ঢাকা, বুধবার ১৬ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২রা আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ৫ই জিলকদ, ১৪৪২ হিজরি

মারমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জীবনধারা ( পঞ্চম ও শেষ পর্ব)


প্রকাশিত: ৭:০৭ অপরাহ্ণ, জুন ২, ২০২০

বিবাহ সংক্রান্ত অনুষ্ঠান

সাধারণত ছেলেদের বয়স আঠার থেকে বিশ বছর হলে এবং মেয়েদের বয়স পনের থেকে ষােল বছর হলে তাদেরকে বিয়ের উপযুক্ত বলে গণ্য করা হয়। মারমারা বরকে ‘লাংসা’ এবং কনেকে ‘খাম্রাসা বলে। আর.এইচ. এস. হাচিনসন মারমাদের উচ্চশ্রেণীর মধ্যে বিবাহের যে সব রীতিনীতি প্রচলিত ছিল তার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন ৷ তার বর্ণনা থেকে মারমাদের প্রচলিত বিবাহের রীতিনীতিগুলাে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলাে;

সাধারণত ছেলের বাবা-মা ছেলের পছন্দ করা মেয়েকে পুত্রবধূ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। ছেলের পিতা-মাতা প্রথমে তাদের কোন ঘনিষ্ঠ পুরুষ আত্মীয় বা বন্ধুকে মেয়ের বাবা-মার কাছে তাদের মতামত জানার জন্য পাঠায়। তখন মেয়ের বাবা-মা এ বিষয়ে তাদের হ্যাঁ সূচক সম্মতি প্রকাশ করলে ছেলের পিতা-মাতা বেজোড় সংখ্যক পুরুষ আত্মীয়কে এক বােতল মদসহ মেয়ের বাড়িতে আরাে একদিন পাঠায়। তারা এবার গিয়ে বিয়ের দিনক্ষণ ধার্য করার ব্যাপারে আলােচনার জন্য নির্দিষ্ট একটি দিন ঠিক করে আসে। পরবর্তী যাত্রায় ছেলেপক্ষ তাদের সাথে সিদ্ধ করা মুরগী, আলু, শুটকী ইত্যাদিসহ মেয়ের বাবা-মার কাছে যায়। সেখানে তারা মেয়ের বাবা-মা ও অভিভাবকদের সাথে বিয়ের দিনক্ষণ, কনেকে প্রদানযোগ্য অলংকার, পােশাক-পরিচ্ছদ ও অন্যান্য বিষয়াদি ঠিক করে। বিয়ের দু’দিন পূর্বে বরের বাবা তাদের বাড়িতে গৃহদেবতাদের উদ্দেশ্যে চুং-মং-লে পূজার আয়ােজন করে। উক্ত পূজায় দেবতাদের উদ্দেশ্যে একটি শূকর ও পাঁচটি মােরগ-মুরগী বলি দেওয়া হয়।

 

এদিকে বিয়ের অনুষ্ঠানের কয়েকদিন পূর্বে কনের বাবা বরের গ্রামে বসবাসকারী তার আত্মীয়দের নামের একটি তালিকা বরের বাবার কাছে পাঠায়। রীতি অনুযায়ী বরপক্ষকে তাদের গ্রামে বসবাসকারী কনের আত্মীদের কাছে পরিবার পিছু এক বােতল মদ, একটি সিদ্ধ করা মুরগী একটি (রৌপ্য) টাকা পাঠাতে হয়। অবশ্য ঐ টাকাটি কেবল প্রথা পালনের জন্য পাঠানাে হয়। কারণ কনের আত্মীয়েরা ঐ টাকা ফেরত দেয়। ফলে ঐ টাকাটি কেবল কনের আত্মীয়দের হাত ঘুরে পুনঃরায় বরের বাড়িতে ফেরত আসে। ঐদিকে কনের গ্রামের যুবকেরা সেখানে কনের বাড়ির সম্মুখে একটি সুবিধাজনক স্থানে বরের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য একটি বিশ্রামাগার তৈরি করে। বর বিয়ের দুদিন পূর্বে তার সঙ্গীদের নিয়ে সেখানে গিয়ে বিশ্রাম নেয় এবং সেখান থেকে কনের গ্রামে বসবাসকারী কনের আত্মীয়স্বজনদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করে আসে।

 

