মহামারির দিনে পুশকিনের প্রেম

প্রকাশিত: ৮:০৯ অপরাহ্ণ, জুন ২, ২০২০

১৮৩০ সালে কলেরার প্রাদুর্ভাব হলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল রাশিয়াজুড়ে। পুশকিন তখন বাবার কাছ থেকে সদ্য পাওয়া তাঁর বলদিনোর জমিদারিতে গিয়েছিলেন সম্পত্তি–সংক্রান্ত ব্যাপারে। এবং সেখানে আটকে পড়েছিলেন তিন মাস। কলেরা তখন ছিল মৃত্যুর অন্য নাম। বাড়িতে বসে সংক্রমণ এড়ানো ছাড়া এই ভয়াবহতা কাটিয়ে ওঠা কঠিন ছিল।

পুশকিন কি এই তিন মাস মন খারাপ করে শুধু আকাশ দেখেছেন? আত্মহত্যার চিন্তা কি মাথায় এসেছিল তাঁর? একেবারেই না। বরং বলা হয়, তাঁর সৃষ্টিশীলতার এক অপূর্ব সমাহার ঘটেছিল বলদিনো–পর্বে। আমরা সেই বিশদ আলোচনায় যাব না। এ সময় তিনি নাতালিয়া নিকোলায়েভ্‌না গনচারোভাকে যে চিঠিগুলো লিখেছিলেন, তাতেই আমাদের কথাবার্তা সীমাবদ্ধ রাখব। পুশকিনের জীবনের একটা বৈচিত্র্যময় এবং প্রচণ্ডভাবে সাহিত্যিক ফসল ফলানোর সময় এটা।

প্রেমিকা নাতাশা

বলে রাখা ভালো, নাতাশা গনচারোভা তখনো পুশকিনের স্ত্রী নন। বিয়ের কথাবার্তা চলছে। হবু শাশুড়ি নাতালিয়া ইভানোভ্‌নার সঙ্গে পুশকিনের চলছে দ্বৈরথ। এ রকম এক অস্বাভাবিক সময়ে বলদিনোয় এসে আটকে গেলেন পুশকিন। ফলে তাঁর মনের অবস্থা তখন কেমন, সেটা নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলতে হবে না।

এখানে রুশ ভাষায় নাম নিয়ে একটা মজার আলোচনা করে নেওয়া যাক। আলেক্সান্দর সের্গেয়েভিচ পুশকিন আর নাতালিয়া নিকোলায়েভ্‌না গনচারোভা হচ্ছে প্রেমিক–প্রেমিকার নাম। প্রথম যে শব্দটা, সেটাই নির্দিষ্ট মানুষের নাম। দ্বিতীয় শব্দটা পিতৃনাম। তৃতীয়টি বংশের পদবি। তার মানে, আলেক্সান্দর হচ্ছে আমাদের পরিচিত কবি পুশকিনের নাম। তিনি সের্গেই–পুত্র। (মেয়ে হলে হতেন সের্গেয়েভ্‌না, সের্গেই–কন্যা)। তিনি পুশকিন (মেয়ে হলে পুশকিনা) বংশের একজন। অন্যদিকে নাতালিয়া হচ্ছে মেয়েটির নাম। নিকোলাই তাঁর বাবা (ছেলে হলে হতেন নিলোলায়েভিচ)। গনচারোভা হচ্ছে তাঁর বংশপরিচয় (ছেলে হলে হতেন গনচারোভ)।

এখানেই শেষ নয়। যার নাম আলেক্সান্দর, অবধারিতভাবেই তাঁকে ডাকা হবে সাশা নামে। পুশকিন তাই বন্ধু–স্বজনদের কাছে সাশা নামেই পরিচিত। আর নাতালিয়াকে ডাকা যাবে নাতাশা বলে।
নাতালিয়া গনচারোভাকে বলদিনো থেকে প্রথম চিঠি

