূভাগে এই সভ্যতাগুলির বিকাশ ও বিস্তৃতির সাক্ষ্য পাওয়া যায়। ইনকা সভ্যতার বিকাশ মূলত ইনকা সাম্রাজ্য ‘কেচুয়া’ নামক নেটিভ আমেরিকানদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত প্রায় ৩০০ বছর ধরে রাজত্ব করে গেছে। মূলত একটি উপজাতি হিসেবে বর্তমান পেরুর কোস্কো এলাকায় সুপ্রাচীন ইনকা সভ্যতার সূচনা হয়েছিল। ইনকা সাম্রাজ্য একসময় বিস্তৃত ছিল বর্তমান পেরুর কস্কো ভ্যালি থেকে উত্তরে ইকোয়েডর এবং সুদূর দক্ষিণে বলিভিয়া, চিলি এবং আর্জেন্টিনা পর্যন্ত ৷ বর্তমান প্রত্নতাত্তিক অনুসন্ধানকে ভিত্তি করে ধারণা করা হয় ইনকাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্টেট অব দ্য আর্ট বা নিদর্শন যা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত তা হলো ‘মাচুপিচু’ শহর, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৪০০ মিটার (৭,৮৭৫ ফিট) উপরে।

 

 

ইনকা সাম্রাজ্যের ইতিহাস

১১০০-১২০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এদের একটি দল দক্ষিণ আমেরিকার অন্দিজ পর্বতমালার পেরুর উচ্চভূমির দিকে চলে আসে এবং এখানকার কুজবেন নামক স্থানে বসতি স্থাপন করে। স্থানের নামানুসারে এদেরকে বলা হয় কেচুয়া জাতি। এরা এই অঞ্চলে জঙ্গল কেটে কৃষিভূমি উদ্ধার করে এবং চাষাবাদ করতে থেকে। এদের অন্যতম ফসল ছিল ভুট্টা এবং আলু। প্রাথমিক অবস্থায় এই জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলে একটি রাজত্ব গড়ে তোলে। কুজবেনে বসবাসের সময় এদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং ধীরে ধীরে এদের বসবাসের এলাকা বৃদ্ধি পায়। এই সময় অন্যান্য ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগুলোর সাথে কিছু যুদ্ধবিগ্রহ হলে, এরা প্রতিটি ক্ষেত্রেই জয়ী হয়। এই সকল যুদ্ধের সূত্রে এদের ভিতরের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধারা সমাজে সম্মানিত এবং ক্ষমতাধর হয়ে উঠে। এরপর এই সকল যোদ্ধাদের সমর্থনে কেন্দ্রীয় নেতার উদ্ভব হয়েছিল ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের আগেই। ধীরে ধীরে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এই ব্যক্তি কাপাক (capac) নামে অভিহিত হতে থাকে। উল্লেখ্য ইনকাদের ভাষায় কাপাক শব্দের অর্থ শাসক। ইনকা ইতিহাসে মানকো কাপাক (Manco Capac)-কে প্রথম রাজা বা সম্রাটের মর্যাদা দেওয়া হয়। ইনকা সমাজের রীতি অনুসারে, মানকো তাঁর নিজের বোনকে বিবাহ করেছিলেন।

 

১২০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তিনি কুজকো (Cuzco) নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়, মানকো কাপাকের উত্তরসূরীরা ছোটো ছোটো রাজাদের রাজ্য জয় করে রাজ্যের বিস্তার ঘটায়। প্রস্তর লিপি থেকে যতটুকু জানা যায়, ১৪৩৮ খ্রিষ্টাব্দে পাচুকুটি ক্ষমতা লাভ করেছিলেন। সাম্রাজ্যের অধিকার লাভের পর তাঁর সময়ে তৈরি সবচেয়ে আলোচিত নগরী হলো মাচুপিচু (Machu Picchu)। সম্ভবত ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে পাচুকুটি মাচুপিচু নগরী তৈরি করেছিলেন। এই নগরীটি কেন তৈরি করেছিলেন, তা নিয়ে নানা জনের নানা মত রয়েছে। অনেকে মনে করেন মাচুপিচু নগরীটি ছিল সম্রাটের নিজস্ব সম্পদ। এখানে একটি শক্তিশালী দুর্গ তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া শীতকালীন রাজধানী হিসেবে নগরীটি ব্যবহার করা হতো।

 

উল্লেখ্য, ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাইরাম বিংহাম (Hiram Bingham) ‘মাচুপিচু’ নামক শহরটির সন্ধান পান। এই নগরীটি স্প্যানিশদের হাত থেকে বিস্ময়করভাবে রক্ষা পেয়েছিলো।