পরদিনও বর একই ধরণের সাক্ষাতে ব্যস্ত থাকে। বিয়ের দিন বরযাত্রীরা রীতি অনুযায়ী শুভক্ষণে কনের বাড়িতে রওনা হয়। সেখানে বর যখন কনের বাড়িতে প্রবেশ করতে যায় তখন কনের ঘনিষ্ঠ কোন আত্মীয় তাকে বাধা দেওয়ার ভান করে। বর সে বাধা অতিক্রম করে আরাে অগ্রসর হতে চাইলে এবার কনের কোন ভাই সম্পর্কীয় আত্মীয় পুনরায় বরকে জোরালােভাবে বাধা দেওয়ার ভান করে। এরপর বর সকল বাধা অতিক্রম করলে তখন কনের ভাই সম্পর্কীয় কোন আত্মীয় তার হাত ধরে তাকে বিয়ের আসরে সাদরে পৌছে দেয়। সেখানে একটি পাটি বিছানাে থাকে। এর এক প্রান্তে আধা মণের মত ধান, তার দুদিকে জলপূর্ণ পাত্র এবং সেগুলাের মুখে আম পাতা, ফুল ইত্যাদি গুঁজা থাকে।

 

উল্লেখ্য যে, জলপূর্ণ পাত্রগুলোর গলায় সাদা সূতাগাছি প্যাঁচানাে থাকে। একটি প্লেটে বিনি চালের ভাত ও একটি পাত্রে বিনি ধানের খৈ রাখা হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানের সময় বরের বাম পাশে কনেকে বসানাে হয়। বিবাহ ক্রিয়া জনৈক “উবদিদাই’ (বিবাহের মন্ত্র জানা ব্যক্তি) কর্তৃক পরিচালিত হয়। তিনি বিয়ের সময় জলপূর্ণ পাত্র থেকে এক গুচ্ছ আমপাতা পবিত্র জলে ডুবিয়ে তা দিয়ে বর ও কনের শিরে ৫/৭ বার পবিত্র জল ছিটিয়ে দেন। বিয়ের অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত পর্যায়ে কনের ডান হাতের কড়ে আঙ্গুলের সাথে বরের বাম হাতের কড়ে আঙ্গুলটি যুক্ত করে তাতেও পবিত্র জল ছিটানাে হয়। এরপর দুটি প্লেটে তাদের জন্য খাবার আনা হয়।

 

তবে ঐ দুটি প্লেটের খাবার একত্রিত করে একটি প্লেটে রাখা হয় এবং বর ও কনে তা থেকে খাবার গ্রহণ করে। এতে তারা সমাজে স্বামী-স্ত্রী রূপে স্বীকৃতি লাভ করে। তাদের গুরুজনেরা তাদেরকে আশীর্বাদ করে এবং সঙ্গী সাথীরা তাদেরকে অভিনন্দন জানায়। অতঃপর অতিথিরা সবাই আনন্দের সাথে ভােজে অংশগ্রহণ করে। উল্লেখ্য যে, বরযাত্রী গিয়ে কনেকে বরের বাড়িতে এনেও বিয়ের অনুষ্ঠান করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বরের বাড়ি থেকে যথারীতি বরযাত্রীরা কনের বাড়িতে যায় এবং সেখান থেকে কনেকে নিয়ে বরের বাড়িতে ফিরে আসে। ঐ দিন লাংশা (বর) এবং খাম্রাশা (কনে)-কে পৃথক পৃথক কক্ষে রাখা হয়। পরদিন ভােরে বিবাহ ক্রিয়া সম্পন্ন হয় ।

 

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

মারমা সমাজে কারাের মৃত্যু হলে প্রথমে আত্মীয়-স্বজনদেরকে তার মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়। মৃতকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানাে হয়। বৌদ্ধ ভিক্ষুদেরকে এনে তার আত্মার সদগতি কামনা করে ধর্মীয় সূত্র পাঠ করানাে হয়। মূতের আত্মীয়-স্বজনেরা তার আত্মার সদগতি কামনা করে সাধ্যমত দান করে। মৃতকে সাধারণত দাহ করা হয়। মৃত ব্যক্তি পুরুষ হলে চিতায় তিন স্তর লাকড়ি এবং স্ত্রীলােক হলে চার স্তর লাকড়ি দেওয়া হয়। মৃতের শির উত্তর দিকে রেখে তাকে চিতায় তােলা হয়। অতঃপর নিকটস্থ কোন আত্মীয় এসে তাতে প্রথমে অগ্নিসংযােগ করে। তৎপরে একে একে অন্যান্য আত্মীয় ও প্রতিবেশীরা তাতে অগ্নি সংযােগ করে। পরদিন সেখান থেকে তার অস্থি সংগ্রহ করে নতুন মাটির পাত্রে (হাড়িতে) রেখে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