৯ সেপ্টেম্বর
‘আপনার অসাধারণ চিঠিটা আমার হাতে এতে পৌঁছেছে, আমাকে শান্ত করেছে। এখানে আমি কত দিন থাকব, তা এক আকস্মিক ঘটনার কারণে এখনই নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না। আমি ভেবেছিলাম, এখানে বাবা আমার জন্য যে সম্পত্তি রেখেছেন, তা এক জায়গায় একসঙ্গে আছে। কিন্তু এখানে এসে দেখি, এটা ৫০০ জন মানুষের গ্রামের একটা অংশ, যা এখন আবার ভাগ করতে হবে। আমি চেষ্টা করব খুব তাড়াতাড়ি বিষয়টি মিটিয়ে ফেলতে। আরও ভয় পাচ্ছি কোয়ারেন্টিনের। শোনা যাচ্ছে, এই এলাকা আটকে দেওয়া হবে। এই অঞ্চলে এখন— Cholera morbus (খুব ছোট ভাইরাস)। এই ভাইরাসটা হয়তো আমাকে আরও দিন বিশেক এখানে থাকতে বাধ্য করবে। কেন আমি চাই দ্রুত কাজ শেষ করতে, সেটা নিশ্চয়ই আপনি বুঝতে পারছেন।’

আসুন, এবার দেখি, কেন পুশকিন গিয়েছিলেন বলদিনোয়। এটা মোটেই বিলাসভ্রমণ ছিল না। ছিল কাজের জন্য যাওয়া। নিঝেগোরাদের এই বলদিনোয় পুশকিনের বাবা সের্গেই ল্‌ভোভোভিচের ছিল এই ছোট্ট জমিদারিটি। বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। পুশকিনের ইভগেনি আনেগিন কাব্যোপন্যাসের নায়কের বাবাকেও পুশকিন দেখিয়েছেন নিজের বাবার মতো করে—আকণ্ঠ দেনায় নিমজ্জিত ব্যক্তি হিসেবে।

সে যাক। ১৮৩০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পুশকিন আসেন বলদিনোয়। কিন্তু এসে দেখেন, জমির কাগজপত্র তৈরি করা দরকার। কিস্তেনিওভা অঞ্চলের গ্রাম বলদিনোর জমিটির কাগজপত্র ঠিক করতে যেতে হবে স্থানীয় সরকারি অফিসে। এই কাজ সম্পন্ন করতে লাগবে দুই সপ্তাহ। এরপর আরও দুই সপ্তাহ লাগবে কাগজপত্রে সিল–ছাপ্পড়ের জন্য। এ কারণে পুশকিন ভেবেছিলেন, সেপ্টেম্বরের শেষে তিনি ফিরে যেতে পারবেন মস্কোয়। ৯ সেপ্টেম্বর যখন নাতাশাকে এই চিঠি লিখছেন পুশকিন, তখনো তিনি জানতেন না, কলেরা নামক মৃত্যুদূত তার থাবা বাড়িয়ে গ্রাস করে ফেলবে নিঝেগোরাদ প্রদেশ ও কেন্দ্রীয় অঞ্চল এবং এই এলাকা থেকে মস্কো ফিরতে পুশকিনের লেগে যাবে আরও দুটো মাস। এ সময় পর্যন্ত পুশকিন শুনেছিলেন, দক্ষিণ প্রদেশে শুরু হওয়া কলেরা নামক মহামারি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। ত্‌ফিলিসি (এখন ত্‌বিলিসি) আর আস্ত্রাখানে এই মহামারির আগমনীবার্তা শোনা যায়। আগস্ট মাসের শেষ দিকে তা ছড়িয়ে পড়ে সারাতোভ, সিমবির্স্কে। এবং তারপর কলেরায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনার দেখা পাওয়া যায় নিঝেগোরাদ প্রদেশে।

পুশকিনের ১৯৩০ সালের বলদিনো–পর্বকে বলা যেতে পারে কবির জন্য সুস্থিতির পর্ব। এ সময় তিনি লিখেছেন অনেক কিছুই। তাই বলদিনোর এই শরৎকালটাকে পুশকিনের জীবনীকারেরা একটু সমীহ করে চলেন। বলদিনোয় বসে লেখালেখি এবং চিঠিপত্রগুলো দেখলে বোঝা যায়, কতটা আবেগ আর চিন্তার মিলন তিনি ঘটিয়েছেন এই সময়টায়। এই পুরো সময়টায় বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র উপায় ছিল চিঠিপত্র। পুশকিন বলদিনোর নাম দিয়েছিলেন ‘অসহ্য এক দ্বীপ’। এ সময় প্রণয়িনী নাতাশা ছাড়াও পুশকিন তাঁর পিতেরবুর্গের সাহিত্যিক বন্ধু পিওতর প্লেৎনিয়োভ, আন্তন দেলভিগ, মস্কোর প্রকাশক মিখাইল পাগোদিনকেও চিঠি লিখেছিলেন। নাতালিয়াকে তিনি লিখেছেন ফরাসি ভাষায়। বলে রাখা ভালো, সে সময়টায় রুশ অভিজাতশ্রেণির মানুষ ফরাসি ভাষাকেই তাদের কথোপকথনের মধ্যে রাখত সর্বাগ্রে।

