মানবতাবাদী দর্শনের বিকাশ (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ৬:০০ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

মানবতাবাদী দর্শনের বিকাশ 

ইউরোপে রেনেসাঁসের সময় মানবতাবাদ তথা মানবতাবাদী দর্শনের বিকাশ লক্ষ করা গেছে। মানবতাবাদ মানুষের গুরুত্ব, বিশ্ব প্রকৃতিতে মানুষের অবস্থান ইত্যাদি তুলে ধরে কাজ করে । বিশেষকরে মানবতাবাদ পৃথিবী ও পৃথিবীতে বসবসাকারী মানুষ সম্পর্কিত চিন্তা চেতনা বিকাশের একটি পথ। এই মানবতাবাদ রেনেসাঁসের সময়কালে একটি পূর্ণাঙ্গ চরিত্র অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলো। মানবতাবাদী দর্শনের অধ্যয়ন ও গবেষণার বিষয়বস্তু  হচ্ছে মানুষ।

টেরেন্স-এর মতে

মানুষ ও মানুষের স্বভাব সম্পর্কে একজন মানবতাবাদীকে জানতে হবে। এখানে মানুষের স্বভাবের কোন কিছুই মানবতাবাদীর চিন্তার বাহিরে থাকবেনা। মান-মর্যদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বপূর্ণ সামাজিক জীবনে একজন মানুষ অন্যজনের কাছে সম্মানের পাত্র।

রেনেসাঁসাসের সময়কালে প্রাচীন রোমে প্রচলিত স্টোয়িক ও এপিকিউরীয় দর্শনের চিন্তার প্রভাবে মানবতাবাদ বিকশিত হয় । কিন্ত এর প্রসার ঘটতে ১৪-১৬ শতক অর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। গ্রেকো রোমান সাহিত্য থেকে প্রথম মানবতাবাদী আন্দোলন প্রসার লাভ করে। রোমান সভ্যতার পতনের পর এই সকল সাহিত্য অনেকটাই অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলো। মানুষের জীবনধারার বিবরণ সম্বলিত এই সব প্রাচীন সাহিত্য মানবতাবাদীদের আকৃষ্ট করে।

মানবতাবাদী দর্শন অনেকাংশে মধ্যযুগের  ধর্মীয় অনুশীলনের বিপরীতে চলে যায়। বিশেষ করে এই সময় মনে করা হতো- দুনিয়ার জীবন মানুষের জন্য একটি ঘৃণ্য জীবন। এই জীবনের মায়া ত্যাগ করে মানুষের উচিত সর্বদা পরকালের স্বর্গ লাভের চেষ্টা করা।

তাই অনেক সাধক নিজের উপর নারকীয় অত্যাচার বেছে নিয়েছিলেন। সেইন্ট সিমন একটি  অপরিসর স্তম্ভের উপর তাঁর জীবনের অনেক সময় পার করে দেন। স্বর্গলাভের প্রতি উৎসুক এইসব সাধকের ধর্ম চর্চার অনেকটাই জটিল  ও মানবতা পরিপন্থী ছিল । কেউ বা গরু ছাগলের মত ঘাস, পাতা-লতা আহার করতেন, কেউ বা কাটাঝোপে গড়াগড়ি দিয়ে নিজেকে রক্তাক্ত করতেন, প্রখর সূর্যালোকে হা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকতেন। উত্তপ্ত বালুতে চিৎ হয়ে সূর্যের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকতেন প্রভৃতি। মানবাতাবাদী  চিন্তা এইসকল আজগুবি চিন্তাধারাকে অনেকাংশেই নাকচ করে দিয়েছিলো। ইতালিতে প্রসার লাভ করায় মানবতাবাদ ইউরোপের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে । ১৬ শতকে এসে মানবতাবাদ আন্তর্জাতিক মর্যাদা পায়। এখানে মূলত মানব জীবনের সামজিক বাস্তবতাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছিলো।

মানবতাবাদী সাহিত্য বাস্তবধর্মী, জীবন আচরণ নির্ভর, সমালোচনামূলক ও কখনো কখনো হাস্যরসাত্মক  হতে দেখা গেছে। এই সময় কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন পেত্রার্ক, বোক্কাসিও বা বোক্কাচো, রাবেলাইস, ইরাসমাস, কোটেল ও টমাস মুর। মানবতাবাদী দর্শন বিকাশে তাদের ভূমিকা নিচে তুলে ধরা হল।

পেত্রার্কঃ  পেত্রার্কের কবিতায় মূলত প্রকাশ পেয়েছে মানব জীবন ধারার নানা চিত্র। তিনি ছিলেন একজন ইতালীয় মানবতাবাদী লেখক। প্রাচীন সাহিত্য আবিষ্কারে বিশেষ ভূমিকা পালনকারী পেত্রার্ক, সেসেরো ও লিভির অনেক লেখা জনসম্মুখে প্রকাশ করে বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। পেত্রার্কের রচনায় গ্রেকো-রোমান প্রাচীন ধারা আবার নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসে। তিনি মনে করতেন প্রাচীন ও প্রচলিত খ্রিস্ট্রধর্মীয় সাহিত্য চর্চার মধ্যে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নির্দেশ করা সম্ভব নয়।

ইতালির কাব্য ভাষায়  পেত্রার্ক তাঁর প্রিয়তমা লারার চমকপ্রদ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি নানা আঙ্গিকে লারার সৌন্দর্যের বিবরণ দিয়েছেন। এই বিবরণের সাথে খ্রিস্টধর্ম যুক্ত হওয়ায় তা মানুষের চিন্তাধারাকে অনেকটাই বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে আসতে সাহায্য করেছে।

পেত্রার্কের বিবরণীতে লারা ছিলেন বাস্তববাদী নারী। তিনি রক্ষণশীল নারী ছিলেন না। এর ধারাবাহিকতায় পেত্রার্ক প্রায় চারশতাধিক কাব্য রচনা করে ছিলেন। পেত্রার্কের বিখ্যাত ক্যানোজনিয়ারি বইটি প্রথম অংশ রচিত হয়েছিলো লারা জীবদ্দশায়। বইটির পরের অংশ লারার মৃত্যুর পর রচিত। এই দুই খণ্ডের বিশ্লেষন করতে গেলে এখানে লারার জন্য কবির প্রচণ্ড ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। পরিশেষে কুমারি মেরির প্রতি একটি সংগীত দিয়ে এই বইটির ইতি টানা হয়েছে। তবে পুরো বইটিতে ঐশ্বরিক ক্ষমতা ও পার্থিব মানবতার মধ্যে একটি তুমুল দ্বন্দ্ব সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়।

বাকি অংশ পরের পর্বে