মেঘের উপরে হারানো শহর মাচুপিচু

আমজাদ হোসাইন

প্রকাশিত: ১১:০৩ অপরাহ্ণ, জুন ১৪, ২০২০

 বর্তমান বিশ্বে ইনকা সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শন হচ্ছে মাচুপিচু নগরী ৷ যাকে ইনকাদের হারানো শহর বলা হয়। মাচুপিচু শব্দটি নেটিভ আমেরিকান কেচুয়া জাতির ব্যবহৃত শব্দ। আর এর অর্থ প্রাচীন পর্বত। অধিকাংশ সময় মাচুপিচু নগরী মেঘের আড়ালে ঢাকা থাকে বলে একে মেঘের দেশের নগরীও বলা হয় ৷ এটি পঞ্চদশ শতাব্দির মাঝামাঝি ইনকা রাজা পাচাকুতিক এর রাজত্বকালে নির্মিত হয়েছিলো ৷

 

রহস্যময় এই নগরী কয়েক’শ বছর অজ্ঞাত থাকার পর, ১৯১১ সালে হাইরাম বিঙাম (Hiram Bingham) নামে এক মার্কিন ঐতিহাসিক এটিকে আবার সমগ্র বিশ্বের নজরে নিয়ে আসেন। তারপর থেকে মাচু পিচু পর্যটকদের কাছে একটি আকর্ষণী দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে। এটিকে ১৯৮১ সালে পেরুর সংরক্ষিত ঐতিহাসিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ইউনেস্কো ১৯৮৩ সালে এটিকে তাদের বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ২০০৭ সালে New 7 Wonders Foundation এটিকে পৃথিবীর সপ্তাশ্চার্যের একটি হিসেবে ঘোষণা করে ৷

 

অবস্থান

মাচুপিচু দক্ষিণ আমেরিকার একটি অন্যতম প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্র এবং পেরুর সবচাইতে আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। এই দুর্গনগরীটি ইনকাদের রাজধানী কোস্কো (Qusqu) থেকে উত্তর-পশ্চিমে মাত্র ৮০ কিলোমিটার (৫০ মাইল) দূরে অবস্থিত। কিন্তু এর অবস্থান অজ্ঞাত থাকার কারণে অন্যান্য ইনকা নগরীর মত এই শহরটি কখনোও স্পেনীয়দের দ্বারা আক্রান্ত এবং লুট হয়নি ৷ শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৪০০ মিটার (৭,৮৭৫ ফিট) উচ্চতায় পবর্তের চূড়ায় অবস্থিত। মাচু পিচুর এক পাশ চূড়া থেকে একেবারে খাড়া ভাবে ৬০০ মিটার নিচে উরুবাম্বা (Urubamba) নদীর পাদদেশে গিয়ে মিশেছে। গিরিখাত ও পাহাড়-পর্বতের দ্বারা প্রাপ্ত চমৎকার প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে এই শহরের অবস্থান সামরিক কৌশলগত দিক থেকে গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। উরুবাম্বা নদীর ওপর দড়ির তৈরি সেতু ইনকা সৈন্যদের গোপন প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

 

মাচুপিচুর পশ্চিম দিকে গাছের গুড়ি নির্মিত আরেকটি সেতু ছিলো। এই সেতুর মাঝে ৬ মিটার (২০ ফুট) জায়গা ফাঁকা ছিলো, প্রয়োজনমত গাছের তক্তা দিয়ে সেতুর দুই অংশকে সংযুক্ত করা যেতো। সেতুটির নিচে ৫৭০ মিটার (১৯০০ ফুট) গভীর গিরিখাত, তাই গাছের তক্তা সরিয়ে দিলে কোনও শত্রুর পক্ষে তা অতিক্রম করা দুঃসাধ্য ব্যাপার হতো। আর এই সেতুটি নির্মিত হয়েছিল উরুবাম্বা উপত্যকার ওপর। শহরটি মূলত দুই পাহাড়ের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ফলে এখান থেকে নিচের উপত্যকা পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান, যা সামরিক দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থান। এছাড়া শহরের পেছনের খাড়া পর্বত প্রায় অনতিক্রম্য। মাচুপিচুর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পাহাড়ি ঝরনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিলো, যা সহজে বন্ধ করা যেতো না।

 

