ঢাকা, শনিবার ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১০ই সফর, ১৪৪৩ হিজরি

যুগশ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক সম্রাট আল্লামা “রূমি”র চরণে আমার নজরানা


প্রকাশিত: ৭:১৬ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৮, ২০২১

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

লিখেছেন- তানজিনা আক্তার

শিক্ষার্থী: উর্দু বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

সুফিরা ইন্দ্রিয়লদ্ধ বিশ্বের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করার আগে নিজের অভ্যন্তরস্থ বিশ্বের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে বলেন। এতদুভয় জগতের মধ্যে সমন্ধ স্থাপনের মাধ্যমে স্রষ্টায় একাঙ্গীভূত হওয়াতেই সুফিদের স্বার্থকতা।

 

কুরআনুল কারীমও ঠিক এই নির্দেশই দেয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন –

“আমি তাদেরকে আমার আয়াতসমূহ (নিদর্শনসমূহ)
দেখাবো দিগন্তে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে; যতোক্ষণ না তাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয় যে, তিনিই মহাসত্য “।

রূমীও তদনুরূপ বলেছেন,

” যা-ই তুমি বহির্জগতে দেখো তা তোমার মধ্যেই বিদ্যমান”।

তিনি অন্যত্র বলেন,

“তুমি নিজেকে মহাসমুদ্রের একটি ফোঁটা ভেবো না, বরঞ্চ তুমি এমন একটি ফোঁটা যা মহাসমুদ্রকে ধারণ করে”।

তেমনিভাবে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন,

” আত্মজ্ঞানী যে হয়েছে, স্রষ্টাকে সে চিনেছে “।
অর্থাৎ আত্মজ্ঞানই হলো স্রষ্টাকে চেনার উপায়।

 

শামস তাবরিজকে হারিয়ে রূমী অন্য এক রূমী হয়ে উঠার পর তিনি জীবনের গভীর ভাবনা ভাবতে ভাবতে তাঁর দিন কাটতে থাকে। জীবনে আর গুরত্বপূর্ণ কেউ না আসলেও আবারও এক বন্ধু এলেন। যার নাম ছিল সালাউদ্দিন জাকুব। পেশায় তিনি একজন স্বর্ণকার ছিলেন। রূমী অবশ্য এই বন্ধুকেও হারান। যদিও ততদিনে তিনি সম্পর্কের বন্ধন থেকে নিজেকে অনেক উপরে নিয়ে গিয়েছিলেন।

 

“মসনবী শরিফ” রচনা-

রূমী তাঁর জীবনের শেষ বারোটি বছর ধরে একটি সুদীর্ঘ ধারাবাহিক মহাকাব্য “মসনবী শরিফ” রচনা করেন।

চৌষট্টি হাজার লাইন বিশিষ্ট কবিতাটি ছয় খণ্ডে বিভক্ত। বিশ্ব সাহিত্যে এর সমতুল্য গ্রন্থ আর দ্বিতীয়টি নেই।

সুফিবাদের উপর রচিত এটি গোটা দুনিয়ায় সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রভাবশালী রচনার মধ্যে একটি। এতে কুরআন ও আধ্যাত্মিক জীবন সম্পর্কিত রূমীর উপলব্ধির বর্ণনা রয়েছে। কীভাবে খোদার সাথে প্রেমের লক্ষে পৌঁছানো যায় তার শিক্ষা দেয়। “মসনবী” কে ফার্সি ভাষার “কুরআন” বলে অভিহিত করা হয়।

 

রূমী তাঁর উক্তিগুলোকে তাঁর লিপিকার হুসাম চেলেবিকে লিখে রাখতে বলতেন, যখন তাঁরা কৌনিয়ায় ঘুরে বেড়াতেন। হুসাম ছিলেন শামস এর শিষ্য।

এই গ্রন্থের প্রথমেই তিনি লিখেন,

“বাঁশের বাশি যখন বাজে, তখন তোমরা মন দিয়ে শোনো সে কী বলে,,
সে তাহার বিরহ বেদনায় অনুতপ্ত হইয়া ক্রন্দন করিতেছে”।

 

