ফিকহী মতবিরোধে হাদীসের প্রভাব

প্রকাশিত: ৫:৩০ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২০

লিখেছেন- ফয়জুল্লাহ মুনির

মুসলিম মাত্রই রাসূলের বাণীর প্রতি অগাধ ভালোবাসা লালন করেন। হাদীসের কথা শুনলেই শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। বিনা বাক্যব্যয়ে করজোড়ে স্যারেন্ডার করতে রাজি হয়ে যান। এ তো গেল যে কোন সাধারণ মুসলমানের কথা। সেই তুলনায় রাসূলের প্রতি সাহাবীদের প্রেম, ভক্তি বা ভালোবাসা কোনও মাপকাঠিতে কি তুলনা করা যায়? অবশ্যই না। কল্পনা করলেও আমরা হয়তোবা কাছাকাছি পৌঁছুতে পারব। কিন্তু একেবারে সঠিক উপলব্ধি, এ তো এক অসম্ভব ব্যাপার। যাই হোক, খাইরুল কুরুনের প্রতিটা ব্যক্তিরই প্রায় একই হালত ছিল। তাঁরা হাদীসের নামে ছিলেন পাগলপারা, অজ্ঞান। হাদীসের বিপরীত কোন কথা তাঁরা শুনতে রাজি নন। আমাদের ফিকহী মাযহাবের চার ইমামও ছিলেন সেই সময়কার। তাঁরাও হাদীসের প্রতি অগাধ ভক্তি লালন করতেন।

ইমাম শাফেয়ি রহ. সম্পর্কে বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, যদি আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীস রেওয়ায়েত করে ভিন্নমত পোষণ করি, তবে (জানি না) কোন আসমান আমাকে ছায়া দিবে আর কোন যমীনই বা আমাকে আশ্রয় দিবে? (ইমাম সুবকী রহ. রচিত معنى قول الإمام المطلبي: فهو مذهبي এর ভূমিকা দ্রষ্টব্য)

ইমাম মালেক রহ. চমৎকার উপমা দিয়েছেন। “রাসূলের সুন্নাত হচ্ছে নূহ আ. এর নৌকার মতো। যে তাতে চড়ল সে মুক্তি পেল। আর যে পিছু হটে রইল সে নিশ্চয়ই ডুবে যাবে”। (ইমাম সুয়ূতীর রচিত مفتاح الجنة في الاحتجاج بالسنة এর পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য)

অপরদিকে ইমাম আহমদ রহ. শক্ত ভাষায় বলেছেন, “যে ব্যক্তি হাদীস প্রত্যাখ্যান করল সে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে”। (ইমাম ইবনুল জাওযী রহ. রচিত مناقب الإمام أحمد এর ১৮২ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)

এসব উদ্ধৃতি থেকে খুব সহজেই হাদীসের প্রতি তাঁদের একান্ত নির্ভরতা অনুমান করা যায়। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত মাযহাবও কিন্তু এর বাইরে ছিল না এবং লোকদেরকেও তাঁরা উর্বর মস্তিষ্কের চিন্তা গ্রহণ না করে হাদীসের উপর আমল করতেই উদ্ধুদ্ধ করতেন।

ইমাম আবু হানিফা রহ. স্পষ্টই বলেছেন, “তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে স্বমত নির্ভর কথা বলা থেকে বেঁচে থাকো। তোমাদের উপর কর্তব্য হচ্ছে সুন্নাহকে আঁকড়ে থাকা। যে এর থেকে সটকে পড়বে সে নিশ্চয়ই পথভ্রষ্ট”। (আল্লামা শি’ররানী রহ. রচিত الميزان الكبرى প্রথম খণ্ডের ৫০ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)

এখন স্বভাবতই আমাদের মনে একটি প্রশ্ন জাগে। সবাই যখন কুরআন সুন্নাহকেই নিজের মাসলাকের মূল ভিত্তি বানিয়েছেন, তবে তাঁদের মাঝে এত ইখতিলাফ বা মতদ্বৈধ তৈরি হল কি করে? এর উত্তর অনেক ব্যাখ্যাসাপেক্ষ এবং দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে। আমি এখানে সংক্ষেপে চারটি কারণ উল্লেখ করছি—

প্রথম কারণঃ হাদীস কখন আমলযোগ্য হয়?