এছাড়া পাহাড়ের পাশগুলো ধাপকেটে সমান করা হয়েছিলো। এতে একদিকে যেমন চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিলো, অন্যদিকে খাড়া ঢাল বেয়ে শহরে আসার পথটি আক্রমণকারীদের জন্য দুর্গম করা হয়েছিলো। মাচুপিচু থেকে পাহাড়ের ওপর দিয়ে কোস্কো যাবার দুটি পথ আছে, একটি “সূর্য দরজা” দিয়ে, এবং অন্যটি “ইনকা সেতু” দিয়ে। শত্রুর আক্রমণের মুখে দুটি পথই সহজে বন্ধ করে দেয়া যেতো। এই শহরের মূল উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিলো খুবই মজবুত।

 

ইতিহাস

 

ইনকা সভ্যতার স্বর্ণযুগ সম্রাট ‘পাচাকুতিক’-এর শাসনামলে ১৪৫০ সালের দিকে মাচুপিচু নির্মিত হয়। কিন্তু তার ১০০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এটি পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে। ধারণা করা হয়, স্পেনীয় অভিযাত্রীদের আগমনের আগেই এই শহরের অধিকাংশ অধিবাসী গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। স্পেনীয়রা যখন ইনকা রাজ্য আক্রমণ করে তখন তারা এ শহরের কথা জানতো না। ফলে অন্যান্য ইনকা নগরীর মতো এ শহরটি তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। যার ফলে এ শহরে লুটপাটের কোন ঘটনাও ঘটেনি। এরপর অনেক বছর এ শহর জন মানবহীন ছিলো। ফলে শহরটি ধীরে ধীরে ঘন জঙ্গলে পরিণত হয় এবং ঢেকে যায়।

 

মার্কিন ঐতিহাসিক ‘হাইরাম বিঙাম’ ১৯১১ সালে শহরটি সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন এবং ১৯১৫ সাল পর্যন্ত খনন কাজ পরিচালনা করেন ৷ মাচুপিচুর সন্ধানকারী ‘হাইরাম বিঙাম’ এবং আরোও অনেকের মতে এই সুরক্ষিত শহরটি ইনকাদের ঐতিহ্যগত জন্মস্থান এবং সূর্য কুমারীদের পবিত্র কেন্দ্র ছিলো। অনেকের মতে মাচুপিচু ছিলো ধর্মীয়ভাবে ইনকাদের পবিত্র স্থান। অন্য একটি মতবাদ অনুসারে মাচুপিচু একটি ইনকা লিয়াক্তা বা এমন একটি উপনিবেশ যা বিজিত অঞ্চল সমূহের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হতো। আবার কেউ কেউ মনে করেন এটি একটি জেলখানা হিসাবে ভয়ংকর অপরাধীদের রাখার জন্য নির্মিত হয়েছিলো। অন্যদিকে জন রো ও রিচার্ড বার্গারসহ আরোও অনেকের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মাচু পিচু কোনোও প্রতিরক্ষামূলক আশ্রয়স্থল নয়, বরং এটি ইনকা সম্রাট পাচাকুতিকের একটি অবকাশযাপন কেন্দ্র ছিলো। বেশির ভাগ পুরাতত্ত্ববিদই এই মতবাদকে সমর্থন করেছে।

 

খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা

মাচুপিচু শহরে খাদ্য ব্যবস্থা ছিলো কৃষি নির্ভর ৷ বেশিরভাগ কৃষিকাজই করা হতো পাহাড় কেটে নির্মিত সিড়িরূপ জমিতে। এগুলো দারুন প্রকৌশলী বিদ্যার পরিচায়ক, যেখানে পানি নিষ্কাশন সুবিধাসহ মাটির উর্বরতা রক্ষার পাশাপাশি পাহাড়ের মাটি ক্ষয় রোধ এবং ভেঙ্গে পড়া রোধের বিষয়গুলো বিবেচনা করে জমি বানানো হতো। সিড়ির মতো তৈরী জমিতে কোনো কোনো জায়গায় ধস হয়েছিলো যা আজও দেখা যায় ৷ ১৪৫০ সাল হতে হিসেব করে দেখা গেছে যে উক্ত স্থানে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১,৮০০ মিমি (৭১ ইঞ্চি) বৃষ্টি হতো, যা শস্য উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্তই ছিলো না বরং তার থেকেও বেশি ছিলো। তাদের জমিতে পানি সেচের দরকার পড়তো না। বৃষ্টিতে এতো বেশি পানি পাওয়া যেতো যে বাড়তি পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা করতে হতো।

