ফর ‘সামা’: সিরিয়ার আকাশের গল্প (১ম পর্ব)

প্রকাশিত: ৬:১৭ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২০

লিখেছেন মাহমুদ আবদুল্লাহ

২০১১ সালে আরব বসন্ত যখন সিরিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ল তখন উয়াদ আল খতীব আলেপ্পো ইউনিভার্সিটির ছাত্রী৷ নানা সময় নিজের মোবাইলে বিক্ষোভ মিছিলের দৃশ্য ভিডিও করতেন তিনি। আসাদ বিরোধী বিক্ষোভ, শ্লোগানের এইসব ভিডিওই ছিল বহির্বিশ্বের কাছে সিরিয়ার আরব বসন্তের খবর। উয়াদ আল খাতীবের ধারণা ছিল জনগনের স্বতঃস্ফূর্ত এই আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ভাবেই চলবে, আর তার মেয়াদ হতে পারে বড়জোর ছয় মাস। কিন্তু সিরিয়ার ভাগ্যে এত সহজ সমাধান লেখা ছিল না। দেখতে দেখতে কঠোর হতে শুরু করে আসাদ সরকার, বিক্ষোভ দমন করা হয় নৃশংস উপায়ে। মিছিলে গুলি চলে, দেয়া হয় গণ কবর আর সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন আলেপ্পো নগরীতে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে মানবিক সংকট। সেই সাথে উয়াদ আল খতীবের হার্ডডিস্কে জমা হতে থাকে সেইসব কঠিন সময়ের দিনলিপি। সেইসব ভিডিওর পরবর্তী কাহিনীই আমরা জানব এই লেখা থেকে। 

সেই দিনগুলোতে উয়াদ আল খাতীবের আশ্রয় হয়ে ওঠে শহরের উত্তরাংশে অবস্থিত এক হাসপাতালে। যা আসাদ সরকারের হামলায় আহত রোগীদের জরুরি সেবাপ্রদান করত৷ বলাবাহুল্য চিকিৎসকগণও ছিলেন আসাদ বিরোধী আন্দোলনকারী। ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত উয়াদ আল খাতীব এখানে থেকেছেন৷ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সংবাদ সরবরাহ করেছেন৷ এমনকি প্রেমে পড়েছেন এই হাসপাতালেরই এক চিকিৎসক হামযা আল খাতীবের। উয়াদ সাধারণত নিজ বন্ধুদের আলাপচারিতা, আড্ডা, হাসিঠাট্টা এসব ভিডিও করতেন। শুরুর দিকে সেসবের কোনো মানে বোঝা না গেলেও যখন আসাদ সরকারের হামলায় তাদের বন্ধু মাহমুদ ও গেইথ মারা গেলেন তখন সেইসব ভিডিওই হয়ে উঠলো মূল্যবান। যেখানে দেশের মুক্তির জন্য প্রাণ বিলিয়ে দেয়া দুই যোদ্ধার লড়াই ধরে রাখা আছে। 

যত যুদ্ধই চলুক, যত লড়াইই আসুক জীবন তো থেমে থাকে না। সেই অবরুদ্ধ নগরীতে একদিন বিয়ের জাগলেতা শোনা গেল। বন্ধুদের আয়োজনে সাদা গাউন চড়িয়ে নতুন জীবন শুরু হলো উয়াদ আল খাতীবের। বিয়ের বাজনা বাজলো বটে, কিন্তু সে যতোটা না আনন্দে তার চেয়ে বেশি বোমাবর্ষণের আওয়াজ ঢেকে রাখার চেষ্টায়। সামনে বাগান আর খোলা বারান্দাওয়ালা আলেপ্পোর এক বাড়িতে শুরু হলো তাদের যৌথ জীবন, যেখান থেকে প্রায়শই দেখা যায় রাশান বিমান উড়ে চলেছে কোথাও হামলা চালাতে। কখনো আচমকা বাড়ির উঠানে নেমে আসা শেলের আঘাতে ভেঙে যায় নতুন গজিয়ে ওঠা চারা। আর উয়াদের ক্যামেরা সেসব দৃশ্যের টুকরো টুকরো অংশ ধারণ করে যেতে থাকে৷

দু হাজার ষোল সালের শেষে যখন আসাদ সরকার আর তার মিত্ররা আলেপ্পোর পূর্বাংশের নয়টি হাসপাতালের আটটিই ধ্বংস করে দিয়ে মানবিক সংকটকে চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছে দএয় তখন টিকে থাকে কেবল সেই হাসপাতালটি, যেখানে হামযা আল খাতীব সেবা প্রদান করেন। সারা শহরের খাদ্য সংকট এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে — উয়াদ দেখিয়েছেন — মাত্র একটি আম পেয়ে বন্ধু আফরা কেমন খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলেন। উপর্যুপরি বিমান হামলায় প্রায় বিধ্বস্ত সে হাসপাতাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন হামযা আল খাতীব। আর দু হাজার ষোলর শেষে যখন সপরিবারে পাড়ি জমান তুরস্কে ততদিনে উয়াদ-হামযার ঘর আলো করে এসেছে প্রথম সন্তান। সামা, যার নামে আর কয়েকদিন পর মা উয়াদ নির্মাণ করবেন এক অতুলনীয় ডকুমেন্টারি ফিল্ম। আর তার সাথে পেছনের ফেলে আসা স্মৃতি হিসেবে এলো প্রায় পাঁচশো ঘন্টার ভিডিওক্লিপ, যেখানে ধরা আছে কী করে একটি প্রাণবন্ত শহরে নেমে আসে অমানবিকতার চূড়ান্ত দৃশ্যপট। (আগামী পর্বে সমাপ্য)