বরিশালের নারীঃ কবি কুসুমকুমারী দাস ( প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ১১:২৪ অপরাহ্ণ, জুন ৪, ২০২০
ছবিঃইন্টারনেট। কবি কুসুমকুমারী দাস।

লিখেছেনঃ স্বর্ণা লাকী

“আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে

কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে”

আমরা সকলেই কমবেশি পরিচিত কবি কুসুমকুমারী দাসের এই প্রবাদ প্রতিম পঙক্তি দুটির সাথে। কুসুমকুমারী দাস নিজের পরিচয়েই পরিচিত। পাশাপাশি তাঁর আরেকটি পরিচয় আছে। তিনি জীবনানন্দ দাশের মা। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে এই কবিতা পড়লে মনে হয়-আমাদের দেশের সেই ছেলে জীবনানন্দ দাশ। তিনি তাঁর মায়ের কথা রেখেছেন। মায়ের কথাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁর সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে।

কুসুমকুমারী দাস কবি ছিলেন। ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের একজন সক্রিয় কর্মী,সুশিক্ষিতা,বিশিষ্ট এক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে গিরীন্দ্রমোহিনী,মানকুমারী বসু,কামিনী রায়, প্রিয়ম্বদা দেবী, স্বর্ণকুমারী দেবী, বেগম রোকেয়া প্রমুখ মহিলা কবির মতো কুসুমকুমারী দাসেরও একটি বিশিষ্ট স্থান আছে।

জীবনকথাঃ

কুসুমকুমারী দাস ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে বরিশাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা চন্দ্রনাথ দাস, মা ধনমনি দেবী। পিতা চন্দ্রনাথ দাসের পৈত্রিক নিবাস গৌরনদী থানার গৈলা গ্রামে। চন্দ্রনাথ ও তাঁর অগ্রজ কালীমোহন দাস ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করলে গ্রামবাসীর বিরোধিতার ফলে তাঁরা পৈত্রিক ভিটেমাটি ছেড়ে বরিশালে চলে আসেন। বরিশালে এসে প্রথম দিকে সর্বানন্দ দাসের বাড়িতে কিছু দিন বসবাস করেন। সর্বানন্দ দাস তখন বরিশালের ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক। তিনি ছিলেন জীবনানন্দ দাসের পিতামহ। অর্থাৎ কুসুমকুমারী দাসের জন্মের আগেই দুই পরিবারের মধ্যে একটি নিবিড় সম্পর্ক ছিলো।

কুসুমকুমারীরা ছিলেন এক ভাই- প্রিয়নাথ ও তিন বোন- কুসুমকুমারী, সুকুমারী,হেমন্তকুমারী। কুসুমকুমারী প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু করেন বরিশালে। তখন বরিশালে মেয়েদের জন্য আলাদা হাইস্কুল ছিলো না। ছাত্রবৃত্তি পর্যন্ত পড়ানো হতো মাইনর স্কুলে। ১২৯৬ বঙ্গাব্দে কিছুদিনের জন্য বরিশালে মেয়েদের হাই স্কুল করা হয়। ইন্দুভূষণ রায় চৌধুরী ছিলেন সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। ছাত্রী স্বল্পতার কারণে অচিরেই স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। কুসুমকুমারী এই স্কুলেই চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত লেখা পড়া করেন। পরে তাঁকে কলকাতায় বেথুন স্কুলে ভর্তি করানো হয়।

কুসুমকুমারীর ছোট বোন হেমন্তকুমারী পিতার জীবনী লিখতে গিয়ে বলেছেন-

“আমরা নিঃসম্বল হইলেও তিনি আমাদের উচ্চশিক্ষা দিতে কার্পণ্য করেন নাই।”

প্রকৃতপক্ষে কুসুমকুমারী একটি বিদ্যানুরাগী পারিবারিক পরিমণ্ডল পেয়েছিলেন আশৈশব। ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত কুসুমকুমারী দাস বেথুন স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। প্রবেশিকা শ্রেণীতে (১৮৯৪) পড়াকালীন তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। আর এখানেই তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অবসান ঘটে।

মায়ের মেধা ও পড়াশোনা সম্পর্কে পুত্র, কবি জীবনানন্দ দাশের ধারণা :

আমার মা শ্রীযুক্তা কুসুমকুমারী দাস কলকাতার বেথুন স্কুলে পড়তেন। খুব সম্ভবত ফার্স্ট ক্লাস অবধি পড়েছিলেন। তার পরেই তার বিয়ে হয়ে যায়। তিনি অনায়াসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষায় খুব ভালোই করতে পারতেন। এ বিষয়ে সন্তানদের চেয়ে তাঁর শক্তি বেশি ছিলো মনে হচ্ছে।

