বানুকবার্নের যুদ্ধ : রবার্ট ব্রুসের বিজয় ও মাকড়সার জাল বুনার ইতিহাস

প্রকাশিত: ৭:০৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০২১
স্টারলিং দুর্গে রাজা রবার্ট ব্রুসের প্রতিকৃতি।‌ ছবিঃ ইন্টারনেট।

বানুকবার্নের যুদ্ধটা হয়েছিলো ১৩১৪ সালে ইংরেজ আর স্কটিশদের মধ্যে স্টারলিং দুর্গের দখল নিতে বানুকবার্ন নদীর তীরে যুদ্ধের অবতীর্ণ হয়েছিলেন ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় এডওয়ার্ড আর ‘স্কটদের রাজা’ রবার্ট ব্রুস। নির্ভুল যুদ্ধনীতি আর কিছুটা ভাগ্যের উপর ভর করে বিশাল আয়তনের ইংরেজ বাহিনীকে সোজা বাংলায় কচুকাটা করেন রবার্ট ব্রুস।

ইতিহাসের অন্যতম এই অসম যুদ্ধে জয়ের মাধ্যমে উত্থান ঘটে রাজা রবার্ট ব্রুসের এবং একই সাথে শুরু হয় স্কটিশদের স্বাধীনতা সংগ্রাম।

 

রবার্ট ব্রুসের মাকড়শা

মাকড়সা নিয়ে এই গল্পটা আমরা কমবেশি সবাই শুনেছি। রবার্ট ব্রুস একাধিকবার স্কটিশদের ঐক্যবদ্ধ করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু বার বার তিনি পরাজিত হতে থাকেন।

 

এক পর্যায়ে সবকিছু হারিয়ে একটি গুহার ভেতর আশ্রয় নিলেন তিনি। তখন দেখলেন একটি মাকড়সা প্রবল বাতাসের মুখে একশত বার চেষ্টা করার পর জাল বুনতে সক্ষম হলো। ক্ষুদ্র মাকড়সার জাল বোনা দেখে তিনি উপলব্ধি করেন, সফল হতে হলে অধ্যবসায়ের কোনো বিকল্প নেই।

 

এই ঘটনায় অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রুস আবার সৈন্যদের জড়ো করতে শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত এই বানুকবার্নের যুদ্ধে চুড়ান্তভাবে ইংরেজদেরকে পরাজিত করতে সক্ষম হন।

 

সত্যি বলতে এই মাকড়সার ঘটনাটার আসলেই ঘটেছিলো কিনা তার পেছনে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে এটা ঠিক, সেসময় পরিস্থিতি আসলে এমনই ছিলো। স্কটল্যান্ড দখল করার পর ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম এডওয়ার্ড খুব শক্ত হাতে ব্রুসদের দমিয়ে রেখেছিলেন। পরাজিত হতে হতে একটা পর্যায়ে ব্রুসের কাজ হয়ে যায় চোরাগোপ্তা হামলা করে দুর্গ দখল করা, আর লুটপাট করে পালানো।

 

প্রথম এডওয়ার্ডের মৃত্যু

১৩০৭ সালে রাজা এডওয়ার্ডের মৃত্যু ঘটে, ক্রুসেড ফেরত এই রাজার আমলে শুধু স্কটল্যান্ড না, বরং গোটা ইউরোপেই আধিপত্য বিস্তার করে ছিলো ইংল্যান্ড। সেই বছরেই সিংহাসনে অভিষিক্ত হন তার পুত্র দ্বিতীয় এডওয়ার্ড। নতুন রাজা ব্যক্তিগত জীবনে একজন শিল্প অনুরাগী মানুষ ছিলেন, যুদ্ধবিগ্রহ তিনি একদম পছন্দ করতেন না। এবং তার অধীনস্থ লর্ডদের ভেতরেও তাকে নিয়ে অসন্তোষ ছিলো।

 

এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে স্কটল্যান্ডে আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠেন বরার্ট ব্রুস। চোরাগোপ্তা হামলা ছেড়ে সামনাসামনি যুদ্ধ করার প্রস্তুতিটা দ্বিতীয় এডওয়ার্ড ক্ষমতায় বসার সময় থেকেই নিতে শুরু করেছিলেন তিনি।

 

স্টারলিং অবরোধ

স্টারলিং দুর্গ। ছবিঃ ইন্টারনেট

 

