মারমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জীবনধারা ( দ্বিতীয় পর্ব)

আমজাদ হোসাইন

প্রকাশিত: ৭:১০ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

রাজা বায়িন্নঙ তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী চিয়েংমাইয়ের শান রাজপুত্র মেকুতিকে আশ্রয়দানের কারণে তাঁর সেনাবাহিনী লাওসের লুয়াংপ্রবাং রাজ্যের রাজধানী ভিয়েনচাং প্রথম বার দখল করে ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে পেগুতে প্রত্যাবর্তন করে। রাজা বিয়াননঙ ১৫৭১ খ্রিস্টাব্দে পেগুতে জিস্মী হিসেবে রাখা শ্যামের যুবরাজ ফ্রানারেত (পরবর্তীকালে রাজা নরেসুয়েন) কে মুক্তি দিয়ে তাঁর এক বােনকে বিয়ে করেন। রাজা বিয়াননঙ ১৫৭৪-৭৫ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনচাং-এর সিংহাসনে লাওসীয় যুবরাজ (Oupahat)-কে বসিয়েছিলেন। তিনি ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে পরলােক গমন করেন।

রাজা বায়িন্নঙের মৃত্যুর পর তৎপুত্র ন্যানদা বায়িং পেগুর সিংহাসনে আরােহণ করেন। তাঁর সময়ে আভা, প্রােম, তৌঁগুর ও চিয়েংমাইয়ের ভাইসরয়রা তাঁর আত্মীয় ছিলেন। তাঁর এক চাচা আভার ভাইসরয় থাদোমিনসাউ তাঁর বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধের সূচনা করলে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি তাঁকে হাতীতে চড়ে দ্বৈতযুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করেন।

ইতােমধ্যে শ্যামের রাজা ফ্রানারেত স্বাধীনতা ঘােষণা করলে ১৫৮৭ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত তাঁর প্রেরিত তিনটি বর্মী অভিযান আয়ুথিয়া অধিকার করা সত্ত্বেও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে ব্যর্থ হয়। ১৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে চিয়েংমাই তাঁর হাতছাড়া হয়। এভাবে অনবরত যুদ্ধের ফলে এবং রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার কারণে পেগু রাজ্য দুর্বল হতে হতে শেষ পর্যন্ত ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে আবার গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হয়। এ সময় তৌগুর রাজা আরাকানীদেরকে যৌথভাবে পেগুড আক্রমণে আমন্ত্রণ জানান। আরাকান রাজ মাঙরাজাগ্রি (১৫৯৩-১৬১২ খ্রিস্টাব্দ) সে সুযােগ গ্রহণ করেন। ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী স্থলসৈন্যদের নিয়ে নৌপথে পেগুড পৌঁছে তৌগুর সৈন্যদের সাথে যৌথভাবে আক্রমণ চালিয়ে পেগু অধিকার ও ধ্বংস করে।

যুদ্ধজয়ের পর তৌগুর বাহিনী পেগু থেকে একটি বুদ্ধদন্ত ও পেগুর রাজা ন্যানদাবায়িংকে লাভ করে। আর আরাকানীরা তাদের ভাগে পেগুর এক রাজকুমারী ও রাজকীয় সাদা হাতীটি পায়। তৌগুতে পৌঁছার পর ন্যানদাবায়িংকে হত্যা করা হয়। (হল ১৯৮১ : ৩০০)। অপরপক্ষে আরাকান রাজা তাঁর সুন্দরী বন্দী (রাজকন্যার) প্রতি মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিয়ে করেন এবং তাঁর শ্যালক (পেগুর রাজপুত্র)-কে ১৬১৪ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের গভর্নর পদে নিযুক্ত করেন । পেগুর এই রাজপুত্রের নাম ছিল মেঙ স পিউ। আরাকান রাজা মেঙখামং (১৬১২-২২ খ্রিস্টাব্দ) তাঁকে “বােমাং উপাধি দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, আজকের বান্দরবানের বােমাং রাজপরিবারের লােকেরা পেগুর রাজপুত্র মেঙ স পিউ-এর বংশধর। পর্তুগীজ সূত্র থেকে ন্যানদাবায়িং-এর কন্যা পেগুর রাজকুমারীর নাম ‘ক্ষেনানঙ’ পাওয়া যায়। । আসলে তাঁর নাম ছিল খিংমাহ্নং (সাই-ড-হনং)।

