বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে রাশিয়ার ভূমিকা (৪র্থ পর্ব)

প্রকাশিত: ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৯, ২০২০

গত পর্বে আলোচনা হচ্ছিল,  বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মস্কোর অনাগ্রহ নিয়ে। রাশিয়া চাচ্ছিল না পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে একটা নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটুক এবং পূর্ব পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ শুরু হোক। তাই তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থন দিতে আগ্রহী ছিল না। এর পেছনে কারণগুলো ছিল।

 

প্রথমত, ১৯৬৬ সালের তাসখন্দ চুক্তির পর থেকে এবং বিশেষত ১৯৬৯ সালের চীনা–সোভিয়েত সীমান্ত যুদ্ধের পর থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল। ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং পাকিস্তানকে চীনের প্রভাব বলয় থেকে দূরে সরিয়ে আনা ছিল মস্কোর লক্ষ্য। এজন্য ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি বজায় রাখা মস্কোর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল এবং এই উদ্দেশ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৬৬ সাল থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় ‘মধ্যস্থতাকারী’ ও ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থাপকে’র ভূমিকা পালন করছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সহজেই ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধে রূপ নিতে পারত এবং এই পরিস্থিতির যাতে উদ্ভব না ঘটে সেজন্য মস্কো পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি আরো উত্তেজক করে তোলার পক্ষপাতী ছিল না।

 

১৯৬৬ সালে তাসখন্দে পাকিস্তানি রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এবং সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিন; Source: Russia Beyond

 

দ্বিতীয়ত, সাধারণভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন তৃতীয় বিশ্বের জাতিগুলোর স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করত। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কোনো ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত হচ্ছিল না, বরং তৃতীয় বিশ্বেরই একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। এজন্য মস্কো প্রাথমিক পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধকে একটি স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে নয়, বরং ‘পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে যুদ্ধ’ এবং ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ হিসেবে বিবেচনা করেছিল।

 

তৃতীয়ত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৬০–এর দশকের শেষদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি চলনসই সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল এবং ১৯৭১ সালের প্রারম্ভে সোভিয়েত–পাকিস্তানি সম্পর্কে গুরুতর কোনো সমস্যা ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের নিকটবর্তী হওয়ায় (ওয়াখান করিডোর নামে পরিচিত আফগানিস্তানের একটি সরু অঞ্চল সোভিয়েত তাজিকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানকে পৃথক করেছিল) মস্কোর কাছে পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক গুরুত্ব অনেক বেশি ছিল এবং পাকিস্তানে সোভিয়েত অর্থনৈতিক তৎপরতার সিংহভাগই কেন্দ্রীভূত ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। এমতাবস্থায় মস্কো পূর্ব পাকিস্তানের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলনকে সমর্থন করে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে আগ্রহী ছিল না।

 

চতুর্থত, মস্কোর আশঙ্কা ছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানে সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত হবে, ভারতে ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো শক্তিশালী হবে, ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়বে, এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তাতে প্রত্যক্ষ চীনা হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা দেখা দেবে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় সোভিয়েত প্রভাব হ্রাস পাবে। এজন্য মস্কো পূর্ব পাকিস্তানের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’দের সমর্থন দিয়ে দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থিতিশীল করতে প্রস্তুত ছিল না।

 

সোভিয়েত নেতা লিওনিদ ব্রেঝনেভের সঙ্গে সিরীয় রাষ্ট্রপতি হাফেজ আল–আসাদ। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন সিরিয়াসহ বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিল; Source: The American Mag

 

পঞ্চমত, ১৯৫০ ও ১৯৬০–এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিভিন্ন আরব (মিসর, সিরিয়া, আলজেরিয়া, সুদান, ইরাক ও দক্ষিণ ইয়েমেন) ও অনারব (আফগানিস্তান, গিনি, নাইজেরিয়া প্রভৃতি) মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিল এবং অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী ছিল। এসময় পাকিস্তান ছিল জনসংখ্যার দিক থেকে মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র এবং পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করার প্রচেষ্টায় সোভিয়েত ইউনিয়ন জড়িত থাকলে এই রাষ্ট্রগুলো সেটি নেতিবাচকভাবে দেখত। পূর্ব পাকিস্তান সংক্রান্ত নীতি গ্রহণের সময় মস্কোকে এই বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয়েছিল।

 

ষষ্ঠত, পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের হাতে ছিল না এবং আওয়ামী লীগ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরের প্রতি ক্ষেত্রবিশেষে সহানুভূতিশীল হলেও একদিকে যেমন মস্কোপন্থী বাঙালি কমিউনিস্টদের সাথে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ভালো ছিল না, অন্যদিকে তেমনি মস্কোও আওয়ামী লীগকে একটি ‘বুর্জোয়া’ ধনিক শ্রেণির দল হিসেবেই দেখত। তদুপরি, সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির প্রতিবেদন থেকে মস্কো জানত যে, পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের সিংহভাগ রক্ষণশীল মুসলিম এবং তাদের অভিজাত সম্প্রদায় সাধারণভাবে পশ্চিমাপন্থী। এরকম একটি অঞ্চল স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হলে সেখানে মস্কোর প্রভাব কতটুকু থাকবে সেটি নিয়েও সোভিয়েত নেতাদের মনে সন্দেহ ছিল।

সপ্তমত, পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করার প্রচেষ্টায় সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি জড়িত থাকলে পাকিস্তানের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সরাসরি সংঘাত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে অগুরুত্বপূর্ণ পূর্ব পাকিস্তানে প্রভাব বৃদ্ধির অনিশ্চিত আশায় মস্কো এত বড় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল না, অন্তত যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে।

 

১৯৭০–এর দশকে ভারতে পিকিংপন্থী কমিউনিস্টদের একটি মিছিল; Source: Telegraph India

 

এবং অষ্টমত, পূর্ব পাকিস্তান একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হলে সেটি যে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবাধীন হবে এরকম কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানে পিকিংপন্থী কমিউনিস্টরা সক্রিয় ছিল এবং স্বাধীন বাংলাদেশে এরা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারলে সেটি হত মস্কোর জন্য বড় একটি সমস্যা। বাংলাদেশ চীনের প্রভাব বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হলে এটি ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য এবং পশ্চিমবঙ্গ ও অন্যান্য প্রদেশে সক্রিয় পিকিংপন্থী কমিউনিস্টদের জন্য একটি নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হতে পারত। সেক্ষেত্রে ভারত অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কারণে দুর্বল হয়ে যেত এবং ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিপক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার সোভিয়েত পরিকল্পনা ব্যাহত হতো।

 

এমতাবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানে মস্কোর উদ্দেশ্য ছিল ত্রিমুখী। এগুলো হলো– যত দ্রুত সম্ভব পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিক সমাধানের ব্যবস্থা করে সম্ভাব্য ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ রোধ করা ও দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। পাকিস্তান যদি একত্রিত থাকে সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের ওপরে সোভিয়েত প্রভাব অটুট রাখা এবং বাংলাদেশ যদি স্বাধীন হয় সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপরেও সোভিয়েত প্রভাব বিস্তার করা।

 

পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পাঁচ দিন পর ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ মস্কোয় সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ২৪তম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এই কংগ্রেসে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিদ ব্রেঝনেভ উল্লেখ করেন যে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা এতদঞ্চলের শান্তির জন্য হুমকি। এর দুদিন পর ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাই পদগর্নি পাকিস্তানি রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানের কাছে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের ওপর পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচার বন্ধ করার এবং পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যাটি শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে সমাধান করার আহবান জানান। তার এই পরামর্শটিকে যেন পাকিস্তানের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে’ হস্তক্ষেপ হিসেবে না দেখা হয় সেটিও তিনি তার চিঠিতে উল্লেখ করেন।

 

সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাই পদগর্নি পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সৈন্যদের নিষ্পেষণ বন্ধের আহবান জানিয়ে পাকিস্তানি রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়েছিলেন; Source: সংগ্রামের নোটবুক

 

প্রত্যুত্তরে ইয়াহিয়া খান সোভিয়েত রাষ্ট্রপতিকে লেখা একটি চিঠিতে উল্লেখ করেন, পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার জন্য ‘খোলাখুলি ও নির্লজ্জ ভারতীয় হস্তক্ষেপ’ দায়ী এবং সোভিয়েত ইউনিয়নসহ কোনো রাষ্ট্রই নিজ সীমানার ভেতরে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ সহ্য করে না। বস্তুত, ইয়াহিয়ার জবাবের ভাষা ছিল খানিকটা কড়া এবং পাকিস্তানি সরকার মনে করেছিল, পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার প্রতি সোভিয়েতদের মনোভাবে ভারতের প্রতি সোভিয়েত পক্ষপাতিত্ব প্রকাশ পেয়েছে।

 

এরপর থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধ সম্পর্কে পাকিস্তান ও ‘বাংলাদেশে’র মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার একটি রাজনৈতিক সমাধানের জন্য পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে মস্কো পাকিস্তানে কর্মরত সোভিয়েত অর্থনৈতিক ও কারিগরি উপদেষ্টাদের প্রত্যাহার করে নেয়। সোভিয়েত রাষ্ট্র–নিয়ন্ত্রিত প্রচার মাধ্যমে আংশিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের দুর্দশা এবং লক্ষ লক্ষ বাঙালি শরণার্থীর উপস্থিতির কারণে ভারতে সৃষ্ট আর্থ–সামাজিক সমস্যাগুলো সম্পর্কে প্রচার চালানো হতে থাকে। কিন্তু অন্যদিকে, এসময় সোভিয়েত সরকার সরাসরি পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে।

 

বাকি অংশ পরের পর্বে।