বেকারত্ব কমবে কারিগরি শিক্ষায়

প্রকাশিত: ১০:৫২ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২০

লিখেছেন বাংলাদেশ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক।

 

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলো গত ৩১ মে। এটা যেমন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, তেমনি চলার পথে একটা বড় বাঁকও হতে পারে। কারণ দেখা যায় এ স্তর থেকেই কর্মসংস্থানের বাস্তব প্রেক্ষাপট ও পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে অনেকে তার গন্তব্য বা যাত্রাপথ বদলে ফেলে।

এ বছরের প্রেক্ষাপট অন্যান্য বছরের চেয়ে আলাদা। কমবেশি আমরা সবাই জানছি, আগামীর পৃথিবী হবে প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবর্তনমুখী। তবে কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের প্রভাবে এই পরিবর্তন যে এত দ্রুত হবে, তা একেবারেই অনুমেয় ছিল না। যারা এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো, তারা এত দিন যে পৃথিবী বা প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে পেশাজীবনের পরিকল্পনা করেছে, মাত্র দু-তিন মাসের ব্যবধানে সেটা আমূল বদলে গেছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হবে। আর এই পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিতে হবে কারিগরি দক্ষতাকে।

এবার যারা এসএসসি উত্তীর্ণ হলে, দ্রুত পেশাজীবনে প্রবেশ করতে চাইলে তারা সামনে পা বাড়ানোর আগে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে পারো। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৪৫০টির বেশি পলিটেকনিক রয়েছে, যেখানে এসএসসি পাসের পর ভর্তি হয়ে ৪ বছরের মধ্যে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হিসেবে সরকারি বা বেসরকারি, দেশে বা বিদেশের প্রতিষ্ঠানে নিজের স্থান করে নেওয়া সম্ভব। অথবা উদ্যোক্তা হয়ে নিজের প্রযুক্তি জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে ব্যবসাও শুরু করা যায়।  তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস কৌশল, যন্ত্রকৌশল, অটোমোবাইল, ফুড, এনভায়রনমেন্টাল, কেমিক্যাল, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, স্থাপত্য, টেলিযোগাযোগ—প্রতিষ্ঠানভেদে এমন নানা বিষয় নিয়ে পড়ার সুযোগ আছে। ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হয়ে পরবর্তী সময়ে চাইলে স্নাতক ডিগ্রিও অর্জন করা যায়।

সবাই হয়তো কারিগরি শিক্ষায় পড়াশোনা করবে না বা সুযোগ পাবে না। কিংবা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সাধারণ শিক্ষাক্ষেত্রেই পড়বে। তবে যারা সাধারণ শিক্ষায় ভবিষ্যৎ শিক্ষা পরিকল্পনা করছে, তাদেরও নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি কারিগরি জ্ঞান অর্জন করতে হবে সামনের পৃথিবীতে নিজের অবস্থান টেকসই করার জন্য।

ইতিমধ্যে আমরা বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করেছি। যেমন অনলাইন ক্লাস, ক্লাউড বেজড লার্নিং, অনলাইনের মাধ্যমে ভর্তি এবং পরীক্ষা, হোম বা ভার্চ্যুয়াল অফিস, অনলাইন মিটিং, লাইভ স্ট্রিমিং, অনলাইন সাক্ষাৎকার, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল মার্কেটিং, রোবটিকস, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি, অগমেন্টেড রিয়েলিটি, ব্লকচেইন, বিগ-ডেটা ইত্যাদি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সামনের দিনে সব কর্মপরিকল্পনা পরিচালিত হবে বলে বিশেষজ্ঞরা প্রায় নিশ্চিত করছেন এবং আমরা বাস্তবে তা গত কয়েক মাসে দেখতে পাচ্ছি। ভবিষ্যতে এর ব্যবহার আরও বাড়বে এবং পরিবর্তিত ও উন্নত হবে। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে তারাই এগিয়ে থাকবে, যারা প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত বা এই সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত।

এবার যারা এসএসসি পেরোল, তাদের কর্মক্ষেত্র হবে এমন, যা এখনো শুরুই হয়নি। নতুন প্রযুক্তি, যা হয়তো এখনো আবিষ্কৃতই হয়নি, সেগুলোই সমাধান করবে সেই সব সমস্যার, যার এখনো অস্তিত্বই নেই। যেসব প্রযুক্তি আমাদের কাছে এই মুহূর্তে খুব আধুনিক এবং কার্যকর মনে হচ্ছে, তা হয়তো ৫-৭ বছরের মধ্যে পুরোনো ও গতিহীন মনে হবে।

বাংলাদেশে গত ৫ বছরে প্রযুক্তিনির্ভর কাজের সংখ্যা বেড়েছে অনেক, তবে সে তুলনায় প্রযুক্তিনির্ভর কর্মীর সংখ্যা খুব কম। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ডিগ্রি অর্জনের পর তরুণদের নাম লেখাতে হচ্ছে শিক্ষিত বেকারের তালিকায়। পলিটেকনিক শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম একটি দিক হচ্ছে, এখানে সেশনজট নেই এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শিক্ষাক্রম সম্পন্ন হয়। যেহেতু পলিটেকনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাক্রম, তাই একজন শিক্ষার্থীর প্রযুক্তি-জ্ঞান বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অধিকাংশ অভিভাবকের পলিটেকনিক শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে খুব একটা ধারণা নেই। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পলিটেকনিক বা কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার অভিভাবক বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কিছুটা দায়িত্ব নিতেই হবে। বর্তমান ও ভবিষ্যতের পৃথিবীতে কারিগরি দক্ষতাই বড় ভূমিকা রাখবে। সে জন্য নিশ্চয়ই কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যসূচি এবং পাঠদান পদ্ধতিকেও পরিবর্তনের আওতায় আনতে হবে।

মনে রাখতে হবে, শুধু সচেতনতার অভাবে আমরা আমাদের আশপাশে থাকা সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে পারি না। পাস করে তারপর চাকরি বা ব্যবসার প্রস্তুতি নেব, এমন সময় সম্ভবত আমদের আর নেই। বিষয়টি আমাদের শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের এই মুহূর্ত থেকে অনুধাবন করতে হবে। সবশেষে একটি কথা নিশ্চিত করে বলতে চাই, যার কারিগরি দক্ষতা আছে, তাকে বেকারত্ব স্পর্শ করতে পারে না।