রবীন্দ্রনাথঃ একজন কবি, একজন মুসলিম বিদ্বেষী- কিছু আলোচনা এবং একটু সমালোচনা –

প্রকাশিত: ৩:১৫ পূর্বাহ্ণ, মে ২৪, ২০২০
ছবিঃ সংগৃহীত

লিখেছেনঃ মাহমুদ হাসান।

 

৮ই মে ছিলো রবীন্দ্রনাথের ১৫৯তম জন্মবার্ষিকী। জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে লক ডাউনের কারণে রবীন্দ্র-পূজারীরা এবার খুব ঘটা করে কিছু করতে পারে নি। তাদের দুঃখ দেখে আমার নিজেরও দুঃখ হচ্ছে। আমাদের দেশে এক দল রবীন্দ্রনাথকে দেবতার পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আরেক দল আবার ঘোর রবীন্দ্র-বিরোধী। এসব নিয়েই কিছু লিখবো আজ-

রবীন্দ্রনাথের সাথে আমাদের সবারই পরিচয় ঘটে একেবারে বাচ্চাকালে। স্কুলে ভর্তি হয়েছি। অ,আ কিছুই জানি না, কিছুই শিখি নি। কিন্তু স্কুলের এসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে ‘আমার সোনার বাংলা’ গেয়েছি। গাইতে না পারলেও শুনেছি। এই তো রবীন্দ্রনাথের সাথে আমাদের পরিচয় হয়ে গেলো। তারপর থেকে ইচ্ছায়,অনিচ্ছায়, পছন্দে, অপছন্দে রবীন্দ্রনাথ আমাদের সাথেই আছে। ঘোর রবীন্দ্র-বিরোধী কেউও হয়তো নিজের অজান্তেই বৃষ্টির দিনে গুনগুন করেছেন- আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে। বসন্তে হয়তো গুনগুন করেছেন-আহা আজি এ বসন্তে। মনে প্রেম জেগেছে,গেয়ে উঠেছেন- আমারও পরাণো যাহা চায়। সুতরাং রবীন্দ্রনাথকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না।

রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্য পাঠ সম্ভব নয় ।রবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখেছেন। লিখেছেন ছোট গল্প, উপন্যাস,নাটক, গান। বাংলা সাহিত্যের ছোট গল্পের জনক বলা হয় তাঁকে। উপন্যাস,নাটক,গানে যোগ করেছেন নতুন মাত্রা, করেছেন প্রাণের সঞ্চার। তারপরও তাঁর প্রধান পরিচয় তিনি কবি। রোমান্টিক ধারার কবি। রবি ঠাকুর না থাকলে আমাদের,বাঙ্গালিদের, রোমান্টিকতা আওড়াতে খুব সমস্যাই হতো। ‘মুখের পানে চাহিনু অনিমেষে বাজিল বুকে সুখের মতো ব্যাথা’- এই লাইন কি আর কেউ লিখতে পেরেছে? রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগে পঞ্চপাণ্ডব হিসেবে যারা পরিচিত তাঁরা রবীন্দ্র-বিরোধী ছিলো। রবীন্দ্র প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে এসে সৃষ্টি করেছেন আধুনিক কবিতা। কিন্তু তাঁরাও রবীন্দ্র প্রভাবে প্রভাবিত ছিলেন। বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের আলোচনা করে শেষ করা যাবে না।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর সময়েই প্রচুর সমালোচনা এবং কটাক্ষের শিকার হয়েছিলেন। অন্তত নোবেল পাওয়ার আগ পর্যন্ত তো অবশ্যই। কটাক্ষ কোন পর্যায়ের ছিলো উদাহরণ দিচ্ছি- তখনকার ম্যাট্রিক পরীক্ষায় রবীন্দ্রনাথের রচনার অংশ তুলে দিয়ে বলা হতো- বিশুদ্ধ বাংলায় লেখো। এর লেখা থেকে, ওর লেখা থেকে চুরি করেছেন- এই অভিযোগ তো ছিলো রবীন্দ্রনাথের নিত্যসঙ্গী। নোবেল পাওয়ার পর ওয়েস্টের ক্রিটিকরা প্রমাণ করে দেখালো গীতাঞ্জলীর দুটি কবিতা বাইবেল থেকে কপি করা। চুরি শব্দটা রবীন্দ্রনাথের সাথে যায় না। লিখতে অস্বস্তি লাগে। কিন্তু স্পেডকে তো স্পেড বলাই বাঞ্ছনীয়। আল্লামা রুমির কবিতা থেকেও তিনি চুরি করেছেন। গ্যেটে থেকেও করেছেন। আহমদ ছফা অবশ্য এই সম্পর্কে সাফাই গেয়ে বলেছেন- “বিভিন্ন জায়গা থেকে নিয়ে এই যে তালি দেওয়ার ক্ষমতা এটাই মানুষকে বড় করে।” এটা আমিও স্বীকার করি।