রাজকুমারী খিংমাহ্নং-এর মা বংশের দিক থেকে শ্যামের রাজকন্যা ছিলেন। তাঁর অনুরােধে ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে আরাকান রাজা মাঙরাজাগ্রি পেগু থেকে আনীত লোকদেরকে ১২টি ‘থং’-এ একত্রিত করে রাখার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। এতে তারা বিভিন্ন বিষয়ে পূর্বাপেক্ষা কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় বসবাসের সুযােগ পেয়েছিল। ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগীজ পাদ্রী ম্যানরিক চট্টগ্রামের দেয়াং থেকে রামু হয়ে আরাকানের রাজধানী মাউকউ (শ্রোহং) পর্যন্ত গিয়েছিলেন। ঐ সময় সেখানে অবস্থান কালে পেগুর রাজকুমারী খিনমাহ্নং-এর সাথেও সাক্ষাৎ করার সুযােগ পেয়েছিলেন। বােমাং রাজাদের যে বংশ তালিকা তাঁর লিখিত বান্দরবনের রাজ-পরিবারের ইতিবৃত্ত প্রবন্ধে প্রদান করেছেন তাতে মেঙ-স-পিউ (১৫৯৯-১৬৩০ খ্রিস্টাব্দ) তৎপরে তৎপুত্র মেওরাই প্রু ওরফে পালাই প্রু (১৬৩০-৬৫ খ্রিস্টাব্দ), অতপর তৎপুত্র হরি প্রু (১৬৬৫-৮৭ খ্রিস্টাব্দ) এবং তৎপরে তৎ ভ্রাতৃষ্পুত্র হরিঞো (১৬৮৭-১৭২৭ খ্রিস্টাব্দ) মারমাদের রাজা হন বলে লিখেছেন।

হাচিনসন (১৯০৯) তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন যে,”তিন পুরুষ পরে Angunya -এর পুত্র হারিও (Hario) চট্টগ্রামের গভর্ণর হন। তিনি ১৭১০ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের রাজা (চান্দা) উজিয়ার সাথে সাক্ষাত করেন এবং তাঁর কাছ থেকে ‘বােমাংগ্রি উপাধি লাভ করেন।” অতঃপর তৎ দৌহিত্র কং-হ্লা-প্রু রাজা হন। প্রকৃতপক্ষে তিনিই ছিলেন বান্দরবানের প্রথম বােমাং রাজা। আবদুল মাবুদ খান (১৯৮৩)-এর মতে কং-হ্লা-প্রুর রাজত্বকাল হলাে ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে যখন বােমাং রাজা কং-হ্লা-প্রুর সাথে ফ্রান্সিস বুকাননের সাক্ষাৎ হয় তখন তাঁর বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছরের মত ছিল বলে বুকাননের মনে হয়েছিল। বান্দরবান শহরের অনতীদূরে সােয়ালক নদীর পূর্ব তীরে কাঠের তৈরি তাঁর একটি সুন্দর রাজবাড়ি ছিল। তাতে চেয়ার, কার্পেট, বিছানা, ম্যাট এবং আসবাব পত্র ছিল। তাঁর তিন রাণী, ছয় পুত্র ও ছয় কন্যা ছিল। তারাও বিবাহিত ছিল। প্রচুর সংখ্যক চাকর-চাকরাণী তাদের সেবায় নিয়ােজিত ছিল। বােমাং রাজা কং-হ্লা-প্রু যথেষ্ট ধনী ব্যক্তি ছিলেন। (আকৃতির দিক থেকে) তিনি (কিছুটা) ছােট, শক্তিশালী এবং ভদ্র ছিলেন । তাঁর রাজবাড়ির নিকটে ৪০ বা ৫০টি বাড়ি নিয়ে একটি গ্রামে বৌদ্ধবিহার ছিল। তাতে বৌদ্ধভিক্ষুরা ছাত্রদেরকে শিক্ষা দিতেন ৷

ঐ গ্রামটি প্রায় ৪০ বছর পূর্বে গঠিত হয়েছিল বলে। ঐ সময়ে ফ্রান্সিস বুকানন শুনেছিলেন। হাচিনসন (১৯০৯) -এর মতে “মােগলেরা ১৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দে। বােমাং রাজা কং-হা-প্রু-কে আরাকানে তাড়িয়েছিল। তিনি ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে আরাকান। রাজদরবারের অত্যাচারের ফলে (বৃহত্তর) চট্টগ্রামে প্রত্যাবর্তন করে তাঁর অনুসারীদের। নিয়ে (বর্তমান কক্সবাজার জেলার) রামু, ঈদগড় ও মাতামুহুরী নদীর তীরে নিজেকে। প্রতিষ্ঠা করেন।” ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে ঐ সব অঞ্চলে যে সব জমিদারীগুলাের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল তাতে রামু, চকোরিয়া ও সাতকানিয়া এলাকায় কমলা ফ্রু  -এর নামে জমিদারী ছিল। তখন তাঁর ছেলে সাথাং প্রু (সেতুং ফ্রু)-এর অধীনে ঐ জামিদারী ছিল ।

