ব্যাটল অব অটলুকভেলিঃ ওসমানীয়দের ভাগ্যনির্ধারণী যুদ্ধ

প্রকাশিত: ৪:৪৩ অপরাহ্ণ, জুন ৬, ২০২০

লিখেছেনঃ মেহরান তাহমীদ খান

১৪৬৯ সাল

ইউরোপে যখন অটোমানদের সাথে ভেনিস-হাঙ্গেরি আর পোপতন্ত্র-জোটের যুদ্ধ চলছিল, তখন পূর্বে শুরু হয়েছিল আরেক বিবাদ। এই বিবাদ ছিল পশ্চিমের যুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

 

সেলজুকদের পতনের পর আনাতোলিয়ায় সেলজুক সালতানাত-ই-রোমের উত্তরাধিকার নিয়ে সেই সুলতান মুরাদ আউয়ালের সময় থেকে অটোমানদের সাথে কারামানিদের লড়াই চলছিল। এই লড়াইকে সমাপ্তির দিকে নিয়ে এসেছিলেন সুলতান বায়েজিদ ইয়িলদিরিম, কিন্তু কারামানের পরাজিত বে পালিয়ে গিয়ে আমির তাইমুরের দরবারে আশ্রয় নিলে খেলার ছক পাল্টে যায়। পরবর্তী সময়ে বায়েজিদ তার কাছে পরাজিত হবার পর অটোমানদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যায়। এই ধাক্কা সামলে উঠতে তাদের প্রায় পঞ্চাশ বছর লেগেছিল।

সুলতান মুরাদ সানির সময়ে অটোমানরা ফের কারামান আক্রমণ করে। সেবার কারামানের বে মামলুক সুলতানের দরবারে আশ্রয় নেন। তখনো অটোমানরা মামলুকদের নিজেদের চেয়ে উচ্চ মর্যাদার বলে মনে করত। তাই কারামান সেবারের মতো বেঁচে যায়। কিন্তু সুযোগ বুঝে অটোমানদের শত্রুদের সাথে হাত মেলাতে কারামান কখনোই দ্বিধা করেনি। সেলজুকদের রাজধানী কোনইয়া ছিল তাদের দখলে, তাই অটোমানরা আনাতোলিয়ার একচ্ছত্র নেতৃত্বের দখলও পাচ্ছিল না।  সুলতানের আদেশে জেদিক আহমেদ পাশা ১৪৬৬ সালে অটোমানদের পৌনে দুই শ বছরের পুরনো শত্রু কারামানিদের তাড়িয়ে কারামান জয় করে নেন।

 

কারামান আনাতোলিয়ার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ছিল। আর আক-কয়ুনলু আমিরাত ছিল উত্তর-পূর্ব আনাতোলিয়ায়। কারামান অটোমানদের হাতে এসে পড়ায় একদিকে অটোমানদের পূর্ব সীমান্তের প্রতিবেশী হলো আক-কয়ুনলু। অন্যদিকে,  দক্ষিণে অটোমানদের সীমান্ত চলে গেল সিরিয়ার মামলুক সালতানাতের কাছাকাছি।

এখানে এসে সমস্যাটা আর আঞ্চলিক রইল না। এই সমস্যা থেকে শুরু হলো খেলাফত নিয়ে এক সুদীর্ঘ লড়াই।

উজুন উজ্জল হাসান ১৪৬৬ সালে মুহাম্মদ আল ফাতিহ এর সাথে লড়াই করার মতো অবস্থায় ছিলেন না। পূর্বে তার ঘাড়ের ওপরে হাজির ছিল চিরশত্রু কারা-কয়ুনলু আমিরাত, তাদের দখলে ছিল পুরো ইরাক আর আজারবাইজান সহ ককেশাসের একটা বিরাট অংশ। ইরানের একটা বিশাল এলাকা ছিল কারা-কয়ুনলুদের প্রভাব বলয়ে।

তাইমুরি সাম্রাজ্য ভেঙ্গে যাবার পর ধীরে ধীরে ইরাক, ইরান ও ককেশাসে কারা-কয়ুনলু ও আক-কয়ুনলু এই দুটি শক্তিশালী আমিরাত গড়ে ওঠে। আদিতে এরা ছিল দুটি তুর্কমান গোত্র। আক-কয়ুনলু মানে সাদা ভেড়া আর কারা-কয়ুনলু মানে কালো ভেড়া।

