বরিশালের নারীঃ কবি কুসুমকুমারী দাস ( তৃতীয় ও শেষ পর্ব)

প্রকাশিত: ৯:০৫ অপরাহ্ণ, জুন ৬, ২০২০
ছবিঃইন্টারনেট। কবি কুসুমকুমারী দাস।

লিখেছেনঃ স্বর্ণা লাকী

(দ্বিতীয় পর্বের পর)

বরিশাল স্কুল থেকে পাস করে অনেক বড় বড় কলেজে পড়েছি, ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি, কিন্তু আজ জীবনের মাঝামাঝি এসে প্রতিনিয়তই টের পাচ্ছি- আমার জীবনে শিক্ষার ভিত্তি এঁদের হাতে গড়া। এক এক সময়ে মনে হয়- মহাভারতের রচনাকর্তা বেদজাসের মতো দৃষ্টি এঁরা সবাই শিখিয়েছিলেন আমাকে। আমার জীবনে সে শিক্ষা যদি ব্যবহারিকভাবে ফলপ্রসূ না হয়ে থাকে তাহলে কোন দোষ নেই, যদি মনোলোক কিছু সার্থক হয়ে থাকে, তা হয়েছে এঁদেরই প্রশস্ত দানের ফলে।

 

নানা নামী কলেজের বড় বড় অধ্যাপকের কাছে পড়েছি বটে। সাহিত্য, দর্শন,ইতিহাস,অর্থননীতি সম্পর্কে অনেক খবর যুগিয়েছেন তাঁরা, কিন্তু বোধের অভাবে সে খবর পরীক্ষার খাতায় পর্যবসিত হয়ে ডিগ্রী দান করে অন্ধকারে বিলীন হয়ে গেছে। জীবনের যা কিছু কাণ্ডজ্ঞান, মর্মজ্ঞানজ্ঞান,রসাস্বাদ যা কিছু লোক সমাজে এষণা শক্তি বা নির্জনে ভাবনা প্রতিষ্ঠা,যা কিছু mother wit, যা কিছু সংবাদকে বিদ্যায় পরিনত করতে পারে,বিদ্যাকে জ্ঞানে, সমস্ত জিনিসেরই অন্তদীর্পন ও বিধি নিয়ম এঁদের কাছ থেকে লাভ করবার সুযোগ হয়েছিলো আমার।

 

আর মুখের ভাষা কী রকম প্রাণক্ষরা ছিলো, কত লোকগাথাও প্রবাসের যথোচিত সংমিশ্রণে তির্যক ও উজ্জ্বল হয়ে উঠতো, বরিশালে যতোদিন তাঁর উদ্যম ও কর্মপ্রবাহ অক্ষুণ্ণ ছিলো ততোদিন তা শুনেছি, বুঝেছি। সে ভাষা প্রকৃতি ও প্রকৃতির মতো মানুষগুলোকে নিখুঁতভাবে ধরতে পেরেছিলো বলেই অমন সহজ পবিত্রতায় ব্যক্ত হতে পারতো।

 

সমস্ত স্কুল জীবনে তিনি আমাদের স্কুলের পড়া শিখিয়েছেন সংসারের কাজ কর্মের ফাঁকে ফাঁকে। স্কুলী পড়া শেখাবার সুযোগে যে বুনিয়াদ গড়েছেন সেটা স্কুল কলজের কারিকুলামের সঙ্গে খাপ খেয়ে চলে না। শুধু সদর্থ আবিষ্কার করে চলতে থাকে সংসারের,সমাজের,দেশের,জীবনের। সে পরমার্থগুলো আজো প্রায় সম্পূর্ণভাবে সত্য। কোনো নিপাট দর্শন এসে খণ্ডন করতে পারে নি সেগুলোকে,কোনো নতুন বিজ্ঞান এসে ছেদ করতে পারেনি।

 

মানুষ এতোদিন পৃথিবীতে থেকে পৃথিবীকে ভুল বুঝেছে, অথবা নিজের জীবনকে চিনতে পারেনি- এ মত পোষণ করা চলে না। সমাজ ও জীবন সম্বন্ধে অনেক দীর্ঘস্হায়ী হয়তো শাশ্বত সত্য আবিষ্কার করেছে মানুষ। জীবনে সেসব সত্যের প্রচলন চেয়েছে সৎ মানুষেরা ; মা- ও আজীবন সে জিনিসই চেয়েছিলেন।

 

সাহিত্য পড়ায় ও আলোচনায় মাকে বিশেষ অংশ নিতে দেখেছি। দেশী বিদেশী কোনো কোনো কবি ঔপন্যাসিকের কোথায় কী ভালো,কী বিশেষ দিয়ে গেছেন তাঁরা এসবের প্রায় প্রথম পাঠ তাঁর কাছ থেকে নিয়েছি। ওয়ার্ডসওয়ার্থের অনেক ছোট ছোট কবিতা তাঁর মুখে শুনেছি এবং শেলী ব্রাউনিভের, বৈষ্ণব পদাবলী থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত আমাদের দেশের কবিতার মোটামুটি সম্পূর্ণ ঐতিহ্য জেনে ও ভালবেসে বিদেশী কবিদের কাউকে কাউকে মনে রেখে তিনি তাঁর স্বাভাবিক কবিজনকে শিক্ষিত ও স্বতন্ত্র করে রেখেছিলেন।

