ঢাকা, শনিবার ২৩শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৬ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৩ হিজরি

মারমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জীবনধারা ( তৃতীয় পর্ব)

আমজাদ হোসাইন


প্রকাশিত: ৭:২৩ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

মঙ রাজ পরিবার

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মানিকছড়িতে মঙ সার্কেলের প্রধান মঙ চীফ বা মঙ রাজার রাজবাড়ি আছে। মঙ রাজপরিবারের সদস্যরাও উপজাতি হিসেবে মারমা উপজাতির লােক। তাদের পরিবারের ইতিহাস নিম্নরূপ— ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে বর্মী রাজ বােধপায়ার সেনাবাহিনী যখন আরাকান দখল করে তখন আরাকান থেকে অনেক লােক কক্সবাজার ও বান্দরবান পার্বত্য জেলার দক্ষিণাংশের দিকে পালিয়ে আসে। ইংরেজদের রেকর্ডপত্র থেকে জানা যায় যে, ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মাত্র তিন বছরে ঐ সব শরণার্থীর সংখ্যা চল্লিশ হাজার ছাড়িয়ে যায়। জনশ্রুতি মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সব শরণার্থীরা এসেছিল তাদের মধ্যে একটি দল জনৈক ম্রাচাই নামক তাদের এক নেতার নেতৃত্বে আরাকানের পলৈংখ্যং নামক নদীর উপত্যকা থেকে এখানে প্রথমে মাতামুহুরী উপত্যকায় আসে। অতঃপর “১৭৮৭ সালে ম্রাচাই-এর মৃত্যু হলে তাঁর পৌত্র সাইলেং প্যালেইংসাদের সর্দার হোন।

১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর অনুগামী ১৮৭ পরিবারের জন্য মোট ১৭৪ টাকা কার্পাস কর প্রদানের শর্তে একটি মহল লাভ করেন। সাইলেং নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র খেদু মহল পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে প্যালেইংসাদের ধাবেং বা সর্দার হোন। তিনি মাতামুহুরী নদী উপত্যকা ত্যাগ করে তাঁর অনুগামীদের সহ রেগুলেশন এলাকায় সীতাকুণ্ড পাহাড়ে চলে আসেন। সেখানে তিনি তাঁর অনুগামীদের বসবাস করার জন্য একটি কার্পাস মহল লাভ করেন। খেদুর পুত্র কুঞ্জধামাই, তিনি পরে এটাকে ক্রমশ পূর্বাভিমুখে সরিয়াছেন। কুঞ্জধামাইর মৃত্যুর পর তার পুত্র ক্যজচাই দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৷

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইংরেজ ডেপুটি কমিশনার ক্যাপ্টেন টি.এইচ. লুইনের সুপারিশ ক্রমে সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তরাংশের ৬৫৩ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে মঙ সার্কেল সৃষ্টি করে তাঁকে মঙ চীফ (মঙ রাজা) করেন। তিনি ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে পরলােক গমন করলে, তৎপুত্র নরবদি (হরচন্দ্র) ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মঙ সার্কেল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর তাঁর বড়বােনের ছেলে নেপ্রুসাই চৌধুরী ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই মে তারিখে মঙ চীফ হিসেবে নিযুক্ত হোন। রাজা নেপ্রুসাই চৌধুরী তাঁর মামাতাে বােন নরবদির দুই কন্যা রাজকুমারী চৌথুই এবং হ্রাম্রাচুকে বিবাহ করেন। তাঁর প্রথম স্ত্রী রাণী চৌথুইয়ের গর্ভে রাজকন্যা হ্লানুমা চৌধুরাণী (কিরণশশী) -এর জন্ম হয়।

পিতার মৃত্যুর পর রাজকুমারী হ্লানুমা চৌধুরাণী সার্কেল প্রধান নিযুক্ত হন। তাঁর স্বামী কং-হা-চাই বান্দরবানের বােমাং রাজপরিবারের সদস্য ছিলেন। মণ্ড রাণী ক্লানুমার মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র মং-প্রু-সাইন মঙ সার্কেলের চীফ নিযুক্ত হন। তিনি চাকমা রাজা ভুবন মােহন রায়ের কন্যা রাজকুমারী নীহারবালাকে বিবাহ করেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি সপরিবারে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