 

৯০ দশকে খনন এবং মাটি পরীক্ষা করেন ‘কেনেথ রাইট’ তাতে দেখা যায় সোপানগুলো স্তরবিশিষ্ট একেবারে নিচের স্তর হল বড় পাথর এবং নুড়ি। তার উপরের স্তরে রয়েছে বালি এবং নুড়ির স্তর ৷ আর একেবারে উপরের স্তরে রয়েছে উর্বর মাটির স্তর। উপরের স্তরের এই মাটি উপত্যকা হতে আনা হয়েছে কারণ পাহাড়ের চূড়ার দিকের মাটি এতো উর্বর হয় না ৷ চাষের জমির পরিমান ছিল মাত্র ৪.৯ হেক্টর (১২ একর) যা একটি শহর বা নগরীর জন্য নিতান্তই কম ৷ কিন্ত তাদের পরিকল্পিত চাষাবাদ এবং অত্যধিক ফলনের কারণে খাদ্য চাহিদা মোটামুটি পূরণ হলেও ঘাটতি থেকে যেতো ৷ মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে সেখানে আলু এবং শস্য উৎপাদিত হতো যা শহরের সকল মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। যার কারণে তাদেরকে আশেপাশের উপত্যকা ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে খাদ্য সংগ্রহ করতে হতো ৷

 

 

বাসস্থান ও স্থাপত্যশৈলী

মাচুপিচু যেহেতু ইনকা সভ্যতার একটি নগরী ছিলো তাই বেশির ভাগ স্থাপনাই ইনকা বাস্তুকলার ঐতিহ্যবাহী নির্মাণ পদ্ধতিতে তৈরি হতো। স্থাপনাগুলোর দেয়াল পাথর নির্মিত এবং জোড়া দেবার জন্য কোনো রকম সিমেন্ট জাতীয় পদার্থ বা চুন-সুরকির মিশ্রন ব্যবহার করা হয়নি। ‘অ্যাশলার’ নামক এই নিমার্ণ কৌশলে ইনকারা খুবই দক্ষ ছিলো। এই পদ্ধতিতে পাথরের খণ্ড এমন নিখুঁত ভাবে কাটা হতো যেনো কোন রকম সংযোগকারী মিশ্রণ ছাড়াই পাথরগুলো খাজে খাজে শক্তভাবে একটার ওপর আরেকটা বসে যায়। ইনকারা পাথরের এই নির্মাণ পদ্ধতিতে পৃথিবীর সেরা ছিলো। তাদের নির্মিত পাথরের দেয়ালগুলোর গাঁথুনি এতোই নিপুন যে একটা পাতলা ছুরির ফলাও সেগুলোর ভেতর দিয়ে প্রবেশ করানো সম্ভব নয়। মাচুপিচুর কিছু কিছু স্থাপনা আছে সেগুলো চুনসুরকির মিশ্রণ ব্যবহার করে তৈরি, তবে ইনকা নির্মাণশৈলীর মান বিচারে সেসব নিম্নমানের এবং তড়িঘরি করে তৈরি করা।

 

পেরু একটি অতি ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা এবং সিমেন্টজাতীয় মিশ্রণের গাথুনি দিয়ে তৈরি স্থাপনার চাইতে গাথুনি ছাড়া শুধুমাত্র খাজে খাজে পাথর বসিয়ে তৈরি স্থাপনা অনেক বেশি ভূমিকম্পপ্রতিরোধী। দেয়ালগুলোতে প্রচুর সুক্ষ্ম নকশা দেখা যায়, যেগুলো ভূমিকম্পের সময় দেয়াল ধ্বসেপড়া রোধ করে। দরজা এবং জানালাগুলো অসমচতুর্ভুজ আকৃতির এবং নিচ থেকে ওপরে ক্রমে ভেতরের দিকে হেলানো ৷ দেয়ালগুলো ওপর থেকে নিচে একদম সোজা নয়; বরং পাথরগুলো এক সারি থেকে অন্য সারি কিছুটা হেলানো ভাবে গেঁথে দেয়ালগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে। ফলে মাচু পিচু শহরটি অনেকগুলো ভূমিকম্প সহ্য করে এখনও ভালোভাবে টিকে আছে।

 

ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, ইনকারা কখনোই ব্যবহারিক কাজে চাকার ব্যবহার করেনি। তাই তারা কীভাবে এত সংখ্যক বিশাল আকৃতির পাথর খণ্ড এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে গেছে সেটা এক রহস্য; যদিও সাধারণভাবে মনে করা হয় যে, এই বিশার আকৃতির পাথর খণ্ডগুলো পাহাড়ের সমতল ঢাল দিয়ে ঠেলে ওপরে তুলতে তারা শত শত শ্রমিক ব্যবহার করেছিলো। এখনও কিছু কিছু পাথরের গায়ে হাতলের মতো গাঁট রয়েছে যা পাথরগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে বসানোর জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে ৷

 

শহরটিতে ১৪০ টি স্থাপনার মধ্যে রয়েছে কিছু মন্দির, পবিত্র স্থান, উদ্যান এবং আবাসিক ভবন ইত্যাদি। চলাচলের জন্য রয়েছে ১০০টিরও বেশি সিড়ি যার মধ্যে কিছু কিছু একটি মাত্র গ্রানাইট পাথরের খণ্ড খুদে তৈরি করা হয়েছে। এখানে রয়েছে প্রচুর সংখ্যক ঝরনা, যেগুলো পাথর কেটে তৈরি করা এবং ছোট ছোট খালের মাধ্যমে পরস্পর সংযুক্ত; এসব মূলতঃ সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিলো। এছাড়াও একটি পবিত্র ঝরনা থেকে প্রতিটি বাড়িতে পানি সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, মাচু পিচুর শহর ব্যবস্থা তিনটি বড় বিভাগে বিভক্ত ছিলো ৷ এগুলো হলো:- ১. পবিত্র এলাকা, ২. জনসাধারণের এলাকা, এবং ৩. পুরোহিত ও অভিজাত শ্রেনীর এলাকা। পবিত্র এলাকায় মাচুপিচুর প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদগুলো অবস্থিত ৷ যেমন: ইন্তিউয়াতানা পাথর, সূর্য মন্দির এবং তিন জানালা ঘর। এসব স্থাপনা উৎসর্গ করা হয়েছিলো ‘ইনতি’ তাদের সূর্য দেবতা এবং মহান দেবতার প্রতি। জনসাধারণের এলাকায় সাধারণ নিম্ন শ্রেনীর লোকজন বাসবাস করতো। এই এলাকার স্থাপনা গুলোর মধ্যে রয়েছে গুদামঘর এবং বসত বাড়ি। অভিজাত এলাকায় সম্ভ্রান্ত শ্রেনীর থাকার জন্য একটি অংশ বরাদ্দ ছিলো। এ অংশের বাড়িগুলো একটি ঢালের ওপর কয়েক সারিতে অবস্থিত।

 

হামাউতা (Hamawt’a) বা বিচক্ষণ ব্যক্তিদের বাড়িগুলোর দেয়াল কিছুটা লালচে রঙের। অন্যদিকে নিউস্তা (Ñusta) বা রাজকুমারীদের অংশের ঘরগুলো অসম আয়তাকার। আর স্মৃতিসৌধ একটি খোদাইকৃত ভাস্কর্য যার ভেতর একটি নকশাকৃত কক্ষ রয়েছে। এটি যজ্ঞ এবং উৎসর্গের কাজে ব্যবহার করা হতো। সড়ক ব্যবস্থার অংশ হিসাবে উপত্যকা থেকে শহরের চূড়া পর্যন্ত একটি রাস্তা তৈরি করেছিল। বর্তমানে হাজার হাজার পর্যটক ইনকাদের তৈরী এ পথে পায়ে হেঁটে মাচুপিচু ভ্রমণ করে। তবে এর জন্য আগে কোস্কোতে যাত্রাবিরতি করে স্থানীয় আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিয়ে তারপর উরুবাম্বা উপত্যকা হয়ে আন্দেস পর্বতমালার ওপর দিয়ে দুই থেকে চার দিনের এই পদযাত্রায় বের হতে হয়।

 

