বিশেষ প্রতিবেদন

যুগশ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক সম্রাট আল্লামা “রূমি”র চরণে আমার নজরানা

প্রকাশিত: ১:৫৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৮, ২০২১

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

১২২৮ সালের দিকে আনতোলিয়ার শাসক আলাউদ্দিন কায়কোবাদ রুমীর বাবা বাহাউদ্দীন এবং তার পরিবারকে আনাতোলিয়ার কৌনিয়ায় নিমন্ত্রণ করে আনেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুরোধ করেন। যার ফলশ্রুতিতে রূমীর পুরো পরিবার সেখানে থেকে যায়। তাঁর বাবা সেখানের একটি মাদ্রাসায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। কিছুদিন পর তিনি মারা গেলে মাত্র ২৫ বছর বয়সে রূমী সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে সবার কাছে “মাওলানা” হিসেবে পরিচিত হতে থাকেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতা ছিল বলেই তিনি সেসময় নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হন।

 

লিখেছেন- তানজিনা আক্তার

শিক্ষার্থী: উর্দু বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

মাওলানা রূমীর ভেতর গভীর চিন্তা – চেতনার জন্ম আসলে এমনি এমনি হয়নি। প্রচুর পড়াশোনা আর জগত জানার চেষ্টাই তাঁকে নিয়ে গেছে জ্ঞানের গভীরতম শাখায়। জ্ঞান আমাদেরকে অহম থেকে মুক্ত করে প্রকৃত “আমিকে” ধারণ করার সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

 

তাই রূমী বলেন,

“যে জ্ঞান তোমাকে তোমার অহম থেকে মুক্ত করতে পারে না ; সে জ্ঞান অপেক্ষা অজ্ঞতা ঢের শ্রেয়”।

 

রূমীর বাবার এক ছাত্রের কাছে তিনি টানা নয় বছর পড়াশোনা করেন ইসলামী শরিয়াহ আর সুফিজম নিয়ে। তাঁর লেখায় জীবন নিয়ে যেসব গভীর ভাবনা আমাদের হৃদয় নাড়িয়ে দেয়, সে অবস্থায় যেতে আসলে তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে জ্ঞানের এক বিশাল পথ। সেই সাথে নিজের ভেতর নানা রকম জ্ঞানগত পরিশ্রম, কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজই হলো আলো বিলানো।

 

তাই হয়তো মাওলানা রূমী বলতেন –

“মোমবাতি হওয়া সহজ কাজ নয়, আলো দেয়ার আগে নিজেকে পুড়তে হয়”।

 

শামস – তাবরিজির সাক্ষাত লাভ:

১২৪৪ সালে রূমীর সাথে শামস – তাবরিজির সাক্ষাত ঘটে। এ সাক্ষাত রূমীর জীবনের সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ ঘটনা। শামস ছিলেন প্রচণ্ড এক খোদা ভক্ত মানুষ। মানুষ তাঁকে “পাখি” বলে ডাকতো, কারণ, তিনি এক জায়গায় বেশিক্ষণ থাকতেন না, দ্রুত জায়গা পরিবর্তন করতেন। একটি কালো রঙের আলখিল্লা পরিধান করতেন তিনি।

 

সুফি কাহিনি অনুসারে তিনি একজন বন্ধুর সন্ধানে ঘুরছিলেন। শামস তাঁর সময় অতিবাহিত করতেন ভাব বিহ্বল অবস্থায়, আবার কখনো কারিগর হিসেবে কায়িক পরিশ্রম করে। শামসের চিরন্তন একটি প্রশ্ন ছিল, “আমি কি কোনো বন্ধু পাবো না”? শেষপর্যন্ত একটি কণ্ঠ বলল, “বিনিময়ে তুমি কী দিবে”? “আমার মাথা”। “তোমার বন্ধু হবেন কৌনিয়ার জালালুদ্দিন”।

 

রূমী ও শামস এর মধ্যে প্রথম সাক্ষাতের বিভিন্ন বিবরণ রয়েছে। একটি বিবরণ অনুসারে, কৌনিয়ার এক চত্বরে ফোয়ারার পাশে বসে রূমী তাঁর মুরিদদের তাঁর পিতার মা’রিফ পড়ে শুনচ্ছিলেন। শামস ভিড় ঠেলে সেখানে প্রবেশ করে বইটি এবং অন্য বইগুলো পানিতে ফেলে দিলেন। ” আপনি কে, আর এটা কী করছেন”? রূমী প্রশ্ন করেন। শামস বলেন – “তুমি যা পড়ছিলে তা আর পড়া উচিত নয়”। রূমী পানির তলদেশে বইগুলোর দিকে ফিরলেন, “আমরা এগুলো তুলে নিতে পারি। আগে যেমন শুকনা ছিল, এখনও তেমনই আছে” শামস বললেন।
তিনি এটি রূমীকে দেখালেন, ঝকঝকে শুকনো।

 

