মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মকে কেন্দ্র করে করোনার গুজব

প্রকাশিত: ৬:৫০ অপরাহ্ণ, মে ২৮, ২০২০

করোনাকে কেন্দ্র করে শুরু থেকেই ভুল তথ্য বা গুজবে ভরপুর সামাজিক গণমাধ্যম৷ এর অনেকগুলো ধর্মকে কেন্দ্র করে৷ বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে এসব গুজব ছড়িয়েছে ব্যাপকহারে৷

মধ্যপ্রাচ্যে করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে দলে দলে মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছেন, মুসলিমদের কিছু হবে না-এমন সব খবর সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছিল৷ বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, এমন অভূতপূর্ব একটি মহামারীর প্রাদুর্ভাবের কারণে একটা সমাধান পাবার আশায় এসব খবর ছড়াতে শুরু করেন মানুষ৷

‘‘দুর্ভেদ্য সংকট ও সংঘাতের সময় মানুষ প্রচলিত বিশ্বাসের ওপর ভর করে এর ব্যাখ্যা করতে চান,” বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন অ্যামেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ বৈরুতের শিক্ষক নাবিল দাজানি৷ ‘‘শুধু ইসলাম বিশ্বে নয়, সব জায়গাতেই এমনটি দেখেছি৷”

কোভিড-১৯ ছড়ানো শুরু করলে এর প্রতিকার থেকে শুরু করে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব সবকিছু নিয়েই গুজব ছড়াতে শুরু করে৷

এ অবস্থায় আরব বিশ্বের সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্টের সত্যতা যাচাই করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি৷ যেমন, গেল ফেব্রুয়ারিতে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে বলা হচ্ছে অনেক চীনা নাগরিক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছেন, কারণ করোনা ভাইরাস মুসলিমদের আঘাত করে না৷

প্রকৃতপক্ষে ভিডিওটি ২০১৯ সালের মে মাসের, করোনা ভাইরাস চীনে দেখা দেবারও কয়েক মাস আগের৷ ভিডিওটিতে দেখা গেছে টাগালগ ভাষাভাষী কিছু মানুষ সৌদি আরবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছেন৷

আরেকটি ক্লিপে দেখা গেছে, কোরআনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার পর থেকে চীনা নাগরিকরা পবিত্র গ্রন্থটির কপি পাচ্ছেন৷ আসলে ক্লিপটি কমপক্ষে ২০১৩ সালের, যেখানে বাইবেল বিতরণ করা হচ্ছিল৷

আরেকটি ভিডিও ফেসবুক, ইউটিউব ও টুইটারে ছড়িয়ে পড়ে৷ সেখানে বলা হচ্ছিল, পাঁচশ বছরের ইতিহাসে স্পেনে প্রথমবার আযানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে৷ স্পেন করোনায় অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত একটি দেশ৷ বাস্তবতা হল, স্পেনে অনেকদিন ধরেই আযানের ওপর কোন নিষেধাজ্ঞা নেই৷

‘‘আমাদের এখানে কখনো কখনো এমন সব ধর্মীয় দাবি ওঠে যা বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিপরীত,” বলেন এইউবির সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক সারি হানাফি৷ ‘‘তবে ধর্ম সামাজিক সংহতিরও অন্যতম ভিত্তি যা কোয়ারান্টিনের সময় মানসিক চাপ সামলাতে সাহায্য করে৷”

শুধু ধর্মকে কেন্দ্র করেই নয়, এএফপি পশ্চিমা দেশগুলো নিয়েও বেশ কিছু দাবি বা গুজবের সত্যতা যাচাই করেছে৷ যেমন, আরববিশ্বে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে বলা হচ্ছে, ইটালিয়ানরা করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় একটি পাবলিক চত্বরে গণআত্মহত্যা করছেন৷

আসলে ভিডিওটি কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার অনেক আগেই একটি প্রতীকী প্রতিবাদের অংশ৷ প্রতিবাদটি ইটালির অতিডানপন্থিদের বিরুদ্ধে ছিল৷

এছাড়া ইটালির প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, ‘সমাধান একমাত্র স্বর্গ থেকেই আসবে’ এমন কথাও ছড়ানো হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে, যা সত্য নয়৷

এদিকে, ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ নিয়ে ব্রিটেনে স্কুল অফ অরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের গবেষক দিনা মাতার বলেন, এটি কোন আঞ্চলিক বিষয় নয়৷

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বা পৃথিবীর অন্য কোন জায়গায় এ তত্ত্বগুলো ‘‘ধর্মকে রাজনৈতিক চর্চা জায়েজ করবার কাজে ব্যবহার করা হয়৷”

শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পশ্চিমেও একই দশা বলে মনে করেন তিনি৷

হানাফি বলেন, অন্যান্য অঞ্চলে ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো হয়তো শুধু ধর্মকে ব্যবহার করে হয় না৷ তার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ, সামাজিক সংস্কার ও বর্ণবাদ যুক্ত করা হয়৷

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, কোন দেশের ল্যাবে করোনা ভাইরাস তৈরি করে অন্য দেশে আঘাত করা কিংবা শরণার্থীরা কোভিডে বেশি আক্রান্ত হন-এগুলোর সঙ্গে ধর্মীয় বিষয়গুলোকে কোথাও কোথাও জড়িয়ে দিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোকেই উস্কে দেয়া হয়৷

আমরা যখন দূর্বল বোধ করি এবং যখন কোন কিছুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করতে পারছি না বলে মনে হয়, তখনই এ ধরনের তত্ত্ব ছড়ায় বলে মনে করেন হানাফি৷

সূত্রঃ এএফপি