স্কটল্যান্ডের মূল ভূখণ্ডে আধিপত্য বজায় রাখতে ইংল্যান্ডের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো সীমান্তবর্তী স্টারলিং দুর্গ। ১৩১৪ সালে এই দুর্গটা অবরোধ করেন রবার্ট ব্রুসের ভাই, এডয়ার্ড ব্রুস। জায়গামতো ইংরেজদের আটকানো গেছে – এটা টের পেয়ে তিনি নাটকীয় এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন রাজার প্রতি, ইংল্যান্ডের রাজা নিজে এসে যদি দখল নিতে পারেন দুর্গটার, তবেই অবরোধ তুলবেন এডয়ার্ড, তার আগে নয়!

 

তখন ১৩১৪ সাল, অর্থাৎ দ্বিতীয় এডওয়ার্ডের ক্ষমতায় বসার সাত বছর হয়ে গেছে। এবং নিজের নামের (কু)খ্যাতি তিনি মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন। এডয়ার্ডের এই চ্যালেঞ্জটা পেয়েই একদম লুফে নিলেন তিনি।

 

ঠিক করলেন বিশাল এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে স্কটিশদের হারিয়ে গোটা দুনিয়াকে দেখিয়ে দিবেন তিনি তার পিতার যোগ্য সন্তান, যুদ্ধে তিনিও জিততে পারেন। প্রায় বিশ হাজার সৈন্য জড়ো করে ১৩১৪ সালের মার্চ মাসে স্কটল্যান্ডের দিকে রওনা দেন রাজা – উদ্দেশ্য স্কটিশ অবরোধ থেকে স্টারলিং দুর্গকে মুক্ত করা।

 

খবরটা পেয়ে এতোদিন সুযোগের অপেক্ষায় থাকা রবার্ট ব্রুসও তার বাহিনী নিয়ে রওনা দেন স্টারলিং অভিমুখে। ইংরেজ বাহিনীকে প্রতিহত করতে হবে।

 

যুদ্ধের ছক 

আগেই বলেছি ইংরেজদের সৈন্য ছিলো প্রায় বিশ হাজার, সংখ্যাটা অনুমানিক কারণ আসলে সৈন্য কতজন ছিলো তা কেউ মাথা গুনে লিখে রাখেনি। তাদের সামনের সারিতে ছিলো অশ্বারোহী যোদ্ধা, যারা শুরুতেই শত্রুপক্ষের লাইন ভেঙ্গে দিয়ে আসতো। আর একদম পেছনে ছিলো তীরন্দাজ বাহিনী, তাদের কাজ ছিলো শর নিক্ষেপ করে শত্রুদের পদাতিক বাহিনীকে রুখে দেয়া।

 

অন্যদিকে স্কটিশদের ‘সৈন্য’ ছিলো সর্বসাকুল্যে সাত হাজারের মতো, যাদের একটা বড় অংশের তেমন কোনো ট্রেনিং ছিলো না। তবে তাদের আক্রমণের সামনের সারিতে ছিলো পাইকম্যানদের ইউনিট, যারা লম্বা আর ধারালো বর্শা দিয়ে প্রতিপক্ষের অশ্বারোহী যোদ্ধাদের বধ করতে পারতো।

 

যুদ্ধের পূর্বমূহুর্তে নিজের বাহিনীকে সংগঠিত করছেন ব্রুস।

ছোট ছোট বৃত্ত বানিয়ে অশ্বারোহীদের ঘিরে ধরে আক্রমণ করাকে স্থানীয় ভাষায় তারা বলতো ‘শেলট্রন’। এই শেলট্রন করার কাজে তারা ছিলো বেশ দক্ষ। কিন্তু এর বাইরে শখানেক অশ্বারোহী তাদেরও ছিলো, কিন্তু ইংরেজদের বিশাল বাহিনীকে রুখে দেয়ার জন্য সেই সংখ্যাটা ছিলো একেবারেই নগণ্য।

 

যুদ্ধ শুরু হলো

প্রায় দুই দিন ব্যাপী চলা এই যুদ্ধের শুরুতে একটা ঘটনা ঘটে। হেনরি দ্য বহুন নামের এক ইংরেজ আর্ল স্কটিশ সেনাপতি ব্রুসকে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহবান জানান। বহুনের উদ্দেশ্য ছিলো এক ঢিলে দুই পাখি মারা। ব্রুসকে হত্যা করতে পারলে এই যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাবে, একই সাথে নেতৃত্বহীন স্কটিশরা চিরতরে পদানত হয়ে যাবে ইংরেজদের কাছে। কিন্তু যা ঘটার কথা, তা কি সবসময় ঘটে?