১৪৬৯ সালে পূর্ব আনাতোলিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে চাপচুরমাকের যুদ্ধে কারা-কয়ুনলুর সুলতান জাহান শাহ আক-কয়ুনলুর খান উজুন হাসানের হাতে পরাজিত হলে সমগ্র ইরাক ও ককেশাস উজুন হাসানের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এরপর উজুন হাসান পূর্বে এগিয়ে গিয়ে তাবরিজ অধিকার তাবরিজকে নিজেদের রাজধানী ঘোষণা করলেন। সেই সাথে তিনি ঘোষণা করলেন যেহেতু আব্বাসীয় খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ তার দখলে এসে গেছে, তাই তারই মুসলিম জাহানের খলিফা হওয়া উচিত।

এই ঘোষণা শুনে ঘাবড়ে গেল মামলুকরা। কারণ আব্বাসীয় খলিফা ছিলেন মামলুকদের কাছে আশ্রিত। খলিফাকে আশ্রয় দেওয়া এবং হজের ব্যবস্থাপনা তাদের কাছে থাকায় তারা গোটা ইসলামি জাহানের নেতার আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। এবার তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল।

 

ওদিকে মুহাম্মাদ আল ফাতিহর কাছেও ছিল খলিফা হবার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ। তার যুক্তি ছিল মামলুকরা যখন ক্রুসেডার আর মোঙ্গলদের সাথে লড়েছিল তখন ইসলামী দুনিয়ার নেতৃত্ব তাদের হাতে থাকাটাই ছিল যৌক্তিক, কিন্তু বিগত প্রায় এক শতাব্দী ধরে ক্রুসেডের পুরো লড়াইটা অটোমানরা একাকীই লড়ে যাচ্ছে। তাই ইসলামি জাহানের নেতৃত্বের হক তাদেরও আছে।

কে হবে ইসলামি জাহানের নেতা, তা নিয়ে উজুন হাসান ও মুহাম্মাদ আল ফাতিহর দাবির মুখে শুরু  হতে থাকে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ। কারামানের পীর আহমেদ এসময় উজুন হাসানের কাছে আশ্রয় নিলে মুহাম্মাদ আল ফাতিহর সাথে উজুন হাসানের সংঘাত হয়ে ওঠে অনিবার্য।

শাহানশাহ-ই-ইরান, পাদিশাহ-ই-ফার্স, সুলতান আস সালাতিন, খাকান-ই-তুর্কমান, খান-ই আক কয়ুনলু উজুন হাসানের দূত এসেছে ইস্তাম্বুলে। পূর্ব আনাতোলিয়া, কুর্দিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কারাবাগ, মেসোপটেমিয়া, সমগ্র দক্ষিণ তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান ও বেলুচিস্তানের একচ্ছত্র অধিপতি অটোমান সালতানাতের সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহের কাছে কর দাবি করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, ত্রেবিজন্ড ও কারামান দখলের ক্ষতিপূরণবাবদ তাকে যদি এক লক্ষ দিনার না পাঠানো হয় এবং বার্ষিক ২৫হাজার দিনার কর হিসেবে না দেওয়া হয় তাহলে তিনি তার বাহিনী নিয়ে এসে সুলতানকে ক্ষমতাচ্যুত করবেন। বসফরাসের এপার থেকে অটোমানদের নাম নিশানা মুছে দেওয়া হবে।

সুলতানের চেহারায় ক্রোধের বদলে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল।

তিনি বিনীত কন্ঠে দূতকে জানালেন, তোমাদের খানকে বল এ বছর আমার আর্থিক অবস্থা ভালো নেই, আগামী বছর তোমাদের যা প্রয়োজন তা আমি নিজে গিয়ে তোমাদের দিয়ে আসব।

মুহাম্মাদ এখন আর সেই কন্সটান্টিনোপল বিজয়ী একুশ বছরের তরুন নন, অথবা নাইটদের সামনে রুখে দাঁড়ানো চব্বিশ বছরের বেপরোয়া যুবক নন।

তার বয়স চল্লিশ। সময় পেরিয়ে গেছে একটু একটু করে, নদীর স্রোতের মতই।

তিনি জানেন, উজুন হাসানের ক্ষমতা কত বেশি।

 

মুহাম্মদের মনে পড়ল, ছোটবেলায় পড়া ইতিহাসের কথা। তার পরদাদা বায়েজিদ একবার গোটা আনাতোলিয়া জয় করেছিলেন। তাইমুর লং তা কেড়ে নেন। পূর্ব আনাতোলিয়া তিনি দান করেন সাদা ভেড়া তুর্কমান উপজাতিকে। এদেরকেই আক কয়ুনলু বলা হয়।

কারা কয়ুনলুদের সুলতান জাহান শাহকে পরাজিত করার পর এরা ছেয়ে ফেলেছে মধ্যপ্রাচ্যের এক বিরাট অংশ, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যগুলোর একটার মালিক এখন আক কয়ুনলুর খান।

তার সাথে জোট বেধেছে সুলতানের সবচেয়ে বড় শত্রু ভেনিস। এমনকি পোপের সমর্থনও উজুন হাসানের পক্ষে, কারামানিরা পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে তার দরবারে। যতদুর জানা গেছে হাঙ্গেরির সম্রাটও তাকে সমর্থন জানিয়েছেন।

তিন বছর হল উজুন হাসান আজারবাইজানিদের কাছ থেকে তাবরিজ কেড়ে নিয়ে তাবরিজকে নিজের রাজধানী ঘোষণা করেছেন। তার ফরমানে যেকোনো সময় হাজির হতে পারে লাখের বেশি সৈন্য, যুদ্ধের ময়দানে ২ লাখের বেশি সৈন্য হাজির করার ক্ষমতা আছে এই সুলতানের।

 

মুহাম্মাদ গত সাত বছরে তার বেশিরভাগ অর্থ ব্যায় করেছেন নৌবহরের পিছনে। তার বেশিরভাগ সৈন্য এখন আলবেনিয়া আর হাঙ্গেরি সীমান্তে ব্যাস্ত।

বয়সের সাথে মানুষ স্থির হয়। তিনি জানেন, বেপরোয়া আচরণ এখন তাকে মানায় না।

পুরো সেনাবাহিনীর চার ভাগের তিন ভাগকে সুকৌশলে বসফরাসের এপারে নিয়ে আসা হয়েছে গত তিন মাসে।

পাহাড়ি অঞ্চলে লড়াই করার একটা বিশেষ মহড়া চলছে বারবার।

দুই শাহজাদা ভালোই বড় হয়েছে। বড় শাহজাদা বায়েজিদের বয়স ২৪, মুস্তফার বয়স ২২। বায়েজিদ কিছুটা ধীরস্থির, মুস্তফা আগুনের গোলা।

শাহজাদাদের উচু পর্বতের ওপর লড়াই শেখানোর জন্য জেদিক পাশা দিনরাত পরিশ্রম করছেন। এরই মধ্যে দুঃসংবাদটা এলো।

উজুন হাসানের বাহিনী গোটা পূর্ব আনাতোলিয়া দখল করে কারামানে প্রবেশ করেছে। আনাতোলিয়ার বেইলার্বি দাউদ পাশা উজুন হাসানের সামনে টিকতে না পেরে আনকারা থেকে পিছু হটে কোনিয়াতে চলে এসেছেন।

উজুন হাসান বলেছেন তিনি ইস্তাম্বুল লুট করে নিয়ে যাবেন।

 

ক্ষোভে ফেটে পড়লেন সুলতান।

গত ছয় মাস ধরে তিনি তৈরি হচ্ছিলেন উজুন হাসানের জন্য একটু একটু করে, তার প্রস্তুতির জন্য আরও মাসখানেক সময় দরকার ছিল।

তুর্কমান যোদ্ধা চলে এসেছেন আরও আগেই। তিনি যতটা না তার স্বার্থ পূরণ করছেন, তার চেয়েও বেশি লাভ করে দিচ্ছেন হাঙ্গেরি আর ভেনিসকে।সাত দিনের মধ্যে সুলতান মার্মারা সি, দার্দানেলিস, বসফরাস, ব্ল্যাক সি, দানিয়ুব নদীতে নৌবাহিনীর অবস্থান জোরদার করলেন। ভেনিসকে এই যুদ্ধের সুযোগ নিতে দেয়া যাবে না। বুলগেরিয়ার নিকোপলিস, সোফিয়া আর সার্বিয়ার সেমেন্দিরে স্ট্র‍্যাটেজিক পজিশনে সৈন্য রেখে বাকিদের নিয়ে তিনি ইস্তাম্বুল থেকে ইউরোপ থেকে এশিয়ায় পা রাখলেন।

