বখতিয়ারের বাঙলা বিজয়: সংখ্যালঘুদের মুক্তির পয়গাম (প্রথম পর্ব)

প্রকাশিত: ৫:০৫ অপরাহ্ণ, জুন ৮, ২০২০

লিখেছেন আরজু আহমেদ

ক.
বাঙলায় ইসলামের আবির্ভাব ঠিক কখন হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কোনও প্রমাণ ইতিহাসে সংরক্ষিত নেই। তবে নানাবিধ প্রমাণ থেকে আন্দাজ করতে অসুবিধে হয় না- হিজরী প্রথম শতাব্দীর শেষাংশে কিংবা এর অব্যবহিত পরেই এই অঞ্চলে ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছিল। কুমিল্লায় এবং রাজশাহীতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রাপ্ত হারুন অর রশিদের আমলের স্বর্ণমুদ্রা এর প্রমাণ বহন করে। তিনি ছিলেন পঞ্চম আব্বাসীয় খলীফা৷ ১৭০ হিজরীতে তাঁর শাসনামল শুরু হয়৷

আল্লামা ইবনে খুরদাযবিহ, জন্ম গ্রহণ করেছিলেন হিজরী ২০০ সানে। যিনি আব্বাসী খলিফা মুতামিদের সময় গুরুত্বপূর্ণ একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁর প্রণীত কিতাব ‘আল মাসালিক ওয়াল মামালিক’ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, তৎকালে বাঙলায় আরব মুসলমানদের যাতায়াত এবং বসতিও ছিল৷ এমনকি বেশ কিছু অন্য ঐতিহাসিক ব্যাপার থেকে এও ধারণা করা যায়, হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর শুরুর ভাগে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, সন্দীপ প্রভৃতি অঞ্চলে ছোট ছোট মুসলিম সালতানাত গড়ে উঠেছিল। এটা খ্রিস্টীয় দশম শতকের ঘটনা।

যদিও বাঙলার ইতিহাসে সব থেকে বড়ো অধ্যায় ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর ১২০৪ সালের নদীয়া বিজয়। কিন্তু এও সত্য ইসলামের সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের পরিচয় তারচে’ পুরোন। দ্বীন প্রচারে অসংখ্য বিখ্যাত উলামা মাশায়েখের এ অঞ্চলে আগমন ঘটেছিল আরো বহু আগেই৷ যেমন খিলজীর বাঙলা বিজয়ের কমপক্ষে দেড়শো বছর আগেই প্রান্তিক অঞ্চল নেত্রকোনার মদনপুরে ক্বমর উদ্দিন রুমী রহ. এর খানকাহ প্রতিষ্ঠিত হয়।

খ.
ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী রাজবংশের কেউ ছিলেন না। নিতান্ত সাধারণ পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি৷ কর্ম জীবনের শুরুতে বর্তমান আফগানিস্তানের যে ঘুর প্রদেশ, সেখানে তদানীং সুলতানের রাজস্ব অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। রাজস্ব দফতরের কাজে মন বসে না বলে তরুণ বখতিয়ার ভারতে এলেন ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে। চেষ্টা করলেন কুতুবউদ্দিনের সেনাবাহিনীতে ঢোকার। কিন্তু তিনি ছিলেন খাঁটো। চেহারাতেও তেমন যোদ্ধা সুলভ ভাব ছিল না। বাদ পড়লেন। বাদায়ুনে (বর্তমানে উত্তর প্রদেশে) জেনারেল মালিক হিজবার উদ্দিনের সেনাবাহিনীতে অল্প কিছুকাল চাকুরিকালেই তিনি অযোধ্যার গভর্নর মালিক হিশাম উদ্দীনের দৃষ্টি আকর্ষণে সফল হন। তাঁকে এলাহাবাদের একটা এস্টেট জায়গির দেওয়া হয়।

জায়গিরের মালিক হয়ে তিনি ছোট্ট একটা সেনাদল গঠন করেন। মাত্র দুইশজন অশ্বারোহী নিয়ে উদন্তপুরী (বর্তমান বিহার) বিজয় করেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর জন্য বাঙলা বিজয়ের দ্বার উন্মুক্ত হয়। তিনি বাদায়ুনে কুতুব উদ্দিনের কাছে গণিমতের মাল ও কর প্রদান করতে যান। কুতুব উদ্দিন তাঁকে বাঙলায় অভিযানের অনুমতি দেন এবং বিজিত অঞ্চলের শাসনভার প্রদান করেন।

১২৫০- ১২৬০ সময়কালে রচিত তাবাক্বাত এ নাসিরির বর্ণনা থেকে জানা যায়- মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি যখন বিহার থেকে বাঙলা অভিমুখে রওনা করেন তখন তাঁর সাথে মাত্র আঠারো জন অশ্বারোহী ছিলো৷ তিনি এই ছোট্ট দলটি নিয়ে নদীয়ায় প্রবেশ করেন। নগরিতে ঢোকার সময় খুব শান্ত, বিনয়ীবেশে ছিলেন। প্রহরীদের বিভ্রান্ত করা ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। নগররক্ষীরা তাঁকে কোনও হুমকি মনে না করে বিনা বাঁধায় নগরে প্রবেশের সুযোগ দেয়। প্রহরীদের ধারণা ছিল, তিনি সম্ভবত ঘোড়া বিক্রি করতে এসেছেন।

শহরে প্রবেশের পরপরই বখতিয়ার সোজা রাজপ্রাসাদে ঢুকে পড়েন৷ সে সময় সবে মাত্র রাজসভা শেষ হয়েছে। মধ্যাহ্ন ভোজনের সময় হয়ে এসছিল। অপ্রস্তুত রাজমহলে ঢুকে যাওয়ায় রাজা লক্ষণ সেন ভয় পেয়ে পেছনের দরজা দিয়ে খালি পায়ে পালিয়ে যান এবং বিক্রমপুরে আশ্রয় নেন৷ ছোটখাটো বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের কথা বাদ দিলে প্রায় বিনা রক্তপাতে তিনি বাংলা বিজয়ের সবচে’ বড়ো ধাপ সম্পন্ন করেন। এরপর একে একে সমগ্র বাঙলা বিজয় করে থানা ও তহশিল এবং সেনানিবাস স্থাপন করেন। তারিখে ফারিশতা থেকে জানা যায়, রংপুরের অদূরে তাঁর স্থাপিত একটা বৃহৎ সেনানিবাস ছিলো। (আগামী পর্বে সমাপ্য)