‘ইন্তিউয়াতানা’ বিস্ময়কর পাথর

ইনকারা যেসকল পাথরের পূজা করতো এর অন্যতম ছিল ইন্তিউয়াতানা ৷ তারা বিশ্বাস করতো এর মধ্যে অলৌকিক ক্ষমতা আছে ৷ স্থানীয় উপাখ্যান অনুসারে কোনো অনুভূতি সম্পন্ন মানুষ যদি এই পাথরে তার কপাল ঘসে তাহলে আধ্যাত্মিক জগৎ দেখতে পাবে। ইন্তিউয়াতানা (Intiwatana) পাথর দক্ষিণ আমেরিকার পূজিত পবিত্র পাথরগুলোর একটি। স্পেনীয়রা ২০ শতকের আগে এই পাথরটি খুঁজে পায়নি; ফলে এটি ইনকাদের অন্যান্য পবিত্র পাথরের মতো ধ্বংস হবার হাত থেকে বেঁচে যায়। এই পাথরগুলো এমন ভাবে স্থাপন করা হয় যাতে শীতকালে এগুলো সরাসরি সূর্যের দিকে নির্দেশ করে। একে “সূর্যের আকঁড়া বিন্দুও” বলা হয়, কেননা উপকথা অনুসারে এটি সূর্যকে তার জায়গায় আটকে রাখে ৷

 

ছবি: theonlyperuguide.com

 

২১শে মার্চ ও ২১শে সেপ্টেম্বর, বছরে এই দুবার দিনের মাঝামাঝি সময়ে সূর্য ইন্তিউয়াতানা পাথরের একেবারে ওপরে থাকে; ফলে এর কোনো ছায়া তৈরি হয় না। প্রকৃতপক্ষে ইন্তিউয়াতানা একটি “মহাকাশ ঘড়ি”। এটি ২০০০ সাল পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় ছিলো। সেই বছর একটি মদ কোম্পানির বিজ্ঞাপন নির্মাণের সময় ৯৯০ পাউন্ড ওজনের একটি ক্রেন এই পাথরের ওপর পড়ে গেলে এর কিছু অংশ ভেঙে যায় ৷ অনেক মানুষ মনে করে এই ঘটনার পর আত্মারা ইন্তিউয়াতানা ছেড়ে চলে গেছে।

 

বর্তমান অবস্থা

মাচুপিচু এখন ইউনোস্কো কর্তৃক ঘোষিত একটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। পেরুর সবচাইতে জনপ্রিয় পর্যটন স্থান ও অন্যতম আয়ের উৎস হিসেবে পরিণিত হওয়ার ফলে শহরটি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। ১৯৯০ সালের শেষের দিকে পেরু সরকার এখানে যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধার জন্য একটি কেবল কার নির্মাণ করে ৷ এছাড়াও বুটিক, পর্যটকদের কমপ্লেক্স ও রেস্তোরাঁ সংবলিত একটি বিলাসবহুল হোটেল তৈরির অনুমতি দেন। বিজ্ঞানী, শিক্ষাবীদ ও পেরুর জনগণ এই পরিকল্পনার তীব্র প্রতিবাদ করে, তাদের সংশয় ছিল এর ফলে মাচুপিচুতে পর্যটকের সমাগম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধিপাবে এবং তা এই পুরাকীর্তির অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকির সৃষ্টি করবে। যাতায়ত ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার ফলে প্রতি বছরই মাচু পিচুতে পর্যটক সমাগম বাড়ছে, যা ২০০৩ সালে ৪ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। এতে চূড়ার ওপরে টেরেস করা চাষের জমি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ৷

 

মাচুপিচুতে যেনো আর কোনো ধরনের সেতু নির্মাণ না হয় সেজন্য প্রতিবাদ অব্যাহত আছে ৷ ইউনেস্কো একে বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার চিন্তভাবনা করছে। তা সত্ত্বেও, অতিরিক্ত ব্যবহার ও লোকসমাগমের ফলে মাচু পিচুর বেশ ক্ষতিসাধন হয়েছে। ফেদেরিকো কাউফমান দোইগ (Federico Kaufmann Doig) নামক পেরুর একজন পুরাতত্ত্ববিদ বলেছেন – “মাচু পিচু আমাদের পুরাতাত্মিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু এবং ইন্তিউয়াতানা মাচু পিচুর হৃদয়। তারা আমাদের সবচাইতে পবিত্র ঐতিহ্যকে আঘাত করেছে”। উল্লেখ্য, ১৯৯০ সাল থেকে কোনো ধরনের উড়োজাহাজে মাচু পিচুতে যাতায়াত বন্ধ করা হয়েছে ৷ আর বর্তমানে মাচুপিচুর উপর দিয়ে কোনো ধরণের উড়োজাহাজ চালানোও নিষিদ্ধ।