 

মা’র বাবা চন্দ্রনাথ দাসও গান ও কবিতা লিখেছেন অনেক। এঁরও দেখেছি অব্যর্থ স্বভাব রয়েছে যা বিশেষভাবে শিক্ষিত ও নিয়ন্ত্রিত হলে কাজে প্রকাশিত হয়ে উঠতে পারে। না হলে অশিক্ষিত পটুত্ব উল্লেখ্য পদ্যে কোনো কোনো লাইনের বা উপমার উল্লেখযোগ্যতা আরো কিছু প্রগাঢ় হলেও দাদাথ শারের অনেক লেখা ঈশ্বরগুপ্ত, মধুসূদন,হেম,রঙ্গলাল ইত্যাদিকে মনে করিয়ে দিলেও,তাঁর সফলতার লেখা বিশেষ করে কয়েকটি গান,লোকগাথা,ও লোককবিতা খানিকটা স্বার্থক উত্তরসাক্ষ্য হিসেবে টিকে থাকবে মনে হয়।

মা বেশি লেখবার সুযোগ পেলেন না। খুব বড় সংসারের ভেতরে এসে পড়েছিলেন, যেখানে শিক্ষা ও শিক্ষিতদের আবহ ছিলো বটে , কিন্তু দিনরাত অবিশ্রান্ত কাজের ফাঁকে সময় করে লেখা তখনকার দিনের সেই অস্বচ্ছল সংসারের একজন স্ত্রীলোকের পক্ষে শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়ে উঠলো না আর। কবিতা লেখার চেয়ে কাজ ও সেবার সর্বাত্মকতার ভেতরে ডুবে গিয়ে তিনি ভালোই করেছেন হয়তো। তাঁর কাজকর্মের আশ্চর্য নিষ্ঠা দেখে সেই কথা মনে হলেও ভেতরের খবর বুঝতে পারিনি, কিন্তু তিনি আরো লিখলে বাংলা সাহিত্যে আরো বিশেষ কিছু দিয়ে যেতে পারতেন মনে হয়।

 

মা’র কবিতায় আশ্চর্য প্রসাদ গুণ! অনেক সময়ে বেশ ভালো কবিতা বা গদ্য রচনা করছেন দেখতে পেতাম। সংসারের নানা কাজকর্মে খুবই ব্যস্ত আছেন এমন সময় ব্রাহ্মবাদীর সম্পাদক আচার্য মনমোহন চক্রবর্তী এসে বললেন,এক্ষুণি ব্রাহ্মবাদীর  জন্য তোমার কবিতা চাই, প্রেসে পাঠাতে হবে, লোক দাঁড়িয়ে আছে। শুনে মা খাতা কলম নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে এক হাতে খুন্তি আরেক হাতে কলম নাড়ছেন দেখা যেতো, যেনো চিঠি লিখছেন,বড় একটা ঠেকছে না কোথাও ; আচার্য চক্রবতীকে প্রায় তখনই কবিতা দিয়ে দিলেন। স্বভাবকবিদের কথা মনে পড়তো আমার, আমাদের দেশের লোককবিদের স্বভাবই সহজাতকে।

 

অনেক আগে প্রথম জীবনে মা কয়েকটি কবিতা লিখেছিলেন। যেমন ‘ছোট নদী দিনরাত বহে কুলকুল’ অথবা ‘দাদার চিঠি’ কিংবা ‘বিপাশার পরপারে হাসিমুখে রবি উঠে’ ; একটি শান্ত, অর্থধ্বন সুম্মিত ভোরের আলো, শিশির লেগে রয়েছে যেনো এসব কবিতার শরীরে। সে দেশ মায়েরই স্বকীয় ভাবনা কল্পনার স্বীয় দেশ। কোনো সময় এসে সেখান থেকে এদের স্থানচ্যুত করতে পারবে না।

 

আজকের পৃথিবীর জীবনবেদের তাৎপর্য মা বেশি বুঝেছিলেন, তাঁর গদ্য লেখায়, অভিভাষনে, সমাজের নানা সমিতির কাজকর্মে, লোক সমাজের সঙ্গে লেনদেনে, নানা রকম বিখ্যাত বই ও চিন্তা ধারার সঙ্গে পরিচয়ের পিপাসায়, ভাবনা বিচারের আধুনিকতায় মর্ম দেখছিলেন যখন তার কিছু আগেই কবিতা লেখা প্রায় ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন তিনি ; ফলে যে মহৎ কবিতা হয়তো তিনি লিখে যেতে পারতেন, তাঁর রচিত কাজের ভেতরে অনেক জায়গাতেই প্রায় আভাস আছে কিন্তু কোন জায়গাতেই সম্পূর্ণ সিদ্ধি নেই – মাঝে মাঝে কবিতার ভেতর দু-চারটে বিচ্ছিন্ন সিদ্ধিকে বাদ দিয়ে।