হেমন্তকুমারী লিখেছেন ‘ ১৩০১ সালের ১০ জ্যৈষ্ঠ বরিশালের ব্রজমোহন ইনস্টিটিউশন-এর প্রধান শিক্ষক সত্যানন্দ দাসের সহিত কুসুমকুমারীর বিয়ে হয়।’ সত্যানন্দের পিতৃপুরুষেরা বিক্রমপুরের দ্বিতীয় কীর্তিপাশা নদীর তীরস্থ গাউপারা গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। একসময়ে তাদের জমিদারি ছিলো যার কিছুটা অবহেলায় নষ্ট হয়। বাকিটুকু নদীগর্ভে বিলীন হলে তারা বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জে এসে বসবাসবাস শুরু করেন। সত্যানন্দের পিতা সর্বানন্দ দাসগুপ্ত বরিশালের কালেক্টরিতে কাজ করতেন। পরিবারে তিনিই প্রথম ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেন। ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণের পর বৈদ্যদের জাতিচিহ্ন স্বরূপ “গুপ্ত” পদবী বর্জন করে “দাস” লিখতে শুরু করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি সর্বনান্দ দাস নামেই পরিচিত হন। তারপর দাস পরিবার বরিশালে নিজ বাড়ি নির্মাণ করে বাড়ির নাম রাখেন “সর্বনান্দ ভবন”। এভাবেই বরিশালে দাস পরিবারের স্থায়ী আবাসন তৈরি হয়।

সত্যানন্দ দাস ছিলেন বরিশাল থেকে প্রকাশিত মাসিক ” প্রধান শিক্ষক এবং মাসিক “ব্রাহ্মবাদী” পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। পরবর্তীতে এরূপ প্রজ্ঞাকামী দার্শনিক মানুষ সত্যানন্দ দাস তাঁর যোগ্য জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন কুসুমকুমারী দাসকে। তাঁর পঠিত একটি প্রবন্ধ শুনেই নাকি সত্যানন্দ বিয়েতে সম্মত হয়েছিলেন।

সংসার জীবনে ও সামাজিক নানাবিধ কাজে ব্যস্ততার পরও কুসুমকুমারীর লেখালেখিতে তেমন কোন সমস্যা হয় নি। তবে এ কাজে তাঁর স্বামী তাঁকে বেশি সহযোগিতা করতেন। কুসুমকুমারীকে লেখা সত্যানন্দের একটি চিঠিতে এ সম্পর্কে তাঁর মনোভাব জানা যায়-

সন্তান পালন ব্যতীতও একটা কিছু দ্রুত গ্রহণ করো,একখানা কিছু লিখতে আরম্ভ করো।

কুসুমকুমারীর কর্মজীবনের পুরোটাতেই সমাজসেবা প্রাধান্য পেয়েছে। শ্বশুর ও স্বামী ছিলেন বরিশালে ব্রাহ্মসমাজের দুই কেন্দ্রীয় পুরুষ।  ব্রাহ্মসমাজের সুবাদেই সে কালের নারীরা যে ঘরের বাইরে পা রেখে সামাজিক কাজকর্মে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন তার প্রমাণ কুসুমকুমারী দাস নিজেই। কুসুমকুমারীর কর্মজীবনের পরিচয় পাওয়া যায় “ব্রাহ্মবাদী” পত্রিকার ‘স্থানীয় প্রসঙ্গ ও সংবাদ’ শিরোনামের বিভাগে। বিয়ের পর সংসার জীবনের দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সাহিত্যচর্চা ও ব্রাহ্মসমাজের কর্মকাণ্ডে নিজেকে যেমন নিয়োজিত রেখেছিলেন তেমনি পাড়া প্রতিবেশি ও আত্মীয়স্বজনের প্রয়োজন, সংকটেও ছুটে গেছেন সব সময়। বাড়িতে শিশুসন্তান রেখে রাত্রিবেলা প্রতিবেশীর সমস্যায়, সংকটে গিয়ে দাঁড়াবার মতো নারী শুধু সে কালে কেনো এ যুগেও অল্পই। এ থেকেই উনিশ শতকের নবজাগরণের পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর প্রমুখের সাথে কুসুমকুমারীর চিন্তা ও কর্মের একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

কুসুমকুমারীর শশুরালয়ে ব্রাহ্মসমাজের উদ্যোগে শিশুদের নীতিশিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার উদ্দ্যেশ্যে ‘নীতি বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ বিদ্যালয়ে শিশুদের প্রবণতা নির্ধারনের প্রচেষ্টা ছিলো। কুসুমকুমারী দাস এই স্কুলটির সাথে যুক্ত ছিলেন।  এভাবেই কুসুমকুমারী দাস বরিশাল ব্রাহ্মসমাজের নানারকম  উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দীর্ঘ সময়ব্যাপী এ কর্মকাণ্ডের মধ্যে তার আগ্রহ ও দক্ষতার সুস্পষ্ট পরিচয় লক্ষ করা যায়।

শুধু পরিবেশগত নয় ইচ্ছাশক্তির বলেই তিনি নারী আন্দোলনের পথিকৃতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নিজেকে আলোকিত করেছেন। কুসুমকুমারী দাস জীবনের অধিকাংশ সময় বরিশালে কাটালেও কৈশরে কলকাতায় বেথুন স্কুলে, সন্তানের রোগ নিরাময়ের জন্য উওর ও পশ্চিম ভারতে, পুত্র আশোকানন্দের কর্মক্ষেত্র পুনা,দমদম, ব্যারাকপুরসহ বিভিন্ন স্থানে পরিভ্রমণ করেছেন। ১৯৪২ সালের ২২ শে নভেম্বর স্বামী সত্যানন্দের মৃত্যুর পর কুসুমকুমারী মূলত আশোকানন্দ ও তার পত্নী নলিনী দেবীর কাছেই থাকতেন। তবে ১৯৪৭ সালের পর বয়সের ভার ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে আর বরিশালে যাননি। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় তিনি পরলোক গমন করেন।