এ ব্যাপারে শুধু ফুকাহাদের মাঝে নয়। বরং খোদ মুহাদ্দিসদের মাঝেও এ নিয়ে বিস্তর মতানৈক্য রয়েছে। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়—

(ক) হাদীস সহীহ হওয়ার জন্য শর্ত কি, এই বিষয়েও ইমামদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। যার দরুন মাসআলার ক্ষেত্রেও ভিন্ন মত প্রকাশ পেয়েছে।

(খ) হাদীস আমলযোগ্য হওয়ার জন্য কি সহীহ হওয়া শর্ত? অধিকাংশই শর্ত করেন নি। বরং যে ক্ষেত্রে কোন সহীহ হাদীস পাওয়া না যায় সেখানে তারা কিয়াসের পরিবর্তে যয়ীফ (ضعيف) হাদীসের উপর আমল করাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কিংবা যেখানে মাসআলার দুইটা দিকই বরাবর, সেক্ষেত্রে তারা কোন একটাকে গ্রহন করার জন্য যয়ীফ হাদীসের সহায়তা নিয়েছেন। এখান থেকেও কিছু মাসআসায় মতভিন্নতা দেখা দিয়েছে।

(গ) হাদীসের শব্দ হুবহু মুখস্থ করা কি জরুরী, নাকি সমার্থক শব্দে হাদীসের ভাষ্যটুকু ব্যক্ত করলেই যথেষ্ট। এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও যে ব্যক্তি অর্থ অনুধাবন করতে পারে তার জন্য মুহাদ্দিসগণ এটা জায়েজ বলেছেন। কিন্তু ইমাম আবু হানিফা রহ. সাথে সাথে আরেকটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন‌। তিনি বলেন, ফকীহ ছাড়া অন্য কারও জন্য এই কাজ করা জায়েয নেই। কারণ, অনেক সময় একই শব্দ ব্যবহারগত ভিন্নতার কারণে মাসআলার মধ্যে অনেক পার্থক্য হয়ে যায়। কথাটাকে খোলাসা করার জন্য আমি একটি উদাহরণ টানছি—

বুখারীর রেওয়ায়েতে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাসবুক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন,

وما فاتكم فأتموا

তোমাদের যেই রাকাতগুলো ছুটে গেছে তা পূর্ণ করে নাও। (হাদীস নং—৬৩৫)

একই হাদীস নাসায়ীর রেওয়ায়েতে এসেছে একটু ভিন্ন শব্দে—

وما فاتكم فاقضوا

(হাদীস নং—৮৬১)

কাযা (قضاء) এবং ইতমাম (إتمام) শব্দ দুটির মাঝে আভিধানিকভাবে তেমন কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু মাসআলার ক্ষেত্রে কতটা ফারাক হবে চিন্তা করতে পারেন? ধরুন, এক ব্যক্তি ইমামের সাথে চার রাকাতের এক রাকাত পেয়েছে। তাহলে বাকি তিন রাকাত আদায় করার ক্ষেত্রে সে কিভাবে আদায় করবে? যদি ইতমাম (إتمام) শব্দ ধরি, তবে সে ইমামের সাথে যেই রাকাত আদায় করেছে তা তার জন্য প্রথম রাকাত। বাকি তিন রাকাত সে নিজে নিজে পূর্ণ করে নিবে। সুতরাং তার নিজের তিন রাকাতের প্রথম রাকাতে কেরাত পড়ে বৈঠক করবে। এরপর বাকি দুই রাকাত শুধু সুরা ফাতিহা পড়েই শেষ করে দিবে।

অপরদিকে যদি কাযা (قضاء) শব্দ গ্রহণ করি তাহলে ইমামের সাথে আদায় করা রাকাতটি তার জন্যও চতুর্থ রাকাত বলেই গণ্য। বাকি প্রথম তিন রাকাত তাকে একাকী আদায় করতে হবে। এজন্য সে নামাজ যেভাবে সানা দিয়ে শুরু করতে হয় সেভাবেই শুরু করবে। পাশাপাশি প্রথম দুই রাকাতেই কেরাত মিলাবে। তবে হানাফি মাযহাবের বক্তব্য হল, এক্ষেত্রে তার একাকী নামাজের প্রথম রাকাতেই বৈঠক করবে। যেন উভয় রেওয়ায়েতের উপরই আমল করা হয়ে যায়।

