বদর যুদ্ধ: ইসলামের জিহাদ ও বর্তমান জঙ্গিবাদ এবং কিছু কথা

প্রকাশিত: ২:৪৮ পূর্বাহ্ণ, মে ২৪, ২০২০
ছবিঃ সংগৃহীত

লিখেছেনঃ মাহমুদ হাসান

১৭ই রমজান ছিলো ঐতিহাসিক বদর দিবস।

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সামরিক লড়াই হয়েছিলো বদর প্রান্তরে। হিজরতের দুই বছরের মাথায়। মুসলিমদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। মুসলিমরা সংখ্যায় কম আবার অনেক সাহাবীই নওমুসলিম। বাবা,চাচা,ভাই বা অন্যান্য আত্মীয় স্বজনের বিরুদ্ধে সাহাবীদেরকে যুদ্ধ করতে হবে। এটা নিয়ে রাসূল (সাঃ) খুব চিন্তিত। তিনি বদর প্রান্তরে সাহাবীদেরকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছিলেন। আবু বকর,ওমর (রাঃ) ভাষণ দিলেন। তাঁদের পূর্ণ প্রচেষ্টা এবং আত্মত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। মিকদাদ ইবন আমর নামক এক সাহাবী দাঁড়িয়ে গেলেন। খুব আবেগময়ী ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন- ” হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ আপনাকে যে আদেশ করেছেন আপনি আমাদেরকে সে দিকে নিয়ে চলুন।আমরা প্রস্তুত। বনী ঈসরাইল মূসা (আঃ)কে বলেছিলো- ‘হে মূসা তুমি এবং তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করো। আমরা এখানে বসে আছি। আমরা যুদ্ধ করতে পারবো না।’ কিন্তু আল্লাহর কসম করে বলছি- আমরা আপনাকে বনী ঈসরাইলের মতো এমন কথা বলবো না। বরং আমরা বলবো- আল্লাহর নির্দেশে আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন, আমরা সেখানেই যাবো,সেখানেই যুদ্ধ করবো। আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান না করা পর্যন্ত আমরা আপনার ডানে, বামে, সামনে ও পেছনে সবদিক থেকেই যুদ্ধ করবো।”

একটা ইনফরমেশন দিয়ে রাখি। বদর যুদ্ধে তিনজন সাহাবী ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করেছিলেন। এর মধ্যে একজন হলেন এই মিকদাদ ইবনে আমর (রাঃ)।বাকী দুইজন – মুরছেদ ইবন আবী মুরছেদ ও যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাঃ)। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে- মিকদাদ ইবন আমরই ছিলেন একমাত্র অশ্বারোহী। তাই বলা হয়ে থাকে- মিকদাদই আল্লাহর রাস্তায় প্রথম ঘোড়া দৌড়েছিলেন।

মিকদাদ (রাঃ) এর এই ভাষণে রাসূল (সাঃ) খুব খুশি হলেন। তাঁর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তিনি বললেন- ‘এই যদি হয় তোমাদের মনোবাসনা তাহলে চলো আমার সাথে জান্নাতে। এমন জান্নাত যে জান্নাতের বিশালতা আসমান ও যমীনের চেয়েও বিশাল।’ রাসূল (সাঃ) এর এই কথা শুনে উমায়ের ইবন হামাম নামের এক সাহাবী দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি বসে খেজুর খাচ্ছিলেন। হাতে কয়েকটা খেজুর ছিলো। দাঁড়িয়ে বললেন- ” কতো সুন্দর কথা বললেন হে আল্লাহর রাসূল! আসমান ও যমীনের চেয়েও বিশাল জান্নাত পাবো! আমার হাতে যে খেজুর আছে এগুলো যদি আমি খেতে থাকি তাহলে তো অনেক সময় লাগবে। জান্নাতে যেতে দেরি হয়ে যাবে। তিনি খেজুরগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। যুদ্ধ করলেন।শহীদ হলেন। বদর যুদ্ধে যে চৌদ্দজন সাহবী শহীদ হয়েছিলেন উমায়ের ইবন হামাম (রাঃ) তাঁদের একজন।

যুদ্ধ শেষ হলো। আল্লাহ মুসলিমদেরকে বিজয় দান করলেন। উমায়ের ইবন হামাম (রাঃ) এর লাশ দেখে রাসূল (সাঃ) আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বললেন- ‘ ইন্নাকা মিন আহলিহা। যে জান্নাতের জন্য খেজুর খাওয়ার দেরিটুকু তোমার সহ্য হচ্ছিলো না, হে উমায়ের, তুমি সে জান্নাতের অধিবাসী।’ (কুরআন,বুখারী ও মুসনাদে আহমাদ)

বর্তমান সময়ে ইসলামের জিহাদকে জঙ্গিবাদের সাথে মিলিয়ে এক করে ফেলা হচ্ছে। হলুদ মিডিয়া এবং ইসলামবিদ্বেষীরা এই জঘন্য কাজ করেছে এবং করে যাচ্ছে। আবার আমাদের কিছু আলেম এবং মডারেট মুসলিমরা জিহাদ ও জঙ্গিবাদ যে এক জিনিস না এটা প্রমাণের জন্য আজগুবি সব কথা বলছে। হাবিজাবি বিভিন্ন এভিডেন্স দিচ্ছে। যেমন- মনের বিরুদ্ধে জিহাদই সবচেয়ে বড় জিহাদ। জিহাদ মানেই যুদ্ধ না। কোন কিছুর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করাই জিহাদ। হাবিজাবি আরো অনেক কিছু।

একটা সহজ ব্যাপার দেখেন। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে বর্তমান আধুনিক রাষ্ট্রে যুদ্ধ বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাষ্ট্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। প্রতিরক্ষা খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বাজেট রাখা হয়। সেনাবাহিনীর পেছনে বিশাল টাকা খরচ করা হয়। বিভিন্ন দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে এবং হচ্ছে। আমরা দেখেছি এবং এখনো দেখছি। রাষ্ট্রের এই যুদ্ধাবস্থাটাই হলো জিহাদ। রাষ্ট্র প্রধানের সরাসরি নির্দেশনায়,অনুমোদনে যে যুদ্ধ হয় সেটাই জিহাদ। বদর যুদ্ধ বা এরও পরে ইসলামের ইতিহাসের শুরুর দিকে যে যুদ্ধগুলো হয়েছিলো তখন রাসূল (সাঃ) ছিলেন মদীনার রাষ্ট্র প্রধান। তাঁর অনুমোদন এবং নির্দেশনাতেই এই যুদ্ধগুলো হয়েছিলো। পরবর্তীতে খলিফাদের নির্দেশে যুদ্ধ হয়েছে। এগুলোই জিহাদ। যুদ্ধ বা জিহাদের জন্য গভঃমেন্ট বডি দরকার। ইচ্ছা হলো- কেউ একজন বুকে বোমা বেঁধে নিজেকে উড়িয়ে দিলো। কিছু সাধারণ মানুষ হত্যা করলো। এটা তো জিহাদ না। এটা জঙ্গিবাদ। এটা কুলাঙ্গারগিরি। জঙ্গিবাদকে জিহাদ বলে যারা ব্রেইনওয়াশ করছে তারাও কুলাঙ্গার। আবার ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা- জিহাদকে যারা জঙ্গিবাদের সাথে মিলিয়ে অপপ্রচার করছে তারাও কুলাঙ্গার।

আপনার যদি এই সহজ বুঝ না থাকে তাহলে বোঝার চেষ্টা করেন। আর বুঝেও যদি না বোঝার ভান করে থাকেন তাহলে আপনি ইসলাম বিদ্বেষী। অসাম্প্রদায়িকতার ধ্বজাধারী জঘন্য সাম্প্রদায়িক। আপনার জন্য শুভকামনা- আল্লাহ আপনাকে সুমতি দান করুক।

আল্লাহ সবাইকে ভালো রাখুক,সুস্থ ও সুন্দর রাখুক।