 

প্রথমবার নাগালের ভেতর পেয়েই ভারী বর্মে সজ্জিত বহুনের গর্দানটা এক কোপে নামিয়ে দেন ব্রুস। আর প্রবলভাবে উজ্জীবিত স্কটিশরা বর্শা নিয়ে এগুতে শুরু করে ইংরেজদের অশ্বারোহী ইউনিটের উপর।

 

প্রচণ্ড এক কোপে বহুনের গলা নামিয়ে দিলেন ব্রুস।

 

প্রথম দিনের যুদ্ধের ছক

 

প্রথম দিনের যুদ্ধের ছক।

 

প্রথম দিনের যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাই হোক, কোনো পক্ষই তেমন সুবিধা করতে পারেনি। শেলট্রনের ফাঁদে আটকা পড়ে ইংরেজ অশ্বারোহীর দলকে পিছিয়ে আসতে হয়েছে বার বার।অন্যদিকে অশ্বারোহীদের রুখে দিলেও ইংরেজ তীরন্দাজদের ক্রমাগত তীর নিক্ষেপের ফলে সামনে এগুনো সম্ভব হয়নি স্কটিশদের পক্ষেও। তাই কোনো ফলাফল ছাড়াই শেষ হয়ে যায় যুদ্ধের প্রথম দিনটা।

 

রাতের অন্ধকারে দলবদল

সারাদিন তুমুল যুদ্ধের পর দুই পক্ষ যখন নিজেদের ক্যাম্পে ফিরে গেছে, তখন ইংরেজ শিবির থেকে আলেকজান্ডার সিটন নামে এক স্কট যোদ্ধা পালিয়ে আসেন ব্রুসের কাছে।

 

সারাদিন স্কটিশরা ইংরেজদের আটকাতে পেরেছে ঠিকই কিন্তু ইংরেজরা সংখ্যায় তখনো অনেক বেশি। যুদ্ধ করে আরও একদিন তাদেরকে ঠেকিয়ে রাখা আর সম্ভব মনে হচ্ছিলো না ব্রুসের কাছে। এমনকি ‘উচিত শিক্ষা দেয়া হয়েছে’ বলে সম্মুখ যুদ্ধ থেকে ইস্তফা দিয়ে আবার গেরিলা যুদ্ধে ফেরত যাওয়া যায় কিনা, সেটাও ভাবছিলেন তিনি।

 

এই পরিস্থিতিতে বড় একটা ভূমিকা রাখেন দলবদল করা যোদ্ধা সিটন। তিনি ব্রুসকে জানান দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা ইংরেজ যোদ্ধারা ক্লান্ত এবং যুদ্ধে অনিচ্ছুক। রাজার প্রতি তাদের কোনো আনুগত্যও নেই, তাই সংখ্যায় তারা যত বড় হোক না কেন, সম্মুখ যুদ্ধে তাদের হারানো মোটেই অসম্ভব কিছু না।

 

সিটন সোজা সাপটা ভাবে ব্রুসকে বলেন, তুমি স্কটল্যান্ড মুক্ত করতে চাও? তাহলে এটাই মোক্ষম সুযোগ। আটঘাট বেঁধে আক্রমণ করো, ইংরেজরা পালানোর সুযোগটাও পাবে না।

 

সিটনের যুক্তি ব্রুসের মন পূত হয়, তিনি পরদিন সকালে নতুনভাবে আক্রমণের পরিকল্পনা কষতে শুরু করেন।

 

শেষদিনের যুদ্ধ

পরদিন সকালে দ্বিতীয় এডওয়ার্ড যখন আবার নদীর তীর ধরে সামনে এগুতে শুরু করেন, তখন তাদেরকে প্রতিরোধ করতে নিউ পার্ক জঙ্গল থেকে হামলা শুরু করে স্কটিশরা।

 