বাই দ্যা ওয়ে, একটা ইনফরমেশন দিয়ে রাখি। লালনের শিষ্য,গগন হরকরার “আমি কোথায় পাবো তারে” গান থেকে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের সুরও কিন্তু রবি বাবু চুরি করেছিলেন। যদিও পূজারীরা চুরি বলতে নারাজ। তারা বলে-রবি বাবু অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন ।

হরিনাথ মজুমদার। কাঙ্গাল হরিনাথ নামেই তিনি পরিচিত। ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামে একটা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। রবি বাবুদের জমিদারীর অত্যাচার সম্পর্কে তিনি নিয়মিতই তাঁর পত্রিকায় লিখতেন। জমিদার হিসেবে রবি বাবুর বাবা,দাদারা যেমন অত্যাচারী ছিলো, তেমনি রবীন্দ্রনাথও ছিলো। হরিনাথ লিখেছেন- দ্বারকানাথ,দেবেন্দ্রনাথের সময়ে অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে প্রজারা অন্তত চিৎকার করতে পারতো। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সময়ে চিৎকার করারও সুযোগ ছিলো না। শুধু চোখের পানিতে বক্ষস্থল সিক্ত হতো। এই কঠিন সত্য প্রকাশের জন্য অবশ্য হরিনাথকে চরম মূল্যও দিতে হয়েছিলো।

রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ জমিদারি পরগণার অধিকাংশ প্রজাই ছিলো মুসলিম। তিনি তাদের জন্য কোন স্কুল,মক্তব বা মসজিদ,মাদরাসা করে দেন নি। কিন্তু হিন্দু ধর্মের কালীপূজা উদযাপনের জন্য এই মুসলিম প্রজাদের থেকেই কর আদায় করতেন। “সব জমিদার খাজনা আদায় করতেন একবার। রবীন্দ্রনাথ করতো দুইবার। একবার জমির খাজনা দ্বিতীয় বার কালী পূজার সময় চাদার নামে খাজনা।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে যে জনসভা হয় এটার সভাপতি ছিলেন স্বয়ং রবি ঠাকুর। এটা তো মোটামুটি সবাই জানেন। যদিও রবীন্দ্র-পূজারীরা এগুলো অস্বীকার করে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনেক লেখায় মুসলিমদেরকে কটাক্ষ করেছেন। নীচ জাত,ম্লেচ্ছ, যবন,তস্কর ইত্যাদি বলে তুচ্ছ,তাচ্ছিল্য করেছেন। নোবেল প্রাপ্তির আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন-
“কোরআন পড়তে শুরু করেছিলুম কিন্তু বেশিদূর এগুতে পারিনি আর তোমাদের রসুলের জীবন চরিতও ভালো লাগেনি”। যদিও নোবেল প্রাপ্তির পর উনি ভোল পাল্টে ছিলেন। অসাম্প্রদায়িক হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ঈদে মিলাদুন্নবীতে নবীর প্রশংসা করে চিঠিও দিয়েছিলেন। একজন নোবেল লরিয়েট মারাত্মক ধরণের সাম্প্রদায়িক এটা তো বিশ্ব সংস্কৃতির সাথে যায় না। রবীন্দ্র-পূজারীরা যখন তাঁকে অসাম্প্রদায়িক প্রমাণ করতে চায় তখন তাদের কুচেষ্টা দেখে হাসি পায়। হাসি আর মনে মনে রবীন্দ্রনাথের বুলিই আওড়াই- ‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে!’

রবীন্দ্রনাথের ভাবি,কাদম্বরী দেবীর সাথে তাঁর পরকীয়া, কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যা – এ সব নিয়ে জল বহু ঘোলা হয়েছে। এ ব্যাপারে আমার চুপ থাকাই ভালো। আহমদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু’ বইটি থেকে, জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের একটা কথা দিয়ে শেষ করছি। রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন- “রবীন্দ্রনাথ বড় লেখক, রবীন্দ্রনাথ মানুষ হিসাবে বিদ্যাসাগর কিংবা তাঁর মত মানুষের ধারে কাছেও আসতে পারেন না। বড় লেখক আর বড় মানুষ এক নয়।”

জন্মবার্ষিকীতে লেখক রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা।