মানবতাবাদী দর্শনের বিকাশ (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রকাশিত: ২:২১ অপরাহ্ণ, জুন ১, ২০২০

বোক্কাসিও বা বোককাচোঃ পেত্রার্কের অনুসারী অন্যতম মানবতাবাদী সাহিত্যিক ছিলেন বোক্কাসিও বা বোককাচো। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন একজন বণিকের পুত্র। প্যারিসে জন্ম গ্রহণ করলেও তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছিলেন নেপলস ও ফ্লোরেন্সে। প্রায় ১০০ মতো গল্প নিয়ে রচিত “ডেকামেরনের”-এর জন্য তিনি অধিক বিখ্যাত। এই গ্রন্থ সমসাময়িক সমাজ ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে উপস্থাপন করেছেন। গ্রিক শব্দ ডেকামেরন অর্থ দশ দিন।

গ্রন্থটির শুরুতে তিন যুবক ও সাত যুবতীর প্লেগ রোগের আক্রান্ত হয়ে ফ্লোরেন্স থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এরা পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয় একটি গ্রামে । এই গ্রামে অবস্থানকালে তারা গল্পের আসর বসাতো। গল্পের বিষয় হিসাবে তারা প্রতিদিন একজন করে রাজা বা রাণী নির্ধারণ করতে থাকে। এভাবে দশজন পালাক্রমে গল্পবলা চালিয়ে যায়।  এই গল্পে  প্রকৃতির কঠিন অবস্থার কাছে মানুষের অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। এর পাশাপাশি বীরত্বগাথা ও গ্রামীণ জীবনের নানা চিত্র এখানে প্রতিফলিত হয়েছে।

রাবেলাইসঃ  ফ্রাঙ্কোসিস রাবেলাইস ছিলেন একজন ফরাসি মানবতাবাদী সাহিত্যিক। একসময় মঠবাসী রাবেলাইস ছিলেন একজন চিকিৎসক। এই পেশায় নিয়োজিত থেকে সামাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়ে ছিল রাবেলাইসের। তিনি হাস্যরসের সাহায্যে মানুষের নানা দিক ফুটিয়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। এক্ষেত্রে তাঁকে প্রতিকূলতা সহ্য করতে হয় । যেমন প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের সরবন কলেজ অশ্লীলতার দায়ে তাঁর একটি গ্রন্থ নিষিদ্ধ করে দেয়। রাবোলাইস সাহিত্যের ভাষায় রাজনীতি, শিক্ষা, বিচার-আচার থেকে শুরু করে ধর্মীয় অবস্থাসহ নানাদিকের বিশ্লেষণ করেছেন। ফারসি ভাষায় রচিত রসাত্বক রচনা হিসাবেও রাবেলাইসের সাহিত্যকর্মের কথা বলা যায়। হাস্যরসাত্নক ও বিদ্রুপাত্নক সাহিত্য হিসাবে রাবেলাইস রচনা করেছেন “গার্গানটুয়া” এবং “প্যান্টাগ্রচয়েল”। এখানে গার্গানটুয়া  ও তার পুত্র প্যান্টাগ্রচয়েল ছিল দুইজন দানব। এদের দু’জনের ক্ষুদা ছিল খুব বেশি, যা মিটাতে গিয়া তারা বিভিন্ন উদ্ভট কাণ্ড ঘটাতো । এদের কাণ্ডকারখানার  বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লেখক সমসাময়িক রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা , শিক্ষা ব্যবস্থা  ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে উপহাস করার চেষ্টা করেছেন। তবে সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে মানব জীবনের প্রতি এক অনুপম অনুরক্তি প্রকাশ পেয়েছেন তাঁর রচনায়। সাহিত্যজ্ঞান ও পাঠকপ্রিয়তা অচিরেই রাবেলাইসকে একজন জননন্দিত ফরাসি লেখকে পরিণত করে।

ইরাসমাসঃ নন্দিত ফ্লেমীয় মানবতাবাদী লেখক ডেসিডেরিয়াস ইরাসমাস ১৪৬৬ সালে নেডারল্যান্ডেসের রোটারডামে জন্মগ্রহন করেন । রোটারডামের গৌদের একটি বেসরকারি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর ডেভেনটারের একটি ধর্মীয় স্কুলে বছর পাঁচেক লেখপড়া করেন। এরপর একটি মঠে অবস্থান করে ধর্মসংক্রান্ত জ্ঞান লাভ করেন । মঠের জীবনযাপনকালে ইরাসমাস প্রচুর প্রাচীন সাহিত্য নিয়ে অধ্যয়ন করার সুযোক পান। লেখক হিসাবে ইরাসমাস তাঁর রচনায় বেশীরভাগ ক্ষেত্রে রাজনীনি ধর্ম ও সামাজিক বিষয়াবলির প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। জন্মগতভাবে একজন ওলান্দাজ হওয়াতে ইরাসমাসের পক্ষে সাহিত্য চর্চা করা অনেটাই কঠিন ছিল। ইরাসমাস সাহিত্য চর্চার উদ্দেশ্যে ল্যাটিন ভাষায় বিশেষ দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করেন। ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে ইউট্রেক্টে ধর্মযাজক হিসাবে নিযুক্ত হওয়ার পর ১৪৯৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনুমতি পান । ১৪৯৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি প্রাপ্তির বক্তৃতায় তিনি ব্যক্তিগত ধর্মীয় দর্শন ও বিবিধ বিষয় বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন।

ইরাসমাস প্রথমত মৌলিক কোনো গ্রন্থ প্রণয়নের তুলনায় প্রাচীন লেখনী থেকে সংগৃহীত মতামত নিয়ে একটি সংকলন তৈরি করার চেষ্টা করেন। ১৫০০ সালে এই সংকলন “এডাগেজ” নামে প্রাকাশিত হয়। এই গ্রন্থ  পরবর্তীকালে বেশ গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হতো। এডাগেজ অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। উনিশ শতকে অনেক লেখককে এই বই থেকে উদ্ধৃতি দিতে দেখা গেছে। ১৯০১ থেকে থেকে ১৯০৬ সালের মধ্যে তিনি বেশ কয়েকটি গ্রিক বই ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেন । এই সকল গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে সিসোরো রচিত “দ্য অফিসিসসহ ইউরিপিডিস ও লুসিয়ান”। এর পাশাপাশি ইরাসমাস খ্রিস্টান ধর্মের মূলনীতি নিয়ে কাজ করেন। তিনি খ্রিস্টান ধর্মে মূলনীতি নিয়ে প্রকাশ করেন “ হ্যান্ড বুক অফ ক্রিশ্চিয়ান নাইট”।

‘প্রেইজ অফ ফলি’ ইরাসমাসের সবচেয়ে প্রচারিত গ্রন্থের একটি। এই গ্রন্থে তিনি অনেকটা রসাত্নকভাবে মানবজীবনের নানাদিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এখানে ফলি নামক এক ভদ্র মহিলার কাহিনীর মাধ্যমে সমাজের নানা চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন । খ্রিস্টান ধর্মে নারীদের একটু অন্য চোখে দেখা হতো। ইরাসমাস এর কঠিন সমালোচনা করেছেন। ইরাসমাস বলতেনঃ

“নারীদে সম্মানের চোখে দেখা উচিৎ। কারণ নারী না থাকলে পুরুষরা বিয়ে করে তাদের সাংসারিক জীবন বিকাশ ঘটাতে পারত না। সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব থাকতো না । ঠিক তেমনি সাহিত্যের কোন বিকাশ ঘটতো না।”

ইরাসমাসের রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে জানার সুযোগ রয়েছে “এডুকেশন অভ ক্রিশ্চিয়ান প্রিন্স” নামক গ্রন্থটিতে । তিনি এই গ্রন্থে ম্যাকিয়াভেলীর রাষ্ট্রদর্শনের গভীর সমালোচনা করেছেন। এখানে তিনি দেখাতে চেয়েছেন “ রাজনীতিতে নীতিশাস্ত্র মেনে চলা উচিৎ, যেখানে জনগণের প্রতি দায় স্বীকার করা রাজার কর্তব্য। ঠিক এর বিপরীতে ম্যাকিয়াভেলী  বলেছিলেন  “রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে যেকোন রকম সিদ্ধান্ত নিতে পারে। গভীরভাবে বিশ্লেষন করলে বুঝা যায় প্লেটো এরিস্টটল ও একুইনাসের সাথে ইরাসমাসের রাজনৈতিক দর্শনের বেশ মিল রয়েছে। এই দর্শন প্রচার করার জন্য তিনি “ কমপ্লেইন্ট অফ পিস” নামে একটি পুস্তিকা তৈরি করেন। রাজার স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন ইরাসমাস । তিনি মতবাদ জনপ্রিয় করার জন্য জার্মান ভাষায় বেশ কিছু লেখালেখি করেন। ইরাসমাস বাইবেলের জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন। ক্যাথলিক চার্চের সংস্কার প্রশ্নে তিনি মার্টিন লুথারের কঠোর সমালোচনা করেছেন।

জন কোটেলঃ ইরাসমাস ও মুরের ঘনিষ্ট বন্ধু কোটেলের জন্ম ১৪৬৭ সালে ইংল্যান্ডে । শিক্ষক হিসাবে কর্ম জীবন শুরু করার পর ১৫০৫ সালে লন্ডনের সেন্ট পল চার্চের ডীন নিযুক্ত হয়েছিলেন। এখানে থাকাকালীন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অক্সফোর্ডে তিনি সেন্ট পলের উপর বেশ কয়েকটি বক্তৃতা করে ছিলেন। জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি সহজ ভাষায় পুরো বাইবেলের ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তিনি মূল বাইবেল গ্রন্থের সরাসরি অর্থ প্রচার করার চেষ্টা করেন।  তিনি বালগিটের বিশুদ্ধতা নিয়ে কোন প্রশ্ন না করলেও বিধান হিসাবে মূল বাইবেল গ্রন্থকে অধিক গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছিলেন। লন্ডনে লর্ড মেয়র পিতার মৃত্যুর পর প্রাপ্ত অগাধ ধনসম্পত্তি তিনি সেন্ট পলের স্কুলের তহবিলকে সমৃদ্ধ করার কাজে ব্য্যয় করেন। এই স্কুল পরবর্তীকাল খ্রিস্টানদের ধর্মীয় শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। তিনি ইংরেজ ধর্ম যাজকদের সম্মানে বক্তৃতা করেন। এখানে খ্রিস্টান ধর্মের নানা নিয়মকানুনে সংস্কার আনার দাবি তোলেন।

ট্মাস মুরঃ অক্সফোর্ড এক সময় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই সময় যে সকল মানবতাবাদী বিশেষ সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হয়ে ছিলেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিটি ছিলেন স্যার ট্মাস মুর ।  তিনি প্রখ্যাত মানবাতাবাদী ইরাসমাস ও জন কেটেলেতর ঘনিষ্ট বন্ধু ছলেন। খ্রিস্টীন ধর্মের প্রচলিত জ্ঞানতাত্ত্বিক অনুশীলনের বাইরে এসে তিনি নতুন ধারার জ্ঞান চর্চার প্রতি আগ্রহী হয়েছিলেন। তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়াবলিকে ঘিরে তাঁর বেশিরভাগ চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটান । রাজনৈনিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসাদবে রাজা অষ্টম হেনরি তাঁকে লর্ড চ্যান্সেলর নিযুক্ত করেছিলেন।

নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও সমসাময়িক তথ্যাবলির সুনিপণ সংযোজন করে তিনি ০৫১২ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন “ইউটোপিয়া”। এই গ্রন্থে অনেকটা হাস্যরসের ভিত্তিতে তিনি পৃথিবীর কয়েকটা নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর অবস্থান তুলে ধরেন। এর ধারাবাহিকতায়  আস্তে আস্তে মানবতাবাদী দর্শন একটি পূর্ণাঙ্গ ও জনপ্রিয় দর্শন হিসাবে সারা পৃথিবীতে স্বীকৃতি পায়।