ঢাকা, বুধবার ২৪শে নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৮ই রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি

মা ও নারীজাতি: নবীজীর দীক্ষা


প্রকাশিত: ১২:৪৯ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

 লিখেছেন আরজু আহমেদ

পরিণত বয়সে স্বীয় মাতৃসেবার কোনও সুযোগ রাসূল ﷺ পান নি। কিন্তু মাতৃসম তিন নারী ছুয়াইবা, হালিমা ও উম্মে আয়মান রা. এর অতুলনীয় সেবার মাধ্যমে তিনি আমাদের জন্য মাতৃসেবার প্রায়োগিক শিক্ষা রেখে গিয়েছেন৷

ছুয়াইবা রা. তাঁর প্রথম দুধ মা৷ ছিলেন আবু লাহাবের দাসী৷ আবু লাহাব তাকে মুক্তিও দিয়েছিলো রাসূল ﷺ এর জন্মসংবাদ প্রদান করার কারণে৷ হালিমা রা. এর পরিচয় তো সুবিদিত৷ জন্ম পরবর্তী দীর্ঘ সময় রাসূল ﷺ তাঁর কাছেই লালিত পালিত হয়ে ছিলেন৷ রাসূলের দুধমাতা বললে আমাদের স্মৃতিপটে তাঁর নামখানিই সর্বাগ্রে ভেসে ওঠে৷ আর উম্মে আয়মান রা. মা আমেনার ইন্তেকালের পর থেকে রাসূল ﷺ কে মাতৃস্নেহের আচলে বেধে রেখেছিলেন আমৃত্যু৷ এমনকী খাদিজা রা. এর সাথে বিবাহ কর্মে তিনিই মায়ের ভূমিকা পালন করেছিলেন৷

• তাদের সাথে কেমন ছিলো রাসূল ﷺ এর আচরণ

ছুয়াইবা রা. দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন, দুগ্ধপানের বিনিময় হিসেবে এটা ছিলো অনেক বেশী। তবুও রাসূল ﷺ তাঁকে সম্মান করতেন। অর্থ ও বস্ত্র হাদিয়া হিসেবে প্রেরণ করতেন নিয়মিত। খোঁজ রাখতেন। প্রয়োজন পূরণ করতেন।

তাঁর প্রথমা স্ত্রী খাদিজা রা. নিজে আরবের সবচে’ সম্ভ্রান্ত ও ধনী মহিলা হয়েও একজন আজাদকৃত সেই দাসীর খিদমতে হাজির হতেন। ছুয়াইবা রা. মারা যান ৭ম হিজরীতে। তাঁর পুত্র তাঁর আগেই মারা যান।

তাঁর মৃত্যুতে রাসুল ﷺ ব্যথিত হন। খোঁজ করতে শুরু করেন তাঁর আর কোনও স্বজন আছে কী না। যাতে এই মাতৃসুলভ সম্পর্কের স্বীকৃতি তিনি বজায় রাখতে পারেন। যদিও তাঁর আর কোনও আত্মীয় খুঁজে পাওয়া যায় নি।

উম্মে আয়মান রা.কেও আযাদ করা হয়েছিল। রাসূল ﷺ তাঁকে নিজের মা বলতেন। এমনকি একবার তাকে ‘একমাত্র অবশিষ্ট পরিবার’ বলেও অভিহিত করেছিলেন। রাসূল ﷺ তাঁর যাবতীয় উপার্জনের একটা অংশ তাঁর খিদমতে পেশ করতেন।

রাসুল ﷺ তাঁর আরেক দুধমাতা হালিমাকেও কখনো ভুলেন নি। সুযোগ পেলেই তাঁর খিদমতে হাজির হয়ে যেতেন। একবার সমগ্র আরব দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হলো। হালিমা তখন মক্কায় আসলেন, যুবক মোহাম্মদ ﷺ নিজের স্বচ্ছলতা না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে চল্লিশটা বকরী ও একটা উটনী প্রদান করেন।

তাঁর নবুওয়তকালে হালিমা রা. যখনই তাঁর কাছে আসতেন রাসূল ﷺ নিজ দরবার থেকে উঠে দাঁড়াতেন, এগিয়ে আনতে যেতেন আর বলতে থাকতেন থাকতেন, ‘আমার আম্মা, আমার আম্মা…’।

নিজে হাত ধরে তাঁকে ভেতরে আনতেন। নিজের গায়ের মোবারক চাদর বিছিয়ে দিয়ে এর উপর বসতে দিতেন। হুনায়নের যুদ্ধে হাওয়াযিন গোত্রের এক হাজার যুদ্ধবন্দীকে বিনা মুক্তিপণে রাসুল ﷺ ক্ষমা করে দেন। কেবল হালিমা রা. এর সাথে এই গোত্রের সম্পর্কের সম্মানে। অথচ তিনি চাইলে লক্ষ লক্ষ মুদ্রা মুক্তিপণ হিসেবে আদায় করতে পারতেন। কিন্তু দুধ মাতার সম্মানে সেসব ত্যাগ করেছেন। উম্মতকে মাতৃজাতির মর্যাদা শিখিয়েছেন।

তাঁর নিজের মা বেঁচে ছিলেন না, দুধমাতাকে সম্মান করে উম্মতকে শিক্ষা দিয়েছেন মাতৃসম্মান কেমন করে প্রদর্শন করতে হয়। রাসূল ﷺ নিজের গায়ের জামা খুলে দুধমাতাকে বসতে দিয়েছেন। আমরা আমাদের মায়েদের কতখানি সম্মান করি?

রাসূল ﷺ নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত হাজারো বন্দি শত্রুকে বিনা মুক্তিপণে ক্ষমা করে শিখিয়েছেন- আমাদের পেশাগত, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক ব্যস্ততা, টাকাকড়ির নেশা যেন মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।

যেনো মাকে সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি করার অযুহাত হয়ে না উঠে এসব। মায়ের সেবা গ্রহণ করা নয় বরং আমরা তাঁর সেবা করবো। আমাদের কাপড় আমাদের মায়েরা কেন কাঁচবেন? বরং আমরা তাঁর কাপড় কাঁচবো৷ তাঁর পাতে ভাত তুলে দেবো, মুখে তুলে দেবো।

রাসুল ﷺ তো আসমান ও জমিনে সমস্ত সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও নিজের দুগ্ধমাতাকে নিজের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। এরচে বেশি আর কাউকে সম্মান করেন নি।

আমাদেরকেও শিক্ষা দিয়েছেন, আল্লাহর আরশের নিচে মায়ের থেকে বেশী সম্মান আর ইজ্জত কারো পাবার অধিকার নেই। কেবলই দিবসী উদযাপন নয়- বরং যাপিত জীবনে মায়েরা থাকুন যথাযথ স্থানে।

আমার নেতা, আমার প্রধানমন্ত্রী, আমার রাষ্ট্রপতি, আমার অফিসের বস, আমার শায়েখ; তাদের প্রত্যেকের চেয়ে বেশি সম্মানিত আমার মা। মা থাকবেন ব্যক্তিগত ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে সবার উপরে৷ এটা সেই প্রিসিডেন্স যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ আমাদের জন্য প্রণয়ন করে গেছেন।

তাই মায়েদের, জগতের সব নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই। ইবনুল ক্বাইয়্যিম রহ. বলতেন, ‘নারীরা পৃথিবীর অর্ধেক। বাকি অর্ধেকের জন্মও তাঁরাই দেন। ফলত যেন তাঁরাই সমগ্র পৃথিবী।’