উল্লেখ্য যে, ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ‘Kumla Pru’  ইংরেজদেরকে ৭০৩ টাকা খাজনা দিয়েছিলেন। (এ. ম্যাকাঞ্জী ১৯৮৪)। বােমাং কং-হ্লা-প্রু ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে পরলােক গমন করেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তার ছেলে সাথাং প্রু ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে রাজা হন। বােমাং সা-থাং-প্রু ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান বান্দবরান শহরে তাঁর রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন ।

উল্লেখ্য যে, বান্দরবান শহরাঞ্চলে মারমাদের বিভিন্ন দলের মধ্যে রিগ্রেসা (Regretsa) দলের লােকেরাই প্রধান দল। “১৮০৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বােমাঃ সা-থাং-প্রুকে চট্টগ্রাম নদীর দক্ষিণ দিকে কর্ণফুলী নদী থেকে নাফ নদী পর্যন্ত মুহলের কর আদায়ের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। 

বােমাং সাথাং প্রুর আমলে তৎ কর্তৃক আরাকানী নেতা চিনপিয়ান ও তাঁর লােকদের বােমাং রাজার এলাকা থেকে বিতাড়নের ব্যাপারে নিম্নলিখিত কথাগুলাে লিখেন,

“১৮১৩ অব্দের আগস্ট মাসে খ্যান ব্রৈ (চিনপিয়ান)… ২০০ উশৃঙ্খলচারী লােক লইয়া পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে এত উপদ্রব করিতে থাকে যে, তাহাতে ত্রত্য অধিবাসিগণ পলাইয়া যায়। বােমাং কোং-লা-ফ্রুর ছয় পুত্র ছিল। জ্যেষ্ঠ ছাথান ফ্রু (সা থাং প্রু) ৪০০ লােক লইয়া তাহাদিগকে এদেশ হইতে সম্পূর্ণ রূপে তাড়াইয়া দেন।”

তবে ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের ১২ই সেপ্টেম্বর তারিখ চিনপিয়ান কর্তৃক ইংরেজ কর্তৃপক্ষের নিকট যে পত্র প্রেরিত হয় তাতে তিনি বােমাং রাজা কং-হ্লা-প্রুর এলাকায় আত্মগােপন করে থাকার কথা লিখলেও তাঁর লােকেরা সেখানে কোন লুটতরাজ করেনি বলে জানান। (রতন লাল চক্রবর্তী, ১৯৮৪ : ২১৫)। তবে চিনপিয়ানের উক্ত পত্র থেকেও সা-থাং-প্রু এবং অন মুরাং টয়ঞ্জা (ত্রিপুরা উপজাতীয় টয়ঞ্জা নামক জনৈক ব্যক্তি)-এর সংঘর্ষ চলছিল বলে জানা যায়।

পরবর্তী কালে চিনপিয়ানের মৃত্যুর পরে ঐ বিরােধ আপনিই শেষ হয়ে। যায়।” “১৮২৬ অব্দে ছাথান ফ্র বনজগী (বর্তমানে বম) সদ্দার রেং চুলুমকে জয় করিলেন।” (ঘােষ ১৯০৯ : ৩২)। বােমাং রাজা সা-থাং-প্রু দীর্ঘদিন রাজত্ব করার পর ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে পরলােক গমন করে। তাঁর পরবর্তীকালে বােমাং রাজা হিসেবে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র ক-ঙ-হু ঞ্চো (১৮৪০-৬৬), অতঃপর তার খুড়তুত ভাই মঙ প্রু (১৮৬৬-৭৫), তৎপরে তৎ ভ্রাতা হ্লাইং ঞো (১৮৭৫-১৯০১), অতঃপর তৎ ভ্রাতুষ্পুত্র চ হ্লা প্রু (১৯০১-১৬), তৎপরে তৎ ভ্রাতুষ্পুত্র মঙ সা ঞো (১৯১৬-২৩), এরপর তৎ ভ্রাতুষ্পুত্র ক্য জ্যাইং প্রু (১৯২৩-৩৩), তৎপর তৎপুত্র ক্য-জ-সাইং প্র (১৯৩৩-৫৯), তৎপরে তৎ ভ্রাতা মণ শৈ প্রু চৌধুরী ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে রাজা হন। সম্প্রতি তিনি পরলােক গমন করেন। এমতাবস্থায় এ বছর ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে মিঃ অং শৈ প্রু চৌধুরী বামাং রাজা হয়ে অভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছেন।