বখতিয়ারের বাঙলা বিজয়: সংখ্যালঘুদের মুক্তির পয়গাম (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

প্রকাশিত: ১১:১৯ অপরাহ্ণ, জুন ৯, ২০২০

লিখেছেন আরজু আহমেদ

গ.
ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজী কতো সালে বাঙলা বিজয় করেছেন তা নিয়ে ১১৯৯ থেকে ১২০৫ পর্যন্ত- ছয়টি সালের মধ্যে বিতর্ক আছে। কিন্তু ১২০৫ সালে রচিত হাসান নিজামি-র ‘তাজুল মাসাইর’ গ্রন্থটি এর সমাধান টানে।

তিনি লিখেছেন, ৫৯৯ হিজরির রজব মাসে বখতিয়ার খিলজী কুতুব উদ্দিনের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। ( খ্রিস্টাব্দের হিসেবে তা ছিল মার্চ ১২০৩ ) এর পরের বছর নদীয়া বিজয় করেন তিনি। তাবাক্বাত-ই নাসিরির বর্ণনাও এটাকে সমর্থন করে।

রজব, হিজরি বর্ষের সপ্তম মাস। সে হিসেবে ১২০৩ সালের সেপ্টেম্বরে হিজরি পরবর্তী বছরের সূচনা হয়। সমসাময়িক অন্য সব ঘটনাবলী বিচার করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, ১২০৩ এর শেষভাগে নয় বরং ১২০৪ সালের অগ্রভাগেই বখতিয়ার খিলজী বাঙলা বিজয় করেন। কারণ, কুতুবউদ্দিনের সাথে তাঁর সাক্ষাত ও বাংলা অভিযানের মাঝে এক বছরের থেকে বেশি পার্থক্য ছিল না। ফলে বাঙলা বিজয় ১২০৪ সালেই হয়েছে এটাকেই আমি বিশুদ্ধ মত বলে মনে করি।

(সম্প্রতি কিছু লেখা আমার নজরে এসেছে, যেখানে দাবী করা হয়েছে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বখতিয়ার খিলজি বাঙলা বিজয় করেন ১৯ রমযান। দিনটিকে কেন্দ্র করেই সেসব পোস্ট করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের সে কালের সমসাময়িক তো বটেই বরং পরবর্তীতেও গ্রহণযোগ্য কোথাও এই বিজয় কিংবা অভিযানের কোনও প্রকার তারিখ উল্লেখ নেই। ফলে যেখানে সাল নিয়েই এত দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে, সেখানে এইভাবে তারিখ নির্দিষ্ট করাটা ইতিহাস শাস্ত্র নীতি বিবর্জিত।)

ঘ.
চারশো বছরের বৌদ্ধ শাসনের ইতি ঘটিয়ে দক্ষিণ ভারতীয় সেন রাজশক্তি বৃহৎ বাঙলা অঞ্চল দখলে নিলে বৌদ্ধরা ব্যাপক দলন-দমন ও হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছিল। এর ফলে বৌদ্ধদের অনেকেই নিজের জীবন ও ধর্ম রক্ষায় নেপাল, তিব্বত, চীনে পালিয়ে চলে যায়। বাঙলা ভাষার সর্বপ্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদ নেপাল থেকে আবিষ্কৃত হওয়ায় এটাই বোঝা যায়- ‘বৌদ্ধধর্ম সংগীত’ বুকে ধারণ করেই বাঙালি বৌদ্ধরা হিন্দু সেনবংশীয় শাসনকালে সুদূর নেপালে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।

তৎকালীন মাত্র একশ বছরের সেন সাম্রাজ্যকালে অত্যাচারমূলক সাম্প্রদায়িক নীতির কারণে এ অঞ্চলের সংখ্যাগুরু বৌদ্ধরা জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছিল৷ আজো হয়ত নেপাল, মিয়ানমার, চীনের কোনও প্রান্তরে এই বাঙালি বৌদ্ধের অধঃস্তন উত্তরাধিকারের বাস রয়েছে৷ বিপরীতে সমসাময়িককালে মুসলমানদের ভারত বিজয়ে যে শান্তি ও সমৃদ্ধি কায়েম হয়েছিল- সেন বংশের রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করার মধ্য দিয়ে বাঙলাতেও সেই ধারাবাহিকতা শুরু হয়।

ড. দীনেশ চন্দ্র সেন মুসলিম বিজয়ের দিকে ইঙ্গিত করে লিখেন-

‘ইতিহাসে কোথাও একথা নাই যে সেনরাজত্বের ধ্বংসের প্রাক্কালে মুসলমানদিগের সঙ্গে বাঙালি জাতির রীতিমত কোনো যুদ্ধবিগ্রহ হইয়াছে। পরন্তু দেখা যায় যে বঙ্গবিজয়ের পরে বিশেষ করিয়া উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সহস্র সহস্র বৌদ্ধ ও নিম্নশ্রেণীর হিন্দু, নব ব্রাহ্মণদিগের ঘোর অত্যাচার সহ্য করিতে না পারিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণপূর্বক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়াছে।’

চর্যাপদের আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেন, –

‘একদিনেই বৌদ্ধদের অর্ধেক ইসলাম গ্রহণ করেন।’

এই জনপদে ইসলাম আগে থেকেই ছিল। কিন্তু বখতিয়ারের মাধ্যমে রাজশক্তি হিসেবে ইসলামের এই বিজয় ছিল মাজলুমের জন্য সুরক্ষা। নির্যাতিত বৌদ্ধদের, আর নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মুক্ত জীবনের ত্রাতা হিসেবে এর আবির্ভাব ঘটেছিল। আর মুসলমানদের দান করেছিল ইজ্জত। এই বিজয়ের মধ্য দিয়েই ‘বাঙলা’ অঞ্চল প্রথমবারের মত একটা রাষ্ট্রকাঠামোয় রূপ নেয়। তাই বখতিয়ারের বিজয়াভিযান ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।

ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজী কেবল এ অঞ্চলে নয় বরং ইসলামের সামগ্রিক ইতিহাসের বিচারেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি। তিনি এমন এক অঞ্চলে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করে ছিলেন যা উমাইয়া কিংবা আব্বাসীয় খেলাফতকালে কারো চিন্তাতেও ছিল না। আল্লাহ্‌ তাঁকে জান্নাতে উঁচু মাকাম দান করুন।