ঢাকা, মঙ্গলবার ১৫ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

মির্জা, আপনাকে খুব কাছের মানুষ মনে হয়


প্রকাশিত: ১১:৩৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২০

 

লিখেছেন: তানজিনা আক্তার

 

“হুয়ি মুদ্দাত কি গালিব মার গ্যায়া পার ইয়াদ আতা হ্যায়
ও হার এক বাত পার ক্যাহনা কে ইয়ুঁ হোতা তো কেয়া হোতা।
অর্থ- “গালিব মরেছে বহু যুগ হলো তবু মনে পড়ে
প্রতি কথায়, তার বলা এমন হলে কেমন হতো!”

 

মির্জা আসাদুল্লাহ খাঁ। কবি নাম গালিব- যার অর্থ “বিজয়ী”। জন্ম ২৭ ডিসেম্বর, ১৭৯৭ তে, আগ্রায়। জীবনের প্রধান সময় কাটিয়েছেন দিল্লীতে। মোঘল দরবারে। বলা হয়ে থাকে, ভারতবর্ষে মোঘলদের দুটি শ্রেষ্ঠ দান রয়েছে- এক তাজমহল, আরেক মির্জা গালিব।

 

একজন কবি একা একটি ভাষার প্রতিনিধিত্ব করেছেন, ইতিহাসের পাতায় এমন নজির বিরল। তবে মির্জা গালিব এখানে লা জাওয়াব দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে গেছেন। উর্দু ও ফারসি ভাষায় কবিতা লিখেছেন অসংখ্য। স্বাক্ষর রেখে গেছেন পাণ্ডিত্যের। ভারতীয় উপমহাদেশসহ গোটা পৃথিবীকে উর্দু ও ফার্সি ভাষার সাথে, বিশেষত উর্দু ভাষার অনবদ্য মাধুর্য- এর গজলের সাথে, পরিচয় করিয়েছেন। উর্দু ভাষা অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক ও জগদ্বিখ্যাত পণ্ডিতের জন্ম দিয়েছে। তবে মির্জা আসাদুল্লাহ খাঁ গালিব উর্দু সাহিত্যের এক অদ্বিতীয় প্রাণপুরুষ। তাঁর অলংকার ও ছন্দ এতো উচ্চ-মার্গীয় যে জীবদ্দশাতেই তিনি দুরূহ কবির পরিচয় পেয়েছেন।

 

ভক্ত হিসেবে, পাঠক হিসেবে, যখন গালিব পড়ি, তখন একজন বড় কবির পরিচয় ছাপিয়ে এই মানুষটিকে খুব আপন মনে হয়। একেবারে নিজের বন্ধুর মতোই মনে হয়। মনে হয় যেনো এক কিনারাবিহীন মধুর সমুদ্রে অজানাকে জানার আগ্রহে উদ্দেশ্যহীন পথে ক্লান্তিহীন সাঁতার কেটে চলেছি। সাহিত্যরসের শরাব পান করে বুঁদ হয়ে আছি।

 

সাধারণ বাক্যে এই মহান সাহিত্য সম্রাটের গুণকীর্তন করার দুঃসাহস এই অধমের নেই। তবে গালিবকে ভালোবেসে তাঁর প্রতি কিছু অনুভূতি তাঁরই কাব্যিক আন্দাজে প্রকাশ করার প্রত্যয়ে এই গুফতুগু।

 

কবি গালিব এমন এক জীবনবোধের কবি যার কথাগুলো অসহ্য গুমোট গরমে, বাসের ভীড়ে, গলার ভেতরে কান্না চেপে রেখে দুপুরে না খাওয়া কোনো বন্ধুর দেখা পেয়ে তার সফলতার সাতকাহন শুনতে গিয়ে কিংবা নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়েও মনে পড়ে যায়।

“বানা কার ফাকিরোঁ কা হাম ভেস গালিব
তামাশায়ে আহলে কারাম দেখতে হ্যায়”
গালিব বলছেন- “ফকিরের বেশ ধরে আমি গালিব,
এই জগতের মায়া দয়া দেখানোর তামাশা দেখি”।