 

গদ্যসন্দর্ভ রচনারও এরকম সৎ সাহিত্যের উপাদান ছিলো তাঁর মধ্যে। বাবা ও পিশে মশায়ের অবর্তমানে তিনি বরিশালের  ব্রাহ্মসমাজের আচার্যের কাজ করতেন। আরাধনা উপাসনা আশ্চর্য নির্ঝরের মতো ধ্বনিত হয়ে তবুও ধ্বনির অতীত অর্থগৌরবের দিকে আমাদের মর্ম ফিরিয়ে রাখতো : কোথাও ঠেকতেন না : তাল কেটে যেতো না, পুনরুক্তি ছিলো ন। কিন্তু যে সাহিত্যিক ও কবির গরিমা তাঁর প্রাপ্য ছিলো, সেটাকে অন্তর্দমিত করে রাখলেন তিনি। প্রকাশ্যে কোন পুরষ্কার নিতে গেলেন না। শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের লেখায় ও নিজের অলিখিত অনুভাবনা বিতর্ক ও ধ্যানের ভেতর কেমন যেন আত্মনির্বাণ খুঁজে পেলেন আত্মশুদ্ধিরর জন্য।

 

অনেক দিন আগে, চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুর পর তার ওপর আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম। মা নিজে কবি। পত্র পত্রিকার পাতায় আমার সেই প্রায় প্রথমজাতক কবিতাটি সম্বন্ধে তাঁর মতামত জানবার জন্য মাকে এক কপি সাহিত্যপত্র পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। মা আমাকে ফেরত ডাকে লিখলেন-

চিত্তরঞ্জন সম্পর্কে লিখেছো, ভালোই করেছো, কিন্তু রামমোহনের উপর লিখতে বলেছি তোমাকে, মহর্ষির ওপরেও।

তিনি পড়ে বিক্ষুব্ধ বোধ করেছিলেন – এ যেনো ধান ভানতে শীবের গীত।

 

অনেক আগে আমার মন  বড় বড় আদর্শ পুরুষকে তাঁদের উঁচু পীঠস্থান থেকে নামিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে চাইতো তাঁদের সত্যিকারের মূল্য নিরূপনের নামে বিনাশী বুদ্ধিবলে তাঁদের আঘাত করে। মা টের পেয়েছিলেন, বলেছিলেন-

ওরকম করে হয় না। আগে তাঁদের মহত্ত্বে বিশ্বাস করো, মনের নেতিধর্ম নষ্ট করে ফেলো ; শুধু মহা মানুষ কেনো, যে কোন মানুষ কতখানি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের পাত্র তা অনুভব করতে শেখো।

 

দেশে ও বিদেশে যেসব মহাপুরুষের তালিকা দিয়েছিলেন তিনি আমাকে, অনেক অনুতর্ক বিতর্কের পর টের পেয়েছি সত্যিই তাঁরা মহৎ। যে কোন তুচ্ছ মানুষকে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস করতে বলেছিলেন। এখন বুঝেছি ঠিকই বলেছিলেন। যদিও মায়ের সেই নির্ধািরত পথে মনপবনের মাঝির দল চলেছে যতো বেশি,বাস্তব যাত্রা সেই অনুপাতে কিছুই হয়ে উঠছে না ব্যক্তির বা জাতির বা পৃথিবীর জীবনে। বিদ্বেষই বেশি,হিংসা কেটে যায় না, সংঘর্ষ নষ্ট করে ফেলতে চায় সব। রোলার মত, টমাস মান, রবীন্দ্রনাথ, আইনস্টাইন, গান্ধীজীর মতো একজন লোক তবুও আশা করে বসে থাকেন। ইতিহাস চেনে তাঁদের। আমার মা’র মতো একজন মহিলাও আশা করে বসেছিলেন, বিশ্বাস করতেন।

 

তথ্যসূত্র :
১) লায়লা জামান সম্পাদিত : কুসুমকুমারী দাসের কবিতা। অবসর, ঢাকা ২০০০
২) ড.মিজান রহমান সম্পাদিত : শ্রেষ্ঠ কবিতা : কুসুমকুমারী দাস, কথা প্রকাশ, ঢাকা ২০১২
৩) যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত : বঙ্গের মহিলা কবি। কলকাতা : দ্বিতীয় সংস্করণ ১৩৬০

 

আরও পড়ুনঃ

বরিশালের নারীঃ কবি কুসুমকুমারী দাস ( প্রথম পর্ব)

বরিশালের নারীঃ কবি কুসুমকুমারী দাস ( দ্বিতীয় পর্ব)