পিওতর প্লেৎনিয়োভের কথা যখন এল, তখন ওই একই দিনে, অর্থাৎ ৯ সেপ্টেম্বর তাঁকে লেখা পুশকিনের চিঠির উল্লেখ করা যায়। এ চিঠিতে পুশকিন বলছেন, ‘গ্রামটায় এসে অবকাশ যাপন করছি। আমার চারপাশে কলেরা মর্বুস। তুমি কি এই প্রাণীটা সম্পর্কে কোনো খোঁজখবর রাখো? ও (এই ভাইরাস) যদি বলদিনো পর্যন্ত চলে আসে, তাহলে আমাদের প্রত্যেককেই সে কামড়াবে। তাহলে ভাসিলি চাচার কাছে যেতে সময় লাগবে না আমার, তুমি তখন আমার জীবনী লিখতে বোসো।’

এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে, তখনই পুশকিন বুঝে গিয়েছিলেন যে কলেরা দ্রুত এগিয়ে আসছে তাঁদের দিকে। তিনি মরেও যেতে পারেন। কিন্তু সে কথা নাতাশার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছেন। পিওতরকে লেখা এই চিঠিতে মৃত্যুভাবনাও আছে। ২০ আগস্ট পুশকিনের চাচা ভাসিলি ল্‌ভোভোভিচ মারা গিয়েছিলেন। এই চিঠিতে সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন পুশকিন।
নাতালিয়াকে লেখা দ্বিতীয় চিঠিভাসিলি ল্_ভোভোভিচ পুশকিন
ভাসিলি ল্_ভোভোভিচ পুশকিন

৩০ সেপ্টেম্বর
‘আমাদের বিয়ে মনে হয় আমার কাছ থেকে দূরে পালিয়ে যাচ্ছে। এই মহামারি, এই কোয়ারেন্টিন—মানুষের ভাগ্যে এর চেয়ে বড় পরিহাস কি আর কিছু হতে পারে? আমার দেবী—আপনার ভালোবাসাই শুধু আমাকে আমাদের বিষণ্ন প্রাসাদের দরজায় ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুবরণ করা থেকে বিরত রেখেছে। (ব্র্যাকেটে বলে রাখি, আমার দাদা অসন্তুষ্ট হয়ে আবোত নিকোল নামের এক ফরাসি শিক্ষককে লটকে দিয়েছিলেন এখানে)। আমাকে আপনার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করবেন না, বিশ্বাস করুন, শুধু সেখানেই রয়েছে আমার সুখ।

আপনাকে আলিঙ্গন করার অনুমতি দেবেন? আমাদের মধ্যকার ৫০০ ভার্স্ট দূরত্ব কিংবা ৫টি কোয়ারেন্টিন অঞ্চল পেরিয়ে আপনার কাছে এই আলিঙ্গন পৌঁছে যাবে। কোয়ারেন্টিনের চিন্তা আমার মাথা থেকে বেরই হচ্ছে না।’

এ মাসের শেষেই পুশকিন বলদিনো ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দিতে পাঁচটি কোয়ারেন্টিন এলাকা পার হতে হয়। তারপরও তিনি নাতালিয়া গনচারোভার কাছে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন। সব যখন ঠিক, তখন খবর এল মস্কোতেও পৌঁছে গেছে কলেরা এবং পুরোনো রাজধানী থেকে বের হওয়া আর সেখানে ঢোকার সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
নাতালিয়াকে লেখা তৃতীয় ও চতুর্থ চিঠি