(ঘ) ঠিক একইভাবে আরবি ব্যাকরণ অনুসারে হাদীসের প্রতিটা শব্দের হরকত ঠিক রাখাও জরুরী। কারণ, অনেক সময় শব্দের সামান্য হেরফের হওয়াতেও হাদীসের অর্থ পাল্টে যায়। এবং সেখান থেকে মাসআলায় মতভিন্নতা দেখা দেওয়াও অস্বাভাবিক নয়।

এবার আসুন একটি প্রশ্ন, বহু ফকীহ থেকে এমন কথা বর্ণিত আছে যে তারা বলেছেন,

إذا صح الحديث فهو مذهبي

অর্থাৎ, কোথাও সহীহ হাদীস পাওয়া গেলে সেটাই আমার মাযহাব। তাহলে এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগবে, বহু জায়গায় তো আমরা সহীহ হাদীস পাই। অথচ সেটা ইমাম নিজের মাযহাব হিসাবে গ্রহণ করেন নি। তাহলে কথার সাথে কাজের মিল রইল কই? উত্তরটা খুবই সহজ। আসলে এক্ষেত্রে হাদীস সহীহ হওয়ার অর্থ হচ্ছে আমলযোগ্য হওয়া। আর আমলযোগ্য হওয়ার জন্য হাদীস শুধুমাত্র সহীহ হওয়াই যথেষ্ট নয়। বরং আরও কিছু বিষয় এখানে লক্ষণীয়। যেমন, আমরা জানি, শরয়ী দলীল চারটা। কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস। তো কোন মাসআলায় যদি হাদীসের খেলাফ কুরআনের আয়াত কিংবা ইজমা পাওয়া যায়, অথবা হাদীসটি মানসুখ হয়ে গেছে জানা যায়, তবে সেক্ষেত্রে হাদীস সহীহ হলেও আমলযোগ্য নয়।

এখন হয়তোবা কেউ প্রশ্ন করে বসবেন, আমরা তো রাসূলের অনুসরণের জন্য আদিষ্ট হয়েছি, তাহলে ইমামদের কেন মানতে হবে? কিংবা মেনে নিলাম মাযহাব মানা ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু চারটা মাযহাব থাকবে কেন? সবগুলো মাযহাব সমন্বয় করে সবচেয়ে বিশুদ্ধ মতটাকে গ্রহণ করলেই তো হল।

বুদ্ধিমান মাত্রই জানেন, এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া অবান্তর। তারপরও বলছি, সবগুলো মাযহাবের মধ্যে সমন্বয় কে করবে? আপনি করবেন? আচ্ছা, ধরে নিলাম আপনিই করবেন। তো আজকে আপনার কাছে হানাফি মাযহাবের একটা বিষয় ভালো লাগল, কালকে আবার মনে হল, নাহ, শাফেয়ি মাযহাবেই বুঝি বিশুদ্ধটা বলেছে। পরেরদিন মালেকি, চতুর্থ দিন হাম্বলি। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় দেখবেন আপনার মাথারও তাল নেই, ধর্মকর্মেরও তাল নেই। সঠিক পথ থেকে নিজের অজান্তেই যে কিভাবে সটকে পড়বেন টেরও পাবেন না। তখন সেটা প্রবৃত্তি পুজা ছাড়া হাদীসের অনুসরণ কোন কালেই হবে না। এটাই মূলতঃ ‘এক মাযহাব কেন মানতে হবে’ তার কারণ। যাই হোক, এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা আছে। কেউ চাইলে বড়ো কিতাবগুলো মুতালা করে নিতে পারেন।

দ্বিতীয় কারণঃ হাদীস বুঝার ক্ষেত্রে ভিন্নতা।

এখানে দুইটি বিষয় লক্ষণীয়—

(ক) বোধশক্তির ভিন্নতা।

আল্লাহ তা’আলা সৃষ্টিগতভাবেই অনেককে অসাধারণ ধীশক্তি দান করেন। আবার কেউ কেউ চেষ্টা মুজাহাদা করেও প্রবল বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হতে পারে। ইমাম আবু হানিফা রহ. এর একটি ঘটনা উল্লেখ করছি—

একবার তিনি তাঁর উস্তাদ প্রসিদ্ধ তাবেয়ি আ’মাশ রহ. কাছে বসা ছিলেন। তখন উস্তাদ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এই মাসআলাগুলোর ব্যাপারে কি বলো? তিনি যথাযথ উত্তর দিলেন। তখন উস্তাদ বললেন, এসব ফতোয়া তুমি কোথায় পেয়েছ? ইমাম আবু হানিফা রহ. আ’মাশ রহ. এর সনদে একে একে হাদীস বয়ান করে যেতে লাগলেন। তখন উস্তাদ আ’মাশ রহ. বললেন, যথেষ্ট হয়েছে। আমি একশ দিনে তোমাকে যেই হাদীস বয়ান করিনি, তুমি কয়েক মিনিটেই তা শুনিয়ে দিয়েছ। এরপর তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ উক্তিটি করেন, “হে ফকীহের দল! তোমরা হলে উম্মাহর ডাক্তার, পক্ষান্তরে আমরা (মুহাদ্দিসরা) হচ্ছি ফার্মাসিস্ট। আর ওহে পুরুষ! (আবু হানিফা) তুমি দুটোই অর্জন করেছো। (মোল্লা আলী কারী রহ. রচিত مناقب الإمام أبي حنيفة দ্রষ্টব্য)

উপরের ঘটনা থেকে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর হাদীসের জ্ঞান খুব সহজেই অনুমেয়।

(খ) হাদীসের শব্দে একাধিক অর্থের সম্ভাবনা থাকা। এটাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে মতানৈক্যের সূত্র হয়ে থাকে।

যেমন, কিতাবুল বুয়ূ’র একটি হাদীস। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

البيعان بالخيار ما لم يتفرقا. (হাদীস নং—২০৭৯)

এখানে تفرق এর দুইটি অর্থ।

১. تفرق بالأبدان তথা দৈহিকভাবে আলাদা হয়ে যাওয়া।

২. تفرق بالأقوال তথা অন্য আলোচনায় লিপ্ত হওয়া।

দুইটা অর্থই গ্রহণ করার সুযোগ আছে এবং দুইটার পক্ষেই দলীল বিদ্যমান। ফলশ্রুতিতে এখানে মাযহাবও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে।

উপরোক্ত দু’টি পয়েন্ট থেকে একটা বিষয় সুস্পষ্ট। তা হল, হাদীসের উপর আমল করার জন্য যেমনিভাবে হাদীসের ব্যাপক চর্চা থাকা দরকার, ঠিক তেমনিভাবে হাদীসের সঠিক অনুধাবনও প্রয়োজন। আমাদের ইমামদের মাঝে দুটি গুণই ছিল। সাথে সাথে তাঁদের মধ্যে তাকওয়া, পরহেযগারিরও কোন কমতি ছিল না। এজন্যই তাঁরা ইমাম হতে পেরেছিলেন। এতদসত্ত্বেও আজকাল কিছু লোক বলে বেড়ায়, ইমাম আবু হানিফার ফিকাহ মানতে হবে কেন? কুরআন সুন্নাহর ফিকাহ মানো। রাসূলের ফিকাহ মানো। প্রকারান্তরে এরা ইমাম আবু হানিফাকে বাদ দিয়ে নিজের বুঝটুকু কুরআন সুন্নাহর নামে সরলমনা মানুষগুলোকে গেলানোর চেষ্টা করছে। আসলে এরা ফিকহের শাব্দিক অর্থও বুঝে নি, মর্মও উপলব্ধি করে নি। ফিকাহ যে আসলে আলাদা কিছু নয়, কুরআন সুন্নাহরই ব্যাখ্যা ও সারকথা, এতটুকু বোঝার মত বোধ তাদের এখনও হয়ে ওঠেনি। আল্লাহ তা’আলা সবাইকে সঠিক পথনির্দেশ করুন। আমীন।

তৃতীয় কারণঃ একই মাসআলায় বিপরীতমুখী একাধিক হাদীসের উপস্থিতি।

অনেক সময় একই মাসআলায় বিপরীতমুখী একাধিক হাদীস পাওয়া যায়। তখন দুই হাদীসের মাঝে দুটির একটি করা আবশ্যক হয়ে পরে

এক – تطبيق তথা দুই হাদীসের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা ।

দুই – ترجيح তথা একটিকে আরেকটির উপর প্রাধান্য দেয়া।

এখান থেকেও বিভিন্ন ইখতিলাফের সূচনা হয়। কারণ, সমন্বয় করার বিভিন্ন তরীকা আছে। দেখা যায়, কেউ একটা গ্রহণ করলে অপরজন আরেকটা গ্রহণ করেছেন। এমনিভাবে প্রাধান্য দেয়ারও নানা তরীকা আছে।