মির্জা গালিব ভারতবর্ষের প্রথম সারির আধুনিক ভাবধারার অন্যতম কবি। ব্যক্তিমানুষের মন আর মুখের দ্বি-চারিতা তাঁর কবিতায় উঠে আসে আশ্চর্যজনকভাবে। যার উপমা সর্বজনবিদীত । কবি বলছেন-

“পানি সে জিস তারাহ ডারে হে সগগযিদা আসাদ,
ডারতা হুঁ আয়িনে সে কে মরদুম গযিদা হু”

অর্থ হলো- “কুকুরে কামড়ানো রোগী যেমন জল ভয় পায় আসাদ,
আমি আয়না দেখতে ভয় পাই, আমাকে মানুষ কামড়েছে।”

 

অনেক সময় গালিব পড়তে গিয়ে মনে হয় আমরা মির্জা সাহেবের কদর তো করি কিন্তু তা যেনো কেবল “দিল হি তো হে, না সাঙ ওয়া খীস্ত” অর্থ- “এ তো হৃদয়, ইট পাথর তো নয়” – এরকম একটা ভাবনার জায়গা থেকে। তিনি যেনো এমন এক কবি, যিনি প্রেম আর হৃদয়ঘটিত ব্যাপারগুলো আমাদের থেকে বেশি বোঝেন। এ কারণেই তাঁর আদর ও কদর আমাদের কাছে বেশি।

 

এক নিভে যাওয়া দীর্ঘশ্বাস, থরথর করে কাঁপতে থাকা কোনো না বলা কথার বেদনা। এসবের মধ্যে যে কষ্ট আছে, সেসব না বলা কষ্টকে তিনি যেনো কোনো সুন্দর পোষাক পরিয়ে সামনে আনতে সিদ্ধহস্ত। তিনি নিছক অভিজ্ঞতার অনন্তস্পর্শী এক উড়ান। কিন্তু গালিবের মধ্যে এতো প্রবল ঠাট্টা করার প্রবণতা, এতো অবলীলায় তিনি নিজের দুঃখকে জগতের দুঃখের সীমায় পৌঁছে দেন যে এর নজির এখনো পাওয়া দুষ্কর। মির্যা বলছেন-

“সুরমায়ে মুফতে নযর হু মেরি কীমাত ইয়ে হ্যায়,
কী রাহে চাশমে খরিদার পে এহসাঁ মেরা”

“বিনে পয়সার কাজল আমি মূল্য এতটুকু,
খরিদ্দারের চোখে যেনো কৃতজ্ঞতা থাকে।”

গালিবকে নিয়ে আমরা যতটুকুই জানি না কেনো, এটা মোটামুটি সর্বজন স্বীকৃত যে তিনি একজন বড় মাপের কবি। গালিবের নিজেরও এ নিয়ে কোনো দ্বিধা ছিলো না। তবে স্বভাবসিদ্ধ তামাশা করতে ভুলবেন কেনো! কবি বলেন –

“হোগা কোয়ি এয়সা ভি কে গালিব কো না জানে,
শায়ের তো ওহ আচ্ছা হ্যায় পার বাদনাম বহত হ্যায়”

যার ভাবার্থ এই দাঁড়ায় যে-
“আছে নাকি এমন কেউ যে গালিবকে চেনে না?
কবি সে মন্দ নয়, তবে তাঁর বদনাম অনেক।”

 

গালিবের মধ্যে ইংরেজ-পূর্ব ভারতবর্ষের ভাবনা আর বয়ানের শেষে অনন্য উচ্চতার ঝলক বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। ১৮৫৭ সালে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বাক্ষী মির্জ গালিব। এ স্বাধীনতা সম্পর্কে তিনি অনেক লেখালিখিও করেছেন।

 

বন্ধু হারানোর শোক ও মানব বিভাজনের আক্ষেপ নিয়ে তিনি এক চিঠিতে লিখছেন – “যখন শহরের দরজা ভাঙ্গা হলো, দুই পক্ষে বিষম লড়াই হলো। দুই দিকে অনেক মানুষ মারা পড়লো। তাদের মধ্যে কেউ ছিলো আমার বন্ধু, কেউ অনুরাগী, কেউ নিতান্ত পরিচিত সুখ দুঃখের সাথী। হায়! আর কি কখনো তাদের দেখা পাবো! লোকে বলে কেয়ামতের দিনে সব মৃতের পরস্পর দেখা হবে সে দেখাও কী ছাই দেখা! সেখানে তো সব আলাদা আলাদা দাঁড়াবে। শিয়া এক কাতারে, সুন্নি আরেক,পাপীরা এক কাতারে তো পূণ্যবানেরা আরেক কাতারে। আমার তো সবার মধ্যেই বন্ধু ছিলো!”

 

 

গালিব পড়তে গেলে যেনো শিরদাঁড়ায় এক ঝনঝন শব্দ শোনা যায়। মানুষের জীবনের অর্থ বা লক্ষ্য কী? এই প্রশ্ন মানুষের বিবেক কোনো না কোনোভাবে করতে বাধ্য। গালিব এই বড় প্রশ্নগুলোর কী সরলভাবে বয়ান হাজির করে গেছেন। কবি বলেন –

“জাব কে তুঝ বিন নেহি কোয়ি মওজুদ ফির ইয়ে হাঙ্গামা আয় খোদা কেয়া হ্যায়”
“তুমি ছাড়া যদি আর কিছু না-ই থাকে তাহলে হে খোদা! এই কোলাহল কীসের!”

 

এই কোলাহল তো আমাদের চারপাশের বহমান জীবনের। এখানে আমাদের তো জীবন কাটাতে হয় অতি ক্ষুদ্র সব চাওয়া আর না- পাওয়ার বোঝাপড়ায়। খোদা ছাড়া আর কিছু যদি না-ই থাকে, তবে এই জীবনের এতো কোলাহল কীসের?একে যে আর অস্বীকার করা যাচ্ছে না। এই কোলাহলের জীবনের অর্থ কী? জগতের বিশাল অচেতন আলোড়নে এর মূল্য কী? গালিব এই জীবনকে গভীরভাবে নেওয়ার পথ কেটে গেছেন। তার অর্ধশতাব্দী পর আল্লামা ইকবাল এর জের টেনে খোদ খোদাকেই অপেক্ষা করতে বলেছেন-

“বাগে বেহিশত সে মুঝে হুকুমে সফর দিয়া থা কিঁউ,

কারে জাহাঁ দারাজ হ্যায় আব মেরা ইনতেযার কার”

 “স্বর্গের বাগান থেকে আমাকে বের হয়ে যেতে হুকুম দিয়েছিলে কেনো?

পৃথিবীতে আমার অনেক কাজ, এখন অপেক্ষা করো আমার।”

 

কবিতার ইতিহাসের বিচারেও মির্জা কে দেখা দরকার।গালিব উর্দু কবিতাকে সংস্কৃতির মান দিয়েছেন। আর সংস্কৃতিকে কবিতা বানিয়ে দিয়েছেন। সেই সংস্কৃতি, যা মোঘল শাসনের কয়েকশতো বছরের অর্জন।ড.আব্দুর রহমান বিজনোরি তার ‘মুহাসিনে কালামে গালিব’ বই এ বলেছেন –

“হিন্দুস্থানে দুটো গ্রন্থ অবতীর্ণ হয়েছে প্রথমটি বেদ আর দ্বিতীয়টি দিওয়ান-ই-গালিব।”

 

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৯ সালে এ মহান সাহিত্যিকের প্রয়াণ ঘটে।

প্রিয় মির্জা! আপনি আমাদের মতোই এক অনিশ্চিত দীর্ণ জীবন কাটিয়েছেন। আপনি যেনো আমাদের হয়েই জীবনকে দেখেছেন তাই তো আমরা আমাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি আপনার কবিতায় খুঁজে পাই।পরিশেষে কবির ভাষায় এই বলে শেষ করতে চাই-

দিল- এ নাদাঁ তুঝে হুয়া কেয়া হ্যাঁ
আখির ইস দারদ কা দাওয়া কেয়া হ্যাঁ
হাম হ্যাঁ মুশতাক আওর ওহ বেজার
ইয়া ইলাহী ইয়ে মাজরা কেয়া হ্যাঁ

হে অবুঝ হৃদয়! তোর কী হয়েছে
আসলে এই রোগের চিকিৎসা কী!
আমার মধ্যে আছে পাগলামো আর সে নির্লিপ্ত
হে খোদা! এ কেমন অবস্থা!

 

লেখক: শিক্ষার্থী,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।