মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তা; এক ভারতীয়র প্রশ্নে বাংলাদেশির তথ্যবহুল উত্তর

প্রকাশিত: ৫:৩৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৩, ২০২১

“১৯৭১ সালে ১ কোটি বাংলাদেশি শরনার্থীদের জন্য ভারতের দুর্বল অর্থনীতি যে বোঝা টেনেছিল, এবং হাজার হাজার ভারতীয় সেনারা, যারা নিহত হন বাংলাদেশিদের জীবন রক্ষা ও স্বাধীন করতে, সেই ক্ষতিপূরণ বাংলাদেশ সরকার কেন দিতে বাধ্য নয়?” প্রশ্নটি একজন ভারতীয় নাগরিক করে ছিল আরেকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোরাতে(Quora)।

সেখানে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন বাংলাদেশের একজন নাগরিক। যার নাম- আসলাম মাহমুদ এবং কোরাতে তিনি নিজের পরিচয় দিয়েছেন একজন বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষক।

 

“বিডিহেরাল্ড নিউজ” পাঠকদের জন্য তথ্যবহুল নিবন্ধটি হুবহু তুলে ধরা হলো।

 

প্রশ্ন: ১৯৭১ সালে ১ কোটি বাংলাদেশি শরনার্থীদের জন্য ভারতের দুর্বল অর্থনীতি যে বোঝা টেনেছিল, এবং হাজার হাজার ভারতীয় সেনারা, যারা নিহত হন বাংলাদেশিদের জীবন রক্ষা ও স্বাধীন করতে, সেই ক্ষতিপূরণ বাংলাদেশ সরকার কেন দিতে বাধ্য নয়?

 

উত্তর : আমি দেখতে পাচ্ছি। এই প্রশ্নের উত্তর কেউ সঠিকভাবে না দিয়ে প্রশ্নকর্তার উপর আক্রোশ ছাড়ছেন।

তাই আমি আবেগহীন একটি উত্তর দিচ্ছি। কারণ আমি মনে করি প্রশ্নকর্তার এই প্রশ্ন একজন ভারতীয় হয়ে করতেই পারেন এবং বাংলাদেশি হয়ে এর উত্তর দেয়া উচিত।

 

প্রথমেই 1)দূর্বল অর্থনীতি নিয়ে শরণার্থী বোঝা, 2)যুদ্ধে ভারতের প্রাপ্ত লভ্যাংশ,3) ভারতীয় সেনাদের বাংলাদেশ লুট 4)কেন বৈধ নয় তার ব্যাখা করছি। সবশেষে, বাংলাদেশ কী করেছে ভারতের জন্য।

 

1- দূর্বল অর্থনীতি নিয়ে শরণার্থী বোঝা:

এটি সত্য। তখন ভারতের অর্থনীতি একদমই ভালো ছিল না। তার উপর প্রায় ১ কোটি শরণার্থী দেখাশোনা,খাওয়া দাওয়া ইত্যাদির বোঝা টানা। অনেক ভারতীয় মনে করেন ভারত নিজে একাই এই মহানুভবতার কাজটি করেছে। যেটি একটি ভুল ধারণা। এই শরণার্থীদের জন্য কিন্ত ভারতকে বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ কোটি ডলারের সাহায্যসহ জাতিসংঘের অনেক অনুদান এসেছে। যার অর্থ পরিমাণ নিচে ছবিতে দেওয়া হল। এটা নিতান্তই কম নয়। ৯ মাস হিসেবে যথেষ্ট। তাছাড়া বাংলাদেশ স্বাধীন হবার ফলে ভারতের যে বড় একটা ভৌগলিক,অর্থনৈতিক লাভ হয়েছে তার জন্য এইটুকু কষ্ট ভারতকে করতেই হত।

 

(বই:- মুক্তিযোদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান
লেখক : – এ এস এম সামসুল আরেফিন।
প্রকাশনী :- সময় প্রকাশন ২০১২, পৃষ্টা :৪৫২)

 

2- ভারতের প্রাপ্ত লভ্যাংশ:
যুদ্ধে পাকিস্তান আত্নসমর্পণ করে ভারতের কাছে। এর কারণ ছিল যদি মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্নসমর্পণ করে যারা একটি মিলিশিয়া তবে পাকিস্তানি সেনাদের কচুকাটা করতো মুক্তিবাহিনী। তাই পাকিস্তান ভারতের কাছে আত্নসমর্পন করে যেন ভারত জেনেভা চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানিদের পাকিস্তানে নিরাপত্তার সাথে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকে। যদিও চুক্তিতে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়েরই নাম উল্লেখ ছিল। এসবের বিনিময়ে ভারতকে পাকিস্তান একটি খুবই ভারী অংকের টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়। যা ভারত একাই নিয়ে নেয়। বাংলাদেশকে এর কোন ভাগ দেয়া হয় নি। যদিও বাংলাদেশের এই ক্ষতিপূরণ দরকার ছিল বেশি। বাংলাদেশ দীর্ঘ ৯ মাসের রণক্ষেত্রে ধ্বংসের স্তুপে পরিনত হয়েছিল। যুদ্ধ তো চলছিল পাকিস্তান আর মুক্তিবাহিনী বা বাংলাদেশের। কিন্তু বাংলাদেশ এ নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করে নি যেহেতু মুক্তিবাহিনীকে অস্ত্র ও শরণার্থীদের সাহায্য করেছে ভারত।