হাফেজ ইরাকী রহ. ১১০ টি তরীকা উল্লেখ করেছেন। তাই শুধু বুখারী-মুসলিমে হাদীসটা আছে, এই ভিত্তিতে কোন হাদীসকে প্রাধান্য দেয়া যায় না। বরং কোন কোন মুহাদ্দিস তো এ কথাও বলেছেন, বুখারী-মুসলিমের হাদীস প্রাধান্য পাওয়া এটা হচ্ছে তারজীহের ১০২ নং পদ্ধতি। তার মানে এর আগে আরও ১০১ টা পদ্ধতি বাকি রয়ে গেছে।

এখানে আরেকটা বাস্তবতা বলে রাখা ভালো। আমরা হাদীসের যে সমস্ত কিতাব দেখি। যেমন, সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম। এই কিতাবগুলোর মুসান্নিফগণ হাদীসের সাথে সাথে ফিকহী মেজাযেরও অধিকারী ছিলেন। যার দরুন তাঁদের অধিকাংশই নিজেদের কিতাবে এমন সব হাদীস স্থান দিয়েছেন, যা তাঁদের ফিকহী মাযহাবের অনুকূল। (মা’আরিফুস সুনান—৬১৩, ৬১৪)

সে মতে বুখারীর হাদীসকে আবু দাউদের হাদীসের উপর প্রাধান্য দেয়ার অর্থ হচ্ছে এক মাযহাবকে আরেক মাযহাবের উপর তারজীহ দেয়া। আর এটা আমাদের মত মুকাল্লিদদের জন্য কোনভাবেই সমীচিন নয়। তাছাড়া যারা মাযহাব বাদ দিয়ে শুধু হাদীস মানতে চাচ্ছিলেন, তাদের কিন্তু ঘুরে ফিরে সেই মাযহাবই মানা হচ্ছে। শুধু ব্যবধান এতটুকু, তারা কোন ইমামের নাগাল পাননি।

চতুর্থ কারণঃ সুন্নাহ সম্পর্কে অবগতির ভিন্নতা।

আমাদের ইমামগণ হাদীসের ব্যাপক জ্ঞান ধারন করতেন। এক্ষেত্রে তাঁদের জানাশোনার কোন কমতি ছিল না। যেমনটা আমরা ইতিপূর্বে ইমাম আবু হানিফা রহ. এর ঘটনা থেকে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছি। তারপরও চার ইমাম এক মারহালার ছিলেন না। অবগতির ভিন্নতা ছিলই। যার দরুন বিভিন্ন ক্ষেত্রে মতভেদের তৈরি হয়েছে। এরপরও যখনই তাঁরা তাঁদের অজানা হাদীস সম্পর্কে জানতেন, তখন আপন মত থেকে ফিরে আসতেন। এরকম নযীরও ফিকহের কিতাবাদি ঘাটলে অনেক পাওয়া যাবে।

পরিশেষে আমি দুইটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে শেষ করছি—

প্রথম প্রশ্নঃ আমরা ফিকহের কিতাবগুলোতে এমন অনেক মাসআলা পাই, যেগুলোর দলীল হিসাবে উপস্থাপন করা হাদীসটা দূর্বল। তাহলে কি সেই হুকুমটাও দূর্বল? আর এমন দূর্বল হাদীস দিয়ে যিনি ফতোয়া দেন তিনি ইমাম হন কি করে?

উত্তরঃ এখানে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা বিষয় জানা থাকা জরুরী—

(ক) ফিকহের কিতাবে উল্লেখিত হাদীসগুলো কোন ইমামের দলীল নয়। বরং এগুলো মুসান্নিফ নিজ থেকে তালাশ করে বের করে নিয়েছেন। তাই এর উপর ভিত্তি করে ‘ইমাম দূর্বল হাদীসকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন’ এ কথা বলা ভুল।

(খ) বহু হাদীস এমন পাওয়া যায়, যেগুলোর সনদ ইমামের যামানা পর্যন্ত বিশুদ্ধ ছিল। পরবর্তী রাবীদের কারণে তাতে ফাটল ধরেছে।

(গ) কখনও কখনও মুসান্নিফ সহীহ হাদীসের পরিবর্তে সমার্থক যয়ীফ হাদীস উল্লেখ করেন শুধুমাত্র এই কারণে যে, হাদীসটা হুকুমের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট। সুতরাং ঐ মাসআলায় কোন সহীহ হাদীস নেই, এমনটা বলা উচিত নয়।

