বয়সকালে দ্বীন শিক্ষা: প্রয়োজন ও প্রক্রিয়া

প্রকাশিত: ২:২৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৩, ২০২০

||ফারুক আবদুল্লাহ||

একটা বয়স পার হয়ে যাওয়ার পর মানুষ তার অতীত জীবনকে নিয়ে আবার ভাবে। জীবনে কী কী করলাম, কী করার ছিল, এই জীবনের কতটুকু অর্জন- ইত্যাদি বিষয়ের পরিসংখ্যান মিলানোর চেষ্টা করে। ঠিক এই সয়মটাতে এসে অনেকেই ধর্ম-চর্চা ও দ্বীনি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কিন্তু কিভাবে কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। যারা এমন পরিস্থিতিতে আছেন, তাদের জন্য আজকের এই লেখা।

 

ক. আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর আনুগত্যের জন্য। আল্লাহ তায়ালা বলেন- আমি সৃষ্টি করেছি জিন ও মানুষকে এজন্য যে তারা আমারই ইবাদাত করবে। (সূরা যারিয়াত ৫১:৫৬)

তাঁরই ইবাদাত করার জন্য আল্লাহ মানব ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন- এর অর্থ হচ্ছে আপনার সব কাজ ও পদক্ষেপে আল্লাহর অনুগত্যের নিয়ত থাকতে হবে এবং তা পরিলক্ষিত হতে হবে। আল্লাহর হুকুম জীবনের সমস্ত অঙ্গন জুড়ে পরিব্যপ্ত। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রজীবন সব ক্ষেত্রেই আল্লাহর নির্দেশ বিদ্যমান। প্রকৃত মুমিন হতে হলে আপনাকে অবশ্যই জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করতে হবে। এজন্যই একজন মুসলমানকে সবার আগে জানতে হয় জীবন যাপনের ক্ষেত্রে তার জন্য কী কী নির্দেশনা আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে। এ বিষয়গুলো জানার নামই হচ্ছে ‘দ্বীন শিক্ষা’।

 

খ. ঈমান-আমল রক্ষা হওয়ার পাশাপাশি দ্বীনি শিক্ষার রয়েছে অনেক ফযিলত। যেমন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে ইলম দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহুগুণে বাড়িয়ে দিবেন। (সূরা মুজাদালা ৫৮:১১)

আল্লাহ তা’আলা স্পষ্ট করে বলেছেন যারা ঈমানদার তাদেরকে অবিশ্বাসীদের উপর সম্মানিত করবেন। আর ঈমানদারদের মধ্যে যারা জ্ঞানী, তাদেরকে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী নির্বিশেষে সবার উপর দান করবেন মর্যাদা।

অপর দিকে হাদীসে নববীতে রাসূল ﷺ এর ইরশাদ, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে ব্যক্তি, যে কোরআন শিখে এবং শিখায়। (সহীহ বুখারী :৫০২৭)

সুতরাং দ্বীনি শিক্ষা অর্জনকারী ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে সবচে উত্তম ব্যক্তি। আর একজন ‍মুমিন বান্দার আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম ব্যক্তি হিসেবে পরিগনিত হওয়ার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!

অন্য হাদীসে এসেছে- যে ব্যক্তি ইলম শিক্ষার জন্য কোন পথ বা পদ্ধতি অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯) আরেক হাদীসের ভাষ্য- আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান করেন। (সহিহ বুখারী: ৭১)

একজন মুমিন হিসেবে আমাদের যা চাওয়া-পাওয়া হতে পারে, তার সবই দ্বীনি শিক্ষার ফযিলতের অন্তর্ভুক্ত। তাহলে কেন আমরা দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করবো না?

 

গ. বয়স বেড়ে যাওয়ার পরে যারা দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করতে চান, তাদের মাঝে দুই ধরণের মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি রয়েছেন। ১- কোনো সংকোচ ছাড়াই আগ্রহ প্রকাশ করেন। এটা মাশাআল্লাহ প্রশংসার। ২- প্রচুর সংকোচে ভুগেন। কাউকে নিজের আগ্রহের কথা জানান না। এবং ভাবতে থাকেন যে আমার তো আর এখন শেখার বয়স নাই। এভাবেই নিজের ইচ্ছাকে চাপা দিয়ে রাখেন। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের কোনোভাবেই এমন চিন্তা করার সুযোগ নাই। দ্বীনি শিক্ষা খাদ্যের মতই জরুরী। ক্ষুধার কথা প্রকাশ করতে আমাদের যদি সংকোচ না হয়, তাহলে দ্বীনি শিক্ষার আগ্রহ প্রকাশ করতে সংকোচ হবে কেন?

