মানুষের স্বভাব (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ৪:০৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ৪, ২০২০

লিখেছেনঃ ড. মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান আল-আরেফি

অনুবাদঃ সাব্বির আহমাদ

 

আপনি যদি মানুষের স্বভাব-প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে মাটির স্বভাব-প্রকৃতির সাথে মানুষের স্বভাব-প্রকৃতির অনেক মিল খুঁজে পাবেন। মাটি যেমন নরম ও উর্বর আবার শক্ত ও অনুর্বর হয়ে থাকে, মানুষও ঠিক তেমনি নরম ও কোমল আবার রুক্ষ ও কঠিন স্বভাবের হয়ে থাকে।

 

আপনি খেয়াল করেছেন কি, মাটির ধরণ-প্রকৃতি অনুসারে আমাদের হাটাচলার ধরণও বদলে যায়। ঢালু ও পিচ্ছিল কাদামাটিতে চলতে আমরা সতর্ক থাকি। কিন্তু শুকনো ও সমতল ভূমিতে আমরা নির্ভীগ্নে পথ চলি। মানুষের বেলাও এমন হয়। একজন রুক্ষ, বদমেজাজীর সাথে কথা বলতে মানুষ  বিব্রত বোধ করে। কিন্তু একজন মনখোলা ও মিষ্টিভাষী লোকের সাথে কথা বলতে সে আনন্দ পায়।

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

“আল্লাহ তায়ালা সারা পৃথিবী থেকে জমাকৃত একমুষ্ঠি মাটি থেকে হযরত আদম (:)-কে সৃষ্টি করেছেন মাটির ভিন্নতার কারণে আদম সন্তানের আকার  ও আকৃতি ভিন্ন ভিন্ন হয়েছে। তাদের কেউ লাল, কেউ কালোকেউ ফর্সা আচরণগত দিক দিয়েও কেউ উদারকেউ সংকীর্ণমনা  কেউ ভালো কেউবা মন্দ”                                                              সুনানা তিরমিযী২৮৭৯

 

মানুষের সাথে আচরণ করার সময় এই বিষয়গুলো মাথায় রাখা দরকার। সে আত্মীয় হোক বা অনাত্মীয়।  মাতা-পিতা, স্ত্রী- পুত্র, পাড়া-প্রতিবেশী, সহপাঠী অথবা দোকানদার একেকজনের প্রকৃতি একেকরকম। কারো সাথে কারো মিল নেই। পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষই আলাদা আলাদ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন । তাই সাবার সাথে আচরণের ক্ষেত্রে  এই স্বভাবের-প্রকৃত্রির প্রতি খেয়াল রাখা দরকার।

 

মানুষের  স্বভাব তার আচরণের মধ্যে ফুঁটে উঠে। গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্তের ব্যপারে সে তার সহজাত প্রভৃত্তির অনুসরণ করে। আপনি বিষয়টি একটু যাচাই করে দেখতে পারেন। মনে করুন, আপনার স্ত্রীর সাথে আপনার সমস্যা হয়েছে। আপনি আপনার সবচেয়ে রুক্ষমেজাজী বন্ধুটির কাছে পরামর্শ চান। তাকে বলুন, বন্ধু, তোমার ভাবি আমার সাথে প্রায় ঝগড়া-বিবাদ করে, আমাকে একদম মূল্যায়ন করেনা, আমার সাথে রূঢ আচরণ করে। আমি এখন কি করতে পারি?

 

আমার মনে হয় সে তখন বলবে, স্ত্রীদের সাথে রক্তচক্ষু নিয়ে থাকতে হয়। তাদের বেশী সু্যোগ দেয়া যাবে না। সু্যোগ পেলেই এরা মাথায় চড়ে বসে। কঠোর হতে শিখো। পৌরষত্বের পরিচয় দাও। এসব শুনে যদি আপনি তা করতে যান, তাহলে আপনার সুখের সংসার ভেঙ্গেও যেতে পারে।

 

আপনি যাচাই পর্বটা শেষ করতে চাইলে একই সমস্যা আপনার অন্য কোন কোমলপ্রাণ বন্ধুর কাছে বলুন। প্রথমজনের কাছে যা বলেছেন, তাকে একই কথা বলুন। সে তখন বলবে- দেখো বন্ধু, সে শুধু তোমার স্ত্রীই না, তোমার সন্তান-সন্ততির মা, কোন পরিবারই সমস্যা ছাড়া না। সমস্যা থাকবেই। তুমি ধৈর্য ধরো। বিষয়গুলো সহজভাবে নেয়ার চেষ্টা করো। আশা করি সব ঠিক হয়ে যাবে। সে যা কিছুই করুক, সে তো তোমারি শয্যাশয়ী, তোমার অর্ধাঙ্গিনী, তোমার জীবন পথের সহযাত্রী।

 

লক্ষ করুন, তাদের দুজনের স্বভাব-প্রকৃতি কিভাবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্তে উপর প্রভাব ফেলেছে। তাই আল্লাহর রাসূ্লুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিচারকদের পিসাসার্ত ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় ও  প্রাকৃতিক প্রয়োজনের চাপ রেখে  দুজনের মাঝে ফায়সালা করতে নিষেধ করেছেন। কেননা এসমস্ত বিষয়াশয় তার ব্যক্তিত্বে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে তার সিদ্ধান্ত ত্রুটিপূর্ণ রয়ে যাবে।

 

পূর্বেকার জামানায় ভয়ঙ্কক এক খুনি ছিলো। সে একজন দু’জন না বরং নিরানব্বইজন মানুষকে হত্যা করে। আমি জানি না এতোগুলো খুন করে সে কিভাবে মানুষের হাত থেকে পার পেয়েছিলো। হয়তো সে এতোটাই ভয়ঙ্কর ছিলো যে, কেউ তার কাছে আসার সাহস করতো না। অথবা হতে পারে সে দুর্গম কোন পাহাড়ে বা জঙ্গলে আত্মগোপন করে থাকতো। নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। মূল কথা হলো সে নিরানব্বইটা খুন করেছে।

 

হঠাৎ তার মধ্যে অনুশোচনা আসলো। সে তাওবা করতে চাইলো। সে তখন যুগের সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তির সন্ধান করলো। লোকেরা তাকে একটি গির্জার সন্ধান দিলো। সেখানে একজন আবেদ আছেন। যিনি  তার জায়নামাজ ছেড়ে কোথাও যান না। সারাক্ষণ আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী্তে মশগুল থাকেন। খুবই কোমলপ্রাণ ও দ্বীনদার মানুষ। তিনি ঐ জামানার অনেক বড় আবেদ ছিলেন বটে, কিন্তু তার কাছে শরিয়াতের জ্ঞান ছিলো না।

 

সেই খুনি লোকটি ঐ গির্জায় গেলো। আবেদের সামনে বসে বললো- আমি নিরানব্বইটি খুন করেছি, আমার জন্য কি তাওবার দরজা খোলা আছে?  আমার ধারণা এই পুরোহিত অনিচ্ছাকৃত একটি পিঁপড়া মেরে ফেললে  আফসোস আর অনুশোচনায় দিন কাটাতো। তার সামনে নিরানব্বাইটা হত্যাকাণ্ডের খুনি! আবেদের সারা শরীর নিস্তেজ হয়ে আসলো। নিরানব্বইটা লাশের উপর যেন এই খুনি দাঁড়িয়ে আছে। ঐ আবেদ চিৎকার করে বললো- তোমার জন্য কোন দাওবা নেই, তোমার জন্য কোন তাওবা থাকতে পারেনা।

 

অল্প জ্ঞানসম্পন্ন আবেদের কাছ থেকে এমন উত্তর আস্বাভাবিক নয়। সে আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন ফায়সালা দিয়েছে। প্রকৃত উত্তর তার জানা ছিলো না।  এমন উত্তর শুনে ক্রোধে তার চোখ লাল হয়ে গেলো। সে ছিলো দুর্ধর্ষ ও রক্তপিপাসু। কোমর থকে একটি খঞ্জর বের করলো। খঞ্জরের আঘাতে আবেদের বুক এফোঁর ওফোঁর করে দিলো। তারপর সে গির্জা থেকে বের হয়ে গেলো…

চলবে…