বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে রাশিয়ার ভূমিকা (ষষ্ঠ পর্ব)

প্রকাশিত: ১:১১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৩, ২০২০

লিখেছেন: হিমেল রহমান

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার চেষ্টা করে এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই ‘পূর্ব পাকিস্তান সমস্যা’র সমাধানের চেষ্টা করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের দক্ষিণ এশীয় মিত্র রাষ্ট্র ভারত নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করতে আগ্রহী ছিল, কিন্তু ১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত মস্কো পাকিস্তানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন করতে ইচ্ছুক ছিল না। ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চীনা–মার্কিন মৈত্রীর সূত্রপাত হলে দক্ষিণ এশিয়াসহ সমগ্র বিশ্বের কৌশলগত ভারসাম্যে পরিবর্তন আসে এবং এর ফলে মস্কোর পক্ষে এই সঙ্কটে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করা ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে।

 

চীনা–মার্কিন দাঁতাতের পর ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেকে একটি দুর্বল অবস্থানে আবিষ্কার করে এবং এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার জন্য ১৯৬৯ সালে সোভিয়েত–প্রস্তাবিত ‘এশীয় যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা’কে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে। মস্কো এটিকে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং সম্ভাব্য ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ রোধের একটি চমৎকার উপায় হিসেবে বিবেচনা করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো ও ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং ভারতের নয়াদিল্লিতে ২০ বছর মেয়াদী ‘ভারতীয়–সোভিয়েত শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি’তে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে মাধ্যমে ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের ভারত সফরের পর থেকে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে ‘অনানুষ্ঠানিক’ মৈত্রী স্থাপিত হয়েছিল, সেটি আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

 

এই চুক্তিটির ৮ নং ধারা অনুযায়ী ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরের বিরোধী কোনো সামরিক জোটে যোগদান থেকে বিরত থাকার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় এবং ৯ নং ধারা অনুযায়ী ভারত বা সোভিয়েত ইউনিয়ন তৃতীয় কোনো পক্ষের দ্বারা আক্রান্ত হলে উক্ত হুমকি প্রতিহত করার জন্য উভয় পক্ষ তৎক্ষণাৎ পরস্পরের সঙ্গে আলোচনায় লিপ্ত হবে বলে একমত হয়। এই চুক্তিটিকে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পূর্ণরূপে ‘আত্মরক্ষামূলক’ এবং ‘তৃতীয় কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে’ নয় বলে অভিহিত করে। কিন্তু ওয়াশিংটন, পিকিং ও ইসলামাবাদে এই চুক্তিটিকে চীনা–মার্কিন–পাকিস্তানি জোটের বিরুদ্ধে সম্পাদিত একটি চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাকিস্তানি প্রচারমাধ্যমে চুক্তিটিকে ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় আগ্রাসনের ছাড়পত্র’ হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং পাকিস্তানি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো চুক্তিটিকে চীন ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘আক্রমণাত্মক চুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

 

১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো এবং ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং ২০ বছর মেয়াদী ‘ভারতীয়–সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি’তে স্বাক্ষর করেন; Source: Historic Images Outlet

 

অন্যদিকে, ভারতের মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট দলগুলো থেকে শুরু করে হিন্দুত্ববাদী দলগুলো পর্যন্ত এই চুক্তিকে স্বাগত জানায়, এবং সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো এই চুক্তি ভারতীয়–সোভিয়েত সম্পর্কে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করবে বলে উল্লেখ করেন। কলকাতাকেন্দ্রিক প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারও এই চুক্তিটিকে স্বাগত জানায়, কারণ এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সোভিয়েত মনোভাবে পরিবর্তন ঘটবে বলে তারা আশা করেছিল।

 

কিন্তু মস্কো তখনো পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করার ব্যাপারে রাজি ছিল না এবং তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে নিজেদেরকে নিরাপদ দূরত্বে রাখার চেষ্টা করে। গ্রোমিকোর ভারত সফরের সময় ভারতীয় কর্মকর্তারা তাকে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে অবস্থিত বাঙালি শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করার প্রস্তাব করেন, কিন্তু গ্রোমিকো তাতে অস্বীকৃতি জানান। ১৯ আগস্ট জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে জাতিসংঘে স্থায়ী সোভিয়েত প্রতিনিধি ইয়াকভ মালিক পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে সোভিয়েত ইউনিয়নের মনোভাব পুনর্ব্যক্ত করেন এবং পাকিস্তানকে পূর্ব পাকিস্তানে শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির আহবান জানান।

 

