মানুষের স্বভাব (২য় পর্ব)

প্রকাশিত: ৫:০৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২০

লিখেছেনঃ ড. মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান আল আরেফী

অনুবাদঃ সাব্বির আহমাদ

এভাবে কেটে গেলো আরো কিছুদিন। অপরাধবোধ ও অনুশোচনার আগুন যেন তার দেহমন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। সে আবারো তাওবা করতে চাইলো। বড় কোন আলেমের অনুসন্ধানে বের হলো। লোকেরা এবার তাকে একজন বিদ্বান আলেমের সন্ধান দিলেন। সে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ঐ আলেমের দরবারে উপস্থিত হলো। সে লক্ষ করল আলেম খুবই গুরুগম্ভীর। প্রজ্ঞা ও খোদাভীতির ছাপ চেহারায় স্পষ্ট। এবার সে কাছে এসে নির্দ্বিধায় বললো- আমি একশত মানুষ খুন করেছি, আমার জন্যে কি তাওবার দরজা খোলা আছে?

 

আলেম সাথে সাথে বলে উঠলেন, -সুবহানাল্ললাহ! কে তোমাকে তাওবা করতে নিষেধ করেছে? আসমান ও জমিনের স্রষ্টার কাছে ফিরে যেতে বারণ করেছে? তুমি তোমার প্রভুর কাছে মাথা নত করবে, কৃত গুনাহের জন্য তাওবা করবে, আত্মসমর্পণ করবে, -এতে বাধা দেয়ার সাধ্য কার?

 

আলেম কথা বলছিলেন যুক্তিনির্ভর ও শরিয়াতের উপর ভিত্তি করে । তাঁর কথা পূর্বেকার আবেদের মতো কল্পনাপ্রসূত ও আবেগ-নির্ভর ছিলো না।

 

তিনি আরও বললেন- শোন, তুমি সম্ভবত মন্দলোকদের সাথে বসবাস করো। তিনি এটা কিভাবে বুঝলেন? তার জনপদে অপরাধের ধরণ তাই বলছিলো। সেখানে হত্যা ও জুলুম  বিস্তার লাভ করেছিলো। ফলে  মাজলুমকে সাহয্য করার কেউ ছিলো না। তাই সে এতো এতো অপরাধ করেও পার পেয়ে গেছে।

 

আলেম বললেন- তুমি এই জনপদ ছেড়ে দাও। অমুক শহরে যাও। সেখানে এক সম্প্রদায় পাবে। তারা এক আল্লাহর ইবাদত করে। তুমিও তাদের সাথে গিয়ে মিলিত হও এবং কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো।

 

আলেমের কথা শুনে অপরাধী ঐ শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। মথিমধ্যে তার জীবনপ্রদীপ নিভে গেলো। তিনি মারা গেলেন। এখন আসমান থেকে রহমতের ও আজাবের ফেরেশতারা নেমে আসলেন। রহমতে ফেরেশতারা বলছে- এই লোক তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছে। আর আজাবের ফেরেশতারা বলছে- না, সে জীবনে কোন ভালো কাজ করে নি।

 

এই মুহূর্তে আল্লাহ তায়ালা আসমান থেকে বিচারকরূপে একজন ফেরেশতা পাঠালেনন। তিনি উভয়দলকে ঐ ব্যক্তির ফেলে আসা ভূমির দূরত্ব পরিমাপ করতে বললেন। যদি সে নেক্কার বান্দাদের শহরের নিকতবর্তী হয়, তাহলে রহমতের ফিরেশতারা তার রূহ নিয়ে যাবে। আর যদি বদকারদের জনপদের নিকতবর্তী হয়, তাহলে আজাবের ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে যাবে।

 

আল্লাহ তায়ালা নেককারদের শহর সংকীর্ণ করে তার দেহকে তাদের নিকটবর্তী করে দিলেন এবং মন্দলোকদের জনপদ দূরবর্তী করে দিলেন। ফেরাশতারা জায়গা পেপে  দেখলো সে নেককারদের অধিক নিকটবর্তী। তখন রহমতের ফেরাস্তারা তার রূহ নিয়ে চলে গেলেন।

 

লক্ষ করুন, একজম মানুষের প্রজ্ঞাপূর্ণ বাণী কিভাবে তাকে সত্যের পথে নিয়ে আসলো। আর আবেগতাড়িত ঐ আবেদের কি পরিণাম হলো!

 

আমার একজন প্রতিবেশী ছিলো। সে স্ত্রীর সাথে প্রায় ঝগড়া করতো। একদিন রাগেরবশে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেয়। কিছুদিন পর তালাক ফিরিয়ে নিলে সব ঠিকঠাক হয়ে যায়। কিছুদিন যেতে না যেতে আবার ঝগড়া হয়। সে এবারো তালাক দেয়। আমার সাথে দেখা হলে সাবধান করতাম। সতর্ক করতাম। তার ছোট ছোট বাচ্চাদের কি প্ররিণতি হবে, সে কথা স্মরণ করিয়ে তৃতীয় তালাক দেয়া থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করতাম। এবার যদি শেষ তালাক দিয়ে দাও, তাহলে আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না। তখন অন্য পুরুষের সাথে বিয়ের পর তিনি তালাক দিলে তুমি তোমার স্ত্রীকে পাবে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো। সাধের পাতানো সংসারটা বিনাশ করো না।

 

একদিন মুখ মলিন করে সে আমার সামনে উপস্থিত। বলছে- হযরত, আমাদের মাঝে আবারো ঝগড়া হয়েছে। রাগের মাথায় আমি তৃতীয় তালাকটি দিয়ে ফেলেছি…

একথা শুনে আমি ততোটা আশ্চর্য হয়নি, পরের কথা শুনে যতোটা আশ্চর্য হয়েছি। তিনি বলছেন, আমাকে কি এমন একজন আলেমের সন্ধান দিতে পারবেন, যিনি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার পক্ষে ফতোয়া দিবে? আমি অবাগ হয়ে গেলাম!  কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর পূর্বের বিষয়টি আমার কাছে আরো স্পষ্ট হলো। অনেক মানুষের রাগের মাথায় সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে তা কাল হয়ে দাঁড়ায়। আবার অনেকে আবেগতাড়িত হয়ে এমন কিছু করেন যা তাদের জন্য বেমানান। এমনকি অনেক আলেম পর্যন্ত চিন্তা-ভাবনা না করে ধারণা-প্রসূত এমন সব ফতোয়া দেন যা মৃত্যু পর্যন্ত গড়িয়ে যায়…

 

চলবে…