ফুটন্ত ফুলের মতো আলো-ঝলমলে ইস্তাম্বুলের মসজিদ

প্রকাশিত: ৯:৩৯ অপরাহ্ণ, জুন ৮, ২০২০
ছবিঃ ইন্টারনেট।

লিখেছেনঃ সৈয়দ শামসুল হুদা

তুরস্ক সফর মানেই ইস্তাম্বুল সফর করা। কেউ তুরস্ককে জানতে চাইবে, দেখতে চাইবে, আর সে ইস্তাম্বুল দেখবে না, তাহলে তার তুরস্ক দেখা পূর্ণ হবে না। আর ইস্তাম্বুল দেখা মানেই ইস্তাম্বুলের মসজিদগুলো দেখা। ইস্তাম্বুলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে মসজিদগুলো এমনভাবে মিশে আছে যা উভয়টিকে একাকার করে দিয়েছে। কন্সটান্টিনোপল  বিজয়ের পর ইসলামের ঐতিহ্য অনুসারে মসজিদ নির্মাণের যে ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিলো আজো তা ধারাবাহিকভাবে তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধানদের স্মৃতির সাথে বহমান। শত শত বছরের উসমানী খেলাফতের স্মৃতি ধরে রাখা জায়গাগুলোর অন্যতম হলো এই সকল মসজিদসমূহ।

তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানকে নিয়ে কেউ কেউ যেমন অতিরঞ্জনমূলক প্রশংসা করেন, তেমনি কেউ কেউ তার ওপরে ইনসাফের দৃষ্টিতে জুলুম করেন। কোন পরিবেশে এরদোয়ানরা দ্বীন ও ইসলামের পক্ষে কাজ করছে তারা রীতিমতো তা ভুলে যান । তাকে বিচার করেন নিজ নিজ দেশের কলুসিত রাজনীতির মাপকাঠি দিয়ে। এরদোয়ানকে মাপতে হবে তার দেশের মাপকাঠি দিয়ে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের রাজনীতির মাপকাঠি দিয়ে।

ইসলামের ইতিহাসে যত বিজয় এসেছে তার সাথে মসজিদের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। যেখানেই ইসলাম পৌঁছবে, সেখানেই পৌঁছে যাবে মসজিদ। ১৪৫২সালে সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ কর্তৃক বর্তমান তুরস্কের ইউরোপ অংশ, যেখানে রোমানদের হাজার বছরের সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, তার পতন অনিবার্য হয়ে উঠলে সেখানেও স্বাভাবিক নিয়মেই মসজিদ গড়ে উঠে। কন্সট্যান্টদের যখন পরাজয় ঘটলো, সেই ভালোবাসার আয়া সোফিয়া বা হাজিয়া সোফিয়া যে নামেই ডাকা হোক না কেন মুসলমানদের হাতে তার পতন যখন ঘটলো, তখন স্বাভাবিকভাবেই আয়া-সোফিয়া  মসজিদে রূপান্তরিত হয়ে উঠলো। আয়া-সোফিয়ার কয়েক’শ গজ দূরে প্রতিষ্ঠিত হলো সুলতান আহমদ মসজিদ বা যাকে ব্লু-মস্ক নামে ডাকা হয়। আয়া সোফিয়ার একপাশে তোপকাপি প্যালেস, বিপরীত পাশে ব্লু মস্ক। এই তিনটি স্থাপনাই মারমারা সাগরের উপকূল ঘেষে গড়ে উঠেছে। একদিকে মারমারা সাগর, অপরদিকে বসফরাস শুরু। কী চমৎকার একটি মোহনীয় জায়গায় পৃথিবীর ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাগুলো গড়ে উঠেছে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না।

 

ছবিঃ ইন্টারনেট

ইস্তাম্বুলের যারাই যখন শাসক ছিলেন, তারাই নিজেদেরকে স্মৃতির সাথে স্মরণীয় করে রাখতে গড়ে তুলেছেন অন্যতম পবিত্র স্থান এক একটি মসজিদ। তারা বড় কোন জাদুঘর গড়ে যাননি। অন্য কোন স্থাপনা এতটা আকর্ষণীয় নয়, যতটা আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা হয়েছিল প্রতিটি মসজিদকে। মি’মার সিনানী তুরস্কের নির্মাণ ইতিহাসে এক অক্ষত, অবিস্মরণীয় নাম। তার হাত ধরেই তুরস্কের বড় বড় মসজিদগুলো তৈরী হয়েছে। যার প্রতিটির বয়স বর্তমানে প্রায়  ৪থেকে ৫’শ বছর। স্বাভাবিক কারণেই এসব মসজিদগুলো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় বর্তমান শাসক এরদোয়ান খুব নীরবে সেই কাজটি করছেন। ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে কামাল আতাতুর্ক থমকে দিয়েছিলেন।