 

শাইখুল ইসলাম জিহাদ ঘোষনা করেছেন। প্রতিটি শহরেই যুবকরা তৈরি হচ্ছে উজুন হাসানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য।

সুলতান জানেন এই লড়াইটা হবে তাইমুর এর সাথে বাইজিদের সেই যুদ্ধের মতোই ভয়ঙ্কর। এই যুদ্ধে হারলে অটোমান সালতানাতকে মুছে দেওয়া হবে এশিয়া থেকে। ইউরোপ একজোট হয়ে ভেনিস-হাঙ্গেরি আর মলদাভিয়া ঝাঁপিয়ে পড়বে বলকান মুসলিমদের উপর। কঠিন এই মুহূর্তে তিনি তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু রাদুকে ডাকলেন। ড্রাকুলার ছোট ভাই যখন আগস্ট এর শুরুতে সুলতান এর সাথে মিলিত হলেন শৈশবের বন্ধু সান্নিধ্য তাকে নিল নতুন সাহস।

১১ আগস্ট ১৪৭৩ সাল।  সকালবেলা দুই বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ালো আরজিনজারের এক পার্বত্য উপত্যকায়। অটোমান বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা এক লাখ আশি হাজার। কামান আছে চার শ। আক-কয়ুনলুদের তাঁবু ছেয়ে ফেলেছে পুরো দিগন্ত। সংখ্যায় তারা আড়াই লাখেরও বেশি। গোটা তুর্কমান-ইরান-আফগানের শক্তি এক করে নিয়ে এসেছেন উজুন হাসান।

সকাল আটটা।

১১ আগস্ট ১৪৭৩।

উজুন হাসান কুলকারচেলি পর্বতকে পাশ কাটিয়ে উপত্যকার পানির কূপগুলো কব্জা করে নিয়েছেন। তার আড়াই লাখ সৈন্যের সবাই ঘোড়সওয়ার। বাহিনীর পুরো সেন্টারটা হেভি ক্যাভালরিদের নিয়ে তৈরি। এদের একদম মাঝখানে অবস্থান নিয়েছেন উজুন হাসান।

বাহিনীর অগ্রভাগে উগুরলু মুহাম্মাদ, তার নেতৃত্বে পঞ্চাশ হাজার সওয়ার। ডানে জয়নাল আবেদীন,  পঞ্চাশ হাজার ঘোড়সওয়ার তার কমান্ডে। বাঁয়ে কাসিম বে’র অধীনে ত্রিশ হাজার সওয়ার। এই তিন বাহিনীর পেছনে উজুন হাসান, তার সাথে আছে চল্লিশ হাজার হেভি ক্যাভালরি, এদের অনেকেই বন্ধুকে সজ্জিত। বাহিনীর পেছনে আছে রিজার্ভ ফোর্স, তাদের সংখ্যা এক লাখের কাছাকাছি।

মুহাম্মাদের সেনাবাহিনী উপত্যকার ঢালু দিকটাতে দাঁড়িয়ে আছে। বাহিনীর অগ্রভাগে বাইজান্টাইন বংশেরই এক সন্তান। কনস্টান্টিনোপল জয়ের পর কাপিকুলু বাহিনীতে আসা খাস মুরাদ পাশা। তার অধীনে দশ হাজার তিমারী সিপাহী। তার দুপাশে চার আকিনজি বে’র নেতৃত্বে মোট ত্রিশ হাজার আকিনজি লাইট ক্যাভালরি।

 

ডানে বায়েজিদের বিশ হাজার আনাতোলিয়ান সিপাহী। বাঁয়ে মুস্তফার অধীনে বিশ হাজার রুমেলিয়ান সিপাহী। ফরমেশনের ঠিক সেন্টারে আছে সুইডিশ প্রযুক্তিতে তৈরি করা ওয়াগন ফোর্ট্রেস আরাবা। আরাবার ভিতরে গেরিলা ফরমেশনে দশ হাজার জানিসারির নেতৃত্বে আছেন রাদু বে। তার ঠিক পেছনেই সুইসাইড মিশন সারভাইভ করে আসা চার হাজার সিলাহদার দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে আছেন সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ। আরাবার পেছনে আছেন জেদিক আহমেদ পাশা, আট হাজার কাপিকুলু হেভি ক্যাভালরি নিয়ে।