মারমা সমাজ, সংস্কৃতি ও আচার-ব্যবহার

পার্বত্য চট্টগাম অঞ্চলে বােমাং সার্কেলে মারমা সমাজের প্রধান হলেন বােমাং চীফ বা বােমাং রাজা। আবার মঙ সার্কেলে মারমা সমাজের প্রধান হলেন মঙ চীফ বা মঙরাজা। যদিও উভয় চীফই মারমা তথাপি তাঁরা স্ব স্ব সার্কেলের চীফ হিসেবে স্ব স্ব সার্কেলের মারমা সমাজের প্রধান ব্যক্তি। উভয় সার্কেলেই বহু মৌজা রয়েছে। প্রত্যেক মৌজায় একজন করে হেডম্যান রয়েছেন। তাঁরা চীফদের অধীনে থেকে তাদের কাজকর্ম সম্পাদন ও দায়িত্ব পালন করেন। প্রত্যেক মৌজায় কতকগুলাে গ্রাম রয়েছে। গ্রামবাসী মিলে গ্রামের প্রধান নির্বাচন করে। মারমারা গ্রামকে তাদের ভাষায় রােয়া এবং গ্রামের প্রধানকে ‘রােয়াজা বলে। রোয়াজা হেডম্যানের অধীনে থেকে তার কাজকর্ম, দায়িত্ব পালন ও গ্রামকে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। চাকমা ও ত্রিপুরাদের মত মারমা সমাজের কতকগুলাে দল আছে। তবে চাকমা ও ত্রিপুরাদের মধ্যে যে ধরণের গােত্র বা গােষ্ঠী আছে মারমা সমাজে সে রকম কোন গােত্র নেই।

১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সিস বুকানন যখন পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি সরকারি সফরে এসেছিলেন তখন এ সব দলগুলােকে ‘আম্যো (amyo) বলা হতো ৷ উল্লেখ্য যে, ১৬১২ খ্রিস্টব্দে আরাকানের রাজা মাঙরাজাগ্রি দক্ষিণ বার্মার পেগু শহর থেকে আনীত তাঁর রাণী খিংমাহুং-এর অনুরোেধে মারমাদেরকে ১২টি থঙ’-এ বিভক্ত করে বসবাসের সুবিধা প্রদান করেছিলেন। (মংসাথুয়াই হান্টার: ১৮৭৬) লিখেছেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামে এদের মধ্যে ১৫টি দল রয়েছে। এসব দলগুলো যে সব নদীর তীরে বাস করতাে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঐ সব নদীর নামানুসারে তাদের দলগুলাের নামকরণ করা হয়েছিল ।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই এপ্রিল তারিখ তৎকালীন বােমাং রাজা পার্বত্য চট্টগ্রামের অপর দুই রাজা (চীফ) সহ একটি পত্রে বঙ্গীয় সরকারের রাজস্ব বিভাগের সেক্রেটারীকে তাদের সমাজের প্রধান ১২টি দলের নামগুলাে নিম্নরূপ লিখেন: ১. রিগ্রীসা (Regretsa) ২. মারােসা (Marosa) ৩. সাবুকসা (Sabuksa) ৪. কোকদাইনসা (Kokadansa) ৫. ক্যকফ্যাসা (Kyakfyasa) ৬. লংকাদুসা (Longkadusa) ৭. মারীসা (Mareesa) ৮. চিন রাইসা (Chinraisa) ৯. পলংসা (Polongsa) ১০. ওয়ানাইসা (Wanaisa) ১১. কোলুকসা (Koluksa) এবং ১২. টংরােয়াসা (Tongrwasa)।

উল্লেখ্য যে “সা” শব্দের অর্থ সন্তান; এক্ষেত্রে শব্দটি লােক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অতীতে এ সকল লােকেরা তাদের স্ব স্ব গ্রামের রােয়াজা ও মেজার হেডম্যানের মাধ্যমে রাজাদেরকে বার্ষিক চার থেকে আট টাকা পর্যন্ত কর দিতেন। রােয়াজা গ্রামবাসীদের ছােট খাটো বিবাদের মীমাংসা করে দেন। গ্রামের ভিক্ষুগণ, অবিবাহিত ব্যক্তিরা, বিপত্নীক, বিধবা ইত্যাদি লােকেরা রাজাদেরকে কর প্রদানের বাইরে ছিল।