১১ অক্টোবর
‘মস্কো যাওয়ার সব পথ বন্ধ, আর আমি আটকা পড়ে আছি বলদিনোয়। আকাশ সাক্ষী, প্রিয়তমা নাতালিয়া নিকোলায়েভ্‌না, আপনার লিখতে ইচ্ছে না করলেও আমাকে চিঠি লিখুন। আমাকে বলুন, কোথায় আপনি? মস্কো থেকে অন্য কোথাও গেছেন কি?…আমি খুবই ভেঙে পড়েছি এবং কী করব এখন, তার কিছুই ভেবে বের করতে পারছি না। এ কথা পরিষ্কার, এই বছর (আমি অভিশাপ দিচ্ছি) আমাদের বিয়েটা আর হচ্ছে না। কিন্তু এটা কি সত্য নয় যে আপনি মস্কো ছেড়ে গেছেন? স্বেচ্ছায় নিজের কোলে বিপদ টেনে আনার কোনো মানে হয় না। আমি জানি, পরিস্থিতি আর মৃত্যুর সংখ্যা এখানে সব সময়ই বাড়িয়ে বলা হয়। কোনো একদিন কনস্তান্তিনোপলে এক তরুণী আমাকে বলেছিল, মহামারিতে মারা যায় স্রেফ গরিব সাধারণ জনগণ। তা হতেই পারে। কিন্তু ভদ্রলোকেরা যদি এ সময় যা মেনে চলার, তা মেনে না চলে, তবে শুধু সুললিত কথাবার্তা তাদের বাঁচিয়ে রাখবে না।’

বোঝাই যাচ্ছে, অক্টোবরের এই চিঠিতে কোনো রাখঢাক নেই। এ সময় পুশকিন বুঝতে পারছেন, বলদিনোতেই আরও অনেকগুলো দিন আটকে থাকতে হবে তাঁকে। এ সময় প্রেমিকার খবর জানার জন্য পাগল হয়ে আছেন তিনি। মস্কোভ্‌স্কিয়ে ভেদামোস্ত পত্রিকা থেকে জানতে পেরেছেন, মস্কো কলেরায় আক্রান্ত। নাতাশার কাছ থেকে চিঠি না পেয়ে পুশকিন ভাবছিলেন, তাঁরা বুঝি মস্কো ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে পেরেছেন। পুশকিন নাতালিয়া নিকোলায়েভ্‌নার বহু প্রতীক্ষিত চিঠিটা পেয়েছিলেন ২৬–২৭ অক্টোবর। ওই চিঠির শেষ বাক্যে পুশকিন ফরাসি ভাষায় লিখেছিলেন, ‘বিদায় দেবী, আপনার ডানার কিনারটায় রইল আমার চুম্বন, ভলতেয়ার যেভাবে বলেছিলেন, তা আপনার কাজে লাগুক আর নাই–বা লাগুক।’
২৯ অক্টোবর

‘করুণাময়ী সম্রাজ্ঞী নাতালিয়া নিকোলায়েভ‌না, আমি ফরাসি ভাষায় এ কথা বলতে পারব না, বলব রুশ ভাষায়, আর আপনি, আমার দেবী, পৃথিবীর যেকোনো ভাষায় উত্তর করুন—হোক না চুখোনস্কি ভাষায়, তাতে কিছু আসে যায় না। আপনি শুধু উত্তর দিন…আপনি কোথায়, কেমন আছেন? মস্কোর ঠিকানায় লিখলাম আমি, পেলাম না উত্তর। আমার ভাইও আমাকে লেখে না। মনে করে, ওর চিঠি পড়তে আমার ভালো লাগে না। আরে, মহামারির এই সময়টাই তো ভিন্ন। যে কারও কাছ থেকে যেকোনো চিঠি পাওয়াই এখন দামি খবর। তাতে বোঝা যায়, অন্তত বেঁচে তো আছে। এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কী হতে পারে?’