 

এদের পিছনে রিজার্ভ বাহিনীর নেতৃত্বে মাহমুদ পাশা আর দাউদ পাশা। চল্লিশ হাজার আজব তাদের অধীনে। পেছনের ডান দিকে লুকিয়ে আছে আকিনজি লাইট ক্যাভালরি বাহিনীর আরেকটা অংশ।

যুদ্ধ শুরু হলো। উগুরলু মুহাম্মাদ দুর্দান্ত দাপটে তার সওয়ারদের নিয়ে অটোমানদের উপর ঝড় তুললেন। এক ঘণ্টার মধ্যেই অটোমান বাহিনীর ডান বাহুতে চির ধরল। তুর্কমেন লাইট ক্যাভালরি দমকা হাওয়ার মত একবার আছড়ে পড়ত, ঠিক পরমুহুর্তেই পিছু হটত। বায়েজিদ তার বাহিনী নিয়ে তুর্কমেনদের পিছু ধাওয়া করতেই তাদের ছোঁড়া তীরের ঝাঁক তার বাহিনীকে ছেঁকে ধরল। প্রচুর সৈন্য হারিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হলেন শাহজাদা। ফ্ল্যাংকিংয়ের সুযোগ পেয়ে কাসিম পাশা সেন্টারে চাপ বাড়াল। কিন্তু খাস মুরাদ পাশার বীরত্বের কারণে তার বেশি দূর আগানো সম্ভব হয়নি।

 

ওদিকে মুস্তফা রুমেলিয়ান ক্যাভালরি নিয়ে আটকে রাখছিলেন জয়নাল আবেদীনের বাহিনীকে। খাস মুরাদ পাশা সংখ্যায় কম হলেও সমানে সমান লড়ছিলেন উগুরলু মুহাম্মদের সাথে। কিন্তু আক-কয়ুনলুদের লাইট ক্যাভালরিদের দ্রুতগতির পার্থিয়ান শটের সামনে পড়ে তার সৈন্যরা কাতারে কাতারে মরতে শুরু করল। মধ্য এশীয় স্তেপের যোদ্ধাদের সাথে গতিতে পাল্লা দেয়া আরব বেদুইন ছাড়া অন্য কারো পক্ষেই সম্ভব না।

 

এরই মধ্যে ময়দানে নেমে এলেন উজুন হাসান নিজে। এবার বায়েজিদের রাইট উইং একেবারেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। বীরের মতো লড়েও জীবন দিলেন খাস মুরাদ পাশা ও তার বেশিরভাগ সৈনিক। অটোমানদের সেন্টার ফ্রন্টের ডিফেন্স সিস্টেম একেবারে ভেঙ্গে গেল।

 

বামে মোস্তফা শত্রুর সংখ্যাও গতি কোনোটাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না।  সুলতানের মুখের সামনে চলে এলো আক-কয়ুনলুর বিশাল বাহিনী। ক্যাভালরি চার্জের আদেশ দিলেন হাসান আগা। প্রায় এক লাখ অশ্বারোহী বর্শা বাগিয়ে একরোখাভাবে ছুটল সুলতান বরাবর।

 

বন্ধুর বিপদে নিজের প্রাণ হাতে নিয়ে এগোলেন রাদু বে। দশ হাজার জানিসারি একসঙ্গে হেকে উঠলো, ইয়া আল্লাহ, বিসমিল্লাহ, আল্লাহু আকবার। তিনহাজার জানিসারি সামনে এগিয়ে গুলি ছুড়তে শুরু করল। পেছন থেকে বাকি সাত হাজার ঝাঁকে ঝাঁকে তীর ছুড়তে থাকল, গর্জে উঠল তোপখানার চার শ কামান। এ ছাড়াও আরাবার ওয়াগন গুলোর ভেতর থেকে সমানে ছোড়া হচ্ছিল তীর।

 

