ফর ‘সামা’: সিরিয়ার আকাশের গল্প (২য় পর্ব)

প্রকাশিত: ১২:০২ অপরাহ্ণ, জুন ১, ২০২০

লিখেছেন মাহমুদ আবদুল্লাহ

(১ম পর্বের পর থেকে)
উয়াদ আল খাতীবের এই ডকুমেন্টারির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর কোন কেন্দ্রীয় চরিত্র নেই। বরং প্রতিদিনকার ঘটতে থাকা ঘটনা, আশেপাশের প্রতিবেশীরাই এর চরিত্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। এর কারণ হিসেবে উয়াদ আল খাতীব বলেছেন, এর উদ্দেশ্য হলো মানুষ যাতে এটি দেখার দ্বারা তাদের জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট হতে পারে। নিজেকে তাদের জীবনের একটি অংশ হিসেবে কিংবা তাদেরকে নিজের জীবনের অংশ হিসেবে কল্পনা করতে পারে। যা সিরিয়ার সমস্যাকে আরো আন্তরিক ভাবে ফুটিয়ে তুলবে৷ 

যদিও এই ডকুমেন্টারি নির্মিত হয়েছে উয়াদ-হামযার প্রথম সন্তান সামা’কে লক্ষ্য করে এবং এর ভাষা হচ্ছে প্রেমপত্রের ভাষা, কিন্তু এর দ্বারা কেবল সেই শিশুটিই উদ্দেশ্য নয়। উয়াদ বলেন, এটি সমগ্র সিরিয়াবাসীর কণ্ঠস্বর, সব শিশু সব মায়েদের পক্ষ থেকে সারা পৃথিবীর নিকট বার্তা যে এখানে, সিরিয়াতে, কেমন অমানবিক অত্যাচার চলছে। সিরিয়া ও সিরিয়ার বাইরের সকল রিফিউজিদের গল্প এটি। যার মাধ্যমে সিরিয়া সমস্যাকে প্রায় ভুলতে বসা বিশ্ববাসীর নিকট সিরিয়া আবার সংবাদ শিরোনাম হবে।

অবশ্য এই বার্তা ছড়িয়ে দিতে উয়াদ কোন রাজনৈতিক কিংবা দার্শনিক বক্তব্যকে আশ্রয় করেননি। বরং মানুষের জীবনে স্বাভাবিক যেসব ইচ্ছা থাকে, সেগুলোকেই তুলে ধরেছেন। ডকুমেন্টারির মাঝামাঝি তাকে বলতে শোনা যায়, কেন নিজ কন্যার নাম ‘সামা’ রেখেছেন। আরবীতে সামা মানে আকাশ। যেহেতু আকাশের দিকে মানুষ স্বাধীনতার আশা নিয়ে তাকায় তাই তা একইসাথে আশাও বোঝায়। কিন্তু সিরিয়ার আকাশ মানুষকে সেই বেঁচে থাকার আশা জোগায় না, বরং আকাশ থেকে নিয়মিত মৃত্যু নিয়ে আসে। মৃত্যু আর হতাশার সে আকাশ যাতে আবার আশা ও জীবনের আকাশ হতে পারে সেজন্যেই উয়াদ আল খাতীবের এই প্রচেষ্টা। 

অবশেষে যখন ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত হলো সেই পাঁচশো ঘন্টা থেকে বাছাই করা ৯৫ মিনিট৷ নির্মিত হলো ডকুমেন্টারি ‘ফর সামা’, বিশ্বব্যাপী সচেতন দর্শকদের কাছে উন্মোচিত হলো এক অজানা দলিল। মানুষ অবাক হয়ে দেখল, কীভাবে একটি দেশের মানুষের ওপর লড়াই, হত্যা, দুর্ভিক্ষ চাপিয়ে দেয়া হয় কেবল তারা স্বাধীন স্বাভাবিক জীবন চেয়েছিল বলে। মুক্তি পাওয়ার পর পরই ‘ফর সামা’ জয় করে নিয়েছে বাফটা সেরা ডকুমেন্টারি পুরস্কার৷ মনোনয়ন পেয়েছিল গত একাডেমি অ্যাওয়ার্ডেও। কিন্তু পুরস্কার তো বড় কথা নয়, এক দশক ধরে চলতে থাকা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ — উয়াদ আল খাতীবের ভাষায় বিপ্লবের — সবচেয়ে তরতাজা দলীল হিসেবে এটি বিশ্বের সামনে উপস্থিত হয়েছে। যেখানে ছোট্ট মিষ্টি মেয়ে সামার প্রতীকে সকল যুদ্ধাহত শিশুর বেদনা, তাদের অশ্রু সমেত, বঞ্চনার বেদনাকে সঙ্গে করে মানুষের বিবেকের দরজায় কড়া নেড়েছে। 

আলেপ্পোর বাড়ি থেকে ফিরে আসার সময় উয়াদ আল খাতীব নিজ বাগানের যে গোলাপকুঁড়িটি সঙ্গে করে এনেছিলেন, সেটির সুঘ্রাণ, বেদনা যেন এই ডকুমেন্টারির মাধ্যমে পুরো পৃথিবীর মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন। সারা বিশ্বের দর্শকদের সামনে তার নিরাভরণ ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে যেন প্রশ্ন করতে চেয়েছেন, কয়েকটি পরাশক্তির শক্তি পরীক্ষার কেন্দ্র হয়ে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিতে তাদের কেমন লাগবে?