বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে রাশিয়ার ভূমিকা (৫ম পর্ব)

প্রকাশিত: ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২১, ২০২০

১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে পাকিস্তানি সৈন্যরা সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ ছিল না, কারণ পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে গেরিলা আক্রমণ অব্যাহত থাকে। এর প্রত্যুত্তরে পাকিস্তানি সৈন্যরা সাধারণ জনগণের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। বর্ষাকালে বাংলাদেশি গেরিলারা পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে যে আক্রমণগুলো চালায়, যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্রের অভাবে সেগুলো সাধারণভাবে ব্যর্থ হয় এবং ১৯৭১ সালের জুনের শেষদিকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী দাবি করে যে, তারা বাংলাদেশি গেরিলাদের বর্ষাকালীন আক্রমণ প্রতিহত করে দিয়েছে। এসবের মধ্যে বাঙালি শরণার্থীদের ভারতে পলায়ন অব্যাহত থাকে।

 

১৯৭১ সালে প্রায় এক কোটি বাঙালি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল; Source: Dawn

 

সোভিয়েত ইউনিয়ন এসময় পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল। ১৯৭১ সালের ১ মে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘প্রাভদা’য় (Правда) ‘সঙ্কট ও এর ফলাফল’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয় এবং এতে পূর্ব পাকিস্তানে চলমান হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে সোভিয়েত ইউনিয়নের উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়। নিবন্ধটিতে পূর্ব পাকিস্তানে চলমান সঙ্কটকে ‘পাকিস্তানের জনসাধারণের স্বার্থের জন্য হুমকি’ এবং ‘এশিয়া ও সমগ্র বিশ্বের শান্তির জন্য বাধাস্বরূপ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

 

১৯৭১ সালের ৬–৮ জুন ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং মস্কো সফর করেন। তার সফর শেষে সোভিয়েত–ভারতীয় যৌথ বিবৃতিতে পাকিস্তানকে ভারতে শরণার্থী প্রবেশ রোধ করা, পূর্ব পাকিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এবং শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করার আহবান জানানো হয়৷ উল্লেখ্য, পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সীমিত মাত্রায় সমর্থন করে আসছিল এবং পূর্ব পাকিস্তানকে ‘পূর্ববঙ্গ’ হিসেবে সম্বোধন করত। কিন্তু সোভিয়েত–ভারতীয় বিবৃতিতে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়।

 

১৯৭১ সালের ৯ জুন সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন মস্কোয় একটি নির্বাচনী প্রচারণামূলক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানি সরকারকে অনতিবিলম্বে ভারতে অবস্থানরত বাঙালি শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির আহবান জানান। সোভিয়েত পত্রিকা ‘প্রাভদা’ ও ‘ইজভেস্তিয়া’য় বাঙালি শরণার্থীদের দুর্দশা সম্পর্কে বিশদ বিবরণ প্রচারিত হয় এবং এই সমস্যার সমাধানের জন্য পূর্ব পাকিস্তানকে নিরাপদ করে তোলার দাবি জানানো হয়। বলা বাহুল্য, এসব পদক্ষেপ পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের পূর্ব পাকিস্তানি নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনেনি, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি নীতি সম্পর্কে মস্কো যে ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে, সেটি ইসলামাবাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

 

সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন; Source: Sputnik News

 

অবশ্য ১৯৭১ সালের জুনের শেষদিকে কোসিগিন মস্কোয় পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব পাকিস্তানে চলমান সমস্যাকে পাকিস্তানের ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’ হিসেবে বিবেচনা করে। অর্থাৎ, তখন পর্যন্ত মস্কো পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত করার পক্ষপাতী ছিল না, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা সমাধানে ইসলামাবাদের ব্যর্থতা তাদেরকে অসহিষ্ণু করে তুলছিল।

 

