মারমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জীবনধারা ( চতুর্থ পর্ব)

আমজাদ হোসাইন

প্রকাশিত: ৮:০১ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

পারিবারিক কাঠামাে

মারমা পরিবারে পিতার স্থান সর্বোচ্চে হলেও পারিবারিক কাজকর্মে মাতা উল্লেখযােগ্য ভূমিকা পালন করে। উল্লেখ্য যে, মারমা মহিলারা অত্যন্ত কর্মঠ। তারা কৃষিকাজ ও তাঁতের কাজে দক্ষ। এমনকি তাদের কেউ কেউ ছােটখাটো ব্যবসাও করে থাকে। এ কারণে কোন বিষয়ে পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাদের মতামতের বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সামাজিক জীবনে মহিলাদের গুরুত্বের কারণে মারমা সমাজে খালাতাে ভাইবােনদের মধ্যে বিবাহ পর্যন্ত নিষিদ্ধ। পরিবারে পিতামাতার পরে ছেলেমেয়েদের স্থান।

 

গ্রাম ও বাসগৃহ

মারমারা চাকমাদের মত নদীর তীরে তাদের গ্রামগুলাে নির্মাণ করে। তবে তুলনামূলক মারমারা চাকমাদের চেয়ে অধিকতর সমতল স্থানে তাদের গ্রামগুলাে নির্মাণ করে। তারা সাধারণত চার থেকে ছয় ফুট উঁচু প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে তার উপর একদিকে শােবার ঘর, মধ্যে জল রাখার খােলা মাচান, অপর দিকে পাকঘর, লাকড়ি ঘর ইত্যাদি তৈরি করে। তাদের বাড়িতে খােলা মাচানে ওঠার জন্য কাঠের তৈরি সাঁকো থাকে। উল্লেখ্য যে, অনেকের খােলা মাচানে পা ধােয়ার জন্য গাছের তৈরি পাত্রে জল থাকে।

 

ধর্ম

মারমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, তারা নিষ্ঠার সাথে বিভিন্ন বৌদ্ধ অনুষ্ঠানাদি উদযাপন করে। বিভিন্ন ধর্মীয় কাজে তারা তাদের সাধ্য অনুযায়ী দানও করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় প্রত্যেকটি মারমা গ্রামে বৌদ্ধবিহার ক্যাং এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু ‘ভান্তে’-দের দেখা যায়। তারা বৌদ্ধভিক্ষুদেরকে আহার দান করে। মারমারা বৈশাখী পূর্ণিমা, আশ্বিনী পৃর্ণিমা, কার্তিকী পূর্ণিমা, মাঘী পূর্ণিমা ইত্যাদি বিভিন্ন পূর্ণিমা দিবসগুলোতে বৌদ্ধমন্দিরে গিয়ে ফুল দিয়ে এবং প্রদীপ জ্বালিয়ে বুদ্ধকে পূজা করে। তাদের ভাষায় বুদ্ধ শব্দের প্রতিশব্দ হলাে “ফ্রা”। পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ের অনতীদূরে চন্দ্রঘােনার সন্নিকটে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ‘চিৎমরম বৌদ্ধবিহারটি এতদঅঞ্চলে মারমাদের নির্মিত একটি খুবই সুন্দর বৌদ্ধবিহার ও তীর্থস্থান।

 

পােশাক-পরিচ্ছদ ও বস্ত্রশিল্প

মারমা পুরুষেরা মাথায় ‘গমবং (পাগড়ী বিশেষ), গায়ে জামা এবং নিম্নাঙ্গে লুঞ্জি (লুঙ্গী) পরে। তাদের মহিলারা গায়ে যে ব্লাউজ পরে এর নাম ‘আঞ্জি’, আর তারা নিম্নাঙ্গে যে স্কার্ট পরে তা ‘থামি’ হিসেবে অনেকের কাছে পরিচিত; এগুলাে নানা বর্ণের ও ডিজাইনের হয়ে থাকে। এগুলাের কোন কোন ডিজাইনে নানা ফুলের নকশা থাকে। এজন্য এগুলােকে অত্যন্ত বর্ণাঢ্য ও আকর্ষণীয় মনে হয়। বয়নের কাজে মারমা মহিলাদের দক্ষতা রয়েছে। তাদের মধ্যে হস্তচালিত তাঁত ও কোমরতাঁত, উভয় ধরণের তাঁতের ব্যবহার রয়েছে। তারা অনেকে এসব তাঁতে ভালো ভালো কাপড় তৈরি করে বিক্রি করে।

 

খাদ্যাভাস

মারমারা এখানকার অন্যান্য উপজাতীয়দের মত ভাতের সাথে মাছ-মাংস ও নানা ধরণের শাকসবজি খায়। তারা লাউ, টমেটো ইত্যাদি দিয়ে সুস্বাদু স্যুপ তৈরি করে। তাদের অনেকে শুটকী খেতে পছন্দ করে। মাছের গুঁড়াে শুকিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় এক জাতীয় খাদ্য তৈরি হয় একে ‘ঙাঃপি’ বলে। ঙাঃ’ অর্থ মাছ, আর পি। হলাে হলাে গুড়াে।

 

খেলাধূলা

মারমা ছেলেমেয়েরা চাকমা ও ত্রিপুরা ছেলেমেয়েদের মত ‘ঘিলা’ (গিলা) নামক একপ্রকার গােলাকৃতি চ্যাপ্টা ফলের বিচি নিয়ে নানা ধরণের খেলা খেলতে ভালবাসে। তাদের ছেলেদের খেলাগুলাের মধ্যে কুস্তিও অন্যতম। উল্লেখ্য যে, সাধারণত তাদের ছেলেরা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়।

 

শিশুর নামকরণ

কোন মারমা পরিবারে শিশুর জন্ম হলে সে যদি পরিবারের প্রথম সন্তান হয়ে থাকে। তবে তার নামকরণের সময় তার নামে আদ্যাক্ষর হিসেবে উ যুক্ত করা হয়, যেমন :- উ-হা-প্রু, উ-চা-প্রু, উমে ইত্যাদি। আবার সন্তানটি যদি পরিবারে সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান হয়ে থাকে তবে তার নামের অন্ত্যে থুই যুক্ত করা হয় যেমন : অং-সা-থুই, মং-সা-থুই ইত্যাদি।

 

তথ্য নির্দেশঃ

সুগত চাকমাঃ বাংলাদেশের উপজাতি ও আদিবাসিদের সমাজ, সংস্কৃতি ও আচার ব্যবহার

অংসুই মারমাঃ মারমাদের বিবাহের রীতিনীতি

আব্দুল মাবুদ খানঃ বান্দরবানের রাজপরিবারের ইতিবৃত্ত।

আব্দুল হক চৌধুরীঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা উপজাতি।

ক্য শৈ প্রুঃ মারমা উপজাতি পরিচিতি

Hutchisnson,R.H.S:  Chittagong Hill Tracts District Gazetteer

Hunter, W.W: A Statistical account of Bengal.