 

 

[ উক্ত ছবিটি Official history of the 1971 India Pakistan War নামের নথি থেকে নেয়া হয়েছে। ১৯৯২ তে history Division of the Ministry of Defence of India লেখা। নথিটি পেতে নিম্নের লিংকে গিয়ে appendix অপশন ডাউনলোড করে 822 পেইজে যান।

 

3- ভারতীয় সেনাদের বাংলাদেশ লুট:
ভারত পরবর্তীতে পাকিস্তানীদের ফেলে যাওয়া সকল অস্ত্র এবং ৮৭ টি ট্যাংক নিয়ে যায় যার মূল্য ৭৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। নিজের চোখে দেখা এসব কর্মকান্ডে খুলনার ডিসি কামাল সিদ্দিকি তার বইতে লিখেন ভারতীয় সৈন্যদের লুটপাটের মধ্যে অস্ত্র ছাড়াও ছিল :-

১)মজুদকৃত খাদ্য শস্য,
২)কাঁচা পাট,
৩)সুতা,
৪)গাড়ি,
৫)জাহাজ,
৬)শিল্প প্রতিষ্ঠানের মেশিন ও যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য খাদ্য দ্রব্য।

 

(ছবিটির সোর্স : Bangladesh :A brutal birth বই থেকে)

 

 

খুলনার ডিসি কামাল সিদ্দিকীর মতে, সব মিলিয়ে কম করে ধরলেও এই লুটপাটের পরিমাণ কেবল খুলনা জেলাতে ছিল তৎকালীন হিসেবে ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সারা বাংলাদেশের ১৯টি জেলা থেকে লুটাপাটের পরিমাণ কেমন হতে পারে সেটা অনুমান অসম্ভব নয়।

 

[ বই :-The political economy of rural poverty in bangladesh (1st edition)
লেখক :-kamal Siddiqui
National institutions of local government,1982 ]

 

২১ শে জানুয়ারি ১৯৭২ সালে ব্রিটেনের বিখ্যাত গার্ডিয়ান পত্রিকায় সাংবাদিক মার্টিন ঊলাকট (Martin Woollacott) Indians ‘loot whole factory ‘শিরোনামে লেখায় লিখেন ;

“Systematic Indian army looting of mills, factories and offices in Khulna area has angered and enraged Bangladesh civil officials here. The looting took place in the first few days after the Indian troops arrived in the city on December 17” (Martin Woollacott, Indians ‘loot whole factory, The Guardian, Jan 22, 1972).

 

4- কেন বৈধ নয়:
১) ভারত বাংলাদেশের কাছে কোন প্রকার ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে না। কারণ দুই দেশে মধ্যে এরকম কোন চুক্তি হয় নি যার ভিত্তিতে ভারত এরকম কিছু দাবি করবে।

২) ভারত পূর্ব-পাকিস্তান এ প্রবেশ করেছিল এবং পাকিস্তানি সেনা দ্বারা প্রতিহতে অনেকে নিহত হয়ে ছিল। তাই ভারতের সেনাদের ক্ষতিপূরণ পাকিস্তান দেবার কথা বাংলাদেশ নয়।

৩) ইতিহাস থেকে এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশ ভারতকে পূর্ব পাকিস্তান হামলার জন্য কোন সুবিধা বা কিছু দিবে বলে অঙ্গীকার করে নি।

৪) পূর্ব-পাকিস্তান হামলা ভারতের নিজস্ব সিধান্ত ছিল এবং ভারত বাংলাদেশ হামলা করেছিল কারণ ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের ১১টি বিমান ঘাটিতে একসাথে হামলা চালিয়ে ছিল। তাই ভারত পূর্ব পাকিস্তানে হামলা করতে আন্তর্জাতিক কোন বাধা থাকে নি।

৫) ভারত যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সাথে মিত্রবাহিনীর হিসেবে যোগ দিয়েছিল কিন্তু যুদ্ধে জয়ী হবার পর পাকিস্তানের ক্ষতিপূরণ নিজে একা গিলে ফেলে। বাংলাদেশকে কিছুই দেয় নি। তাই বাংলাদেশ উল্টো সেই পাকিস্তান প্রদত্ত অর্থের থেকে নিজে কিছু দাবি করতে পারে। কারণ যুদ্ধ কেবল আপনি একা লড়েন নি।

 

 

বাংলাদেশ কী করেছে ?

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিসেব মতে স্বাধীনতাযুদ্ধে ১ হাজার ৯৮৪ জন ভারতীয় শহীদ হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১ হাজার ৭৬৯, নৌবাহিনীর ২০৪ এবং বিমানবাহিনীর ১১ জন। এই সংখ্যা ধরেই তাদেরকে ৫ লাখ রুপি করে সম্মাননা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যা পরবর্তীতে দেওয়াও হয়।

 

তথ্যসূত্র : https://bn.quora.com/১৯৭১-সালে-১-কোটি-বাংলাদেশি/answers/200768903?ch=10&share=595ee36f&srid=u1wcxF&fbclid=IwAR0sgks9Es7C5HgI8fTH5CfKsj8txKywmY5-tY8DE1fZGuUx56Voo_CsIMc