১৯৭১ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশি যোদ্ধারা তাদের বর্ষাকালীন অভিযানের ব্যর্থতার পর পুনর্গঠিত হয় এবং পাকিস্তানি সৈন্যদের ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখে। কিন্তু পাকিস্তানি সৈন্যরা পূর্ব পাকিস্তানের শহরাঞ্চল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলো নিজেদের দখলে রাখতে সক্ষম হয় এবং বাঙালি জনসাধারণের বিরুদ্ধে তাদের সন্ত্রাস সৃষ্টির অভিযান অব্যাহত থাকে। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে শরণার্থী প্রবেশের হার বৃদ্ধি পেতে থাকে। একজন ভারতীয় সমরবিশারদের মতে, পাকিস্তানি সশস্ত্রবাহিনী ইচ্ছে করেই বাঙালি জনসাধারণের ওপরে অত্যাচার–নির্যাতন অব্যাহত রেখেছিল, যাতে লক্ষ লক্ষ বাঙালি (বিশেষত বাঙালি হিন্দুরা) পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা সামগ্রিকভাবে হ্রাস পায়। তাঁর মতে, পাকিস্তানি সামরিক সরকারের মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যাকে পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যার সমান করে ফেলা, যাতে পাকিস্তানে বাঙালিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিলুপ্ত হয়।

 

কিন্তু তখনো সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখতে আগ্রহী ছিল না এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর অভ্যন্তরেই পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা সমাধানে আগ্রহী ছিল। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে পাকিস্তানের ওপরে চাপ সৃষ্টির জন্য যেসব সোভিয়েত উপদেষ্টাকে মস্কো প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, জুলাইয়ে তাদেরকে আবার পাকিস্তানে প্রেরণ করা হয়। এসময় কলকাতা–কেন্দ্রিক অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ নেতা (এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) আব্দুস সামাদ আজাদকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সোভিয়েত সমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যে মস্কোয় প্রেরণ করা হয়, কিন্তু সোভিয়েতরা তাকে শীতলভাবে গ্রহণ করে এবং কোনোরকম সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের প্রেরিত পত্রও মস্কো গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়, কারণ এটিকে পাকিস্তান নিশ্চিতভাবে পূর্ব পাকিস্তানের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ প্রতি সোভিয়েত সমর্থনের চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করত।

 

১৯৭১ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশি রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের চিঠি গ্রহণ করতে মস্কো অস্বীকৃতি জানিয়েছিল; Source: Sri Lanka Guardian

 

কিন্তু ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি ‘কূটনৈতিক বিপ্লব’ ঘটে, যা মস্কোর সমস্ত হিসেব–নিকেশ পাল্টে দেয়। এই বিপ্লবটি হলো মার্কিন রাষ্ট্রপতির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী) হেনরি কিসিঞ্জারের চীন সফর। ১৯৭১ সালের ৯–১১ জুলাই কিসিঞ্জার অত্যন্ত গোপনে পিকিং সফর করেন, চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ১৯৭২ সালের বসন্তকালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সনের চীন সফরের জন্য আমন্ত্রণপত্র সংগ্রহ করেন। এর মাধ্যমে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দাঁতাত (Dentente) শুরু হয় এবং তাদের এই মৈত্রী ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে। আর এই মৈত্রী স্থাপনের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী বা বার্তাবাহকের ভূমিকা পালন করেছিল উভয়ের সাধারণ মিত্র পাকিস্তান।

 

চীনা–মার্কিন মৈত্রী মস্কোর জন্য যথেষ্ট খারাপ খবর ছিল, কিন্তু মস্কোর দক্ষিণ এশীয় মিত্র ভারতের জন্যও এটি মোটেই সুসংবাদ ছিল না। এসময় ভারত পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের সমস্যা সমাধানে বৃহৎ শক্তিগুলোর (বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের) সমর্থন লাভে আগ্রহী ছিল, কিন্তু ঠিক এই সময়ে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চীনা–মার্কিন মৈত্রী নয়াদিল্লিতে উদ্বেগের সৃষ্টি করে। ১৯৬২ সালের চীন–ভারত যুদ্ধে ভারতের পরাজয়ের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছিল, কিন্তু চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্থাপিত মৈত্রীর ফলে পরবর্তীতে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো যুদ্ধে আর ভারতের পক্ষে মার্কিন সমর্থন লাভের কোনো সম্ভাবনা রইল না। তদুপরি, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্ভাব্য যেকোনো যুদ্ধে চীনের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা আরো প্রকট হয়।

 

বাকি অংশ পরের পর্বে।