১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উসমানী খেলাফত বিলূপ্ত ঘোষণা করে তথাকথিত আধুনিক তুরস্ক নির্মাণ করতে গিয়ে ইতিহাসের চাকাকে একেবারেই শ্লথ করে দিয়েছিলেন। একটি দেশের ভাষার হরফ পাল্টে দিয়েছিলেন। যেই ইস্তাম্বুলের পরিচয়-পরিচিতি ইসলামের সাথে, দ্বীনের সাথে, মসজিদের সাথে, সেই সম্পর্ককেই ছিন্ন করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহর কিছু অসীম সাহসী ও ত্যাগী বান্দাদের কোরবানী, লক্ষ আলেম, হাফেজ, কারী, দ্বীনদার মানুষের জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে সেই জায়গায় আবার ইসলামের নতুন করে জাগরণ শুরু হয়েছে। এরদোয়ান ইতিহাসকে আবার জাগিয়ে তুলতে প্রতিটি মসজিদেই নতুন করে সংস্কারে হাত দিয়েছেন। সুলতান সুলায়মান আল কানুনী মসজিদ, সুলতান আহমদ খান মসজিদ, সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ মসজিদসহ ছোট বড় প্রায় সবগুলো মসজিদকেই আবার নতুন করে জাগিয়ে তোলা হচ্ছে। সংস্কার করা মসজদিগুলোতে প্রবেশ করার সাথে সাথে মনে হয় এ যেন এক জান্নাতি পরিবেশে বসে আছি। সুলতান সোলায়মানিয়া মসজিদের ভেতরাংশে সংস্কার প্রায় শেষ। আমরা যখন বাদ ইশা, সেই মসজিদে প্রবেশ করি, তখন সেখান থেকে আর বের হয়ে আসতে মন সায় দিচ্ছিল না। এত সুন্দর লাইটিং, কার্পেটিং, ডিজাইন সবকিছু যেন মন কেড়ে নেয়। প্রতিদিন, প্রতিমুহুর্তে সেখানে পর্যটকরা আসছে, মুসুল্লিরা আসছে। এর মাধ্যমে  ইস্তাম্বুলই শুধু নয় তুরস্কের সর্বত্র, সব জাগয়ায় সবগুলো মসজিদেই উন্নয়নের ছুঁয়া পড়েছে। মানুষের প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসছে।

ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায় নিয়ে যেই তুরস্ক দাঁড়িয়ে আছে, সেই তুরস্ককে ইতিহাসের মূল সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে কম চেষ্টা করা হয়নি। কিন্তু সবচেষ্টাই ব্যর্থ হতে চলেছে আল্লাহর কিছু নিবেদিত প্রাণ বান্দাদের কোরবানীর সামনে। তুরস্কের মসজিদগুলো জীবন ফিরে পাচ্ছে। আজকের মাহমুদ আফেন্দী দা.বা.রা একসময় একা একা যুগ যুগ ধরে মসজিদে নামায আদায় করেছেন। মুসুল্লি খুঁজে পাননি। মসজিদ সংস্কারতো দূরের কথা। যেই সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ এর হাত ধরে তুরস্কের চূড়ান্ত উত্থান, সেই ফাতেহ এর স্মৃতি ধন্য আয়াসোফিয়াকে মসজিদ থেকে কামাল আতাতুর্করা যাদুঘরে রূপান্তরিত করেছিল। আজো সেটি মসজিদে রুপান্তর করা সম্ভব হয়নি। পরিবেশের প্রতিকূলতাকে সমীহ করে খুব ধীর গতিতে এগিয় যাচ্ছেন এরদোয়ান। ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত সফল শাসক আদনান মেন্ডারিসকে তৎকালীন কামালীয় দানবরা শুধুমাত্র আরবীতে আজান দেওয়ার অপরাধে একটি নীরব দ্বীপপুঞ্জে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছিল। ১০বছর যিনি ক্ষমতায়, তাকে ফাঁসি দিতে সামান্যও কুণ্ঠাবোধ করেনি তৎকালীন সামরিক সরকার। আজ সেই দ্বীপে তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মসজিদ, মিলনায়তন নির্মাণ করে ইসলামের শক্তি ও সংস্কৃতির পুনরুত্থান ঘটাতে, সেই সকল সেনা অফিসারদের আজীবন যেন তুর্কিরা ঘৃণা করে তার স্থায়ী ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন।