পূর্ব পাকিস্তান সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। ১৯৭১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি পররাষ্ট্র সচিব সুলতান মুহাম্মদ খান মস্কো সফর করেন এবং সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্রোমিকোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গ্রোমিকো তাকে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যাকে যত দ্রুত সম্ভব রাজনৈতিকভাবে সমাধান করার পরামর্শ দেন এবং ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো হঠকারিতা থেকে বিরত থাকতে আহবান জানান। ১৫ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানের রাজা জহির শাহ সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন এবং তার সফর শেষে প্রদত্ত সোভিয়েত–আফগান যৌথ বিবৃতিতেও পাকিস্তানকে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধানের আহবান জানানো হয়। ২০ সেপ্টেম্বর গ্রোমিকো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্সের সঙ্গে বৈঠককালে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার একটি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য পাকিস্তানের ওপরে চাপ প্রয়োগ করতে বলেন। কিন্তু মার্কিনিরা পাকিস্তানের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে আগ্রহী ছিল না এবং এর ফলে বৈঠকটি ব্যর্থ হয়।

 

বস্তুত পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানে ওয়াশিংটনের কোনো আগ্রহ ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের উপায় ছিল দুইটি– ১৯৭০ সালে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা, অর্থাৎ আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা, নয়তো বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেওয়া। কিন্তু মস্কোর প্রতি সহানুভূতিশীল এবং মার্কিন সামরিক জোট থেকে পাকিস্তানকে প্রত্যাহার করে নিতে আগ্রহী আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা কিংবা পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করার ক্ষেত্রে সরাসরি জড়িত থাকা– এর কোনোটাতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ছিল না।

 

সোভিয়েত নিরস্ত্রীকরণ বিশেষজ্ঞ সেমিয়ন ৎসারাপকিন ১৯৭১ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের আগে ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীর সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন; Source: Amazon.com

 

এমতাবস্থায় বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি সৈন্যদের নিরবচ্ছিন্ন নির্যাতন এবং মস্কোর পরামর্শ সত্ত্বেও সমস্যাটি রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে ইসলামাবাদের অনীহা সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিরক্ত করে তোলে। পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে ভারতীয়–সমর্থিত বাংলাদেশি গেরিলাদের সংঘর্ষ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং মস্কো আশঙ্কা করছিল যে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা ক্রমাগত বাড়ছে। এক্ষেত্রে ভারতকে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে মস্কো ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীকে অত্যাধুনিক সোভিয়েত অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করতে শুরু করে। ১৯৭১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত কূটনীতিবিদ ও নিরস্ত্রীকরণ বিশেষজ্ঞ সেমিয়ন ৎসারাপকিন নয়াদিল্লি সফর করেন এবং ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনীকে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তোলার ব্যাপারে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সাথে বিশদ আলোচনা করেন।

 

এমতাবস্থায় ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষদিকে পূর্ব পাকিস্তান সমস্যার ক্ষেত্রে ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী মস্কো সফরে যান। ২৮ সেপ্টেম্বর তার উদ্দেশ্যে প্রদান করা অভ্যর্থনাসূচক ভাষণে সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিন মন্তব্য করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কার্যকলাপ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় এবং পাকিস্তানি সরকারের উচিত পূর্ব পাকিস্তানি জনসাধারণের ‘ন্যায়সঙ্গত’ স্বার্থকে বিবেচনায় রেখে সমস্যাটির একটি রাজনৈতিক সমাধান করা। পরবর্তীতে ভারতীয় প্রচারমাধ্যমকে প্রদান করা এক সাক্ষাৎকারে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যার কথা উল্লেখ করে সরাসরি বলেন, ‘যারা এ ধরনের নৃশংসতা চালিয়েছে তারা কখনো আমাদের সমর্থন পাবে না। আমাদের সহানুভূতি পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতি।’

 

ইন্দিরা গান্ধীর সফর শেষে ভারতীয়–সোভিয়েত যৌথ বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান এবং শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য পাকিস্তানকে আহবান জানানো হয়। উল্লেখ্য, এই বিবৃতিতেও ‘বাংলাদেশ’ বা ‘পূর্ববঙ্গ’ নামটি ব্যবহার না করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামটি ব্যবহৃত হয়, যেটি ইঙ্গিত করে যে, তখনো মস্কো পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ভারতীয় পরিকল্পনার প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রদান করেনি।

 

২৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্রোমিকো পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি কার্যকলাপের ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় বিরাজমান গুরুতর পরিস্থিতির প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং মন্তব্য করেন যে, পরিস্থিতি এরকম চলতে থাকলে এটি আর পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকবে না। এর মাধ্যমে মস্কো পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্কট নিরসন করার জন্য পাকিস্তানের প্রতি চাপ বৃদ্ধি করার প্রয়াস পায়। কিন্তু পাকিস্তান এতে ক্ষিপ্ত হয় এবং ১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের রাষ্ট্র–নিয়ন্ত্রিত ‘পাকিস্তান টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয়তে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভারতের প্রতি ‘অন্ধ পক্ষপাতিত্বে’র দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।

চলবে…