১ অক্টোবর লেখা নাতালিয়া নিকোলায়েভ্‌নার চিরকুট পেয়ে পুশকিন জানতে পারেন যে তাঁরা মস্কোতেই আছেন। এ চিঠি পেয়েই আবেগমথিত হয়ে পুশকিন ওপরের চিঠিটি লেখেন। তিনি এতটাই আবেগাক্রান্ত ছিলেন যে প্রচলিত ফরাসি ভাষায় না লিখে চিঠিটি লিখেছিলেন রুশ ভাষায়। চিঠিতে নিজের ভাইয়ের প্রসঙ্গ এনেছিলেন শুধু এই কথাই বোঝাতে যে মহামারির এই সময়টাতে কেউ বেঁচে আছে কি না আছে, সেটা জানা কতটা জরুরি।

৫ ডিসেম্বর পুশকিন ফিরতে পেরেছিলেন মস্কোয়। পিওতর প্লেৎনিয়োভকে ৯ ডিসেম্বর যে চিঠিটি লিখেছিলেন তিনি, তাতে ছিল এই কথাগুলো, ‘প্রিয়, ৫ ডিসেম্বর থেকে আমি মস্কোয় আছি। এখানে শাশুড়িকে খুঁজে পেয়েছি, তিনি খুব খেপে আছেন আমার ওপর। কিন্তু কোনোভাবে তাঁকে বশে আনতে পেরেছি। এখন পুরো বিষয়টি ভাবার চেষ্টা করলাম। দুবার বলদিনো থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেছি, দুবারই ফিরতে হয়েছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, এখানে আসতে পেরেছি। আমাকে টাকা পাঠান।’

১৮৩০ সালের ২৭ নভেম্বর প্রদেশের লুকোইয়ানোভা শহর থেকে জানানো হয়, বলদিনো থেকে কলেরার ভয় কেটে গেছে। পুশকিন শেষ পর্যন্ত নিঝেগোরাদ প্রদেশের বলদিনো থেকে বের হয়ে মস্কোর পথে রওনা হতে পারেন। পথে মস্কোর কাছাকাছি শহর প্লাতাভে কোয়ারেন্টিনে ছিলেন কয়েক দিন। তিন মাস বলদিনোয় বসবাসকালে তাঁর আর্থিক অবস্থা হয়ে গিয়েছিল খুবই খারাপ। কিন্তু সে সময় তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তা অমূল্য। প্লেৎনিয়োভকে পুশকিন লিখেছিলেন, ‘বলদিনোতে বসে বহুদিন পর পাগলের মতো লিখেছি। আমি যা যা নিয়ে ফিরেছি: ইভগেনি আনেগিনের ৮ম ও ৯ম অধ্যায়। একেবারে ছাপার উপযোগী করে নিয়ে এসেছি। লিখেছি আরেকটি উপন্যাস। কয়েকটি নাটকের দৃশ্য লিখেছি। তার মধ্যে ছোট আকারের কিছু ট্র্যাজেডিও আছে। ‘মহামারির সময় ভোজ উৎসব’, ‘জন জুয়ান’ আছে তার মধ্যে। আর গোটা তিরিশেক কবিতা লিখেছি। কেমন বুঝলেন?’

আগের কথা পরে

নাতালিয়া নিকোলায়েভ্নার সঙ্গে পুশকিনের পরিচয় হয় ১৮২৮ সালের ডিসেম্বরে, কোনো এক অভিজাতবাড়ির বল নাচের আসরে। ১৮২৯ সালের এপ্রিলে বন্ধু ফেওদর তলস্তয়–আমেরিকানেৎসের মাধ্যমে পুশকিন বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। নাতালিয়া নিকোলায়েভ্‌নার মা নাতালিয়া ইভানোভ্‌না কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি। সে সময় নাতাশার বয়স মাত্র ১৬ বছর। বিয়ের জন্য প্রস্তুত নয়। কিন্তু একেবারে ‘না’ করে দেননি তিনি। পুশকিন তখন সেনাবাহিনীর অংশ হিসেবে চলে গেছেন ককেশাস অঞ্চলে। সে বছরের সেপ্টেম্বরে পুশকিন ফিরে এলেন মস্কোয়। কিন্তু তাঁর সঙ্গে গনচারোভ পরিবারের সম্পর্ক কেমন যেন শীতল হয়ে গেল। সম্রাটের সঙ্গে পুশকিনের বিরোধ আছে, এ কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন নাতাশার মা। সম্রাটের সঙ্গে মিটমাট না হলে ময়ের সঙ্গে পুশকিনের বিয়ে তিনি দেবেন না। বাগদান ভেস্তে গেল।