(ঘ) কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায়, ঐ অধ্যায়ে একটিমাত্র যয়ীফ হাদীস ছাড়া কোন সহীহ হাদীসই নেই। তা সত্ত্বেও যয়ীফ হাদীসকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করার কারণ হল, ফুকাহায়ে কেরাম নিজের মতের উপর যয়ীফ হাদীসকে প্রাধান্য দিতে ভালোবাসতেন।

দ্বিতীয় প্রশ্নঃ বর্তমানে তো হাদীসের কিতাবগুলো একেবারেই সহজলভ্য, আমাদের হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা মিনিটের মধ্যেই হাজার হাজার কিতাবের সন্ধান দিতে পারি। তাহলে কি এটা সম্ভব নয় যে, আমরা প্রতিটি অধ্যায়ের সবচেয়ে বিশুদ্ধ হাদীসগুলো একত্র করে একটা নতুন মাযহাব দাঁড় করিয়ে নিব?

উত্তরঃ এখানে প্রথম কথা হচ্ছে, এমনটা ভাবার কোন কারণ নাই যে, আমাদের কাছে যেই পরিমাণ হাদীস পৌঁছেছে ইমামদের কাছে এত হাদীস পৌঁছে নি। বরং বিষয়টা ঠিক তার উল্টো। ঐ সময়কার এক একজন স্কলারের শুধু মুখস্থ হাদীসের সংখ্যাও বোধকরি আমাদের সারা জীবনের পঠিত হাদীসের ফিরিস্তি পেরিয়ে যাবে।

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমরা যেই হাদীসগুলোকে যায়ীফ বা দূর্বল দেখি, এই সবগুলোই কিন্তু ইমামদের কাছে যয়ীফ ছিল না। বরং এর অধিকাংশই বিশুদ্ধ সনদে তাঁদের কাছে সংরক্ষিত ছিল।

শায়েখ ইবনে তাইমিয়া রহ. এর বক্তব্য থেকে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। তিনি বলেছেন, এইসব কিতাব রচনার পূর্বের ইমামগণ হাদীস সম্পর্কে অনেক বেশি অবগত ছিলেন। কিন্তু তাঁদের জানা হাদীসগুলোর অধিকাংশই পরবর্তীতে আমাদের নিকট অজ্ঞাত বা দূর্বল সনদে কিংবা অসম্পূর্ণ হয়ে পৌঁছেছে। (رفع الملام এর ১৮ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)

পরিশিষ্টঃ অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, চার মাযহাবই কাছাকাছি সময়ে প্রতিষ্ঠিত হল কেন? এর আগে সাহাবী যামানায় কেন এর উদ্ভব হয়নি? কিংবা পরবর্তীতে কোন মাযহাব গড়ে ওঠেনি কেন? তাছাড়া বর্তমানে কোন মুজতাহিদে মুতলাক হওয়া সম্ভব নয় কেন?

এর সহজ উত্তর হচ্ছে, ঐ সময়কার পরিবেশ, প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি। তখনকার সময়টা ছিল মুসলমানদের ফুতুহাতের যামানা। মুসলমানগণ বিশাল এলাকা জয় করে এবার তারা জ্ঞান উন্মেষের প্রতি মনোনিবেশ করছিলেন। যার দরুন এই সময়টায় হাদীসের ব্যাপক চর্চা হয়। তাছাড়া বিদআত ও ফেতনা ফাসাদের সূচনা হয়েছিল তাবেয়ীদের যামানা থেকেই। আর সাহবীরা যেহেতু নবীর সোহবত প্রাপ্ত ছিল এইজন্য তাঁরা বিভ্রান্তিতে পড়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ। এসব বিষয়ের প্রতিই সম্ভবত ইমাম আহমদ রহ. ইঙ্গিত করে বলেছেন, “বর্তমান যামানার চেয়ে হাদীস চর্চার অধিক প্রয়োজন আর কোন যামানায় আছে বলে আমি মনে করি না”। সাথী সঙ্গীরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, এর কারণটা কি? তিনি উত্তরে বললেন, “বর্তমানে বিদআত এমনভাবে আত্মপ্রকাশ করছে, কারও কাছে যদি এখন হাদীস না থাকে তবে নিশ্চয়ই সে বিদআতে নিপতিত হবে”।

কারণ যাই হোক না কেন? আল্লাহ তা’আলা তাঁদের তাকওয়া ও খোদাভিরুতা দেখেই সম্ভবত এই মহান নেয়ামত তাঁদেরকে দান করেছিলেন। ذَٰلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاءُ ۚ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ (سورة الجمعة—٤)