শিক্ষার ক্ষেত্রে যারা আমাদের সর্বোত্তম আদর্শ অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম, তাদের অধিকাংশই বয়স হয়ে যাওয়ার পরে ইলম অর্জন করেছেন। সীমিত কয়েকজন সাহাবী ছাড়া যাদের নাম আমরা শুনি তাদের প্রায় সবারই আমাদের প্রচলিত ছাত্রত্বের বয়স পার হয়ে গিয়েছিল। তারপরও তারা শিখেছেন এবং মুসলিম উম্মাহর সবচে বড় আলেম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।

খোদ ওমর রা. এর অবস্থাই দেখুন, বয়স হবার পরও কীভাবে তিনি দ্বীনি ইলম শিখেছেন। তিনি বলেন, আমি ও আমার এক আনসারী প্রতিবেশী পালাক্রমে নবীজির কাছে যেতাম। সে একদিন থাকতো। আমি একদিন থাকতাম। যেদিন আমি থাকতাম সেদিনের ওহী ও অন্যান্য বিষয় আমি তাকে জানাতাম। আর যেদিন সে ‍থাকতো সেও অনুুরূপ করত। (সহীহ বুখারী: ৮৯)

কাজেই দ্বীনি ইলম শিক্ষার সাথে বয়সের কোনো সম্পর্ক নাই। এবং দ্বীনি ইলম শিক্ষার যে ফযিলত তা কোনো বয়সের সাথে নির্দিষ্ট না। যে কোনো বয়সের মানুষই এই ফযিলত অর্জন করতে পারবেন।

একবার আবু আমর ইবনুল আলা নামক এক তাবেয়ীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল- বৃদ্ধ বয়সে কি ইলম শিক্ষা করা যায়? তখন তিনি বলেছিলেন, বৃদ্ধ বয়সে যদি বেঁচে থাকা যায়, তাহলে বৃদ্ধ বয়সে ইলম অর্জন করা যাবে না কেন? (আল ফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ- খতীব বাগদাদী)

এমনিভাবে যারা আমাদের ইতিহাস আলোকিত করে রেখেছেন তাদের অনেকের ব্যপারে বর্ণিত আছে, তারা মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ইলম চর্চা করেছেন।

 

ঘ. পরিণত বয়সে দ্বীন শিখতে গিয়ে আমাদের কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। স্মৃতি শক্তি কমে যাওয়া। মুখস্থ হতে না চাওয়া। অতিরিক্ত পরিশ্রম সহ্য না হওয়া। এসব সমস্যাকে অস্বীকার করার সুযোগ নাই। কিন্তু পরিণত বয়সে দ্বীন শেখার কিছু ইতিবাচক ‍দিকও আছে। পরিণত বয়সে মানুষের বোধ-বুদ্ধি পোক্ত থাকে। অনুধাবন ক্ষমতাও ভাল থাকে। তাছাড়া দ্বীনি শিক্ষাকে কার্যত প্রয়োগ করারও সুযোগ থাকে বেশি। সবচে বড় কথা- নিজ আগ্রহে যে ব্যক্তি পরিণত বয়সে ইলম শিখতে চাচ্ছে, তার মনোযোগ থাকবে শতভাগ। যেহেতু তাকে কেউ বাধ্য করে নি। আর শিক্ষার ক্ষেত্রে মনোযোগই সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষ কোনো বিষয়ে গুরুত্ব দিলে সেটা তার আয়ত্তাধীন হতে বেশি সময় লাগে না। সুতরাং বয়স হয়ে গেছে বলে অজুহাত হাজির করা খুবই বোকামি হবে।

আরেকটা বিষয় এখানে লক্ষণীয়। বয়স্কদের দ্বীন শিক্ষা দ্বারা এটা উদ্দেশ্য না যে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে মাদরাসায় ভর্তি হয়ে যেতে হবে। বরং প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝে কিছু সময় বের করে দ্বীনি বিষয়ে পড়া যেতে পারে। আমাদের দেশে এমন অসংখ্য মানুষ আছে যারা নিজের দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু একটু করে ইলম শিখছেন। আমাদের চারপাশে এমন অনেক ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার আছেন, যারা পেশাদারিত্বের পাশা-পাশি তাবলীগ করছেন। আলেম ওলামাদের কাছে সময় দিয়ে দ্বীন সম্পর্কে অবগত হচ্ছেন। তারমানে আমরা চাইলে নিজেদের কাজকর্ম সব ঠিক রেখেই দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করতে পারি।

 

. এখন প্রশ্ন হতে পারে দ্বীনি শিক্ষা কিভাবে শিখবো? কতটুকু শিখবো? আসলে তো শিক্ষার কোনো শেষ নাই। তবে ‘কুরআন বিশুদ্ধভাবে পড়তে শেখা ও প্রয়োজনীয় মাসআলাগুলো জানা’ এটা তো একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের সবার দায়িত্ব। এছাড়া আকীদা বিষয়ে আমাদের পড়াশোনা যেহেতু খুবই সীমিত, তাই আকাইদ বিষয়েও পড়া যেতে পারে। বিশ্বায়নের এই সময়ে চারদিকে অবিশ্বাসের যে জোয়ার বইছে, আকিদা নিয়ে যথেষ্ট পড়াশোনা না থাকলে আমাদের ঈমান হেফাজত করা কঠিন হয়ে যাবে।

‘কীভাবে শিখবো’ প্রশ্নের উত্তরে থানভী রহ. এর একটা বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে আমাদের সময় ও সমাজ অনুযায়ী কিছু কথা তুলে ধরছি।

 

• দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের জন্য কিছু কার্যকর পদ্ধতি-

  1. দ্বীনি বই-পুস্তক পড়া কিংবা অন্যকে দিয়ে পড়িয়ে শোনা। বই-পুস্তক পড়ার ক্ষেত্রে কোনো আলেমের পরামর্শে পড়া ভাল। কারণ বাজারে হাজার রকমের বই পাওয়া যায়। সব বই সব ধরণের পাঠকের জন্য উপযুক্ত না। কিছু বই পড়ে ফায়দার চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়। এজন্য এসব বিষয়ে জানাশোনা আছে এমন কোনো আলেমের পরামর্শে পড়তে হবে।
  2. পরিবারের লোকজনদেরকে নিজে পড়ানো কিংবা অন্যকে দিয়ে পড়ানোর ব্যবস্থা করা। যারা পড়তে জানে না তারা পড়তে জানে এমন কারো মাধ্যমে পড়া শিখে নিবে। এর জন্য খরচের প্রয়োজন হলে খরচ করতে হবে। দুনিয়ার প্রয়োজনে আমরা কত খরচই তো করছি!
  3. ওলামায়ে কেরাম থেকে বিভিন্ন বিষয়ে মাসআলা জিজ্ঞস করা। যে কোন প্রয়োজনে নির্ভরযোগ্য কোনো আলেমের শরণাপন্ন হওয়া। প্রয়োজনে একটা নোটবুক তৈরি করা যেতে পারে। যেখানে প্রশ্নগুলো লেখা থাকবে। সম্ভব হলে পাশাপাশি উত্তরগুলোও লিখে ফেলবে। এতে করে জানার পরিধি এবং আগ্রহ দুইটাই বৃদ্ধি পাবে।
  4. ওয়াজ শোনা। এটা সবচে সহজলভ্য পন্থা। বর্তমানে ওয়াজ শোনা খুবই সহজ একটি বিষয়। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এখন অনেক ওয়াজের ভিডিও অডিও পাওয়া যায়। দেখে শুনে যারা মুখলিস এবং প্রয়োজনীয় কথাই শুধু বলেন এমন বক্তাদেরকে শোনা উচিত। অন্যথায় হাসি-ঠাট্টার ওয়াজ শুনে সময় পার হবে কিন্তু দ্বীন আর শেখা হবে না।
  5. বিশেষজ্ঞ আলেমের সংস্পর্শে থাকা। অর্থাৎ কোন বুযুর্গ আহলে দিল শায়খের পরামর্শে চলা। তার কাছে নিজের দিলের অবস্থা জানানো। এছাড়া দাওয়াত ও তাবলীগও বর্তমান সময়ের একটি দ্বীন শেখার কার্যকরী মাধ্যম।

পরিণত বয়সে দ্বীন শেখার ক্ষেত্রে একটা বিষয় আমাদেরকে খুব ভালভাবে খেয়াল রাখতে হবে। সেটা হলো সব ধরণের বিতর্ক এড়িয়ে চলা। অনেক ভাই দ্বীন শিখতে এসে এমনভাবে বিতর্কে জড়িয়ে যান যে- তিনি দ্বীন শেখা বাদ দিয়ে দ্বীন সংশোধনে লেগে যান। ফলশ্রুতিতে তার আর দ্বীন শেখা হয় না। সর্বোচ্চ কিছু বিতর্কিত মাসআলা মুখস্থ হয়। বিতর্কিত আলোচনা সম্বলিত ওয়াজ এবং বই-পুস্তক এড়িয়ে যেতে হবে। কারো ব্যপারে হুটহাট সিদ্ধান্ত নেয়া বর্জন করতে হবে। দ্বীন শিখতে গিয়ে গীবতের ভয়াবহতা যেন ভুলে না যাই। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইখলাসের সাথে দ্বীন শিখার তাওফীক দান করুক।

[ লেখাটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মাওলানা শাহাদাত সাকিব এর একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে তৈরি। ]