এই পরিত্যাগের মধ্য দিয়েই রুমীর গভীর জীবনের সূচনা। তিনি বলেন, “আগে আমি আল্লাহ বলতে যা ভেবেছি, একজন মানুষের মাঝে আমি তার সাক্ষাৎ লাভ করলাম”।

 

তাইতো শামস তাবরিজ বলেন-
“শেখার জন্য তুমি পড়াশোনা করো, কিন্তু বুঝতে হলে তোমার প্রয়োজন প্রেম”।

 

ধর্মীয় গুরু হিসেবে রূমীর জীবনের অবসান ঘটলো। তিনি এবং শামস একত্রে মাসের পর মাস নিভৃতে সময় কাটাতে শুরু করলেন। তার সাথে আলাপ – আলোচনায় রূমী যেন অন্য এক জগতের সন্ধান পান; যেখানে দুনিয়ার অনেক বড় বিষয়গুলো ক্ষুদ্র হতে থাকে।

 

শামস – তাবরিজির সাথে দেখা হওয়ার আগেও রূমী অনেক বড় একজন ইসলামী ধর্মতত্ত্ববীদ ছিলেন কিন্তু শাসমের সান্নিধ্যে আসার পর তাঁকে ইশক্বের (খোদা প্রেমের) আগুনে পুড়াতে থাকে তখনই তাঁর মধ্যে রুপান্তর ঘটে এবং তিনি সুফি সাধক হয়ে উঠেন।

 

সত্যের সঙ্গে যখন প্রেমের মিশ্রণ ঘটে তখনই সে প্রেম আমাদের অন্তরাত্মাকে জাগিয়ে তুলে। নিজের মধ্যে রুপান্তর ঘটায়। নিজের মধ্যে স্রষ্টার অস্তিত্ব অনুভব করতে শিখায়।

 

তাইতো শাসম- তাবরিজ বলেন-

“শোন হে রূমী!
ঈমান হচ্ছে নিজের থেকে নিজেকে পৃথক করে তোলা”।

 

বলা হয়ে থাকে ঐশী রূহ যেমন মারিয়ামের মধ্যে এসে ঈসার (আ.) জন্ম দিয়েছে ঠিক তেমনভাবে শামস – তাবরিজ এসে রূমীর জন্ম দিয়েছে। রূমী, রূমী হয়ে উঠেছেন।

 

তাইতো রূমী বলেন –

“খোদাকে পাওয়ার অনেক পথই রয়েছে। আমি প্রেমকে আমার ধর্ম হিসেবে নিয়েছি”।

“শুধু প্রেমই পারে হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করতে”।

 

রূমীর সাথে তাবরিজির জ্ঞানের সম্পর্ক মানুষ মেনে নিতে চায়নি; এক তো তাবরিজি সমাজ থেকে পুরোপুরি আলাদা, সমাজের অধিকাংশ নিয়ম-কানুনকে তিনি সবসময়ই একরকম প্রত্যাখানই করেন। তার উপর রূমীর পরিবার সমাজে সুপরিচিত এবং প্রতিষ্ঠিত। যদিও তাবরিজি জ্ঞানের আলোয় আলোকিত এক বাদশাহ তবে অধিকাংশ মানুষ সেই হিসেবে কোনোদিন তাঁকে বিচার করতে চায়নি। তাদের কাছে তাবরিজ এক নিঃস্ব মানুষ ব্যতীত আর কিছুই ছিল না।

 

সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই এগিযে যান রূমী। যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল, ঠিক তখন রূমী করে বসলেন অদ্ভুত কাজ; তিনি তাঁর সৎ মেয়ে কিমিয়ার সাথে তাবরিজির বিয়ে দিয়ে দেন। এতে করে সেই সমাজে তাবরিজির একটা শিকড় জন্মে, যা প্রত্যাখান করে কেউ আর তাঁকে ছুঁড়ে ফেলার সাহস করবে না।

 

তবে তাবরিজির সাথে রূমীর জ্ঞানসাধনা বেশি দিন টেকেনি। তাঁর সাথে কিমিয়ার বিয়ের অল্প কিছুদিন পরই কিমিয়া মারা যায়। কিছু লোক শামসকে দামেস্কে যেতে বাধ্য করে। কিন্তু রূমী তাঁকে আবার ফিরিয়ে আনেন।

 

শেষ পর্যন্ত এটা মনে করা হয় যে, রূমীর মুরিদদের কেউ কেউ, এবং সম্ভবত রূমীর পুত্র আলাউদ্দিনও তাদের মধ্যে ছিল। তারা শামসকে হত্যা করে তাঁর মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলে। সে যা-ই হোক, তাবরিজ যেন হয়ে উঠেন বনের সেই পাখিটি, যে কিনা আবার হারিয়ে যায়৷

 

বন্ধুকে হারানোর বেদনায় রূমী তাঁর বাগানে একটি খুঁটিকে প্রদক্ষিণ করতে করতে আবৃতি করতে থাকেন, যে কবিতাগুলো স্বর্গীয় মিলনের সন্ধানে উচ্চারিত সেরা কবিতা বলে আমরা বিবেচনা করতে পারি। তাঁর এই প্রক্রিয়াকে নিশ্চিতভাবেই দরবেশদের বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে ( Whirling Darwish Dance) ধ্যানের পদ্ধতির উদ্ভাবনও বলা যায়।