ছবিঃ ইন্টারনেট।

তুরস্কের মানুষের সাহস, তাদের ঈমান অনেক বেশি পরিপক্ক। আল্লাহর বড়ত্বের অনুভুতি তাদের অন্তরে অনেকের চেয়ে অনেক বেশি গভীরে। সেই কারণেই এরদোয়ান সরকার সারা তুরস্কে প্রতিটি বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে হাজার হাজার মসজিদ নির্মাণ করে দিচ্ছেন। যাতে করে পরবর্তী প্রজন্ম যখন ক্ষমতায় আসবে, তখন-এখন যেমন এরদোয়ানরা অনেক কিছুই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও করতে পারছেন না, তা বাস্তবায়ন করতে তাদের সামনে কোন বাধা  থাকবে না। আগামী দিনের সেই পরিবেশ আজকের এরদোয়ানরা করে দিয়ে যাচ্ছেন।  কামাল আতাতুর্ক যে নতুন প্রজন্মের শক্তির জোরে ইসলাম থেকে তুরস্ককে বের করে নিতে চেয়েছিল, সেই তুরস্ককে এরদোয়ান পরবর্তী নুতন প্রজন্ম আশা করা যায়, ইসলামের ফুল ফোটাতে যা কিছু করণীয় তার সবকিছুই করবে। এরদোয়ানরাও যেখানে হাত দিতে সাহস পাচ্ছেন না, সেখানে সেই নতুন প্রজন্ম হাত দিবে, এটা দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করা যায়।

ফাঁসি হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী আদনান মেন্দেরেসকে স্মরণীয় ও বরণীয় করে রাখতে এরদোয়ান সরকার নানামুখি উদ্যোগ গ্রহন করেছে। তুরস্কে কামালিজমের একদলীয় শাসনের ভীতকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন এই আদনান মেন্দেরেস। তিনিই আরবীতে আজান দেওয়াকে পুনঃ বৈধতা দিয়েছিলেন, দিয়েছিলেন ধর্ম-কর্ম করার স্বাধীনতাও। মারমারা সাগরের  জনমানবহীন এক ছোট্ট দ্বীপে ধর্মীয় বিদ্বেষের চরমতম পরাকাষ্ঠা মনোভাব প্রকাশ করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই জনপ্রিয় শাসককে হত্যা করে, যাতে মানুষ কিছুই না জানতে পারে। সেই দ্বীপেও আজ এরদোয়ান মসজিদ নির্মাণ করে কামালপন্থীদের ওপর নীরব প্রতিশোধ নিচ্ছেন। মেন্দেরেসের ফাঁসি হওয়া সেই দ্বীপকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে সিদ্ধান্ত নেয় তুরস্ক সরকার। ২০১৩ সালে কাজ শুরু হওয়া সেই প্রজেক্টের কাজও একদম শেষ পর্যায়ে। তাতে থাকছে একটি মসজিদ, একটি স্মৃতিস্তম্ভ, ৬০০ অতিথির ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টার, মিউজিয়াম, হোটেলসহ নানা নির্মাণ।

এসব কিছুই বর্তমান এরদোয়ান সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। তিনি খুব ঠান্ডা মাথার মানুষ। শীতপ্রধান দেওয়ার কারণে মনে হয় তারা আরো বেশি ঠান্ডা মাথার মানুষ।  এরদোয়ানদের মতোই কারো না কারো হাত ধরে তুরস্কে যে ইসলামের বিজয় ঘটবে, তার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই ইনশাআল্লাহ। এরদোয়ানদের এ পর্যন্ত আসতে আদনান মেন্দেরেসদের ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছে। নাজমুদ্দিন আরবাকানদের বারবার দল পরিবর্তন করতে হয়েছে। সমাজ সংস্কারক, দায়ী, আল্লামা বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসী রহ. এর মতো মহান ব্যক্তিদের কোরবানী দিতে হয়েছে।

বাংলাদেশে বসে অনেক সময় এরদোয়ানকে নিয়ে তিরস্কার করা হয়, তারপ্রতি কোনরূপ সহমর্মিতা প্রদর্শনকে বাঁকা চোখে দেখা হয়। অনেক নবীন আলেম জিহাদ ও শরিয়ার বিভিন্ন মানদন্ডে তাকে মাপতে গিয়ে নানাসমীকরণে অরুচিকর শব্দবানে জর্জরিত করা হয়। এটা আমাদের আঞ্চলিক হীনমণ্যতার অংশ। কোথায় এরদোয়ানদের রাজনীতি? কোথায় আমাদের দৌঁড়ঝাপ? পরিবেশ পরিস্থিতি এটা প্রমাণ করে যে, তুরস্কে ইনশাআল্লাহ বিজয়ীধর্ম হিসেবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেখানে অবশ্যই ইসলামের ফুল আবার ফুটবে।  আর এ জন্য অন্যতম ভূমিকা রাখবে আজকের নির্মিত মসজিদগুলো।