১৮৩০ সালের ৬ এপ্রিল আবার বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন পুশকিন। বিয়ে হবে বলে রাজি হলো নাতাশার পরিবার। পুশকিন তাঁর প্রতিটি কাজের কথা সম্রাট বা জারের কাছে বলার জন্য দায়বদ্ধ ছিলেন। তাঁকে সব সময় চোখে চোখে রাখা হতো। আলেক্সান্দর বেনকেনদোর্ফের মাধ্যমে পুশকিন জারকে তাঁর গতিবিধির কথা জানাতেন।

১৮৩০ সালের ১৬ এপ্রিল পুশকিন বেনকেনদোর্ফকে চিঠি লিখলেন। সেখানে লিখলেন, ‘মিজ গনচারোভা তেমন একজন মানুষের হাতে নিজের মেয়েকে তুলে দিতে ভয় পাচ্ছেন, যাঁকে দেশের জার ভালো চোখে দেখেন না।’ চিঠির শেষে লিখলেন, জার যদি পুশকিনের লেখা বরিস গদুনোভ ছাপানোর জন্য অনুমতি দেন, তাহলে খুব ভালো হয়।

বেনকেনদোর্ফ উত্তরে লিখলেন, ‘জার নিকোলাই পুশকিনের বিবাহ সংবাদে খুব খুশি হয়েছেন। পুশকিনের ওপর কোনো নজরদারি নেই। কিন্তু রাজার কাছের মানুষ হিসেবে তাঁকে দেখেশুনে রাখা জারের দায়িত্ব।

১৮৩০ সালের ৬ মে পুশকিন ও নাতালিয়ার এনগেজমেন্ট হয়। কিন্তু যৌতুক–প্রশ্নে জামাই–শাশুড়ির ঝগড়া তুঙ্গে উঠলে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হয়। পুশকিন যৌতুক নেবেন না। কিন্তু নাতাশার মা যৌতুক ছাড়া বিয়ে দেবেন না। এ সময় পুশকিন লিখেছিলেন, নাতাশা স্বাধীন মেয়ে। আমি শুধু ওকে বিয়ে করতে চাই। ওর দেওয়া যৌতুককে নয়।’ গনচারোভ পরিবারের আর্থিক অবস্থা তখন ভালো ছিল না। কিন্তু নাতালিয়া ইভানোভ্‌না চাননি যৌতুক ছাড়া তাঁর মেয়ের বিয়ে হোক।

সে বছরের আগস্ট মাসে পুশকিনের চাচা ভাসিলি ল্‌ভোভোভিচের মৃত্যু হলে (নাতাশাকে লেখা পুশকিনের চিঠিতে উল্লেখ আছে) বিয়ে আবার পিছিয়ে যায়। এ সময় বাবার সম্পত্তির ব্যাপারে পুশকিন যান বলদিনোয়। এরপরের কথাই তো বলা হয়েছে আগে।
পরের কথা পরে

১৮৩১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি (নতুন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২ মার্চ) মস্কোর বালশোই ভজনেসেনিয়া চার্চে বিয়ে হয় পুশকিন–নাতালিয়ার।

প্লেৎনিয়োভকে লিখেছিলেন, ‘আমি বিবাহিত এবং সুখী; শুধু একটাই চাওয়া, আমার জীবনের কিছুই যেন পাল্টে না যায়—ভালো কিছু হোক না হোক। এই ঘটনা আমার জীবনে এমনই নতুন যে মনে হচ্ছে আমি বুঝি আবার নতুন করে জন্মেছি।’

বিয়ের পরপরই নতুন দম্পতি বিয়ের আগেই ঠিক করা একটি অ্যাপার্টমেন্টে ওঠেন (বর্তমানে তা আরবাত রোডের ৫৩ নম্বর বাড়ি)। ১৯৩১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি তাঁরা চলে আসেন ৎসারস্কোয়ে সেলোতে। শাশুড়ি যেন তাদের সংসারে আর নাক গলাতে না পারেন, তা নিশ্চিত করার জন্য পুশকিনই এখানে আসার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিতায়েভের বাগানবাড়িতে কয়েক মাস খুব আনন্দের সঙ্গেই ছিলেন তাঁরা। এ সময় শুধু বন্ধু আর কাছের আত্মীয়স্বজনেরই অনুমতি ছিল তাঁদের কাছে যাওয়ার।

সূত্রঃ প্রথম আলো