দিনটি ছিলো রবিবার, দুই পক্ষ মুখোমুখি হওয়ার আগে দূর থেকে স্কটিশ যোদ্ধাদের হাঁটু মুড়ে প্রার্থনা করতে দেখে এডওয়ার্ড ভেবেছিলেন এরা বুঝি আত্মসমর্পণ করে তার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করছে। কিন্তু তার ভুল ভাংতে খুব বেশি সময় লাগেনি।

 

যুদ্ধ শুরুর আগে স্কটিশদের সমবেত প্রার্থনা।

 

যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লান্ত ইংরেজদের সাথে স্বাধীনতাকামী স্কটিশদের পার্থক্য স্পষ্ট হতে শুরু করে। এদিন শেলট্রনের সামনে ইংরেজ অশ্বারোহীরা পাত্তাই পাচ্ছিলো না। আর অবস্থানগত কারণে ইংরেজ তীরন্দাজদেরকে বেগ পেতে হচ্ছিলো স্কটদের নাগাল পেতে। তবে হতাহতের সংখ্যা দুইদিকেই বাড়ছিলো।

 

এমন সময় ব্রুসের একটা কৌশল যুদ্ধের গতি পুরোপুরি পালটে দেয়। আগে বলেছিলাম স্কটিশদের খুব ছোট একটা অশ্বারোহী ইউনিট ছিলো, সংখ্যায় খুব বেশি হলে তিন বা চারশো হবে। এদেরকে ভিন্ন একটা পথে পাঠানো হয় তীরন্দাজদের ‘সাইজ’ করতে। বেশ দীর্ঘ পথ ঘুরে ইংরেজদের ঠিক পেছনে এসে উপস্থিত হয়। আর নাগালের মধ্যে পেয়েই ঝাপিয়ে পড়ে ইংরেজ তীরন্দাজদের উপর।

 

দ্বিতীয় দিনের যুদ্ধের ছক

 

দ্বিতীয় দিনের যুদ্ধের ছক।

 

পেছন থেকে এই আচমকা হামলার পর ইংরেজরা আর দাড়াতে পারেনি। স্কটিশরা চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে তাদের। আর সমস্ত লাইন ভেঙ্গে দিক্বিদিক শূন্য হয়ে পালাতে শুরু করেছে আতংকিত ইংরেজ সেনারা।

 

দুর্গের দরজায় পরাজিত রাজা

পরাজয় যখন নিশ্চিত হয়ে গেলো তখন ইংরেজ সেনাপতিদের মূল লক্ষ্য হয়ে দাড়ায় রাজাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যতটা দূরে সম্ভব সরিয়ে নেয়া। স্যার গিলসের নেতৃত্বে ইংরেজদের একটি ইউনিট রাজা এডওয়ার্ডকে নিয়ে স্টারলিং দুর্গের প্রধান ফটকের সামনে নিয়ে আসে।

 

কিন্তু ইংল্যান্ডের রাজার জন্য এই ফটক তো বন্ধ হয়ে গেছে যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথেই। রাজার সম্ভবত খায়েশ ছিলো স্টারলিং-এ আশ্রয় নেয়ার। তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষাও করেছিলেন যদি এখন শান্তি প্রস্তাব দিয়ে স্কটদের পটানো যায়। কিন্তু উপস্থিত আর্লদের তীব্র বিরোধিতার কারণে শেষমেশ পরাজয়ের মেনে দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হন রাজা।

 

রাজার জন্য বন্ধ হয়ে গেলো স্টারলিং দুর্গের দরজা।

 

এই যুদ্ধে আনুমানিক দশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিলো।

 

যুদ্ধ শেষের সমীকরণ

বানুকবার্ন যুদ্ধ জয়ের পর রবার্ট ব্রুস স্কটল্যান্ডের রাজা হিসেবে ক্ষমতায় আরোহণ করেন। আর অন্যদিকে পরাজয়ের লজ্জা নিয়ে দেশে ফিরে দ্বিতীয় এডওয়ার্ড নিজের কুখ্যাতির পেয়ালা পূর্ণ করেন।

 

এরপর বহুদিন পর্যন্ত ইংরেজরা স্কটিশদের আঙ্গিনায় পা বাড়ায়নি। এই যুদ্ধটাকে স্কটিশরা দেখে তাদের স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধ হিসেবে। আর এই যুদ্ধজয়ের মাধ্যমেই সূচনা হয় স্কটিশ রাজা রবার্ট ব্রুসকে ঘিরে যত কিংবদন্তী।