ঘুরে গেল যুদ্ধের মোড়। ক্যাভালরি চার্জের সামনের দিকে থাকা সৈন্যরা কামানের গোলার সামনে পড়ে তছনছ হয়ে গেল। বিকট শব্দে ঘাবড়ে গিয়ে উল্টো দিকে ছুটল অনেক ঘোড়াই। সামনের কাতারের উল্টোদিকে ঘুরে যাওয়া ঘোড়াগুলোর সাথে পেছন থেকে আসা ঘোড়াগুলোর মুখোমুখি সংঘর্ষে পুরো আক-কয়ুনলু বাহিনীর ফরমেশন নষ্ট হয়ে গেল। মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হল অনবরত তীরবৃষ্টি ও  গোলাবর্ষণ। বেলা বারোটার মধ্যেই উজুন হাসানের প্রায় পঞ্চাশ হাজার সৈন্য লাশ হয়ে গেল।

বিশৃঙ্খলার সুযোগে বাহু থেকে মোস্তফা তীরের মত ঢুকে পড়লেন জয়নাল আবেদীনের ব্যুহ ভেদ করে। মোস্তফার একার তলোয়ারের আঘাতেই ত্রিশ জনেরও বেশি তুর্কমানের প্রাণ গেল। একটু সময় নিয়ে নিজেকে সামলে সেন্টারে আবারো মানুষের ঢেউ তুলে এগোলেন উজুন হাসান।

 

এবার বেড়িয়ে এলেন স্বয়ং সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ। সুলতানের কাপিকুলু হেভি ক্যাভালরি আর রাদু বে’র জানিসারি আর্টিলারি-ইনফ্যান্ট্রি  মাত্র দু ঘন্টায় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল আক-কয়ুনলুর সেন্টার। এর মধ্যে লড়াইয়ে ফিরলেন  ডান বাহুর বায়েজিদ। হঠাৎ বাম বাহু থেকে উধাও হলেন মুস্তফা। পেছন থেকে দাউদ পাশা চলে এলেন একদম সামনে। সুলতান আর রাদু দুইজন দুটো বল্লমের মত ঘেরাও করে ফেললেন উজুন হাসানকে। সুলতানের প্রিয় কামান সুলতানিয়া  আর ব্যাসিলিকা অগ্নি উদগীরণ করতে লাগল। সাথে যোগ দিল কামান বহরের হাউইৎজারগুলো। ব্যাসিলিকা আর  সুলতানিয়ার এক-একটা ফায়ারে আধ টন ওজনের গোলা আছড়ে পড়ছিল আক-কয়ুনলুদের উপর। এমন বিভীষিকা তারা কখনো দেখেনি। উজুন হাসানের পার্সোনাল গার্ড বাহিনী অচিরেই ছিন্নভিন্ন মাংষের স্তুপে পরিণত হল।

 

এরইমধ্যে পেছনে আক-কয়ুনলু শিবিরের ঠিক পেছনে পৌছে গেলেন শাহজাদা মুস্তাফা। তারপর তাদের ওপর বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বায়েজিদ ডানদিক থেকে পালাবার পথ আটকে দিলেন। তিন থেকে ঘেরাও হয়ে পতাকা ফেলে পালালেন উজুন হাসান। আট ঘন্টার যুদ্ধে চুরমার হয়ে গেল আক-কয়ুনলুর গর্ব।

 

আরজিনজারের দুমানলিটেপ পর্বতের চূড়ায় বিজয়ীর বেশে আসরের নামাজ আদায় করলেন সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ।

এই যুদ্ধের মাধ্যমে উজুন হাসানের খলিফা হওয়ার স্বপ্নের বারোটা বেজে গেল। সেই সাথে শেষ হলো বাইজু নোইয়ন থেকে তাইমুর হয়ে উজুন হাসান পর্যন্ত প্রায় দু শ ত্রিশ বছর ধরে পূর্ব আনাতোলিয়াতে টিকে থাকা মঙ্গল আধিপত্যের উত্তরাধিকার।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনীগুলোর একটাকে পরাজিত করে সত্তর বছর আগে পরদাদার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিলেন মুহাম্মাদ।

 

ব্যাটল অব অটলুকভেলি। পঞ্চদশ শতাব্দীর ওসমানীয়দের ভাগ্যনির্ধারণী এই যুদ্ধটি হয়েছিলো মুসলিমদের মধ্যেই।