১২৭৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর সূর্যাস্তের সময় রূমী ইন্তেকাল করেন। বলা হয়ে থাকে যে রূমীর দাফনের সময় সকল প্রধান ধর্মের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা রূমী এবং তাঁর কবিতাকে দেখেছেন তাদের নিজ নিজ বিশ্বাসকে সুদৃঢ় করার উপায় হিসেবে। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে তাঁর মৃত্যুবার্ষিক পালন করা হয় খোদার সাথে তাঁর মিলনের রাত হিসেবে।

 

“আমি সেই প্রেমিকের কাছে আমি
যে দুই পৃথিবীকে একটি হিসেবে দেখেছে
এবং সেই একটিকেই জেনেছে
প্রথম, শেষ, বাহির ও ভিতর বলে
ওটাই কেবল মানুষের নিঃশ্বাস”।

 

রূমীর মৃত্যুর পর জর্জিয়ার রানী তাঁর সমাধিস্থল নির্মাণ করতে তহবিল প্রদান করেন, যার ফলে কৌনিয়ায় তাঁর সমাধিস্থল নির্মাণ করা হয়। তাঁর বড় ছেলে সুলতান ওয়ালাদ বাবার অনুসারীদের নিয়ে মৌলভী সম্প্রদায় গড়ে তোলেন, যারা বর্তমান তুরস্কে ঘূর্ণায়মান দরবেশ নামে পরিচিত। এখনও পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে যায় রুমীর সমাধিস্থলে, যেখানে তাঁর দেখানো পথে মানুষ ঘুরছে সৃষ্টিকর্তার কাছে সঁপে দিতে।

 

আমরা রূমী, তাবরিজের প্রেমবাক্য যতোই আওড়াই না কেন, তার রসবোধ ভাষায় ব্যক্ত করা অসম্ভব।

 

এজন্যই রূমী বলেন,

“নীরবতাই রবের ভাষা; বাকি সব দুর্বল অনুবাদ”।

 

মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালাতে তিনি যা লিখে গেছেন, তার সবই আধুনিক বিশ্বে খুবই আলোচিত।

প্রেম নিয়ে গভীর কবিতা রূমীর মতো করে পৃথিবীর আর কোনো কবি লিখতে সক্ষম হোননি।

রূমী বলেন,

“প্রেম আমার ধর্ম ; আর প্রতিটি হৃদয়ই আমার মন্দির”।

তিনি আরো বলেন,

“আমরা প্রেমের জন্যে জন্মেছি ; প্রেমই আমাদের মা”।

 

রূমী শুধু মুসলিম বিশ্বে নয় পাশ্চাত্যেও খুব প্রভাব ফেলেছেন। তাঁর কবিতা পৃথিবীব্যাপি বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। রূমী হয়ে উঠেছেন সারা বিশ্বে বহুল পঠিত এবং জনপ্রিয় কবি এমনকি আমেরিকায়ও।

 

মানুষ তার জীবনে খুব বেশি কিছু হলে একটি ইতিহাস হয়, মাওলানা জালালুদ্দিন রূমী হয়েছেন এক জীবনব্যবস্থা, ভাবনার পরিপূর্ণতা, পথপ্রদর্শক। তিনি নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন বার বার, তবে পা দুটো তাঁর মাটিতেই ছিল। তিনি নিজের ভেতর জন্ম নেয়া আলোকে চিনতে পেরেছেন, সেই আলোয় আলোকিত করতে চেয়েছেন সারা পৃথিবীকে। শক্তিশালী সব চিন্তা – চেতনা দিয়ে হৃদয় আলোকিত করতেই যেন জন্মেছিলেন মাওলানা জালালুদ্দিন রূমি। এক আধ্যাত্মিক জীবনের খোঁজে তার কাছে তো যাওয়াই যায়।

রূমী বলেন-

“তোমার ক্ষুদ্র জগত থেকে বের হয়ে আসো এবং স্রষ্টার অসীম জগতে প্রবেশ করো “।

” ভালো – মন্দের উর্ধে আছে এক জগৎ ; আর সেটাই আমাদের মিলনস্থল”।

(সমাপ্ত)

 

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব পড়তে লিংকে ক্লিক করুন-

https://www.facebook.com/110467937348910/posts/379917777070590/?sfnsn=mo

https://www.facebook.com/110467937348910/posts/380559110339790/?sfnsn=mo