 

রূমীর পরমানন্দ সূচিত হয়েছিল বিষাদের মধ্য দিয়ে। তাঁর অধিকাংশ কবিতাই স্বতঃস্ফূর্ত ও বিনা প্রস্তুতিতে সৃষ্টি। তাঁর “দিওয়ান – ই – শামস – ই – তাবরিজি” যেন তাঁদের বন্ধুত্বের গভীর অনুভূতির অনুরণন। তাঁদের বন্ধুত্ব লিঙ্গ ও বয়সের বাঁধা, ভাবাবেগ এবং গুরু শিষ্যের সম্পর্কের ধারণা ছাড়িয়ে কবিতার মাঝে বিস্তৃত হয়েছে। তাঁর কবিতা “সূর্যালোক” ও “মানুষের যেকোনো কথাকে” অন্তর্ভুক্ত করার জন্য উন্মুক্ত ছিল।

 

তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল ভিন্ন এক জগত, যেখানে তাঁরা বাস করতেন।” প্রেম দ্বারা যুক্ত হওয়ার পরিবর্তে তাঁরা বরং প্রেমের জীবন্ত জগত ছিলেন”।

 

তাবরিজের হারিয়ে যাওয়া রূমীকে প্রচণ্ড ব্যথিত করে। তাবরিজির হারিয়ে যাওয়া অথবা মৃত্যুর অনেকদিন পর অবধি রূমী তাঁকে ফিরে পাওয়ার আশায় বিভোর ছিলেন। তারপর যখন বুঝতে পারলেন জ্ঞানের সাগরের সাথে তাঁর আর দেখা হচ্ছে না, তখন তাবরিজকে খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার বিপরীত দিকে গিয়ে তিনি লিখেন –

“আমি কেন তাঁকে খুঁজবো?
সে আর আমি তো একই
তাঁর অস্তিত্ব আমার মাঝে বিরাজ করে
আমি নিজেকেই খুঁজছি”।

 

শামস তাবরিজকে নিজের আলোয় অমর করতে তাঁর গ্রন্থ “দিওয়ান – ই – শামস – ই – তাবরিজি”তে একে একে যোগ করতে থাকেন গজল, কবিতা যা আধ্যাত্মিকতার এক নতুন পাঠ হিসেবে সবার কাছে প্রকাশিত হয়।

 

লোকমুখে তখন প্রচলিত হয় যে, তাবরিজির মৃত্যুর পর মাওলানা রূমীই তাবরিজ হয়ে ওঠেন। কারণ ততদিনে রূমীর লেখা একটি লাইন মানুষের ভেতর নাড়িয়ে দিতে থাকে, ক্ষমতাশীল পৃথিবীকে তুচ্ছ করে দেয়ার মতো সব লিখা লিখতে থাকেন তিনি।

 

নতুন রূমী সবার কাছে আধ্যাত্মিক গুরু এবং সুফি কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকেন। হৃদয়ের আলো – অন্ধকারের কথা, সুফিবাদের কথা এমনভাবে বলতে থাকেন, যে দৃষ্টিকোণ থেকে এসব বিষয় কেউ দেখেনি। মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, মানুষের হারিয়ে যাওয়া, সৃষ্টিকর্তার সাথে মানুষের সম্পর্কের ভাবনা নিয়ে হাজির হন এক অন্য রূমী।

 

জীবনে এগিয়ে যাওয়া, পিছিয়ে যাওয়া, দুনিয়ায় টিকে থাকার যুদ্ধ এসব বিষয়কে রূমী যেন পৃথিবীর সামনে নিয়ে আসেন। রুমী মানুষের নিজস্বতার উপর জোর দিলেন, যে আলো পৃথিবীর থেকেও শক্তিশালী বলে জানান –

 

“তুমি কি এখনও এ ব্যাপারে অবগত নও?
এ তো তোমারই আলো, যা দিয়ে সমগ্র জগত প্রজ্বলিত হয়”!

 

রুমী তাঁর কবিতায় নিজের অন্তরের দিকে যাত্রা করার আহ্বান করেছেন।

 

তিনি বলেন,

“হ্যাঁ, তোমাকেই বলছি; অন্তর্লোকের যাত্রা কবে আরম্ভ করবে”।

আরো বলেন-

“কেন তুমি প্রত্যেক দরজায় কড়া নাড়ছো!
যাও নিজের হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ো।”

 

তিনি দগ্ধ হৃদয় সম্পর্কে বলেন,

” তোমার দগ্ধ হৃদয় এমন একটি জায়গা যা তোমাকে আলোর পথে হাঁটতে শিখাবে সত্যের সন্ধান পেতে”।

(চলবে)……

 

প্রথম পর্ব পড়তে লিংকে ক্লিক করুন-

https://www.facebook.com/110467937348910/posts/379917777070590/?sfnsn=mo