 

সাধারণত মৃতকে দাহ করার সাত দিন পর পুনরায় বৌদ্ধভিক্ষু ডেকে তার আত্মার সদগতির উদ্দেশ্য দান করা হয় এবং ধর্মীয় সূত্র পাঠ করা হয়। মৃত ধনী ব্যক্তি হলে তাকে দাহ করার পূর্বে তার মরদেহ কফিনে রেখে কাঠের তৈরি রথে তােলা হয়। রথের দুদিকে লম্বা লম্বা রশি বেঁধে দু’দলে রথটিকে টানাটানি করে। এদের মধ্যে একদল স্বর্গপক্ষের অপর দল বিপরীত পক্ষের (নাগরাজ বা যমের দল)। শেষ পর্যন্ত অবশ্য স্বর্গপক্ষেরই জয় হয়। এরপর রথে অগ্নিসংযােগ করে মৃতকে দাহ করে তার আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা গ্রামে ফিরে যায়।

 

মৃত ব্যক্তি যদি বসন্ত, কলেরা ইত্যাদি দুরারােগ্য কোন সংক্রামক ব্যাধিতে মারা যায় সেক্ষেত্রে মারমারা মৃতকে কবর দেয়। এর পরবর্তী কোন এক সময়ে (সাধারণত একমাস বা দুইমাস পরে) অস্থিগুলাে সংগ্রহ করে সেগুলাে যথারীতি দাহ করে। যেখানে মৃতকে দাহ করা হয় তার চিতার চার কোণে চারটি বাঁশ পুঁতে সেগুলোর মাথায় সাদা রঙের দীর্ঘ কাপড় ‘টাংগােন’ উড়িয়ে দেওয়া হয়। আচার-ব্যবহার মারমারা সাধারণত ফুর্তিবাজ, সরল এবং হাসিখুশি প্রকৃতির মানুষ। তাদের মহিলারা সৌন্দর্যপ্রিয় এবং সেজেগুজে থাকতে ভালবাসে। পুরুষেরা বেশ কৌতুকপ্রিয়। পছন্দমত অতিথি এলে তারা খুবই আপ্যায়ন করে। তারা আমন্ত্রিত অতিথিদেরকেসাধ্যমত খানাপিনা দিয়ে আপ্যায়ন করে। এমনিতেও গ্রাম দেশে যে কোন অতিথি মারমাদের বাড়িতে গেলে তারা তাকে পান-সুপারি ইত্যাদি দিয়ে আপ্যায়ন করে।

 

সাঁংগ্রাই উৎসব

মারমারা বর্ষকে বিদায় ও বর্ষবরণ উপলক্ষে সাঁংগ্রাই উৎসব উদযাপন করে। এ সময় তাদের মধ্যে ‘পানিখেলা’ বা ‘জলােৎসব’ (Water festival) অনুষ্ঠিত হয় । এই উৎসবে নির্দিষ্ট পানিখেলার স্থানে নৌকা বা বড় বড় পাত্রে জল রাখা হয়। তাতে সুসজ্জিত তরুণী বা যুবতীরা প্রতীক্ষায় থাকে। তরুণ ও যুবকেরা দলে দলে জলের পাত্রসহ পানি খেলা স্থানে তরুণী বা যুবতীদের দেহে জল ছিটায়; তখন তরুণী ও যুবতীরাও তাদের সাড়া দিয়ে তরুণ ও যুবকদের প্রতি জল ছিটায়। এতে পানি খেলা উৎসব হাসি আনন্দে ও কলকাকলীতে মুখরিত হয়ে ওঠে। বান্দরবান শহরে ও রাঙ্গামাটিতে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই উৎসব বেশ আনন্দ উৎসাহের সাথে উদযাপিত হয়ে থাকে।

 

তথ্য নির্দেশঃ

সুগত চাকমাঃ বাংলাদেশের উপজাতি ও আদিবাসিদের সমাজ, সংস্কৃতি ও আচার ব্যবহার

অংসুই মারমাঃ মারমাদের বিবাহের রীতিনীতি

আব্দুল মাবুদ খানঃ বান্দরবানের রাজপরিবারের ইতিবৃত্ত।

আব্দুল হক চৌধুরীঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা উপজাতি।

ক্য শৈ প্রুঃ মারমা উপজাতি পরিচিতি

Hutchisnson,R.H.S:  Chittagong Hill Tracts District Gazetteer

Hunter, W.W: A Statistical account of Bengal.