 

পাচুকুটির রাজত্বকালে ইনকা সাম্রাজ্য দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রক্রিয়াটি সক্রিয় ছিল, পার্শ্ববর্তী রাজ্য দখলের মধ্য দিয়ে। এই সময় বিজিত রাজ্যের শাসক যদি ইনকা সম্রাটের আনুগত্য মেনে নিত, তাহলে, তাকে হত্যা করার পরিবর্তে শাসনের অধিকার দেওয়া হতো। মূলত এই প্রক্রিয়ায় ইনকা সাম্রজ্যের বিশাল অংশ ছিল করদ রাজ্য হিসেবে। বর্তমান ইকুয়েডর, পেরু, বলিভিয়া, উত্তর-পশ্চিম আর্জেন্টিনা, উত্তর চিলি ও দক্ষিণ কলম্বিয়া ইনকা সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাচুকুটির রাজত্বকালে সব মিলিয়ে ইনকা সাম্রাজ্য প্রায় দুই হাজার পাঁচশ মাইল বিস্তৃত ছিল। এই সময় ইনকারা নিজেদের সাম্রাজ্যের নাম দিয়েছিল ‘তাহুয়ানতিনসুইউ’ (চতুষ্কোণ ভূমি)।

 

১৪৭১ খ্রিষ্টাব্দে পাচুকুটির মৃত্যুর পর সম্রাট হন টোপা ইনকা (Topa Inca)। তিনি তাঁর আপন বোন মামা ওকক্লো (Mama Occlo) কে বিবাহ করেছিলেন এবং তাঁর প্রধান স্ত্রীও ছিলেন মামা ওকক্লো। তাঁর সময়ে চিনচেরো (Chinchero) এবং চোকুকুইরাও (Choquequirao) রাজকীয় নগরী তৈরি করা হয়েছি। ১৪৯৩ খ্রিষ্টাব্দে টোপা ইনকার মৃত্যু হলে, তাঁর উত্তরসূরী হুয়াইনা কাপাক (Huayna Capac) সম্রাট হন। এই সম্রাট তাঁর সাম্রাজ্যকে সুসংহত এবং শক্তিশালী করেছিলেন। তাঁর আমলে ইনকা সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিল। তাঁর সময়ে তৈরি হয়েছিল কুয়েসপিওয়ানকা (Quespiwanka) এবং টোম্বেবাম্বা (Tombebamba) নগরী। ১৫২৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে প্যারাগুয়ে থেকে চিরিউয়ানো গোষ্ঠীর সৈন্যরা পর্তুগিজ দখলদার আলিক্সো গার্সিয়াকে নিয়ে ইনকা রাজ্য আক্রমণ করে। এই আক্রমণ ইনকা সৈন্যরা সাফল্যের সাথে প্রতিহত করে। কিন্তু ইউরোপীয় সৈন্যদের দ্বারা সিফিলিস, বসন্ত রোগ এবং পেটের রোগ, জ্বর ইত্যাদি সংক্রামক ব্যাধি দ্বারা এরা আক্রান্ত হয়। এই জাতীয় রোগের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ইনকাদের ছিল না। ফলে এই সকল রোগ দ্বারা বহু লোকের মৃত্যু হয় এবং ওয়াইনা কাপাক-এর রাজ পরিবারও আক্রান্ত হয়। ধারণা করা হয় এই মহামারিতে সম্রাট ওয়াইনা কাপাক এবং তাঁর পরিবারের বহুলোকের মৃত্যু ঘটেছিলো।

 

১৫২৭ খ্রিষ্টাব্দে ওয়াইনা কাপাকের মৃত্যুর পর, কোনোক্রমে বেঁচে যাওয়া তার দুই ছেলের ভিতরে হুয়াসকার (Huascar) রাজ্য লাভ করে। কিন্তু তার অপর ভাই আটাহুয়ালপাও (Atahuallpa) সিংহাসনের অধিকার দাবী করেন। ১৫৩২ খ্রিষ্টাব্দে হুয়াসকারকে অপসারিত করে আটাহুয়ালপা সম্রাট হন। আত্মকলহের কারণে এই সময় ইনকা রাজশক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এই বছরেই আটাহুয়ালপা-কে হত্যা করে স্প্যানিশ লুটেরা বাহিনীর নেতা ফ্রানসিসকো পিজারো পেরুর উপর আধিপত্য বিস্তার করে।