মারমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জীবনধারা ( প্রথম পর্ব)

আমজাদ হোসাইন

প্রকাশিত: ৯:২৩ অপরাহ্ণ, মে ৩০, ২০২০

 

 পার্বত্য চট্টগ্রামে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে উপজাতিদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মারমারা ৷ বাংলাদেশ সরকারের ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারি রিপাের্ট অনুযায়ী এখানে মারমাদের জনসংখ্যা ছিল ১,৪২,৩৩৪ জন।  পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যেও কয়েক হাজার মারমা উপজাতীয় লােক রয়েছে।

নাম ও নৃ-তাত্ত্বিক পরিচিতিঃ-

স্যার এ.পি. ফেইরী  এর মতে- বর্মীরা নিজেদের নামের বানান Mramma (ম্রাম্মা) লিখে। “মারমা শব্দটি ম্রাইমা শব্দ থেকে উদ্ভূত ৷”  প্রকৃতপক্ষে ভাষা, ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বর্মী ও আরাকানীদের সাথে মারমাদের গভীর সাদৃশ্য ও ঐতিহাসিক যােগসূত্র রয়েছে। অতীতে মারমারা মায়ানমার থেকে আরাকান হয়ে এই অঞ্চলে এসেছিলো। তবে তারা কখন এই অঞ্চলে আসে সে সম্পর্কে গবেষণা ব্যতীত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

পূর্বে ‘মারমা’ এবং ‘রাখাইন উভয় জনগােষ্ঠীই বাঙালি ও চাকমাদের কাছে ‘মগ এবং ত্রিপুরাদের কাছে মুখুক’ নামে পরিচিত ছিলো। এ বিষয়ে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকানী রাজসভার বাঙালি কবি দৌলত কাজী তাঁর রচিত “সতী ময়না” কাব্যে আরাকানের রাজবংশকে “মগধ বংশ” বলে গুণগান করেছেন।

এককালে গৌতম বুদ্ধের সময় মগধ রাজ্যটি একটি সভ্য রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিলো। মগধের রাজা বিম্বিসারও গৌতম বুদ্ধের একজন পূজারী ছিলেন। তাই আরাকানের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাজবংশকে এক্ষেত্রে মগধ বংশীয় বলে সম্মান জানানাে হয়েছে বলে মনে হয়। আরাকানী পণ্ডিত সেন থা অং এরও ধারণা-

“হিন্দু ধর্ম উত্থানের সময় মগধ রাজ পরিবারের একটি শাখা চট্টগ্রামে আসে বলে তাদের মধ্যে বিশ্বাস রয়েছে। এটা অস্বাভাবিক নয় যে, ঐ রাজ পরিবার বিহারের রাজ বংশজাত হতে পারে । “তার মতে নিম্নরূপে ‘মগ’ শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে”মগহি>মগই>মগ”।

১৬১৪ খ্রিস্টাব্দে মারমা প্রধান মেঙ স পিউ  আরাকানের অধীনে চট্টগ্রামের গভর্ণর নিযুক্ত হন। ফলে মারমারাও ‘মগ’ নামে পরিচিত হতে থাকেন। আবার অষ্টাদশ শতাব্দীতে চট্টগ্রামী বাঙালিরা চাকমা ও মারমা উভয় জনগােষ্ঠীকে জুম চাষের উপর নির্ভরশীল জনগাষ্ঠী বােঝানাের জন্য জুম্মুয়া বলতাে।

১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই এপ্রিল । বান্দরবানের প্রথম বোমাং রাজা কং হ্লা প্রু-এর সাথে  প্রথম সাক্ষাত হয়  ফ্রান্সিস বুকাননের। এ সময় রাজা কং হ্লা প্রু ফ্রান্সিস বুকাননকে তাদের জনগোষ্ঠীগত পরিচয় মারমা’ (Ma-ra-m) বলেন। তবে বর্মী ও আরাকানীদের কাছে চট্টগ্রাম ও পাট্টিকেরা রাজ্য বহুপূর্ব থেকে পরিচিত ছিল ৷ 

আরাকানী রাজা সুলতইং চন্দ্র ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জয় করেন। আর পাট্টিকেরা (ময়নামতী, কুমিল্লা) রাজ্যের রাজা রণবঙ্কমল্ল হরিকেল দেবের উচ্চপদস্থ বর্মী অফিসার ধাদিয়েবা (Dhadi-eba) একটি বৌদ্ধবিহারকে তাম্রলিপি দিয়ে ভূমি দান করেছিলেন। এ সব, বর্মী ও আরাকানী উপস্থিতিগুলাের সাথে মারমাদের কোন ঐতিহাসিক যােগসূত্র ছিল কিনা সে বিষয়ে গবেষণার ব্যাপারে আরাে অগ্রগতি হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

বােমাং রাজ পরিবার ও তাদের পূর্বপুরুষগণঃ

বান্দরবানের বােমাং রাজপরিবারের পূর্বপুরুষ রাজা বায়িন্নঙ (Bayinnaung ১৫৫১-৮১ খ্রিস্টাব্দ) বার্মার একজন শক্তিশালী ও দিগ্বিজয়ী রাজা ছিলেন। বায়িন্নঙ তাঁর ভগ্নীপতি বর্মীরাজ তবিনশােয়েহতি (১৫৩১-৫০ খ্রিস্টব্দ)-এর মৃত্যুর পর তোঁগু এবং পেগু দখলের পর রাজা হন। তিনি মন (Mon/মোঁয়ে), শান ইত্যাদি  জাতিকে বিভিন্ন যুদ্ধে পরাজিত ও বশীভূত করে বার্মাকে ঐক্যবদ্ধ করেন ।

তাঁর রাজধানী ছিল পেগুড শহরে। সেখানে তাঁর একটি সুন্দর রাজপ্রাসাদ ও দরবারগৃহ ছিল। ভেনিসীয় ভ্রমণকারী কায়েজার ফ্রেডেরিকে ও ইংরেজ ভ্রমণকারী র‍্যালফ্ফিচ পেগুর সৌন্দর্যের উচ্ছসিত প্রশংসা করেছেন।

রাজা বায়িন্নঙের সেনাবাহিনী ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে পেগু থেকে রওনা হয়ে উত্তর থাইল্যান্ডের চিয়েংমাই রাজ্য জয় করে তাদের অধীনে আনে। তাঁর স্বপ্ন ছিল চক্রবর্তী রাজা’ হওয়ার। ‘চক্রবর্তী রাজা’ হতে হলে বুদ্ধধাতু এবং সাদা হাতীর অধীশ্বর হতে হয়। তাই তিনি শ্যামের আয়ুথয়ার রাজা চক্রপতের কাছে এক জোড়া সাদা হাতী তাঁকে দেওয়ার জন্য দাবি করেন ৷ শ্যামের রাজা তার এ দাবি প্রত্যাখ্যান করার কারণে তিনি ১৫৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে আয়ুথিয়া অধিকার করে শ্যামের রাজপরিবার ও সাদা হাতীগুলাে পেণ্ড শহরে নিয়ে আসেন। । এতে প্রায় সমগ্র থাইল্যাণ্ডের উপর তাঁর প্রভুত্ব বিস্তার লাভ করে।

তথ্যসূত্রঃ শেষ পর্বে উল্লেখিত।